গোপনে মস্কো সফরে কেন সিআইএ প্রধান, যা বললেন ট্রাম্প, বললেন এটি ‘সেমি-রুটিন’ সফর। তবে ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল জানিয়েছে, ন্যাটো নিয়ে ছিল গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা।
মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএর পরিচালক জন র্যাটক্লিফের আকস্মিক মস্কো সফর ঘিরে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। আগে থেকে ঘোষণা না দেওয়া এই সফরকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ‘খুবই সেমি-রুটিন’ বলে বর্ণনা করেছেন। তবে মার্কিন সংবাদমাধ্যম ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাশিয়াকে ন্যাটোর সদস্য দেশগুলোর ওপর হামলা না করার বিষয়ে সতর্ক করাই সফরের মূল উদ্দেশ্য ছিল।
সিআইএ প্রধানের মস্কো সফরটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে ইউক্রেন যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে। কারণ, সিআইএর কোনো পরিচালকের এমন সফর বেশ বিরল। একই সঙ্গে সফরের উদ্দেশ্য নিয়ে মার্কিন প্রশাসনের বক্তব্য এবং সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্যের মধ্যে পার্থক্যও আলোচনায় এসেছে।
কীভাবে প্রকাশ্যে আসে সফরের খবর
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত মঙ্গলবার সরকারি একটি উড়োজাহাজে মস্কোর উদ্দেশে যাত্রা করেন জন র্যাটক্লিফ। যুক্তরাষ্ট্রের মেরিল্যান্ডের অ্যান্ড্রুজ বিমানঘাঁটি থেকে তাঁর যাত্রা শুরু হয়।
তবে সফরটি আগে থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হয়নি। হোয়াইট হাউস, সিআইএ, পেন্টাগন এবং মার্কিন বিমানবাহিনী—কোনো পক্ষই প্রথম দিকে এ বিষয়ে মন্তব্য করতে রাজি হয়নি।
পরদিন বুধবার ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেশকভ র্যাটক্লিফের মস্কো সফরের বিষয়টি নিশ্চিত করেন। তবে তিনি জানান, সফরের সময় র্যাটক্লিফ রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেননি।
ট্রাম্পের ভাষ্যে সিআইএ প্রধানের মস্কো সফর

রক্ষণশীল রেডিও উপস্থাপক গ্লেন বেককে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছে র্যাটক্লিফের মস্কো যাওয়ার কারণ জানতে চাওয়া হয়।
সেখানে প্রশ্ন ওঠে, রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ন্যাটোর প্রতিরোধক্ষমতা পরীক্ষা করতে পারেন—এমন আশঙ্কা থেকেই কি সিআইএ প্রধান রাশিয়া গেছেন? পাশাপাশি ইরানের ওপর আরও কঠোর মার্কিন নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়নে রাশিয়ার সহযোগিতা পাওয়ার বিষয়টিও সফরের সম্ভাব্য কারণ হিসেবে আলোচিত হয়।
ট্রাম্প এসব সম্ভাবনা সরাসরি নাকচ করেন। তিনি বলেন, সফরটি এসব কোনো কারণেই হয়নি। গ্লেন বেক ওইসব জল্পনাকে ‘পাগলামি’ হিসেবে উল্লেখ করলে ট্রাম্প র্যাটক্লিফের সফরকে ‘খুবই সেমি-রুটিন’ বলে বর্ণনা করেন।
ট্রাম্প আরও বলেন, তিনি মানুষকে হতাশ করতে চান না এবং যুক্তরাষ্ট্র ইউক্রেন যুদ্ধের সমাপ্তি দেখতে চায়।
র্যাটক্লিফকে নিয়ে ট্রাম্পের প্রশংসা
সিআইএ পরিচালক জন র্যাটক্লিফের প্রশংসাও করেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, র্যাটক্লিফ একজন অসাধারণ মানুষ এবং তিনি সিআইএর প্রধান হিসেবে মস্কো সফর করেছেন।
ট্রাম্প স্পষ্ট করে বলেন, আগে যেসব সম্ভাব্য কারণের কথা বলা হয়েছে, সেগুলোর কোনো একটির জন্য র্যাটক্লিফ মস্কো যাননি। তবে একই সঙ্গে তিনি ইঙ্গিত দেন, সফর থেকে পরবর্তী সময়ে গুরুত্বপূর্ণ কোনো ফলাফল সামনে আসতে পারে।
ট্রাম্পের ভাষায়, এই সফর থেকে ‘কিছু একটা বেরিয়ে আসতে পারে’।
অর্থাৎ, সফরটির তাৎক্ষণিক উদ্দেশ্য নিয়ে বিস্তারিত না বললেও এর সম্ভাব্য পরবর্তী ফলাফল সম্পর্কে মার্কিন প্রেসিডেন্টের বক্তব্যে কিছুটা প্রত্যাশার ইঙ্গিত পাওয়া যায়।
ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের ভিন্ন তথ্য
