যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধবিরতি অনিশ্চিত পরিস্থিতিতে নতুন হামলা ও নিষেধাজ্ঞার পর আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বেড়েছে। হরমুজ প্রণালি ঘিরে উদ্বেগে বিশ্লেষকদের সতর্ক বার্তা।
মধ্যপ্রাচ্যে আবারও উত্তেজনা বেড়ে যাওয়ায় যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধবিরতি অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নতুন বিমান হামলা এবং ইরানের অপরিশোধিত তেল বিক্রির ওপর পুনরায় নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হওয়ার পর আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে তেলের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। হরমুজ প্রণালি দিয়ে জ্বালানি পরিবহন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কায় বাজারে নতুন উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধবিরতি অনিশ্চিত: কেন বাড়ছে উদ্বেগ?
মঙ্গলবার যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড জানায়, হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী তিনটি বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার জবাবে ইরানের কয়েকটি লক্ষ্যবস্তুতে বিমান হামলা চালানো হয়েছে।
একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের অপরিশোধিত তেল বিক্রির জন্য আগে দেওয়া সাধারণ লাইসেন্স বাতিল করে পুনরায় নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করে। এই দুই পদক্ষেপের পরই আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দামে ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দেখা যায়।
বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহন রুট হিসেবে পরিচিত হরমুজ প্রণালি দিয়ে মধ্যপ্রাচ্য থেকে বিপুল পরিমাণ তেল ও গ্যাস বিভিন্ন দেশে পরিবহন করা হয়। ফলে এই অঞ্চলে সংঘাত বাড়লে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে তাৎক্ষণিক প্রভাব পড়ে।
আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দামের সর্বশেষ চিত্র

বাজারের তথ্য অনুযায়ী, গ্রিনিচ মান সময় রাত ১টা ২৮ মিনিটে ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১ দশমিক ৩৮ ডলার বা ১ দশমিক ৯ শতাংশ বেড়ে ৭৫ দশমিক ৫৪ ডলারে পৌঁছায়।
একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (ডব্লিউটিআই) অপরিশোধিত তেলের দামও ১ দশমিক ৩৭ ডলার বা ১ দশমিক ৯ শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ৭১ দশমিক ৮১ ডলারে ওঠে।
এর আগের দিন মঙ্গলবারও দুই ধরনের অপরিশোধিত তেলের দাম প্রায় ৩ শতাংশ বেড়েছিল।
হামলা ও নিষেধাজ্ঞা কীভাবে বাজারকে প্রভাবিত করছে?
তিনটি বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার ঘটনার পর যুক্তরাষ্ট্র ইরানের তেল বিক্রির অনুমতি বাতিল করায় বিনিয়োগকারীদের মধ্যে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
জ্বালানি বাজার গবেষণা প্রতিষ্ঠান এমএসটি মারকির গবেষণা প্রধান সল কাভোনিক বলেন, সাম্প্রতিক সংঘাত আবারও মনে করিয়ে দিচ্ছে যে হরমুজ প্রণালি দিয়ে নিরাপদে জাহাজ চলাচলের পরিস্থিতি এখনো অত্যন্ত অনিশ্চিত।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, এতদিন বাজারে ধারণা ছিল বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহ বাড়বে এবং দাম আরও কমতে পারে। কিন্তু সাম্প্রতিক পরিস্থিতি সেই প্রত্যাশাকে দুর্বল করে দিয়েছে। ফলে যারা তেলের দাম কমবে ধরে বিনিয়োগ করেছিলেন, তাদের অবস্থান পরিবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
সরবরাহ সংকটের আশঙ্কা
সল কাভোনিকের মতে, যদি উত্তেজনা দীর্ঘস্থায়ী হয় এবং হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল যুদ্ধ শুরুর আগের তুলনায় ৫০ শতাংশের নিচে নেমে যায়, তাহলে বৈশ্বিক তেল সরবরাহের ওপর বড় চাপ সৃষ্টি হতে পারে।
এতে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম আরও বাড়তে পারে বলে তিনি মনে করেন।
যুদ্ধবিরতির পর যে আশাবাদ তৈরি হয়েছিল
গত মাসে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হওয়ার পর আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম যুদ্ধ শুরুর আগের পর্যায়ে ফিরে এসেছিল।
সে সময় অনেক ব্যবসায়ী ধারণা করেছিলেন, মধ্যপ্রাচ্য থেকে আটকে থাকা বিপুল পরিমাণ তেল আবার বিশ্ববাজারে সরবরাহ হবে। এই প্রত্যাশায় অনেকে তেলের দাম আরও কমবে ধরে বড় অঙ্কের বিনিয়োগও করেছিলেন।
তবে নতুন হামলা ও পাল্টা হামলার ঘটনায় সেই আশাবাদ আবারও অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে।
জাহাজে হামলা নিয়ে কী জানা গেছে?
