আরও খবর

যে কারণে বাতিল মিশরের গোল (7)
যুক্তরাষ্ট্রে গাড়ির ধাক্কায় বাংলাদেশি মা-মেয়ে নিহত
যে কারণে বাতিল মিশরের গোল (18)
ভেনেজুয়েলার সঙ্গে ‘বিশ্ব ইতিহাসের বৃহত্তম তেল চুক্তি’ ঘোষণা ট্রাম্পের
যে কারণে বাতিল মিশরের গোল (6)
স্কুলে ৩ শিক্ষার্থীকে ছুরিকাঘাতের ঘটনায় ১৪ বছরের সন্দেহভাজন আটক
যে কারণে বাতিল মিশরের গোল (3)
স্বাধীন ফিলিস্তিন ছাড়া ইসরায়েলের সঙ্গে কোনো সম্পর্ক নয়: সৌদি আরব
যে কারণে বাতিল মিশরের গোল (21)
গোপনে মস্কো সফরে কেন সিআইএ প্রধান, যা বললেন ট্রাম্প

নেপাল-চীনে নিহত বেড়ে ৭৯৭, নিখোঁজ ৩ হাজারের বেশি

নেপাল-চীনে নিহত বেড়ে ৭৯৭, নিখোঁজ ৩ হাজারের বেশি, বৃষ্টি, বন্যা ও ভূমিধসে উদ্ধারকাজ কঠিন হয়ে পড়েছে, চলছে মরদেহ শনাক্তকরণ।

নেপাল ও চীনে হিমবাহ ধসে নিহতের সংখ্যা বেড়ে ৭৯৭ জনে দাঁড়িয়েছে এবং দুই দেশে এখনো ৩ হাজার ৪৮ জন নিখোঁজ রয়েছেন। বুধবার হিমালয় অঞ্চলে হিমবাহ ধসের পর বরফ, পাথর, কাদা ও ধ্বংসাবশেষের বিশাল স্রোত পাহাড়ি উপত্যকা ও নদীর ওপর দিয়ে নেমে এসে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি ঘটায়। উদ্ধার অভিযান জোরদার হলেও ভারী বৃষ্টি, নদীর পানি বৃদ্ধি, নতুন ভূমিধস ও বিপুল ধ্বংসাবশেষের কারণে কাজ অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে।

রেড ক্রসের হিসাবে, এই দুর্যোগে ৯০ হাজারের বেশি মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে থাকতে পারেন। চীন জানিয়েছে, দীর্ঘমেয়াদি বৈশ্বিক উষ্ণায়নের প্রভাবে হিমবাহ অস্থিতিশীল হয়ে পড়ার সঙ্গে এই দুর্যোগের সম্পর্ক রয়েছে।

নেপাল-চীনে হিমবাহ ধসে নিহত ও নিখোঁজের হিসাব

নেপালের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, দেশটিতে এখন পর্যন্ত ৭৮১ জনের মৃত্যু হয়েছে। নিখোঁজ রয়েছেন ২ হাজার ৫০২ জন

অন্যদিকে, চীনের গিরং কাউন্টিতে ১৬ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং সেখানে আরও ৫৪৬ জন নিখোঁজ রয়েছেন। ফলে দুই দেশে মোট নিহতের সংখ্যা ৭৯৭ এবং নিখোঁজের সংখ্যা ৩ হাজার ৪৮ জনে দাঁড়িয়েছে।

চীন আরও জানিয়েছে, তিব্বতে ২৩টি দেশের ২৬১ জন বিদেশি নাগরিকের কোনো খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না।

দুর্যোগের পর থেকে দুই দেশের দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় উদ্ধারকারী দল কাজ করছে। তবে প্রতিকূল আবহাওয়া ও ভূপ্রকৃতির কারণে উদ্ধার কার্যক্রম বারবার বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