তবে সিআইএ প্রধানের মস্কো সফর নিয়ে ট্রাম্পের বক্তব্যের সঙ্গে পুরোপুরি মিলছে না ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের প্রতিবেদন।
বুধবার প্রকাশিত প্রতিবেদনে সংবাদমাধ্যমটি সফরের বিষয়ে অবহিত ব্যক্তিদের উদ্ধৃত করে জানায়, রাশিয়াকে ন্যাটোর সদস্য দেশগুলোর ওপর হামলা না করার বিষয়ে সতর্ক করাই ছিল র্যাটক্লিফের আকস্মিক মস্কো সফরের মূল উদ্দেশ্য।
এ তথ্য অনুযায়ী, সফরটি শুধু নিয়মিত যোগাযোগ বা রুটিন কার্যক্রমের অংশ ছিল না; বরং ন্যাটোর নিরাপত্তা নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দেওয়ার বিষয়ও এর সঙ্গে যুক্ত ছিল।
তবে এই প্রতিবেদনের তথ্য এবং ট্রাম্পের বক্তব্যের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। তাই সফরের প্রকৃত উদ্দেশ্য নিয়ে এখনো ভিন্ন ব্যাখ্যা সামনে রয়েছে।
২০২১ সালের পর প্রথম সিআইএ পরিচালকের মস্কো সফর
সিআইএ প্রধানের মস্কো সফরের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো এর সময়কাল। ২০২১ সালের নভেম্বরের পর এটিই মস্কোতে কোনো সিআইএ পরিচালকের প্রথম সফর।
২০২১ সালের নভেম্বর মাসে র্যাটক্লিফের পূর্বসূরি বিল বার্নস মস্কো সফর করেছিলেন। সে সময় তিনি ভ্লাদিমির পুতিনকে ইউক্রেনের বিরুদ্ধে সামরিক হামলা চালালে এর পরিণতি সম্পর্কে সতর্ক করেছিলেন।
কিন্তু পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহে পুতিন সেই সতর্কতা উপেক্ষা করেন। ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে রাশিয়া ইউক্রেনে পূর্ণমাত্রার হামলা শুরু করে।
এই অতীতের কারণে বর্তমান সিআইএ প্রধানের মস্কো সফরকে আলাদাভাবে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। বিশেষ করে ইউক্রেন যুদ্ধ এখনো চলমান থাকায় রাশিয়ার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের গোপন বা আনুষ্ঠানিক যোগাযোগের প্রতিটি ঘটনাই আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নজর কাড়ছে।
ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধে ট্রাম্পের প্রচেষ্টা
ডোনাল্ড ট্রাম্প দীর্ঘদিন ধরেই ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধের বিষয়ে কাজ করার কথা বলে আসছেন। দ্বিতীয় মেয়াদে প্রেসিডেন্ট হওয়ার আগে তিনি এমন দাবিও করেছিলেন যে, ক্ষমতায় ফিরলে প্রথম দিনেই যুদ্ধের অবসান ঘটাতে পারবেন।
তবে বাস্তবে তাঁর সেই প্রচেষ্টা এখনো সফল হয়নি।
ট্রাম্পের বক্তব্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধের সমাপ্তি চায় এবং বর্তমানে উভয় পক্ষই যুদ্ধ বন্ধ করতে আগ্রহী। তবে যুদ্ধ শেষ করার ক্ষেত্রে এখন পর্যন্ত বড় কোনো চূড়ান্ত ফলাফল সামনে আসেনি।
এই পরিস্থিতিতে র্যাটক্লিফের মস্কো সফরকে ঘিরে নতুন করে কৌতূহল তৈরি হয়েছে। কারণ, গোয়েন্দা সংস্থার প্রধানের এমন আকস্মিক সফর সাধারণ কূটনৈতিক যোগাযোগের চেয়ে আলাদা গুরুত্ব বহন করতে পারে—যদিও সফরের পূর্ণ উদ্দেশ্য প্রকাশ করা হয়নি।
ট্রাম্প-পুতিন সম্পর্ক ও নতুন জল্পনা
ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে ডোনাল্ড ট্রাম্পের ব্যক্তিগত সম্পর্ক তুলনামূলকভাবে বন্ধুত্বপূর্ণ হিসেবে বর্ণনা করা হলেও, সেই সম্পর্ক এখন পর্যন্ত ইউক্রেন যুদ্ধের অবসানে কার্যকর ফল আনতে পারেনি।
এর মধ্যেই সিআইএ প্রধানের মস্কো সফর নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। একদিকে ট্রাম্প সফরটিকে ‘সেমি-রুটিন’ বলেছেন, অন্যদিকে ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল এটিকে ন্যাটোকে ঘিরে রাশিয়াকে সতর্ক করার উদ্যোগ হিসেবে উল্লেখ করেছে।
ফলে সিআইএ প্রধানের মস্কো সফর নিয়ে মূল প্রশ্ন এখন দাঁড়িয়েছে—এটি কি কেবল নিয়মিত যোগাযোগের অংশ, নাকি ইউক্রেন যুদ্ধ ও ন্যাটোর নিরাপত্তাকে ঘিরে আরও বড় কোনো বার্তার অংশ?
