গয়েশ্বরের অভিযোগ, পার্থর ব্যাখ্যা, শাহজাহানের পাল্টা জবাব, বাজেট আলোচনায় উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে
জাতীয় সংসদে বাজেট আলোচনার সময় ইসলামী ব্যাংকিং ও নিয়োগনীতি নিয়ে তিনজন সংসদ সদস্যের বক্তব্যকে ঘিরে তৈরি হয় তীব্র বিতর্ক, যেখানে মূল কেন্দ্রবিন্দু ছিল ইসলামী ব্যাংকে চাকরি বিতর্ক। বিএনপির গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, বিজেপি চেয়ারম্যান আন্দালিব রহমান পার্থ এবং জামায়াতে ইসলামীর শাহজাহান চৌধুরীর পাল্টাপাল্টি বক্তব্যে সংসদে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে।
শনিবার (২৭ জুন) ২০২৬–২৭ অর্থবছরের বাজেটের সাধারণ আলোচনায় অংশ নিতে গিয়ে এই ঘটনাগুলোর সূচনা হয়। পরে বিষয়টি সংসদে আলোচনার অন্যতম আলোচিত প্রসঙ্গে পরিণত হয়।
বাজেট আলোচনায় শুরু হওয়া বিতর্কের পটভূমি
বাজেট আলোচনায় প্রথমে অংশ নেন আন্দালিব রহমান পার্থ। তিনি ইসলামী ব্যাংকিং এবং জাকাতভিত্তিক অর্থনীতির প্রসার নিয়ে মত দেন।
তার বক্তব্যে তিনি বলেন, বিশ্বজুড়ে ইসলামী ব্যাংকিং একটি জনপ্রিয় ব্যবস্থা এবং ধীরে ধীরে সুদভিত্তিক ব্যাংকিংয়ের ওপর নির্ভরতা কমানো উচিত।
এই বক্তব্যই পরবর্তীতে সংসদে ইসলামী ব্যাংকে চাকরি বিতর্ক–এর সূচনা হিসেবে কাজ করে।
ইসলামী ব্যাংকে চাকরি বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু

পার্থের বক্তব্যের পর আলোচনায় আসেন বিএনপির সংসদ সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায়। তিনি ইসলামী ব্যাংকে অমুসলিমদের চাকরির বিষয়ে একটি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন।
তিনি অভিযোগ করেন, একসময় তিনি একটি ইসলামী ব্যাংকের পরিচালককে একজন হিন্দু যুবকের চাকরির সুপারিশ করেছিলেন। কিন্তু তাকে জানানো হয়, ওই ব্যক্তি অমুসলিম হওয়ায় চাকরি দেওয়া সম্ভব নয়।
এই ঘটনার উল্লেখ করে তিনি বলেন, ব্যাংক কোনো ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান নয়। তাই সেখানে ধর্মের ভিত্তিতে চাকরি না দেওয়াকে তিনি বৈষম্য হিসেবে উল্লেখ করেন। তার বক্তব্যে স্পষ্টভাবে উঠে আসে মূল ইসলামী ব্যাংকে চাকরি বিতর্ক।
গয়েশ্বর চন্দ্র রায়ের বক্তব্য ও প্রশ্ন
গয়েশ্বর চন্দ্র রায় সংসদে বলেন, বাংলাদেশ শুধু একটি ধর্মের জন্য স্বাধীন হয়নি। সব ধর্ম ও বর্ণের মানুষের ত্যাগের মাধ্যমে দেশ স্বাধীন হয়েছে।
তিনি প্রশ্ন তোলেন, যদি কোনো ব্যাংকে ধর্মের ভিত্তিতে চাকরি না দেওয়া হয়, তাহলে সেটি বৈষম্য কিনা এবং সরকারের এ বিষয়ে ব্যাখ্যা দেওয়া উচিত।
এই বক্তব্য সংসদে আলোচনাকে আরও তীব্র করে তোলে এবং ইসলামী ব্যাংকে চাকরি বিতর্ক আরও গভীর হয়।
