একীভূত পাঁচ ব্যাংকের ক্ষেত্রে নতুন সিদ্ধান্ত বাংলাদেশ ব্যাংকের। ৫ ব্যাংকের আটকে থাকা অর্থ ও নতুন সিদ্ধান্তে আর্থিক স্বস্তি এসেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক এক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে একীভূত পাঁচ ব্যাংকের প্রভিশন বাধ্যবাধকতা তুলে দিয়েছে। বৃহস্পতিবার (৩০ এপ্রিল) কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট বিভাগ এই সিদ্ধান্ত জানায়। এর ফলে একীভূত হওয়া পাঁচটি শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকের সঙ্গে সম্পৃক্ত বিভিন্ন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান আপাতত অতিরিক্ত আর্থিক চাপ থেকে কিছুটা স্বস্তি পাবে।
এই সিদ্ধান্তটি এসেছে এমন এক সময়ে, যখন একীভূত ব্যাংকগুলোর মধ্যে বিপুল পরিমাণ অর্থ আটকে রয়েছে এবং তা নিয়ে আর্থিক খাতে উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল।
একীভূত পাঁচ ব্যাংকের প্রভিশন বাধ্যবাধকতা তুলে নেওয়ার প্রেক্ষাপট
বাংলাদেশ ব্যাংকের এই সিদ্ধান্তের মূল উদ্দেশ্য হলো—আটকে থাকা অর্থকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া প্রভিশন চাপ কমানো। আগে নির্দেশনা ছিল, একীভূত ব্যাংকে যেসব প্রতিষ্ঠানের বিনিয়োগ রয়েছে, তাদের সেই বিনিয়োগের বিপরীতে নিরাপত্তা সঞ্চিতি বা প্রভিশন রাখতে হবে।
কিন্তু নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী একীভূত পাঁচ ব্যাংকের প্রভিশন বাধ্যবাধকতা আর প্রযোজ্য থাকবে না।
একজন ঊর্ধ্বতন কেন্দ্রীয় ব্যাংক কর্মকর্তা জানান, এসব অর্থ মূলত বিভিন্ন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের বিনিয়োগ, তাই এর বিপরীতে অতিরিক্ত প্রভিশন রাখার প্রয়োজন নেই বলে বিবেচনা করা হয়েছে।
কোন ব্যাংকগুলো একীভূত হয়েছে?

বাংলাদেশ ব্যাংকের তত্ত্বাবধানে আর্থিক সংকট মোকাবিলায় পাঁচটি শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংক একীভূত করা হয়েছে। এগুলো হলো—
- ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক
- গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক
- ইউনিয়ন ব্যাংক
- সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক
- এক্সিম ব্যাংক
এই একীভূত কাঠামোর কারণে ব্যাংকিং খাতে বড় ধরনের পুনর্গঠন হয়েছে, যার প্রভাব পড়েছে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপরও।
একীভূত পাঁচ ব্যাংকের প্রভিশন বাধ্যবাধকতা ও আটকে থাকা অর্থ
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, এই পাঁচ ব্যাংকের কাছে বিভিন্ন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ১৫ হাজার কোটি টাকারও বেশি অর্থ আটকে রয়েছে।
এর মধ্যে শুধু একটি ইসলামী ব্যাংকেরই প্রায় ৮ হাজার ৪২৫ কোটি টাকা আটকে ছিল। আংশিক অর্থ ফেরত এলেও এখনো প্রায় ৮ হাজার ২৭৯ কোটি টাকা অনিষ্পন্ন অবস্থায় রয়েছে।
এই পরিস্থিতি আর্থিক খাতে বড় চাপ তৈরি করেছিল, যা সামাল দিতেই নতুন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
কেন প্রভিশন বাধ্যবাধকতা তুলে নেওয়া হলো?
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট বিভাগ জানায়, প্রথমে ব্যাংক সুপারভিশন বিভাগ (BSD) এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও বাজার বিভাগ (DFIM) থেকে আটকে থাকা অর্থের বিপরীতে প্রভিশন রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল।
তবে পরবর্তীতে ব্যাংক রেজোল্যুশন বিভাগ (BRD) জানায়, এসব অর্থ বিশেষ স্কিমের আওতায় থাকায় আলাদা প্রভিশন রাখার প্রয়োজন নেই।
ফলে একীভূত পাঁচ ব্যাংকের প্রভিশন বাধ্যবাধকতা বাতিল করা হয়।
অর্থ ফেরতের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা
একজন কেন্দ্রীয় ব্যাংক কর্মকর্তা জানান, আটকে থাকা অর্থ একটি বিশেষ স্কিমের অধীনে রয়েছে।
ভবিষ্যতে এই অর্থ তিনভাবে ফেরত পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে—
- সরাসরি নগদ অর্থ ফেরত
- দীর্ঘমেয়াদি আমানত (FDR) আকারে
- শেয়ারের মাধ্যমে সমমূল্য প্রদান
এর ফলে অর্থ পুরোপুরি হারানোর ঝুঁকি নেই বলে মনে করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
একীভূত পাঁচ ব্যাংকের প্রভিশন বাধ্যবাধকতা: খাতসংশ্লিষ্টদের প্রতিক্রিয়া
আর্থিক খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করছেন, এই সিদ্ধান্ত স্বল্প মেয়াদে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ওপর চাপ কমাবে। তবে দীর্ঘমেয়াদে এখনো বড় চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে।
তাদের মতে, একীভূত পাঁচ ব্যাংকের প্রভিশন বাধ্যবাধকতা তুলে নেওয়া একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ হলেও, আটকে থাকা অর্থ পুরোপুরি আদায় করাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা
বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, ব্যাংক খাতকে স্থিতিশীল করতে রেজোল্যুশন প্রক্রিয়া আরও শক্তিশালী করা হবে। বিশেষ করে একীভূত ব্যাংকগুলোর আর্থিক অবস্থার ওপর নজরদারি বাড়ানো হবে।
এর মাধ্যমে একীভূত পাঁচ ব্যাংকের প্রভিশন বাধ্যবাধকতা সংক্রান্ত নীতিগত পরিবর্তনের পরও ব্যাংক খাতে স্থিতিশীলতা বজায় রাখার চেষ্টা চলছে।