তিনটি বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার দায় এখনো কোনো পক্ষ আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকার করেনি।
তবে কাতার এ হামলার জন্য ইরানকে দায়ী করেছে।
হামলার শিকার জাহাজগুলোর একটি ছিল কাতারের তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) বহনকারী একটি ট্যাংকার। জাহাজটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, একটি ড্রোন আঘাত করার পর ইঞ্জিনকক্ষে আগুন লাগে।
অন্যদিকে সামুদ্রিক নিরাপত্তা সূত্র জানিয়েছে, ওমান উপকূলের কাছে সৌদি আরবের পতাকাবাহী একটি অপরিশোধিত তেলবাহী ট্যাংকারও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, এটি সুপারট্যাংকার ‘ওয়েদিয়ান’। তবে কী কারণে জাহাজটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে বাড়ছে উত্তেজনা
সাম্প্রতিক হামলার পর হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেলবাহী জাহাজ চলাচল নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
ফেব্রুয়ারিতে যুদ্ধ শুরুর আগে বিশ্বের মোট জ্বালানি সরবরাহের প্রায় ২০ শতাংশ এই প্রণালি দিয়ে পরিবহন করা হতো।
বর্তমানে ইরান প্রণালিতে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ আরও জোরালোভাবে কার্যকর করছে। তারা জাহাজগুলোকে ওমানের দিকের পথ এড়িয়ে ইরানের উপকূলঘেঁষা পথ ব্যবহার করতে বলছে।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র বলছে, সংঘাত শুরুর আগের মতোই এই আন্তর্জাতিক নৌপথ সব দেশের জন্য উন্মুক্ত থাকা উচিত।
সম্ভাব্য সরবরাহ সংকট মোকাবেলায় বিভিন্ন দেশ ইতোমধ্যে নিজেদের জ্বালানির মজুদ ব্যবহার করছে।
যুক্তরাষ্ট্রের তেলের মজুদও কমেছে
বাজারসংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, আমেরিকান পেট্রোলিয়াম ইনস্টিটিউটের তথ্য অনুযায়ী গত সপ্তাহেও যুক্তরাষ্ট্রের অপরিশোধিত তেলের মজুদ কমেছে।
রয়টার্সের জরিপে অংশ নেওয়া বিশ্লেষকদের ধারণা, ৩ জুলাই শেষ হওয়া সপ্তাহে দেশটির অপরিশোধিত তেলের মজুদ প্রায় ২৪ লাখ ব্যারেল কমেছে।
মজুদ কমে যাওয়ার তথ্যও আন্তর্জাতিক বাজারে দামের ওপর অতিরিক্ত প্রভাব ফেলছে বলে বাজার পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন।
যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধবিরতি অনিশ্চিত হয়ে পড়ায় মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতি আবারও বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের কেন্দ্রবিন্দুতে এসেছে। নতুন হামলা, নিষেধাজ্ঞা, হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল নিয়ে উদ্বেগ এবং যুক্তরাষ্ট্রের তেলের মজুদ কমার তথ্য—সব মিলিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দামে ঊর্ধ্বমুখী চাপ তৈরি হয়েছে। পরিস্থিতির পরবর্তী অগ্রগতি বিশ্ব জ্বালানি বাজারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে থাকবে।





