এইমাত্র

আরও খবর

যে কারণে বাতিল মিশরের গোল (3)
সাগরে সুস্পষ্ট লঘুচাপ, সমুদ্রবন্দরে সতর্কসংকেত বহাল
যে কারণে বাতিল মিশরের গোল
গঙ্গা চুক্তি: নতুন উদ্যোগ বাংলাদেশের, জেআরসিতে আলোচনা চায় ভারত
যে কারণে বাতিল মিশরের গোল
শাহজালালের থার্ড টার্মিনাল ৯৯.৯১% কাজ শেষ, তবু ব্যয় বাড়ছে ৯০২ কোটি টাকা
যে কারণে বাতিল মিশরের গোল (27)
মালয়েশিয়ায় কর্মী নিয়োগে মানতে হবে যেসব নির্দেশনা
যে কারণে বাতিল মিশরের গোল (24)
মসলা-ঘিসহ ১০ নিম্নমানের পণ্য বাজার থেকে প্রত্যাহারের নির্দেশ

ঢাকায় চার কৌশলে ছিনতাই হচ্ছে, হিসাব নেই, বিচারও নেই

ঢাকায় চার কৌশলে ছিনতাই হচ্ছে, হিসাব নেই, বিচারও নেই, ছয় মাসের ২২ আলোচিত ঘটনায় চার কৌশল, অস্ত্রের ব্যবহার ও তিন নারীর মৃত্যু নগরবাসীর নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে বড় প্রশ্ন তুলছে।

রাজধানীতে ঢাকায় ছিনতাই এখন শুধু রাত বা নির্জন সড়কের অপরাধে সীমাবদ্ধ নেই। গত ছয় মাসে আলোচিত ২২টি ঘটনা বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, চলন্ত রিকশা-অটোরিকশা থেকে ব্যাগ টেনে নেওয়া, দলবদ্ধভাবে অস্ত্র দেখিয়ে টাকা ও মুঠোফোন ছিনিয়ে নেওয়া, নগদ অর্থ বহনকারীদের লক্ষ্য করা এবং ভুক্তভোগীকে আটকে অতিরিক্ত টাকা আদায়ের চেষ্টা—এই চার ধরনের কৌশল বেশি ব্যবহৃত হচ্ছে।

প্রথম আলোর বিশ্লেষণ করা এসব ঘটনায় ২৬ জন সরাসরি ভুক্তভোগীর তথ্য পাওয়া গেছে। তাঁদের মধ্যে ২০ জন পুরুষ ও ৬ জন নারী। তবে নারী ভুক্তভোগীর সংখ্যা কম হলেও তাঁদের পরিণতি ছিল ভয়াবহ। চারটি প্রাণহানির ঘটনার তিনটিতেই নারী নিহত হয়েছেন।

সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, ছিনতাইয়ের প্রকৃত সংখ্যা নিয়ে পুলিশের মামলার হিসাবও পুরো চিত্র তুলে ধরছে না। অনেক ভুক্তভোগী মামলা করতে যান না। আবার থানায় যাওয়ার পরও কোনো কোনো ক্ষেত্রে ছিনতাইয়ের মামলা না নিয়ে ‘হারানো’ মুঠোফোনের সাধারণ ডায়েরি বা জিডি নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।

তিন নারীর মৃত্যু, একই ছিনতাই কৌশলে

গত ছয় মাসে চলন্ত রিকশা বা অটোরিকশা থেকে ব্যাগ টেনে নেওয়ার ঘটনায় তিন নারী প্রাণ হারিয়েছেন। ২৯ আগস্ট ভোরে ঢাকায় চোখের চিকিৎসা করাতে এসে ছিনতাইকারীর ব্যাগ টানে রিকশা থেকে পড়ে মারা যান বগুড়ার গাবতলী উপজেলার বাগবাড়ি সরকারি বালিকা প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক রনজিলা পারভিন।