উদ্ধার অভিযানে নতুন করে বড় বাধা

রবিবারও নেপাল ও চীনের উদ্ধারকারী দল দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় অভিযান চালিয়েছে। কিন্তু ভারী বৃষ্টি, নদীর পানি বেড়ে যাওয়া এবং কাদা-পাথরসহ বিপুল পরিমাণ ধ্বংসাবশেষের কারণে উদ্ধারকাজ ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

নেপালের স্থানীয় পুলিশ জানিয়েছে, কয়েক ঘণ্টার বৃষ্টিতে ত্রিশূলী নদীর পানি বেড়ে গেছে। পরিস্থিতি বিবেচনায় স্থানীয় বাসিন্দা ও উদ্ধারকর্মীদের উঁচু এলাকায় সরিয়ে নেওয়া হয়। এতে নতুন করে বন্যার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

শুক্রবার থেকে খারাপ আবহাওয়া ও বন্যার আশঙ্কায় কয়েক দফা উদ্ধার অভিযান বন্ধও রাখতে হয়েছে।

সীমান্তে তৈরি হ্রদ নিয়ে উদ্বেগ

দুর্যোগের পর নেপাল-চীন সীমান্তে একটি হ্রদের সৃষ্টি হয়েছে। হ্রদের পানি উপচে নেপালের লেন্দে খোলা ও ত্রিশূলী নদীতে পড়লে নতুন করে বন্যা দেখা দিতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

চীনের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম সিসিটিভি জানিয়েছে, ভাটির এলাকার জন্য হুমকি হয়ে ওঠা হ্রদটির বেশির ভাগ পানি শনিবার সন্ধ্যার মধ্যে বের হয়ে যায়। তবে শনিবার রাতে ড্রোনে হ্রদের প্রায় ২ দশমিক ৮ কিলোমিটার ভাটিতে একটি ভূমিধস শনাক্ত হয়।

এই ভূমিধসের কারণে সেখানে নতুন একটি প্রাকৃতিক বাঁধ তৈরি হয়েছে। ফলে ওই এলাকায় আবার পানি জমতে শুরু করেছে।

জলবিদ্যুৎ প্রকল্প ঘিরে নেপালে উদ্ধার অভিযান

নেপালে বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত পাঁচটি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পকে কেন্দ্র করে উদ্ধার তৎপরতা জোরদার করা হয়েছে। এর মধ্যে আপার ত্রিশূলী প্রকল্পও রয়েছে।

কর্তৃপক্ষ শুক্রবার জানিয়েছিল, প্রকল্পটির একটি সুড়ঙ্গে প্রায় ৩৫০ জন আটকা পড়ে থাকতে পারেন। তাদের উদ্ধারে রবিবার নেপালের সেনাবাহিনী দুর্গম এলাকায় ভারী যন্ত্রপাতি নিয়ে যায়।

উদ্ধারকারীরা একটি সুড়ঙ্গের প্রবেশপথে পৌঁছেছেন। সেখানে জমে থাকা কাদা, পাথর ও অন্যান্য ধ্বংসাবশেষ সরানোর কাজ শুরু হয়েছে।

কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, সুড়ঙ্গের প্রবেশপথ নিরাপদ করা গেলে ভেতরে অক্সিজেন সরবরাহের ব্যবস্থা করা হবে। এরপর ক্যামেরা নিয়ে উদ্ধারকারী দল সুড়ঙ্গের ভেতরে প্রবেশ করবে।

নেপালে প্রায় ১০ হাজার সেনা উদ্ধারকাজে নিয়োজিত রয়েছেন। তাদের সঙ্গে চীন ও ভারতের বিশেষজ্ঞ উদ্ধারকারী দলও কাজ করছে।

জাতীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের প্রধান ধরম রাজ উপ্রেতি বলেছেন, সুড়ঙ্গের সামনে বিপুল পরিমাণ ধ্বংসাবশেষ জমে থাকায় উদ্ধারকাজ অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে। সেখানে পথ তৈরির জন্য বিস্ফোরক ব্যবহার করা যাচ্ছে না।