বর্তমান তথ্যের ভিত্তিতে এর চূড়ান্ত উত্তর নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না।
পুতিনের সঙ্গে সাক্ষাৎ হয়নি
ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেশকভ জানিয়েছেন, র্যাটক্লিফ মস্কো সফরের সময় ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেননি।
এ তথ্যটি সফরের চরিত্র বোঝার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, মস্কো সফর হলেও রুশ প্রেসিডেন্টের সঙ্গে সরাসরি বৈঠক হয়নি। ফলে কার সঙ্গে র্যাটক্লিফ যোগাযোগ করেছেন বা কী ধরনের আলোচনা হয়েছে, সে বিষয়ে প্রকাশ্যভাবে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি।
সফরের উদ্দেশ্য নিয়ে মার্কিন প্রশাসনও বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেয়নি। তাই ট্রাম্পের বক্তব্য, ক্রেমলিনের নিশ্চিতকরণ এবং ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের প্রতিবেদন—এই তিনটি সূত্রের তথ্যের ওপরই বর্তমানে আলোচনার বড় অংশ নির্ভর করছে।
ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, এই সফর থেকে পরবর্তী সময়ে ‘কিছু একটা বেরিয়ে আসতে পারে’। একই সঙ্গে তিনি ইউক্রেন যুদ্ধ শেষ করতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকার কথাও জানিয়েছেন।
অন্যদিকে, ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের প্রতিবেদনে ন্যাটোর সদস্য দেশগুলোর বিরুদ্ধে সম্ভাব্য রুশ হামলা ঠেকাতে সতর্কবার্তার কথা বলা হয়েছে।
তাই সিআইএ প্রধানের মস্কো সফরের তাৎক্ষণিক ফলাফল স্পষ্ট না হলেও এর রাজনৈতিক ও কৌশলগত গুরুত্ব নিয়ে আলোচনা অব্যাহত রয়েছে। বিশেষ করে ২০২১ সালের পর প্রথম কোনো সিআইএ পরিচালকের মস্কো সফর হওয়ায় ঘটনাটি আলাদা গুরুত্ব পেয়েছে।
সিআইএ প্রধানের মস্কো সফর নিয়ে পরবর্তী কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য বা ফলাফল সামনে এলে তখনই সফরের প্রকৃত উদ্দেশ্য সম্পর্কে আরও পরিষ্কার ধারণা পাওয়া সম্ভব হবে।
টক্লিফের আকস্মিক মস্কো সফর আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে। ডোনাল্ড ট্রাম্প সফরটিকে ‘সেমি-রুটিন’ হিসেবে দেখালেও ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের প্রতিবেদনে ন্যাটো নিয়ে রাশিয়াকে সতর্ক করার তথ্য এসেছে। তবে ক্রেমলিন জানিয়েছে, র্যাটক্লিফের সঙ্গে ভ্লাদিমির পুতিনের সাক্ষাৎ হয়নি।
এখন পর্যন্ত সফরের পূর্ণ উদ্দেশ্য প্রকাশ্যে না আসায় বিষয়টি নিয়ে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ সীমিত। তবে ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধে যুক্তরাষ্ট্রের চলমান প্রচেষ্টার মধ্যে এই সফর নতুন করে নজর কেড়েছে।





