তেলের মজুদ তিন মাসে উন্নীতসহ ১২ দফা সুপারিশ করেছে বিশেষ কমিটি। জ্বালানি নিরাপত্তা ও সংকট মোকাবিলায় জানুন বিস্তারিত।
দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদার এবং ভবিষ্যতে সম্ভাব্য সংকট মোকাবিলার লক্ষ্যে গঠিত বিশেষ কমিটি জ্বালানি খাতে ১২ দফা সুপারিশ করেছে। রবিবার (৭ জুন) জাতীয় সংসদে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ কমিটির প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন। প্রতিবেদনে আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ বিভিন্ন কারণে সৃষ্ট জ্বালানি সরবরাহ ঝুঁকি মোকাবিলায় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণের ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।
বিশেষ কমিটির মতে, বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতি, হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলে বিঘ্ন এবং সরবরাহ শৃঙ্খলের অনিশ্চয়তা দেশের জ্বালানি খাতে নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। একই সঙ্গে প্যানিক বায়িং, অবৈধ মজুদ ও কালোবাজারির মতো অভ্যন্তরীণ সমস্যাও সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর চাপ সৃষ্টি করেছে।
জ্বালানি তেলের কৌশলগত মজুদ বৃদ্ধির সুপারিশ

প্রতিবেদনের অন্যতম প্রধান সুপারিশ হলো জ্বালানি তেলের কৌশলগত মজুদ কমপক্ষে তিন মাসের চাহিদা পূরণের উপযোগী পর্যায়ে উন্নীত করা। কমিটির মতে, আন্তর্জাতিক বাজারে অস্থিরতা বা সরবরাহ ব্যাহত হলে পর্যাপ্ত মজুদ দেশের অর্থনীতি ও জ্বালানি নিরাপত্তা রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।
এছাড়া জ্বালানি আমদানির উৎস বহুমুখীকরণ এবং সরবরাহ ব্যবস্থাকে আরও স্থিতিশীল করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। এতে কোনো নির্দিষ্ট অঞ্চল বা দেশের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমবে বলে মনে করা হচ্ছে।
কেন তৈরি হয়েছে এই সুপারিশ?
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, সাম্প্রতিক সময়ে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধি, মধ্যপ্রাচ্যকেন্দ্রিক ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা এবং বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থার অস্থিরতার কারণে দেশের জ্বালানি খাতে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
এর প্রভাব পরিবহন, কৃষি, শিল্প এবং সাধারণ মানুষের ওপর পড়েছে। ফলে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা কাঠামো পুনর্মূল্যায়নের প্রয়োজনীয়তা সামনে এসেছে।
অবকাঠামো প্রকল্প দ্রুত বাস্তবায়নের তাগিদ
বিশেষ কমিটি কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো প্রকল্প দ্রুত বাস্তবায়নের সুপারিশ করেছে। এর মধ্যে রয়েছে—
ঢাকা-চট্টগ্রাম পাইপলাইন
দেশের জ্বালানি পরিবহন ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর ও নিরাপদ করতে এই প্রকল্প বাস্তবায়নের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং (এসপিএম) প্রকল্প
তেল খালাস ও সরবরাহ ব্যবস্থার সক্ষমতা বাড়াতে এসপিএম প্রকল্প দ্রুত সম্পন্ন করার সুপারিশ করা হয়েছে।
ইস্টার্ন রিফাইনারি দ্বিতীয় ইউনিট (ইআরএল-২)
দেশে জ্বালানি পরিশোধন সক্ষমতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে ইস্টার্ন রিফাইনারির দ্বিতীয় ইউনিট দ্রুত বাস্তবায়নের প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব
প্রতিবেদনে বিকল্প জ্বালানি হিসেবে এলএনজি এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়েছে।
