এক লাখ কোটি টাকার আমানতের ক্লাবে এবার পূবালী ব্যাংক। গ্রাহকের আস্থা, ডিজিটাল সেবা ও শক্ত ব্যবস্থাপনায় ব্যাংকটির বড় অর্জনের খবর।
দেশের বেসরকারি খাতের অন্যতম পুরোনো ব্যাংক পূবালী ব্যাংকের আমানত প্রথমবারের মতো এক লাখ কোটি টাকার সীমা অতিক্রম করেছে। ব্যাংকটির শীর্ষ কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, দীর্ঘদিনের গ্রাহক আস্থা, বিস্তৃত শাখা নেটওয়ার্ক, ডিজিটাল ব্যাংকিং সেবা এবং করপোরেট সুশাসনের ধারাবাহিকতার ফলেই এই অর্জন সম্ভব হয়েছে।
পূবালী ব্যাংকের আমানত এক লাখ কোটি টাকা ছাড়ানোর মাধ্যমে দেশের বেসরকারি খাতের দ্বিতীয় ব্যাংক হিসেবে এই গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক স্পর্শ করেছে। সরকারি ও বেসরকারি মিলিয়ে এটি দেশের পঞ্চম ব্যাংক, যারা এক লাখ কোটি টাকার আমানতের ক্লাবে যুক্ত হলো।
বর্তমানে এই তালিকায় রয়েছে সোনালী ব্যাংক, ইসলামী ব্যাংক, অগ্রণী ব্যাংক, জনতা ব্যাংক এবং পূবালী ব্যাংক।
পূবালী ব্যাংকের আমানত পৌঁছাল এক লাখ কোটি টাকার ঘরে

গত সপ্তাহ শেষে পূবালী ব্যাংকের মোট আমানতের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৮০০ কোটি টাকা। শুধু আমানতের পরিমাণ নয়, অন্যান্য আর্থিক সূচকেও শক্ত অবস্থানে রয়েছে ব্যাংকটি।
ব্যাংকটির কর্মকর্তাদের মতে, গ্রাহকদের দীর্ঘদিনের আস্থা ও বিশ্বাস এই প্রবৃদ্ধির অন্যতম প্রধান কারণ। একই সঙ্গে প্রযুক্তিনির্ভর সেবা, নিরাপদ ব্যাংকিং ব্যবস্থা এবং দক্ষ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে ব্যাংকটি নিজেদের অবস্থান শক্ত করেছে।
১৯৫৯ সালে প্রতিষ্ঠিত পূবালী ব্যাংক সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ব্যাংকিং সেবায় আধুনিকায়ন এনেছে। বিশেষ করে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম সম্প্রসারণ, মানবসম্পদের কার্যকর ব্যবহার এবং করপোরেট সুশাসনের ওপর গুরুত্ব দেওয়ার ফলে গ্রাহকদের কাছে ব্যাংকটির গ্রহণযোগ্যতা বেড়েছে।
এক লাখ কোটি টাকার আমানতের ক্লাবে পূবালী ব্যাংক
দেশের ব্যাংকিং খাতে এক লাখ কোটি টাকার আমানত একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হয়।
২০১৬ সালে রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী ব্যাংক প্রথমবারের মতো এই সীমা অতিক্রম করে। এরপর ২০২০ সালের জুনে বেসরকারি খাতের প্রথম ব্যাংক হিসেবে ইসলামী ব্যাংক এই ক্লাবে যুক্ত হয়।
২০২১ সালে রাষ্ট্রায়ত্ত অগ্রণী ব্যাংক ও জনতা ব্যাংক এক লাখ কোটি টাকার আমানতের তালিকায় যুক্ত হয়। সবশেষে পূবালী ব্যাংকের আমানতও এই সীমা অতিক্রম করেছে।
বর্তমানে এক লাখ কোটি টাকার আমানতের ক্লাবে থাকা পাঁচটি ব্যাংকের মধ্যে তিনটি রাষ্ট্রায়ত্ত এবং দুটি বেসরকারি খাতের।
