অং সান সু চি আমাদের বোন : মিয়ানমার। সাবেক নেত্রীকে ‘আমাদের বোন’ উল্লেখ করে যথাযথ যত্ন নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছে দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী।
মিয়ানমারের সামরিক সরকারের পক্ষ থেকে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার আঞ্চলিক জোট আসিয়ানকে জানানো হয়েছে যে অং সান সু চি সুস্থ আছেন এবং তাকে যথাযথভাবে দেখাশোনা করা হচ্ছে। দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আসিয়ানের বিশেষ দূত ও ফিলিপাইনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মারিয়া তেরেসা লাজারোকে বলেন, সু চি তাদের “আত্মীয়” এবং “বোনের মতো”, তাই তার যথাযথ যত্ন নেওয়া হবে। একই সময়ে আসিয়ানের সদস্য রাষ্ট্রগুলো সু চির সঙ্গে সরাসরি সাক্ষাতের সুযোগ চেয়েছে, যাতে তার শারীরিক অবস্থা স্বাধীনভাবে যাচাই করা যায়।
অং সান সু চি সুস্থ—আসিয়ানকে কী জানাল মিয়ানমার?
আসিয়ানের বিশেষ দূত এবং ফিলিপাইনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মারিয়া তেরেসা লাজারো জানান, মিয়ানমারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী তাকে বলেছেন, “অং সান সু চি আমাদের আত্মীয়, তিনি আমাদের বোন। তাই আমরা তার যথাযথ যত্ন নেব।”
লাজারো সংবাদ সম্মেলনে আরও বলেন, মিয়ানমারের পক্ষ থেকে তাকে নিশ্চিত করা হয়েছে যে অং সান সু চি সুস্থ আছেন। একই সঙ্গে তাকে আশ্বাস দেওয়া হয়েছে যে সাবেক এই নেত্রীর যথাযথ পরিচর্যা অব্যাহত রয়েছে।
২০২১ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পর পরিস্থিতি

২০২১ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে অং সান সু চির নির্বাচিত সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করা হয়। এরপর থেকেই তাকে আটক রাখা হয়েছে।
এই অভ্যুত্থানের পর দেশজুড়ে সংঘাত ছড়িয়ে পড়ে এবং তা দীর্ঘস্থায়ী গৃহযুদ্ধে রূপ নেয়। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, এ সংঘাতে এখন পর্যন্ত প্রায় এক লাখ মানুষের মৃত্যু হয়েছে বলে ধারণা করা হয়।
বর্তমানে অং সান সু চি ২৭ বছরের কারাদণ্ড ভোগ করছেন। যদিও সম্প্রতি তার সাজা এক-তৃতীয়াংশ কমানো হয়েছে। বিভিন্ন ফৌজদারি মামলায় তাকে এই দণ্ড দেওয়া হলেও তার সমর্থকদের দাবি, তাকে রাজনীতি থেকে দূরে রাখতেই এসব মামলা করা হয়েছে।
অন্যদিকে সু চি সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। বর্তমানে তাকে কোথায় রাখা হয়েছে, তা প্রকাশ করা হয়নি।
আসিয়ান-মিয়ানমার বৈঠকে কী আলোচনা হয়েছে?
২০২১ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পর এই প্রথম আসিয়ানের ১১ সদস্য দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা মিয়ানমারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী টিন মং সোয়ের সঙ্গে সরাসরি বৈঠক করেন।
এই বৈঠকের মূল লক্ষ্য ছিল মিয়ানমারের চলমান গৃহযুদ্ধ বন্ধে শান্তি প্রচেষ্টা পুনরায় সক্রিয় করা এবং মানবিক সহায়তা কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়ার উপায় খুঁজে বের করা।
লাজারো বলেন, এই সংকটের সমাধান এক দিনে সম্ভব নয়। তার ভাষায়, পরিস্থিতি ধীরে ধীরে পরিবর্তিত হচ্ছে এবং সে কারণে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ ও আলোচনা অব্যাহত রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি আরও জানান, মানবিক সহায়তা পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে ইতোমধ্যে কিছু অগ্রগতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
পাঁচ দফা শান্তি পরিকল্পনা নিয়ে মতপার্থক্য
আসিয়ানের প্রস্তাবিত পাঁচ দফা শান্তি পরিকল্পনা বাস্তবায়নে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি না হওয়ায় মিয়ানমারের সামরিক নেতৃত্বকে সংগঠনটির উচ্চ পর্যায়ের বৈঠকে অংশ নেওয়ার অনুমতি দেওয়া হয় না।
যদিও এই পরিকল্পনা এখন পর্যন্ত খুব সীমিত সাফল্য অর্জন করেছে, তবুও মারিয়া তেরেসা লাজারো এর পক্ষে অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেন।
তিনি বলেন, এই পরিকল্পনা সংঘাতে জড়িত বিভিন্ন পক্ষের মধ্যে সংলাপ শুরু এবং মানবিক সহায়তা কার্যক্রম আরও কার্যকর করার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ কাঠামো হিসেবে কাজ করছে।
তার বক্তব্য ছিল, “তারা এই পরিকল্পনা গ্রহণ করুক বা না করুক, আমি আমার অবস্থানে অটল। আসিয়ান এখনো পাঁচ-দফা শান্তি পরিকল্পনার পক্ষেই রয়েছে।”
আসিয়ানের সদস্য রাষ্ট্রগুলোর দাবি
থাইল্যান্ডের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সিহাসাক ফুয়াংকেটকে জানান, আসিয়ানভুক্ত দেশগুলোর পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা টিন মং সোয়েকে তাদের প্রত্যাশার বিষয়গুলো স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন।
তাদের অন্যতম দাবি ছিল অং সান সু চির সঙ্গে সরাসরি সাক্ষাতের সুযোগ দেওয়া, যাতে অং সান সু চি সুস্থ আছেন কি না, তা স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়।
মিয়ানমারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বক্তব্য
মিয়ানমারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, রবিবারের বৈঠকে দুই পক্ষের সম্পর্ক আরও জোরদার করা এবং আসিয়ানের কার্যক্রমে মিয়ানমারের পূর্ণ ও সমান অংশগ্রহণ পুনরুদ্ধারের বিষয়ে গঠনমূলক আলোচনা হয়েছে।
একই সঙ্গে জানানো হয়, আসিয়ানের সদস্য দেশগুলো অং সান সু চির সঙ্গে সাক্ষাতের সুযোগ চেয়েছে।
অন্যদিকে বিবৃতিতে বলা হয়েছে, যারা আসিয়ানের শান্তি পরিকল্পনা অনুসরণ করতে চায় না, তাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ বাড়ানোর সিদ্ধান্ত সমর্থন করা কঠিন।
মিয়ানমারের পক্ষ থেকে অং সান সু চি সুস্থ থাকার আশ্বাস দেওয়া হলেও আসিয়ান সদস্য রাষ্ট্রগুলো স্বাধীনভাবে তার শারীরিক অবস্থা যাচাই করতে সরাসরি সাক্ষাতের সুযোগ চাইছে। একই সঙ্গে মিয়ানমারের চলমান সংঘাত নিরসনে আসিয়ানের পাঁচ দফা শান্তি পরিকল্পনা বাস্তবায়নের ওপরও গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে। তবে পরিকল্পনাটি নিয়ে মতপার্থক্য এখনো বিদ্যমান থাকায় শান্তি উদ্যোগের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে।