এর আগে উত্তরায় মুক্তা আক্তার এবং জুনে শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সামনে সোহেলি ইসলাম একই ধরনের ছিনতাইয়ের শিকার হয়ে মারা যান।

তিনটি ঘটনাতেই ভুক্তভোগীরা চলন্ত যানে ছিলেন। ছিনতাইকারীরা পাশ বা পেছন থেকে ব্যাগ ধরে টান দেওয়ায় তাঁরা যান থেকে পড়ে গুরুতর আহত হন এবং পরে মারা যান।

শুধু এই তিন ঘটনাই নয়, বিশ্লেষণ করা ২২টি ঘটনার মধ্যে অন্তত সাতটিতে ভুক্তভোগীরা রিকশা, অটোরিকশা বা অন্য কোনো যানবাহনে ছিলেন। দুই ঘটনায় চলন্ত ট্রেনেও ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটেছে। আরও দুই নারী বাসা বা গন্তব্যে পৌঁছে রিকশা থেকে নামার পরপরই আক্রান্ত হয়েছেন।

অর্থাৎ রাজধানীতে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যাওয়ার সময়ই মানুষের ঝুঁকি বেশি দেখা যাচ্ছে।

ছিনতাইয়ের খবরই জানে না থানা

ছিনতাইয়ের প্রকৃত চিত্র বোঝার ক্ষেত্রে মামলা ও জিডির তথ্য বড় বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। গত ফেব্রুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত রাজধানীতে দস্যুতার মামলা হয়েছে ১৪৯টি এবং ডাকাতির মামলা হয়েছে ১৮টি। কিন্তু প্রকৃত ছিনতাইয়ের সংখ্যা এসব মামলার হিসাব থেকে জানা যাচ্ছে না।

কারণ, ভুক্তভোগীদের একটি বড় অংশ থানায় মামলা করতে যান না। আবার থানায় যাওয়ার পরও কোনো কোনো ক্ষেত্রে মামলা না নিয়ে সাধারণ ডায়েরি করার অভিযোগ পাওয়া গেছে।

এর একটি উদাহরণ সোহেলি ইসলামের ঘটনা। ওষুধ কোম্পানির কর্মকর্তা সোহেলি ঈদের ছুটি শেষে মেয়েকে নিয়ে দিনাজপুর থেকে ঢাকায় ফিরছিলেন। ৬ জুন ভোরে বাস থেকে নেমে রিকশায় বাসায় যাওয়ার সময় শহীদ সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালের সামনে মোটরসাইকেলে আসা ছিনতাইকারীরা তাঁর ব্যাগ ধরে টান দেয়। তিনি রাস্তায় পড়ে মাথায় গুরুতর আঘাত পান। পাঁচ দিন পর হাসপাতালে তাঁর মৃত্যু হয়।

তাঁর মৃত্যুর খবর প্রকাশের সময় পর্যন্ত পরিবার কোনো অভিযোগ করেনি। মোহাম্মদপুর ও শেরেবাংলা নগর থানার কর্মকর্তারাও তখন এমন ছিনতাইয়ের ঘটনা সম্পর্কে অবগত থাকার কথা জানাননি। পরে ১৩ জুন মামলা হয় এবং একজনকে গ্রেপ্তার করা হয়।

এতে দেখা যায়, প্রাণহানির মতো গুরুতর ঘটনাও মামলা হওয়ার আগে পুলিশের অপরাধের হিসাবের বাইরে ছিল।

‘হারানো ফোন’ হয়ে যাচ্ছে ছিনতাইয়ের অভিযোগ

মোহাম্মদপুরের চাঁন মিয়া হাউজিংয়ে ১১ মে বিকেলে এক কলেজছাত্রকে রিকশা থামিয়ে কয়েকজন ঘিরে ধরে। ধারালো অস্ত্র দেখিয়ে তাঁর মুঠোফোন, টাকা, মানিব্যাগ ও অন্যান্য জিনিস নিয়ে যায় তারা। পুরো ঘটনা সিসিটিভিতে ধরা পড়ে।

