নির্ধারিত সময়ের শুরুতে রিটার্ন জমা দিলে করছাড়, দেরিতে গুনতে হবে জরিমানা, রিটার্ন জমা করছাড় সুবিধা চালুর প্রস্তাব আসছে আগামী অর্থবছরে। আগে রিটার্ন দিলে ৫% পর্যন্ত ছাড়।
আগামী অর্থবছর থেকে দেশের আয়কর ব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনার পরিকল্পনা করেছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। প্রস্তাবিত পরিবর্তনের আওতায় রিটার্ন জমা করছাড় সুবিধা চালু করা হচ্ছে, যাতে অর্থবছরের শুরুতে আয়কর রিটার্ন দাখিলকারী করদাতারা কর ছাড় পাবেন। অন্যদিকে নির্ধারিত সময়ের অনেক পরে রিটার্ন জমা দিলে জরিমানা আরোপ করা হবে। একই সঙ্গে বিনিয়োগজনিত কর রেয়াতের সুবিধা কমানো এবং কিছু সম্পদ বিক্রির মুনাফার ওপর মূলধনি কর আরোপের প্রস্তাবও রাখা হয়েছে।
এনবিআরের দায়িত্বশীল সূত্র জানিয়েছে, কর ব্যবস্থা আরও স্বয়ংক্রিয়, সময়োপযোগী ও শৃঙ্খলাপূর্ণ করতে আগামী বাজেটে আয়কর আইনে একাধিক সংশোধনী আনা হচ্ছে।
বর্তমান ব্যবস্থায় কী আছে?
বর্তমানে ব্যক্তিশ্রেণির করদাতাদের জন্য আয়কর রিটার্ন জমা দেওয়ার নির্ধারিত সময় ৩০ নভেম্বর পর্যন্ত। সময়মতো রিটার্ন দাখিল না করলে বিলম্ব সুদ আরোপের বিধান রয়েছে।
তবে প্রায় প্রতি বছরই করদাতাদের সুবিধার্থে রিটার্ন দাখিলের সময়সীমা কয়েক দফা বাড়ানো হয়। ফলে কর প্রশাসনে জটিলতা তৈরি হয় এবং সময়মতো কর আদায়ে প্রতিবন্ধকতা দেখা দেয়।
এই পরিস্থিতি পরিবর্তনের লক্ষ্যেই পুরো অর্থবছরকে চারটি প্রান্তিকে ভাগ করে নতুন প্রণোদনা ও জরিমানার কাঠামো প্রস্তাব করা হয়েছে।
রিটার্ন জমা করছাড় সুবিধার নতুন কাঠামো

প্রস্তাবিত ব্যবস্থায় জুলাই থেকে সেপ্টেম্বরের মধ্যে রিটার্ন জমা দিলে করদাতারা বিশেষ সুবিধা পাবেন।
জুলাই-সেপ্টেম্বরে রিটার্ন দিলে
এই সময়ে রিটার্ন দাখিল করলে পরিশোধিত করের ৫ শতাংশ অথবা সর্বোচ্চ ২৫ হাজার টাকা পর্যন্ত করছাড় পাওয়া যাবে।
কর প্রশাসনের দৃষ্টিতে এটি হবে আগাম রিটার্ন দাখিলে উৎসাহ দেওয়ার একটি উদ্যোগ।
অক্টোবর-ডিসেম্বরে রিটার্ন দিলে
অক্টোবর থেকে ডিসেম্বরের মধ্যে রিটার্ন জমা দিলে কোনো জরিমানা আরোপ করা হবে না। তবে করদাতারা বিনিয়োগজনিত কর রেয়াতের সুবিধা পাবেন না।
অর্থাৎ সময়সীমার মধ্যে রিটার্ন জমা হলেও অতিরিক্ত কর সুবিধা থেকে বঞ্চিত হতে হবে।
জানুয়ারি-মার্চে রিটার্ন দিলে
এই সময়ে রিটার্ন দাখিল করলে পরিশোধযোগ্য করের ২ শতাংশ অথবা ৩ হাজার টাকার মধ্যে যেটি বেশি, সেই পরিমাণ জরিমানা দিতে হবে।
এপ্রিল-জুনে রিটার্ন দিলে
অর্থবছরের শেষ প্রান্তিকে রিটার্ন জমা দিলে জরিমানার হার আরও বাড়বে। সেক্ষেত্রে পরিশোধযোগ্য করের ৫ শতাংশ অথবা ৫ হাজার টাকার মধ্যে যেটি বেশি, সেই পরিমাণ জরিমানা দিতে হবে।
এই জরিমানার অর্থ মূল করের সঙ্গে যুক্ত হবে।
বিনিয়োগজনিত কর রেয়াত কমছে
বর্তমানে সঞ্চয়পত্র, জীবনবিমা, ডিপিএসসহ বিভিন্ন অনুমোদিত খাতে বিনিয়োগের বিপরীতে কর রেয়াত পাওয়া যায়।