তথ্য অনুযায়ী, গত ৩১ মে ইসলামী ব্যাংকের আমানতের পরিমাণ ছিল ১ লাখ ৮৪ হাজার ৩৮২ কোটি টাকা। ২০২৫ সালের শেষে সোনালী ব্যাংকের আমানত ছিল ১ লাখ ৭৯ হাজার ৮৭৯ কোটি টাকা, অগ্রণী ব্যাংকের ১ লাখ ১৩ হাজার ৬৪ কোটি টাকা এবং জনতা ব্যাংকের ১ লাখ ২৫ হাজার ৫৪৯ কোটি টাকা।
সাড়ে তিন বছরে দ্বিগুণ হয়েছে পূবালী ব্যাংকের আমানত
পূবালী ব্যাংকের আমানত বৃদ্ধির গতি সাম্প্রতিক বছরগুলোতে উল্লেখযোগ্য ছিল।
২০২২ সালের শেষে ব্যাংকটির আমানতের পরিমাণ ছিল প্রায় ৫১ হাজার কোটি টাকা। চলতি বছরের জুলাইয়ের প্রথম সপ্তাহে তা এক লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে।
অর্থাৎ, ১৯৫৯ সালে প্রতিষ্ঠার পর ২০২২ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ সময়ে যে পরিমাণ আমানত সংগ্রহ হয়েছিল, তার প্রায় সমপরিমাণ নতুন আমানত এসেছে গত সাড়ে তিন বছরে।
গত বছরের শেষে ব্যাংকটির আমানত ছিল ৮৯ হাজার ৫১৯ কোটি টাকা। এক বছরের ব্যবধানে এই পরিমাণ আরও বৃদ্ধি পেয়েছে।
সংকট কাটিয়ে ঘুরে দাঁড়ানোর দীর্ঘ পথ
পূবালী ব্যাংকের বর্তমান অবস্থানে পৌঁছানোর পথ সহজ ছিল না।
১৯৫৯ সালে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে বাঙালি মুসলিম উদ্যোক্তাদের উদ্যোগে ‘ইস্টার্ন মার্কেন্টাইল ব্যাংক’ নামে যাত্রা শুরু করে প্রতিষ্ঠানটি। স্বাধীনতার পর ১৯৭১ সালে ব্যাংকটি জাতীয়করণ করা হয় এবং এর নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় পূবালী ব্যাংক।
তবে জাতীয়করণের পরবর্তী সময়ে ঋণ অনিয়ম ও রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের কারণে ব্যাংকটির আর্থিক ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ে। ১৯৮৪ সালের মধ্যে বিতরণ করা ঋণের প্রায় ৫৪ শতাংশ খেলাপিতে পরিণত হয়।
পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার ব্যাংকটিকে পুনর্গঠনের উদ্যোগ নেয়। ১৯৮৪ সালে মাত্র ১৬ কোটি টাকার বিনিময়ে পূবালী ব্যাংকের শেয়ার বেসরকারি খাতে হস্তান্তর করা হয়।
এরপর ব্যাংকটির পরিচালনায় বড় ধরনের সংস্কার আনা হয়। প্রযুক্তিগত উন্নয়ন, দক্ষ ব্যবস্থাপনা এবং করপোরেট সুশাসনের মাধ্যমে ধীরে ধীরে ব্যাংকটি আর্থিকভাবে শক্ত অবস্থানে ফিরে আসে।
পূবালী ব্যাংকের আমানত বৃদ্ধির পেছনে ডিজিটাল সেবার ভূমিকা
পূবালী ব্যাংকের আমানত বৃদ্ধির ক্ষেত্রে ডিজিটাল ব্যাংকিং সেবার সম্প্রসারণকে গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
ব্যাংকটির নিজস্ব ‘পাই ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম’-এর সক্রিয় ব্যবহারকারীর সংখ্যা বর্তমানে প্রায় ৬ লাখ। এছাড়া নগদ টাকাবিহীন লেনদেন বাড়াতে দেশজুড়ে ২৫ হাজারের বেশি পিওএস টার্মিনাল এবং প্রায় দেড় লাখ ‘বাংলা কিউআর’ কোড স্থাপন করেছে ব্যাংকটি।