কিন্তু ভুক্তভোগীর বাবা গণমাধ্যমকে জানান, তাঁরা থানায় মামলা করতে গেলে পুলিশ মামলা না নিয়ে মুঠোফোন হারানোর জিডি করতে বলে।

গত ছয় মাসে ছিনতাইয়ের শিকার সাত ভুক্তভোগীর সঙ্গে কথা বলেছে প্রথম আলো। তাঁদের কেউ থানায় মামলা করেননি। চারজন মামলা করতেই যাননি। আর তিনজন ছিনতাইয়ের পর থানায় গেলে জিডি নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন।

১৬ আগস্ট রাতে মৌচাক এলাকায় ছিনতাইয়ের শিকার হয়ে গুরুতর আহত হন নোমান ছিদ্দিক। তাঁর মুঠোফোন ছিনিয়ে নেওয়া হয়। পরে রমনা থানায় মামলা করতে গেলে মুঠোফোন হারানোর ঘটনায় জিডি নেওয়া হয়। জিডিতে ফোনটি হারিয়ে যাওয়ার কথা লেখা হলেও ভুক্তভোগীর বর্ণনা অনুযায়ী ঘটনাটি ছিল ছিনতাই।

এ ধরনের ঘটনা ঢাকায় ছিনতাই-এর প্রকৃত পরিসংখ্যানকে আড়াল করতে পারে। অস্ত্রের মুখে বা জোর করে মুঠোফোন নেওয়ার ঘটনা যদি হারানো হিসেবে নথিভুক্ত হয়, তাহলে সেটি ছিনতাইয়ের সরকারি হিসাবের অংশ হয় না।

ঢাকায় ছিনতাই: চার কৌশলে বাড়ছে ঝুঁকি

প্রথম আলোর বিশ্লেষণ করা ২২টি আলোচিত ঘটনায় মূলত চার ধরনের কৌশল সামনে এসেছে।

১. চলন্ত যান থেকে ব্যাগ টেনে নেওয়া

এটি সবচেয়ে প্রাণঘাতী কৌশল হিসেবে দেখা গেছে। মোটরসাইকেল, পিকআপ, সিএনজি বা অন্য যান থেকে ছিনতাইকারীরা চলন্ত রিকশা-অটোরিকশার যাত্রীর ব্যাগ ধরে টান দেয়।

মুক্তা আক্তার, সোহেলি ইসলাম ও রনজিলা পারভিন এই কৌশলের শিকার হয়ে প্রাণ হারিয়েছেন। আরও তিনটি ঘটনায় একই ধরনের ঘটনা ঘটেছে।

২. দলবদ্ধভাবে ঘিরে অস্ত্র দেখিয়ে ছিনতাই

দুই থেকে পাঁচজনের দল পথচারী বা রিকশার যাত্রীকে ঘিরে ছুরি-চাপাতি দেখিয়ে অথবা আঘাত করে দ্রুত টাকা ও মুঠোফোন নিয়ে যাচ্ছে।

মোহাম্মদপুরে একটি ঘটনায় মাত্র ২৭ সেকেন্ডে দুই ব্যক্তির সর্বস্ব নিয়ে যাওয়ার ঘটনা সিসিটিভিতে ধরা পড়ে। যাত্রাবাড়ীতেও এক সপ্তাহের ব্যবধানে দুই মাছ ব্যবসায়ীকে কুপিয়ে টাকা নেওয়ার ঘটনা ঘটেছে।

৩. নগদ টাকা বহনকারীদের লক্ষ্য করা

অন্তত আটটি ঘটনায় ভুক্তভোগীরা ব্যবসা বা প্রতিষ্ঠানের নগদ অর্থ বহন করছিলেন। এসব ঘটনায় ব্যাংকারের ১ লাখ ৫৩ হাজার টাকা, বিকাশ এজেন্টের প্রায় ৩ লাখ টাকা, মানি এক্সচেঞ্জ ব্যবসায়ীর ১৭ হাজার ডলার, পেট্রলপাম্পের ১ কোটি ২১ লাখ টাকা এবং একটি প্রতিষ্ঠানের হিসাবরক্ষকের ২ লাখ ১ হাজার টাকা ছিনিয়ে নেওয়ার তথ্য রয়েছে।