আন্দালিব রহমান পার্থের ব্যাখ্যা
গয়েশ্বরের বক্তব্যের পর আবারও বক্তব্য দেন আন্দালিব রহমান পার্থ। তিনি বলেন, বিশ্বব্যাপী ইসলামী ব্যাংকিং ব্যবস্থায় অমুসলিমদের অংশগ্রহণের সুযোগ রয়েছে এবং তার জানা মতে ইসলামী ব্যাংকে চাকরির ক্ষেত্রে কোনো নিষেধাজ্ঞা নেই।
তিনি আরও জানান, যে কেউ সেখানে চাকরি করতে পারে—এটাই তার ধারণা।
তার এই বক্তব্য সংসদে চলমান ইসলামী ব্যাংকে চাকরি বিতর্ক–কে আরও এক ধাপ সামনে নিয়ে যায়।
স্পিকারের সতর্কবার্তা
সংসদ অধিবেশনে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমেদ বিষয়টি নিয়ে সতর্ক করেন। তিনি বলেন, অনেক সময় সংসদে অনুমাননির্ভর বক্তব্য দেওয়া হয়, যা স্পর্শকাতর বিষয়ে বিভ্রান্তি তৈরি করতে পারে।
তিনি সংসদ সদস্যদের এ ধরনের বিষয়ে সতর্ক থাকার আহ্বান জানান, যাতে ইসলামী ব্যাংকে চাকরি বিতর্ক আরও জটিল না হয়।
শাহজাহান চৌধুরীর পাল্টা অবস্থান
পরবর্তীতে জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য শাহজাহান চৌধুরী গয়েশ্বরের অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেন। তিনি বলেন, তার নিজ এলাকায় হিন্দু সম্প্রদায়ের অনেক মানুষ ইসলামী ব্যাংকে চাকরি করছেন।
তার বক্তব্য অনুযায়ী, ইসলামী ব্যাংকে সব ধর্মের মানুষের কাজ করার সুযোগ রয়েছে। ফলে তিনি গয়েশ্বরের অভিযোগকে ভুল বলে উল্লেখ করেন।
এই পাল্টা বক্তব্যের মাধ্যমে ইসলামী ব্যাংকে চাকরি বিতর্ক আরও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসে।
সংসদে তিন পক্ষের অবস্থান
এই পুরো ঘটনাকে কেন্দ্র করে সংসদে তিনটি আলাদা অবস্থান স্পষ্ট হয়—
- গয়েশ্বর চন্দ্র রায়: ধর্মভিত্তিক বৈষম্যের অভিযোগ
- আন্দালিব রহমান পার্থ: ইসলামী ব্যাংকিংয়ে সীমাবদ্ধতা নেই
- শাহজাহান চৌধুরী: সব ধর্মের মানুষ কাজ করছে
ফলে বাজেট আলোচনার মাঝেই একটি বড় রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিতর্কে পরিণত হয় ইসলামী ব্যাংকে চাকরি বিতর্ক।
ইসলামী ব্যাংকিং নিয়ে বাড়তি প্রস্তাব
আলোচনায় পার্থ আরও কিছু প্রস্তাব দেন। তিনি বলেন, প্রতিটি এলাকায় জাকাতগ্রহীতাদের একটি তথ্যভান্ডার তৈরি করা উচিত, যাতে সঠিকভাবে সহায়তা পৌঁছানো যায়।
এছাড়া তিনি একটি “জাকাত টেলিভিশন” চালুর প্রস্তাবও দেন, যা জাকাত কার্যক্রমকে আরও কার্যকর করতে পারে।
এই ঘটনা শুধু একটি বক্তব্যকে কেন্দ্র করে সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং এটি সংসদে নীতি, ধর্মীয় সংবেদনশীলতা এবং কর্মসংস্থান অধিকার নিয়ে বড় প্রশ্ন তৈরি করেছে।
বিশেষ করে ইসলামী ব্যাংকে চাকরি বিতর্ক এখন শুধু রাজনৈতিক বক্তব্য নয়, বরং সামাজিক আলোচনার বিষয়েও পরিণত হয়েছে।