ডিজিটাল অনবোর্ডিং সুবিধার মাধ্যমে গ্রাহকেরা এখন ঘরে বসেই কয়েক মিনিটের মধ্যে হিসাব খুলে ব্যাংকিং সেবা গ্রহণ করতে পারছেন।
শাখাভিত্তিক সেবার পাশাপাশি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে বিনিয়োগ ব্যাংকটির সাম্প্রতিক প্রবৃদ্ধির অন্যতম ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
আর্থিক সূচকেও শক্ত অবস্থানে পূবালী ব্যাংক
আমানতের পাশাপাশি ঋণ ও মুনাফার ক্ষেত্রেও পূবালী ব্যাংক ভালো অবস্থানে রয়েছে।
গত বছরের হিসাব অনুযায়ী, ব্যাংকটির বিতরণ করা ঋণের পরিমাণ ছিল ৭১ হাজার ১৪০ কোটি টাকা। বর্তমানে তা বেড়ে প্রায় ৭৪ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছেছে।
দেশের ব্যাংকিং খাতে যেখানে খেলাপি ঋণের গড় হার প্রায় ৩০ শতাংশের কাছাকাছি, সেখানে পূবালী ব্যাংকের খেলাপি ঋণের হার ২ দশমিক ২০ শতাংশ।
বৈদেশিক বাণিজ্যেও ব্যাংকটির কার্যক্রম উল্লেখযোগ্য। গত বছর পূবালী ব্যাংকের মাধ্যমে ৩৮ হাজার ৬৬৪ কোটি টাকার রপ্তানি এবং ৪৭ হাজার ৩১৪ কোটি টাকার আমদানি বাণিজ্য সম্পন্ন হয়েছে।
একই সময়ে ব্যাংকটির মাধ্যমে দেশে এসেছে ১১ হাজার ৩৬২ কোটি টাকার প্রবাসী আয়।
ব্যাংকটি গত বছর ১ হাজার ৭৯ কোটি টাকা প্রকৃত বা নিট মুনাফা করেছে।
বর্তমানে দেশজুড়ে পূবালী ব্যাংকের রয়েছে ৫১৯টি শাখা, ২৯০টি উপশাখা এবং এক হাজারের বেশি এটিএম ও সিআরএম বুথ।
কর্মকর্তাদের বক্তব্য
পূবালী ব্যাংকের শীর্ষ কর্মকর্তারা বলছেন, আমানতে এক লাখ কোটি টাকার মাইলফলক গ্রাহকদের দীর্ঘদিনের আস্থা ও বিশ্বাসের প্রতিফলন।
তাদের মতে, সম্পদের গুণগত মান, নিরাপদ ঋণ পোর্টফোলিও, করপোরেট সুশাসন এবং টেকসই উন্নয়ন—এই চারটি বিষয় ব্যাংকের প্রবৃদ্ধিতে বড় ভূমিকা রেখেছে।
পূবালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মোহাম্মদ আলী বলেন, দেশজুড়ে বিস্তৃত শাখা নেটওয়ার্ক এবং আধুনিক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের কারণে গ্রাহকেরা সহজে ব্যাংকিং সেবা নিতে পারছেন।
তিনি আরও বলেন, নিরাপদ ও প্রযুক্তিনির্ভর সেবার কারণে নতুন প্রজন্মের গ্রাহকদের মধ্যেও পূবালী ব্যাংকের প্রতি আগ্রহ বাড়ছে।
ভবিষ্যতে ব্যাংকিং সেবার বিস্তারে নজর
এক লাখ কোটি টাকার আমানতের মাইলফলক পূবালী ব্যাংকের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্জন হলেও ব্যাংকটি ভবিষ্যতে আরও উন্নত প্রযুক্তিনির্ভর সেবা সম্প্রসারণের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে।
গ্রাহকদের আস্থা ধরে রাখা, নিরাপদ ঋণ ব্যবস্থাপনা এবং ডিজিটাল সেবার পরিধি বাড়ানোর মাধ্যমে ব্যাংকটি নিজেদের অবস্থান আরও শক্তিশালী করতে চায়।
পূবালী ব্যাংকের আমানত বৃদ্ধির এই অগ্রগতি দেশের ব্যাংকিং খাতে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতার একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।