মতিঝিলে একজন ডলার ব্যবসায়ীকে গুলি করার ঘটনাও ঘটেছে। উত্তরার দুটি ঘটনায় ব্যাংকে টাকা জমা দিতে যাওয়ার পথে ভুক্তভোগীদের ওপর হামলা হয়।

৪. আটকে রেখে অতিরিক্ত টাকা আদায়ের চেষ্টা

কিছু ঘটনায় ছিনতাইকারীরা শুধু মুঠোফোন বা সঙ্গে থাকা টাকা নিয়েই থামছে না। ভুক্তভোগীকে আটকে রেখে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে টাকা নেওয়া কিংবা পরিবারের সদস্যদের ফোন করে অতিরিক্ত অর্থ দাবি করার চেষ্টাও হয়েছে।

শ্যামলী-আদাবর এলাকায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থীকে ধরে গলিতে নিয়ে তাঁর টাকা ও মুঠোফোন নেওয়ার পাশাপাশি পরিবারের কাছে ৫০ হাজার টাকা চাওয়া হয়েছিল। পরে এমন একটি চক্রের নয়জনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।

অস্ত্রের ব্যবহারও উদ্বেগজনক

২২টি ঘটনার মধ্যে ১৭টিতে, অর্থাৎ প্রায় ৭৭ শতাংশ ঘটনায় ধারালো বা আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার কিংবা প্রদর্শনের তথ্য পাওয়া গেছে। এসব অস্ত্রের মধ্যে ছুরি, চাপাতি, ব্লেড, দেশীয় ধারালো অস্ত্র ও পিস্তল ছিল।

ফলে আলোচিত ঘটনাগুলোর বড় অংশ শুধু ব্যাগ টেনে নেওয়ার মতো ছিনতাই নয়। অনেক ঘটনায় অস্ত্র দেখিয়ে ভয় সৃষ্টি, কুপিয়ে বা ছুরিকাঘাত করে টাকা ও মুঠোফোন নেওয়ার প্রবণতা দেখা গেছে।

এ ছাড়া একক ব্যক্তির তুলনায় দলবদ্ধ ছিনতাইয়ের ঘটনাই বেশি। অধিকাংশ সংঘবদ্ধ ঘটনায় দুই থেকে চারজন ছিল। কোনো কোনো ঘটনায় ছয়-সাতজনও অংশ নিয়েছে।

৯ আগস্ট উত্তরায় একটি পেট্রলপাম্পের ১ কোটি ২১ লাখ টাকা ছিনিয়ে নেওয়ার ঘটনায় তিনটি মোটরসাইকেলে ছয়-সাতজন এসেছিল। আরেক ঘটনায় নাদিম নামের এক ভুক্তভোগীর রিকশা প্রথমে একজন থামায়। পরে আরও তিনজন তাঁকে ঘিরে ধরে। যাত্রাবাড়ীতে মাছ ব্যবসায়ী এমেদ আলীকেও চারজন ঘিরে ধরে কুপিয়েছিল।

দিনের বেলাতেও নিরাপদ নয় রাজধানী

রাজধানীর ছিনতাইকে দীর্ঘদিন ভোর, রাত, নির্জন সড়ক বা একা পথচারীর সঙ্গে বেশি সম্পর্কিত বলে মনে করা হলেও সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোতে চিত্রটি বদলেছে।