বিদ্যমান আইনে মোট অনুমোদিত বিনিয়োগের ১৫ শতাংশ অথবা সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত বিনিয়োগের ওপর কর রেয়াতের সুযোগ রয়েছে।
তবে নতুন প্রস্তাবে এই সীমা কমিয়ে অনুমোদিত বিনিয়োগের ১০ শতাংশ এবং সর্বোচ্চ ৭ লাখ ৫০ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।
ফলে করদাতারা আগের তুলনায় কম কর সুবিধা পাবেন। তবে কর রেয়াতের আওতাভুক্ত খাতগুলোতে কোনো পরিবর্তন আনা হচ্ছে না।
স্বর্ণ ও ডিজিটাল সম্পদের মুনাফায় মূলধনি কর
প্রস্তাবিত বাজেটে কিছু সম্পদকে মূলধনি সম্পদ হিসেবে গণ্য করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
এসব সম্পদের মধ্যে রয়েছে—
- স্বর্ণালংকার
- স্বর্ণের বার
- রৌপ্য
- মূল্যবান রত্ন
- ধাতব মুদ্রা
- ডিজিটাল মুদ্রা
- চিত্রকর্ম
- এন্টিকস
- ক্লাব সদস্যপদ
এসব সম্পদ হস্তান্তরের মাধ্যমে অর্জিত আয়কে মূলধনি আয় হিসেবে বিবেচনা করা হবে।
স্বর্ণ বিক্রির মুনাফায় ১৫% কর
করদাতার রিটার্নে প্রদর্শিত স্বর্ণ বিক্রি করে অর্জিত মুনাফার ওপর ১৫ শতাংশ মূলধনি কর আরোপের প্রস্তাব রাখা হয়েছে।
এ ক্ষেত্রে সম্পদ ক্রয়ের সময়ের মূল্য এবং বিক্রয়মূল্যের পার্থক্য থেকে যে মুনাফা হবে, তার ওপর কর প্রযোজ্য হবে।
অতিরিক্ত কর দিলে ফেরত পাওয়ার সুযোগ
প্রস্তাবিত ব্যবস্থায় করদাতাদের জন্য আরেকটি সুবিধা রাখা হয়েছে।
যদি কোনো করদাতা অতিরিক্ত কর পরিশোধ করেন, তাহলে সেই অর্থ ৬০ দিনের মধ্যে ব্যাংক হিসাবের মাধ্যমে ফেরত দেওয়ার ব্যবস্থা চালুর পরিকল্পনা রয়েছে।
এটি করদাতাদের জন্য কর ফেরত প্রক্রিয়াকে আরও সহজ ও স্বচ্ছ করতে সহায়ক হতে পারে।
ভ্যাট ব্যবস্থায় বিআইএন বাধ্যতামূলক করার উদ্যোগ
ভ্যাটের আওতা সম্প্রসারণ এবং ব্যবসা কার্যক্রমকে আরও নিবন্ধনভিত্তিক করার লক্ষ্যে ব্যবসা শনাক্তকরণ নম্বর (বিআইএন) বাধ্যতামূলক করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
প্রস্তাব অনুযায়ী নিম্নোক্ত ক্ষেত্রে বিআইএন বাধ্যতামূলক হবে—
- ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে চলতি হিসাব খোলা
- ঋণ গ্রহণ
- ট্রেড লাইসেন্স নবায়ন
- মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসের মার্চেন্ট অ্যাকাউন্ট খোলা
- বাণিজ্য সংগঠনের সদস্যপদ গ্রহণ বা নবায়ন
- ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের নামে বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংযোগ নেওয়া
- বিআরটিএতে প্রতিষ্ঠানের নামে যানবাহন নিবন্ধন
কর ব্যবস্থায় কী পরিবর্তনের ইঙ্গিত?
প্রস্তাবিত সংস্কারগুলো থেকে স্পষ্ট যে সরকার সময়মতো রিটার্ন দাখিলে করদাতাদের উৎসাহিত করতে চায়। একই সঙ্গে বিলম্বিত রিটার্নের ক্ষেত্রে আর্থিক দায় বাড়িয়ে কর প্রশাসনে শৃঙ্খলা আনার চেষ্টা করা হচ্ছে।
অন্যদিকে বিনিয়োগ কর রেয়াত কমানো, মূলধনি সম্পদের পরিধি বাড়ানো এবং বিআইএন বাধ্যতামূলক করার উদ্যোগ রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধি এবং কর ব্যবস্থাকে আরও ডিজিটাল ও তথ্যনির্ভর করার প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।





