আমাকে বিভ্রান্ত করা হয়েছিল, থালাপাতি বিজয়ের কারুর মন্তব্য ঘিরে নতুন আলোচনা। ৪১ জনের মৃত্যুর ঘটনায় পুলিশ ও তৎকালীন ডিএমকের বিরুদ্ধে বিভ্রান্ত করার অভিযোগ তুলে শোক ও প্রশ্ন প্রকাশ করেছেন তামিলনাড়ুর মুখ্যমন্ত্রী।
তামিলনাড়ুর মুখ্যমন্ত্রী জোসেফ বিজয় চন্দ্রশেখর, যিনি থালাপাতি বিজয় নামে পরিচিত, কারুরে ২০২৫ সালের পদদলিত হয়ে ৪১ জনের মৃত্যুর ঘটনার প্রসঙ্গে বলেছেন, তাকে সেদিন পুলিশ বিভ্রান্ত করেছিল। থালাপাতি বিজয়ের কারুর মন্তব্য দিতে গিয়ে তিনি দাবি করেন, পুলিশ চাইলে সমাবেশ বন্ধ করতে বা তাকে আগে থেকেই সতর্ক করতে পারত। ঘটনার প্রায় ১০ মাস পর কারুর সফরে গিয়ে তিনি নিহতদের প্রতি গভীর শোক প্রকাশের পাশাপাশি তৎকালীন ক্ষমতাসীন ডিএমকের ভূমিকাও প্রশ্নবিদ্ধ করেন।
২০২৫ সালের কারুরের মর্মান্তিক ঘটনা
২০২৫ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর একটি জনসভায় অংশ নিতে কারুরে যান থালাপাতি বিজয়। তাকে একনজর দেখতে বিপুলসংখ্যক মানুষ সমবেত হন। কিন্তু অতিরিক্ত ভিড় ও হুড়োহুড়ির একপর্যায়ে পদদলিত হয়ে নারী ও শিশুসহ ৪১ জন প্রাণ হারান।
এই ঘটনাকে নিজের জীবনের সবচেয়ে বেদনাদায়ক অভিজ্ঞতা হিসেবে উল্লেখ করেছেন বিজয়। তার ভাষায়, এই স্মৃতি এখনও তাকে তাড়া করে বেড়ায়।
থালাপাতি বিজয়ের কারুর মন্তব্য: ‘আমাকে বিভ্রান্ত করা হয়েছিল’

পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন
থালাপাতি বিজয়ের কারুর মন্তব্য-এ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল পুলিশের ভূমিকা নিয়ে তার অভিযোগ।
বিজয় বলেন, তিনি পুলিশের ওপর আস্থা রেখেই সমাবেশস্থলের দিকে এগিয়ে গিয়েছিলেন। তার বক্তব্য অনুযায়ী, পুলিশ চাইলে কারুরে প্রবেশের আগেই তাকে থামাতে পারত কিংবা জানাতে পারত যে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, সমাবেশ বাতিল করার ক্ষমতাও পুলিশের ছিল। কিন্তু তা না করে তাকে অনুষ্ঠানস্থলে নিয়ে যাওয়া হয়। এমনকি তিনি তখন পুলিশের কাজের প্রশংসাও করেছিলেন। পরে তার উপলব্ধি হয়েছে যে ঘটনার পেছনে অন্য কিছু থাকতে পারে।
বিজয়ের ভাষায়, তিনি জানতেন না কী ঘটছে এবং এখন তিনি জানতে চান, প্রকৃতপক্ষে এর জন্য দায়ী কে।
ডিএমকের বিরুদ্ধে ইঙ্গিতপূর্ণ অভিযোগ
কারুরের ঘটনার প্রসঙ্গ টেনে বিজয় তৎকালীন ক্ষমতাসীন ডিএমকে এবং সে সময়ের মুখ্যমন্ত্রী এম কে স্টালিনের দিকেও ইঙ্গিত করেন।
তিনি প্রশ্ন তোলেন, পর্যাপ্তসংখ্যক পুলিশ সদস্য মোতায়েন করা হয়েছিল কি না। তার অভিযোগ, পরে সব দায় তার ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল এবং বিষয়টি রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করা হয়েছে।
এছাড়া তিনি ইঙ্গিত দেন, ২০২৬ সালের এপ্রিলের বিধানসভা নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক সুবিধা নেওয়ার উদ্দেশ্যে ডিএমকে ও পুলিশের মধ্যে ষড়যন্ত্র হয়েছিল বলে তার সন্দেহ রয়েছে।
নীরবতা নিয়ে সমালোচনারও জবাব
ঘটনার পর দীর্ঘ সময় প্রকাশ্যে কোনো মন্তব্য না করায় বিজয় এবং তার দল টিভিকে সমালোচনার মুখে পড়েছিল।
কারুর সফরে কালো পোশাক পরে তিনি সেই সমালোচনারও জবাব দেন। তিনি বলেন, যখন তিনি ব্যক্তিগতভাবে ভেঙে পড়েছিলেন এবং গভীর শোকে ছিলেন, তখন অনেকেই তাকে নিয়ে উপহাস করেছেন এবং অভিযোগ করেছেন যে তিনি লুকিয়ে আছেন।
