মবের শহরে পরিণত হয়েছে দেশ সংসদে রুমিন ফারহানার উদ্বেগ, দেড় বছরে ধারাবাহিক ঘটনায় বিচারহীনতার কঠোর সমালোচনা ও নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন।
মব জাস্টিস বাংলাদেশ নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনের সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা। তিনি জাতীয় সংসদে দাঁড়িয়ে অভিযোগ করেন, গত দেড় বছর ধরে দেশে একের পর এক গণপিটুনির ঘটনায় জননিরাপত্তা ভেঙে পড়েছে এবং রাষ্ট্র কার্যত “মবের শহরে” পরিণত হয়েছে। বিচারহীনতা ও প্রশাসনিক দুর্বলতার কারণেই এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে বলে তিনি মনে করেন।
সোমবার (২০ এপ্রিল) জাতীয় সংসদের অধিবেশনে ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামালের সভাপতিত্বে নোটিশ উত্থাপনকালে তিনি এসব কথা বলেন। তার বক্তব্যে উঠে আসে দেশের বিচারব্যবস্থা, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং সামাজিক অবক্ষয়ের এক উদ্বেগজনক চিত্র।
মব জাস্টিস বাংলাদেশ: সংসদে তোলা অভিযোগ
সংসদে দেওয়া বক্তব্যে রুমিন ফারহানা বলেন, দেশের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলোও এখন নিরাপদ নয়। তিনি উল্লেখ করেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর থেকে শুরু করে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী সমিতি—সব জায়গাতেই নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হয়েছে।
তার ভাষায়, সরকারি গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরে মব তৈরি হওয়া, বরিশাল আদালত প্রাঙ্গণ এবং সুপ্রিম কোর্টের লইয়ার্স রুমে সংঘটিত ঘটনাগুলো বিচার ব্যবস্থার মর্যাদাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।
দেড় বছরের ঘটনাপ্রবাহ: সহিংসতার ধারাবাহিকতা

রুমিন ফারহানা তার বক্তব্যে গত দেড় বছরে ঘটে যাওয়া বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার উল্লেখ করেন। এর মধ্যে রয়েছে:
- ডেইলি স্টার অফিসে হামলা
- চট্টগ্রামে সংঘটিত সহিংস ঘটনা
- কুষ্টিয়ায় অভিযোগকারীকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনা
তিনি বলেন, এসব ঘটনা শুধু বিচ্ছিন্ন নয়, বরং একটি বৃহত্তর সামাজিক অবক্ষয়ের প্রতিফলন।
তার বক্তব্য অনুযায়ী, “এই ঘটনাগুলো আমাদের সমাজের ভয়াবহ অবনতির চিত্র তুলে ধরে।”
বিচারহীনতা ও মব কালচারের সম্পর্ক
বিচার না হলে কী হয়?
রুমিন ফারহানা সরাসরি অভিযোগ করেন, বিচারহীনতার সংস্কৃতি মব জাস্টিসকে উসকে দিচ্ছে। তিনি বলেন, যখন মানুষ ন্যায়বিচার পায় না, তখন তারা নিজেরাই বিচার করার চেষ্টা করে, যা শেষ পর্যন্ত নৈরাজ্যে রূপ নেয়।
তিনি উদাহরণ হিসেবে দেড় বছর আগে চট্টগ্রামে পিটিয়ে হত্যার ঘটনার কথা উল্লেখ করেন, যার বিচার এখনো হয়নি বলে তিনি দাবি করেন। তার মতে, এই ধরনের ঘটনার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না হওয়ায় অপরাধীরা উৎসাহিত হচ্ছে।
সামাজিক হতাশা ও বৈষম্যের প্রভাব
সংসদ সদস্য তার বক্তব্যে আরও বলেন, দেশে বর্তমানে তীব্র হতাশা, ক্ষোভ এবং বৈষম্য বিরাজ করছে। এই সামাজিক বাস্তবতা মানুষকে চরমপন্থার দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
তিনি মনে করেন, বিচার ব্যবস্থার দীর্ঘসূত্রতা এবং অনিয়ম এই পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর প্রতি ক্ষোভ
রুমিন ফারহানা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর প্রতি অসন্তোষ প্রকাশ করে বলেন, মন্ত্রী একাধিকবার আশ্বাস দিয়েছিলেন যে দেশে আর মব কালচার থাকবে না এবং বিচারহীনতার অবসান ঘটবে।
কিন্তু বাস্তবে এর বিপরীত চিত্র দেখা যাচ্ছে বলে তিনি মন্তব্য করেন। তার ভাষায়, “প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও একের পর এক ঘটনা ঘটেই চলেছে।”
নিরাপত্তা পরিস্থিতি: কোথায় দাঁড়িয়ে দেশ?
তার বক্তব্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশের সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তারাও নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। তিনি বলেন, জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যর্থতা এখন একটি বড় জাতীয় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সরকারের প্রতি আহ্বান
দ্রুত পদক্ষেপের দাবি
বক্তব্যের শেষ অংশে রুমিন ফারহানা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রতি দ্রুত ও কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান।
তিনি সতর্ক করে বলেন, যদি অবিলম্বে বিচারহীনতার সংস্কৃতি বন্ধ না করা হয়, তাহলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে।
বর্তমান পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, মব জাস্টিস শুধু আইনশৃঙ্খলার সমস্যা নয়, বরং এটি একটি গভীর সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সংকটের ইঙ্গিত দেয়।