রুফটপ সোলার স্থাপন বাধ্যতামূলক করার পাশাপাশি সেগুলোর কার্যকারিতা নিয়মিত পর্যবেক্ষণের কথাও বলা হয়েছে। একই সঙ্গে সৌর, বায়ু, গ্যাস, কয়লা এবং অন্যান্য উৎস থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য সমন্বিত পরিকল্পনা গ্রহণের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
বিদ্যুৎ বিতরণে সিস্টেম লস কমানোর আহ্বান
কমিটি মনে করে, বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থায় সিস্টেম লস কমানো গেলে জ্বালানি ব্যবহারে দক্ষতা বাড়বে। এজন্য প্রয়োজনীয় পরিকল্পনা ও কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ করা হয়েছে।
পাশাপাশি সরবরাহ ব্যবস্থার পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল মনিটরিং চালুর বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে, যাতে দ্রুত তথ্য সংগ্রহ ও সংকট মোকাবিলা সম্ভব হয়।
বেসরকারি খাতকে আমদানির সুযোগ দেওয়ার প্রস্তাব
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)-এর পাশাপাশি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে জ্বালানি পণ্য আমদানির সুযোগ সৃষ্টি করা যায় কি না, সে বিষয়ে প্রয়োজনীয় সমীক্ষা পরিচালনা করা প্রয়োজন।
কমিটির মতে, এ ধরনের উদ্যোগ বাজারে প্রতিযোগিতা এবং সরবরাহ ব্যবস্থার সক্ষমতা বাড়াতে সহায়ক হতে পারে।
জনসচেতনতা বৃদ্ধির সুপারিশ
সংকটকালীন সময়ে অযৌক্তিক মজুদ ও প্যানিক বায়িং রোধে জনসচেতনতা কার্যক্রম জোরদার করার সুপারিশ করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সংকটের সময়ে তথ্যভিত্তিক সচেতনতা বাড়ানো গেলে বাজারে অস্থিরতা অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে।
বিরোধী দলের ১০ সুপারিশও অন্তর্ভুক্ত
বিশেষ কমিটির প্রতিবেদনে বিরোধী দলের সদস্যদের দেওয়া ১০টি সুপারিশও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
তাদের প্রস্তাব অনুযায়ী, বিদ্যুৎ ও জ্বালানির চাহিদা নির্ধারণে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত স্বাধীন বিশেষজ্ঞ কমিটির মাধ্যমে সমীক্ষা পরিচালনা করা প্রয়োজন। তাদের মতে, অতিরঞ্জিত চাহিদা পূর্বাভাসের পরিবর্তে বাস্তবভিত্তিক পরিকল্পনা গ্রহণ করা উচিত।
এছাড়া বিরোধী দল নিম্নোক্ত বিষয়গুলোতে গুরুত্ব দেওয়ার সুপারিশ করেছে—
- কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের সর্বোচ্চ ব্যবহার
- দেশীয় গ্যাস উৎপাদন বৃদ্ধি
- স্থলভাগ ও সমুদ্রভাগে নতুন গ্যাস অনুসন্ধান
- অপরিশোধিত তেল অনুসন্ধান অব্যাহত রাখা
- এসপিএম ও ইস্টার্ন রিফাইনারি-২ দ্রুত বাস্তবায়ন
- সৌরবিদ্যুতের সম্প্রসারণ
- পার্বত্য অঞ্চলে মাইক্রো-হাইড্রোর সম্ভাব্যতা যাচাই
- নদীপ্রবাহভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের সম্ভাবনা অনুসন্ধান
- সরকারি যানবাহনের ব্যবহার কমানো
- হাইড্রোজেন ফুয়েল, বায়োগ্যাস ও বর্জ্য থেকে জ্বালানি উৎপাদন নিয়ে গবেষণা
দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তার ওপর জোর
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা এবং আন্তর্জাতিক ভূরাজনৈতিক বাস্তবতার প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নীতি, অবকাঠামো ও সরবরাহ ব্যবস্থাকে আরও স্থিতিশীল, বহুমুখী এবং প্রযুক্তিনির্ভর করা সময়ের দাবি।
বিশেষ কমিটির মতে, সাম্প্রতিক পরিস্থিতি দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা কাঠামো পুনর্মূল্যায়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ তৈরি করেছে। সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে পরিকল্পিত ও সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণ করলে ভবিষ্যতের সম্ভাব্য জ্বালানি সংকট মোকাবিলা সহজ হবে।





