জাতীয় গ্রিডে পূর্ণ সক্ষমতায় বিদ্যুৎ পেতে সময় লাগবে প্রায় ১০ মাস, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র জ্বালানি লোডিং শুরু, বাংলাদেশ পারমাণবিক শক্তি যুগে ঐতিহাসিক অগ্রগতি নিশ্চিত।
বাংলাদেশের জ্বালানি খাতে এক ঐতিহাসিক অধ্যায় শুরু হলো রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র-এ জ্বালানি (ইউরেনিয়াম) লোডিং কার্যক্রম আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হওয়ার মাধ্যমে। এই পদক্ষেপের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ বিশ্বের পারমাণবিক শক্তি ব্যবহারকারী ৩৩তম দেশে পরিণত হয়েছে। তবে জাতীয় গ্রিডে পূর্ণ সক্ষমতায় বিদ্যুৎ পেতে সময় লাগবে প্রায় ১০ মাস।
গত মঙ্গলবার কড়া নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে এই জ্বালানি লোডিং কার্যক্রম উদ্বোধন করা হয়। এর মাধ্যমে দেশের জ্বালানি খাতে নতুন যুগের সূচনা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র: জ্বালানি লোডিংয়ের চূড়ান্ত ধাপ
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র বর্তমানে বিদ্যুৎ উৎপাদনের শেষ প্রস্তুতিমূলক ধাপে প্রবেশ করেছে। রিঅ্যাক্টর ডিজাইন অনুযায়ী ১৬৩টি ফুয়েল অ্যাসেম্বলি কোরে স্থাপন করতে হবে, যা সম্পন্ন করতে সময় লাগবে প্রায় ৩০ দিন।
এই পুরো প্রক্রিয়া আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা নির্দেশিকা মেনে কঠোর মনিটরিংয়ের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে। প্রতিটি ধাপ বিশেষজ্ঞদের নজরদারিতে সম্পন্ন করা হচ্ছে।
ফিজিক্যাল স্টার্টআপ ও পরীক্ষামূলক ধাপ

জ্বালানি লোডিং শেষে শুরু হবে ফিজিক্যাল স্টার্টআপ পর্যায়। এই ধাপে নিউক্লিয়ার ফিশন রিঅ্যাকশন শুরু করে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালানো হবে। এতে সময় লাগবে প্রায় ৩৪ দিন।
এরপর ধাপে ধাপে রিঅ্যাক্টরের পাওয়ার বৃদ্ধি করা হবে—
- ৩ শতাংশ
- ৫ শতাংশ
- ১০ শতাংশ
- ২০ শতাংশ
- ৩০ শতাংশ
এই ধাপ সম্পন্ন করতে আরও প্রায় ৪০ দিন প্রয়োজন হবে।
৩ শতাংশ ক্ষমতায় পৌঁছালেই জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু হবে।
পূর্ণ উৎপাদনে সময়: ১০ মাস
সব মিলিয়ে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে জাতীয় গ্রিডে পূর্ণ সক্ষমতায় বিদ্যুৎ পেতে সময় লাগবে প্রায় ১০ মাস।
আগামী আগস্টের মধ্যে প্রায় ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হওয়ার আশা করা হচ্ছে। পরবর্তীতে পুরো সক্ষমতায় ১,২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব হবে একটি ইউনিট থেকে।
জ্বালানি প্রযুক্তি ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা
এই প্রকল্পে ব্যবহৃত হচ্ছে তৃতীয় প্রজন্মের ভিভিইআর-১২০০ রিঅ্যাক্টর প্রযুক্তি, যেখানে স্বয়ংক্রিয় নিরাপত্তা ব্যবস্থা রয়েছে।
ইউরেনিয়াম বিভাজনের মাধ্যমে তাপ উৎপন্ন হয়ে পানি বাষ্পে পরিণত হয় এবং টারবাইন ঘুরিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করে।
একবার জ্বালানি লোড করলে প্রায় ১৮ মাস পর্যন্ত বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব।
আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও অংশগ্রহণ
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন—
- বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ
- রাশিয়ার রোসাটমের মহাপরিচালক আলেক্সি লিখাচেভ
- IAEA মহাপরিচালক রাফায়েল মারিয়ানো গ্রোসি (ভার্চুয়ালি)
অনুষ্ঠানে স্বয়ংক্রিয় সুইচ টিপে জ্বালানি লোডিং কার্যক্রম উদ্বোধন করা হয়।
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নিয়ে আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া
আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা (IAEA) জানায়,
IAEA-এর মতে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র জ্বালানি লোডিং একটি বড় অর্জন, যা বাংলাদেশের জন্য পরিচ্ছন্ন জ্বালানির নতুন দিগন্ত খুলে দেবে।
বাংলাদেশ-রাশিয়া সহযোগিতা
রোসাটম জানিয়েছে, মহামারি ও বৈশ্বিক সংকট সত্ত্বেও প্রকল্পের কাজ একদিনও বন্ধ হয়নি।
বর্তমানে দ্বিতীয় ইউনিটের কাজও এগিয়ে চলছে।
এছাড়া রাশিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ে ৯০০-এর বেশি বাংলাদেশি শিক্ষার্থী পারমাণবিক বিষয়ে প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন।
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র: ইতিহাস ও অগ্রগতি
এই প্রকল্পের ধারণা আসে ১৯৬১ সালে। দীর্ঘ প্রক্রিয়া শেষে ১৯৯৫ সালে বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
প্রকল্পটির মোট ব্যয় প্রায় ১ লাখ ১৪ হাজার কোটি টাকা। এর ৯০ শতাংশ ঋণ দিয়েছে রাশিয়া, যা ২৮ বছরের মধ্যে পরিশোধ করতে হবে।
অর্থনীতি ও জ্বালানি নিরাপত্তায় প্রভাব
বিশেষজ্ঞদের মতে, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র:
- গ্যাস ও কয়লার ওপর নির্ভরতা কমাবে
- কার্বন নিঃসরণ হ্রাস করবে
- শিল্প উৎপাদনে স্থিতিশীল বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করবে
একই পরিমাণ বিদ্যুৎ উৎপাদনে পারমাণবিক জ্বালানি প্রয়োজন হয় মাত্র ২৭ টন, যেখানে কয়লা লাগে প্রায় ৩০ লাখ টন।
প্রকল্পটি শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদন নয়, বরং প্রযুক্তি উন্নয়ন, দক্ষ জনবল তৈরি এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার নতুন দিগন্ত খুলে দেবে।