রনজিলা পারভিন আক্রান্ত হন সকাল সাড়ে ছয়টার দিকে। মুক্তা আক্তারের ঘটনা সকাল নয়টার পর। মোহাম্মদপুরে কলেজছাত্রকে রিকশা থামিয়ে ছিনতাই করা হয় বিকেল ৫টা ৩৭ মিনিটে। মতিঝিলের মতো ব্যবসায়িক এলাকাতেও দিনের বেলায় অস্ত্র নিয়ে হামলার অভিযোগ এসেছে।

২২টি ঘটনার মধ্যে ভোররাত থেকে সকাল ৯টা পর্যন্ত সাতটি ঘটনা ঘটেছে, যা প্রায় ৩২ শতাংশ। সন্ধ্যা ৬টা থেকে রাত ১২টার মধ্যে ঘটেছে আটটি, অর্থাৎ প্রায় ৩৬ শতাংশ।

এই দুই সময় মিলিয়ে ১৫টি ঘটনা বা মোট ঘটনার প্রায় ৬৮ শতাংশ। বাকি সাতটি ঘটনা, অর্থাৎ ৩২ শতাংশ, সকাল ৯টা থেকে সন্ধ্যা ৬টার মধ্যে ঘটেছে।

বাস টার্মিনাল থেকে বাসা ফেরার পথেও ঝুঁকি

ভোরের ঘটনাগুলোতে একটি বিশেষ প্রবণতা দেখা গেছে। ঢাকার বাইরে থেকে বাসে এসে গাবতলী, শ্যামলী, যাত্রাবাড়ীসহ বিভিন্ন এলাকায় নামা যাত্রীরা রিকশা বা অটোরিকশায় গন্তব্যে যাওয়ার সময় লক্ষ্যবস্তু হচ্ছেন।

সোহেলি ইসলাম দিনাজপুর থেকে ঢাকায় ফিরেছিলেন। রনজিলা পারভিন এসেছিলেন বগুড়া থেকে। মোহাম্মদপুরে বাসার সামনে চাপাতির মুখে পড়া দুই নারীও ঢাকার বাইরে থেকে ঈদের ছুটি কাটিয়ে ফিরেছিলেন।

অর্থাৎ বাস থেকে নামার পর টার্মিনাল বা নামার স্থান থেকে বাসা পর্যন্ত যাত্রাপথটি ছিনতাইয়ের একটি ঝুঁকিপূর্ণ ক্ষেত্র হিসেবে উঠে এসেছে।

তেজগাঁও বিভাগে বেশি আলোচিত ঘটনা

পুলিশ রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় ছিনতাইপ্রবণ স্থান চিহ্নিত করেছে। বিভিন্ন সময়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তালিকায় রাজধানীর তিন শতাধিক স্থানকে ছিনতাইপ্রবণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মধ্যে অর্ধশতাধিক এলাকায় ছিনতাই বেশি হয় বলে উল্লেখ রয়েছে।

তবে ২২টি আলোচিত ঘটনা বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, সবচেয়ে বেশি ঘটনা ঘটেছে ঢাকা মহানগর পুলিশের তেজগাঁও বিভাগকেন্দ্রিক এলাকায়। মোট ৯টি ঘটনা মোহাম্মদপুর, আদাবর, শেরেবাংলা নগর ও তেজগাঁওয়ে ঘটেছে।

এ ছাড়া যাত্রাবাড়ী-ডেমরা-ওয়ারী এলাকায় পাঁচটি, মতিঝিল-শাহজাহানপুরে চারটি, উত্তরা-তুরাগ-বিমানবন্দর এলাকায় তিনটি এবং বনানী রেলগেট এলাকায় একটি ঘটনা ঘটেছে।

পুলিশের বক্তব্য ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা

ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) মোহাম্মদ ওসমান গণি প্রথম আলোকে বলেন, ছিনতাইকারীরা নির্দিষ্ট সময় ও জায়গা বেছে নেওয়ার চেষ্টা করছে। বিশেষ করে বাস থেকে নেমে গন্তব্যে যাওয়ার পথে তুলনামূলক ফাঁকা জায়গাগুলোতে সুযোগ নেওয়া হচ্ছে।

তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন পয়েন্টে বর্তমানে ৮৮টি চেকপোস্ট কাজ করছে। প্রতিটি থানায় তিন থেকে পাঁচটি নিয়মিত টহল দল রয়েছে। চেকপোস্ট ও টহলের কার্যক্রম তদারকির জন্য সুপারভিশন টিমও কাজ করছে।

তবে এরপরও বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনা ঘটছে বলে তিনি জানান। জড়িতদের শনাক্ত করে গ্রেপ্তার এবং বিচারের আওতায় আনার চেষ্টা চলছে।

চেকপোস্টে দায়িত্বে গাফিলতির অভিযোগের বিষয়ে ওসমান গণি বলেন, দায়িত্বে অবহেলার তথ্য পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

আর ছিনতাইয়ের ঘটনা ‘মুঠোফোন হারানোর’ জিডি হিসেবে নেওয়ার অভিযোগের বিষয়ে তিনি বলেন, এমন কোনো সুনির্দিষ্ট অভিযোগ বা তথ্য পাওয়া গেলে তা খতিয়ে দেখে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

আতঙ্ক বাড়ছে নগরবাসীর মধ্যে

ছিনতাইপ্রবণ এলাকা চিহ্নিত করা হলেও নগরবাসীর মধ্যে আতঙ্ক কমছে না। রাজধানীতে চলাচলকারী কয়েকজনের অভিযোগ, আগের তুলনায় তল্লাশিচৌকি কম দেখা যায়। কোথাও চেকপোস্ট থাকলেও সব সময় সেখানে পুলিশ সদস্যদের সক্রিয় দেখা যায় না—এমন অভিযোগও রয়েছে।

গুলশানের একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে নয় বছর ধরে কাজ করছেন মাহফুজা আক্তার। তিনি কাফরুলের বাসা থেকে সপ্তাহে পাঁচ দিন অফিসে যান। কাজ শেষ করে কখনো রাত সাড়ে নয়টা পর্যন্তও হয়।

দীর্ঘদিন তিনি রিকশায় বাসা-অফিসে যাতায়াত করলেও এখন সন্ধ্যার পর চলাচলে ভয় পান বলে প্রথম আলোকে জানিয়েছেন।

গত ছয় মাসের ২২টি আলোচিত ঘটনা রাজধানীর ঢাকায় ছিনতাই-এর ধরন ও ঝুঁকির একটি গুরুত্বপূর্ণ চিত্র তুলে ধরেছে। চলন্ত যান থেকে ব্যাগ টেনে নেওয়া থেকে শুরু করে দলবদ্ধ অস্ত্রধারীদের হামলা, নগদ টাকা বহনকারীদের লক্ষ্য করা এবং ভুক্তভোগীর পরিবারকে ফোন করে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের চেষ্টা—ছিনতাইয়ের কৌশলগুলোতে বৈচিত্র্য দেখা যাচ্ছে।

একই সঙ্গে তিন নারীর মৃত্যু এবং ১৭টি ঘটনায় অস্ত্রের ব্যবহার বা প্রদর্শনের তথ্য বিষয়টিকে আরও উদ্বেগজনক করে তুলেছে। অন্যদিকে মামলা না হওয়া বা ছিনতাইয়ের ঘটনা ‘হারানো মুঠোফোন’ হিসেবে জিডিতে নথিভুক্ত হওয়ার অভিযোগ প্রকৃত অপরাধের পরিসংখ্যানকে আড়াল করছে।

রাজধানীতে নিরাপত্তা জোরদারে চেকপোস্ট ও টহল ব্যবস্থা থাকার কথা জানিয়েছে পুলিশ। তবে ঘটনাগুলোর প্রকৃত চিত্র সামনে আনা, অভিযোগ যথাযথভাবে নথিভুক্ত করা এবং জড়িতদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার বিষয়টিই এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

সর্বাধিক পঠিত