নিখোঁজদের স্বজনদের অপেক্ষা, শনাক্ত করা যাচ্ছে না মরদেহ

দুর্যোগের পর কয়েক দিন ধরে নিখোঁজ স্বজনদের সন্ধানে হাসপাতাল, মর্গ ও ত্রাণকেন্দ্রে ঘুরছেন পরিবারের সদস্যরা।

এরই মধ্যে শনাক্ত করা সম্ভব না হওয়া শত শত মরদেহ গণকবর দিতে শুরু করেছে নেপালের কর্তৃপক্ষ। মরদেহগুলো দ্রুত পচে যাওয়ায় জনস্বাস্থ্যের ঝুঁকি তৈরি হওয়ায় এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

দুর্যোগকবলিত এলাকা থেকে প্রায় ২০০ কিলোমিটার দূরে চিতওয়ান জেলার দেবঘাটের একটি জঙ্গলে শত শত কবর খোঁড়া হয়েছে। বন্যার পানিতে ভেসে আসা মরদেহগুলো সেখানে দাফন করা হচ্ছে।

চিতওয়ানের জেলা কর্মকর্তা গণেশ আরিয়াল জানিয়েছেন, মরদেহ দ্রুত পচে যাওয়ায় জনস্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকি তৈরি হচ্ছিল। তাই মরদেহ দাফন করা ছাড়া কর্তৃপক্ষের সামনে আর কোনো উপায় ছিল না।

শনিবার শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি এমন ৯৬টি মরদেহ দাফন করা হয়েছে। রবিবার আরও ১০০টির বেশি মরদেহ দাফনের পরিকল্পনা ছিল।

মরদেহ শনাক্তে ডিএনএ ও ফরেনসিক সহায়তার প্রয়োজন

একই সময়ে উদ্ধারকারী দল নদী ও ধ্বংসাবশেষের মধ্য থেকে আরও মরদেহ উদ্ধারের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।

পরিবারগুলো যাতে পরবর্তী সময়ে মরদেহ শনাক্ত করতে পারে, সে জন্য ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে। কোন মরদেহ কোথায় দাফন করা হয়েছে, সেই তথ্যও সংরক্ষণ করা হচ্ছে।

নেপালের পুলিশ কর্মকর্তা অনিল থাপা জানিয়েছেন, এখন পর্যন্ত উদ্ধার করা মরদেহের অর্ধেকের বেশি শনাক্ত করার মতো অবস্থায় নেই। অনেক মরদেহের মুখ চেনার উপায় নেই। কোথাও শুধু হাত বা পা পাওয়া গেছে, আবার কোথাও শরীরের কিছু অংশ উদ্ধার হয়েছে।

নেপালের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র লোক বাহাদুর ছেত্রী জানিয়েছেন, কিছু ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক সহায়তা প্রয়োজন। এর মধ্যে রয়েছে সুড়ঙ্গে আটকে পড়াদের উদ্ধার, ডিএনএ পরীক্ষা, মরদেহ সংরক্ষণের জন্য হিমায়িত ব্যবস্থা এবং পচে যাওয়া মরদেহ শনাক্তে ফরেনসিক পরীক্ষা।

চীনে উদ্ধার তৎপরতা ও আন্তর্জাতিক নাগরিকদের খোঁজ

চীনের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম সিসিটিভি জানিয়েছে, দেশটি ২ হাজার ১০০-এর বেশি উদ্ধারকর্মী মোতায়েন করেছে। ত্রাণ ও উদ্ধার কার্যক্রমে সহায়তার জন্য অন্তত ২২ কোটি ইউয়ান, অর্থাৎ প্রায় ৩ কোটি ২৭ লাখ ডলার, বরাদ্দ করা হয়েছে।

দুর্গম এলাকায় কাজ করা উদ্ধারকারীদের কাছে চীন আকাশপথে সরঞ্জাম ও ত্রাণসামগ্রী পাঠাচ্ছে। নিখোঁজ মানুষদের সন্ধানে দেশটির সেনাবাহিনী জীবন শনাক্ত করার বিশেষ যন্ত্রও ব্যবহার করছে।