একই সঙ্গে তিনি নিহত শিশুদের ‘নিষ্পাপ দেবদূতের মতো’ উল্লেখ করে তাদের পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানান।
রাজনৈতিক সাফল্যের পর প্রথম কারুর সফর
অভিনয় থেকে রাজনীতিতে আসার মাত্র দুই বছরের মধ্যেই বিজয় তামিলনাড়ুর রাজনীতিতে বড় পরিবর্তনের অংশ হন।
গত এপ্রিলের বিধানসভা নির্বাচনে ডিএমকে ও এআইএডিএমকের দীর্ঘ ৫৯ বছরের ক্ষমতার পালাবদলের ধারাবাহিকতা ভেঙে বিজয়ের নেতৃত্বাধীন টিভিকে জোট সরকার গঠন করে।
এরপর ১০ মে চেন্নাইয়ের জওহারলাল নেহেরু স্টেডিয়ামে আয়োজিত অনুষ্ঠানে তিনি তামিলনাড়ুর ২২তম মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন।
মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পর শুক্রবারের কারুর সফর ছিল সেই মর্মান্তিক ঘটনার পর তার প্রথম সফর।
নিহত পরিবারের চাকরি নিয়ে আদালতের সিদ্ধান্ত
কারুরের ঘটনায় নিহত ৪১ পরিবারের সদস্যদের সরকারি চাকরি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় তামিলনাড়ু সরকার।
এই সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে আদালতের দ্বারস্থ হয় ডিএমকে। দলটির দাবি ছিল, এ ধরনের পদক্ষেপ চলমান তদন্তে সাক্ষীদের প্রভাবিত করতে পারে।
তবে আদালত সেই আবেদন খারিজ করে দেয়। আদালত প্রশ্ন তোলে, একজন মুখ্যমন্ত্রী কী করবেন, তা আদালত নির্ধারণ করবে কি না।
মাদ্রাজ হাইকোর্টের অবস্থান
শুক্রবার বিজয়ের কারুর সফরের আগে ডিএমকে আবারও আদালত-নিযুক্ত তদারকি কমিটি এবং তদন্তকারী সংস্থা সিবিআইয়ের কাছে আবেদন জানায়।
কিন্তু মাদ্রাজ হাইকোর্টের মাদুরাই বেঞ্চ নিহত পরিবারের সদস্যদের চাকরি দেওয়ার সিদ্ধান্তকে সরকারের নীতিগত সিদ্ধান্ত হিসেবে উল্লেখ করে এতে হস্তক্ষেপ করতে অস্বীকৃতি জানায়।
আদালত নিয়োগপত্র বিতরণের অনুমতি দিলেও নির্দেশ দেয়, এসব নিয়োগ আপাতত সাময়িক থাকবে। মামলার চূড়ান্ত রায়ের পর সরকার প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নিতে পারবে।
ঘটনাপ্রবাহের সারসংক্ষেপ
- ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৫: কারুরে জনসভায় পদদলিত হয়ে ৪১ জন নিহত।
- ঘটনার পর বিজয় দীর্ঘ সময় প্রকাশ্যে নীরব থাকেন।
- এপ্রিলের নির্বাচনে বিজয়ের নেতৃত্বাধীন টিভিকে জোট ক্ষমতায় আসে।
- ১০ মে তিনি তামিলনাড়ুর ২২তম মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন।
- মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পর প্রথম কারুর সফরে গিয়ে তিনি বলেন, পুলিশ তাকে বিভ্রান্ত করেছিল এবং ঘটনার জন্য গভীর শোক প্রকাশ করেন।
- একই সময়ে নিহত পরিবারের সরকারি চাকরি নিয়ে আদালত সরকারের সিদ্ধান্তে হস্তক্ষেপ করতে অস্বীকৃতি জানায়।
থালাপাতি বিজয়ের কারুর মন্তব্য নতুন করে ২০২৫ সালের মর্মান্তিক পদদলিত হওয়ার ঘটনাকে আলোচনায় নিয়ে এসেছে। কারুর সফরে তিনি নিহতদের প্রতি গভীর শোক প্রকাশ করার পাশাপাশি পুলিশের ভূমিকা ও তৎকালীন ডিএমকের বিরুদ্ধে প্রশ্ন তুলেছেন। একই সময়ে নিহত পরিবারের সদস্যদের সরকারি চাকরি দেওয়ার বিষয়ে আদালতের সাম্প্রতিক অবস্থানও ঘটনাটিকে নতুন মাত্রা দিয়েছে। মামলার চূড়ান্ত রায় না আসা পর্যন্ত বিষয়টি রাজনৈতিক ও আইনি—দুই ক্ষেত্রেই গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার অংশ হয়ে থাকবে।