তিব্বতে নিখোঁজ ২৩ দেশের ২৬১ জন বিদেশি নাগরিকের সন্ধানেও পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।

চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই শনিবার নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে ফোনে কথা বলেছেন। সিসিটিভির প্রতিবেদনে বলা হয়, ওয়াং ই এই ঘটনাকে সাম্প্রতিক বছরগুলোর সবচেয়ে ভয়াবহ সীমান্তপারের দুর্যোগ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তাঁর মতে, উদ্ধার অভিযান নজিরবিহীনভাবে কঠিন ও জটিল হয়ে উঠেছে।

জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে দুর্যোগের সম্পর্ক

সিসিটিভির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বৈশ্বিক উষ্ণায়নের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবে হিমবাহ অস্থিতিশীল হয়ে পড়ার সঙ্গে এই দুর্যোগের সম্পর্ক রয়েছে।

তিব্বত মালভূমিতে হিমবাহ ও বরফনির্ভর প্রাকৃতিক দুর্যোগের ধরনেও পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

চীনা বিজ্ঞানীদের অনুসন্ধানের বরাত দিয়ে সিসিটিভি জানিয়েছে, নেপালের দিক থেকে আসা কাদা ও ধ্বংসাবশেষের স্রোত গিরং সীমান্ত এলাকায় পৌঁছাতে মাত্র ছয় থেকে সাত মিনিট সময় নিয়েছিল।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে পানি, কাদা ও ধ্বংসাবশেষের প্রবল স্রোতে ভবন ও বিভিন্ন স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হতে দেখা গেছে। একই সময়ে মানুষকে প্রাণ বাঁচাতে নিরাপদ স্থানে ছুটে যেতে দেখা যায়।

নেপাল ও চীনের সীমান্তবর্তী দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় এখনো উদ্ধার অভিযান চলছে। তবে আবহাওয়ার অবনতি, নদীর পানি বৃদ্ধি এবং নতুন ভূমিধসের আশঙ্কা উদ্ধারকারীদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বিশেষ করে নেপালের ত্রিশূলী নদী ও আশপাশের এলাকায় পানি বৃদ্ধির কারণে পরিস্থিতি দ্রুত পরিবর্তিত হতে পারে। একই সঙ্গে প্রাকৃতিক বাঁধ তৈরি হওয়া এলাকায় পানি জমে যাওয়াও নতুন ঝুঁকি তৈরি করেছে।

অন্যদিকে, নিখোঁজদের সন্ধানের পাশাপাশি উদ্ধার হওয়া মরদেহ শনাক্ত করা এবং পরিবারের কাছে তথ্য পৌঁছে দেওয়াও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এ জন্য ডিএনএ নমুনা ও ফরেনসিক পরীক্ষার প্রয়োজন হচ্ছে।

নেপাল ও চীনে হিমবাহ ধসের পর মৃতের সংখ্যা ৭৯৭ জনে পৌঁছেছে এবং ৩ হাজার ৪৮ জন এখনো নিখোঁজ। দুর্গম পাহাড়ি এলাকা, ভারী বৃষ্টি, নদীর পানি বৃদ্ধি, ধ্বংসাবশেষ ও নতুন ভূমিধসের আশঙ্কায় উদ্ধার অভিযান কঠিন হয়ে পড়েছে।

নেপালে হাজারো সেনা ও আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞ দল উদ্ধারকাজে অংশ নিচ্ছে। চীনও দুই হাজারের বেশি উদ্ধারকর্মী মোতায়েন করেছে। একই সঙ্গে নিখোঁজদের সন্ধান, আটকে পড়াদের উদ্ধার এবং শনাক্ত করা সম্ভব নয় এমন মরদেহের ব্যবস্থাপনা—সবকিছু মিলিয়ে দুই দেশেই বড় ধরনের উদ্ধার ও মানবিক তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে।

সর্বাধিক পঠিত