কানাডার দাবানলের ধোঁয়া যুক্তরাষ্ট্রে, শুল্ক বাড়ানোর হুমকি ট্রাম্পের, ৬.৫ লাখ একর এলাকায় আগুন ও হাজারো মানুষ সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কানাডার দাবানলের ধোঁয়া যুক্তরাষ্ট্রে ছড়িয়ে পড়ার জন্য কানাডাকে দায়ী করেছেন। বৃহস্পতিবার ও শুক্রবার কানাডার শত শত দাবানলের ধোঁয়া যুক্তরাষ্ট্রের মধ্য-পশ্চিম থেকে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে। এই পরিস্থিতির জন্য কানাডার পণ্যের ওপর বিদ্যমান শুল্কের সঙ্গে অতিরিক্ত ব্যয় যোগ করার হুমকি দিয়েছেন ট্রাম্প।
ট্রাম্পের দাবি, কানাডা তার বনভূমির যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণ করছে না। এর ফলে দূষিত ও অস্বাস্থ্যকর বাতাস যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করছে। তবে জলবায়ু বিশেষজ্ঞরা তার এই ব্যাখ্যার সঙ্গে একমত নন। তাদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে তাপমাত্রা বৃদ্ধি এবং বনভূমি শুষ্ক হয়ে যাওয়ায় দাবানলের ঝুঁকি বাড়ছে।
কানাডার দাবানলের ধোঁয়া নিয়ে ট্রাম্পের অভিযোগ
ট্রাম্প তার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে কানাডার বনভূমি ব্যবস্থাপনা নিয়ে অভিযোগ করেন। তিনি বলেন, কানাডার বনভূমির যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণের অভাবের কারণে দাবানলের ধোঁয়া যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্টের বক্তব্য অনুযায়ী, এই ধোঁয়ার কারণে যুক্তরাষ্ট্রে দূষণ বাড়ছে এবং এর ফলে দেশটির বিপুল অর্থনৈতিক ক্ষতি হচ্ছে। তিনি দাবি করেন, প্রতি বছর এমন পরিস্থিতির কারণে যুক্তরাষ্ট্রের শত শত কোটি ডলারের ক্ষতি হতে পারে।
ট্রাম্প বলেন, কানাডার দাবানলের ধোঁয়া থেকে সৃষ্ট দূষণ মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্রের যে ব্যয় হচ্ছে, তা কানাডার পণ্যের ওপর বিদ্যমান শুল্কের সঙ্গে যোগ করা উচিত।
তিনি এই পরিস্থিতিকে ‘সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য’ বলে উল্লেখ করেন। একই সঙ্গে কানাডা দাবানল মোকাবেলায় কী পদক্ষেপ নিচ্ছে, তা জানতে দেশটির প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নির সঙ্গে কথা বলার কথাও জানান।
ধোঁয়া ছড়িয়ে পড়ায় যুক্তরাষ্ট্রে সতর্কতা
কানাডার শত শত দাবানল থেকে উৎপন্ন ঘন ধোঁয়া যুক্তরাষ্ট্রের মধ্য-পশ্চিম ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে। এর ফলে বিভিন্ন এলাকায় বাসিন্দাদের ঘরের ভেতরে থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়।
দাবানলের ধোঁয়া সীমান্ত অতিক্রম করে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করায় দুই দেশের মধ্যে পরিবেশ ও বাণিজ্য নিয়ে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে।

ট্রাম্প এই পরিস্থিতিকে কানাডার অবহেলার ফল হিসেবে দেখলেও জলবায়ু বিশেষজ্ঞরা বিষয়টিকে বৃহত্তর জলবায়ু পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে ব্যাখ্যা করছেন।
জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে দাবানলের সম্পর্ক
জলবায়ু বিশেষজ্ঞদের মতে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বৈশ্বিক তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়ায় বনভূমি আরও শুষ্ক হয়ে পড়ছে। ফলে আগুন লাগার ঝুঁকি বাড়ছে এবং দাবানল দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার সুযোগ তৈরি হচ্ছে।
ব্রিটিশ কলাম্বিয়ার থম্পসন রিভার্স ইউনিভার্সিটির বনভূমির দাবানল বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক মাইক ফ্ল্যানিগান বলেন, পৃথিবীর তাপমাত্রা যত বাড়ছে, ততই গরম, শুষ্ক, ঝোড়ো এবং চরম আবহাওয়ার প্রবণতা বাড়ছে।
তার মতে, এই প্রবণতা অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে দাবানলের ঘটনা আরও বাড়তে পারে। অর্থাৎ কানাডার দাবানলের ধোঁয়া নিয়ে বর্তমান সংকটকে শুধু বন ব্যবস্থাপনার সমস্যা হিসেবে দেখলে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবকে উপেক্ষা করা হবে।
শুল্ক নিয়ে নতুন করে উত্তেজনা
২০২৫ সালে ক্ষমতায় আসার পরপরই প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কানাডা থেকে আমদানি করা বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পণ্যের ওপর শুল্ক আরোপ করেন। এবার দাবানলের ধোঁয়া থেকে সৃষ্ট দূষণ মোকাবিলার ব্যয়ও কানাডার পণ্যের ওপর বিদ্যমান শুল্কের সঙ্গে যুক্ত করার কথা বলেছেন তিনি।
তবে এ বিষয়ে কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নির দপ্তর তাৎক্ষণিকভাবে কোনো প্রতিক্রিয়া জানায়নি।
কার্নি বৃহস্পতিবার বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বিশ্বজুড়ে তাপমাত্রা বাড়ছে এবং চরম আবহাওয়ার ঘটনাও বৃদ্ধি পাচ্ছে। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্রের আরও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া উচিত বলে মন্তব্য করেন তিনি।
রবিবার নিউ জার্সিতে অনুষ্ঠিতব্য ফিফা বিশ্বকাপের ফাইনালে ট্রাম্প ও কার্নির মুখোমুখি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
অন্টারিওতে দাবানলের ব্যাপক বিস্তার
কানাডার অধিকাংশ দাবানল অন্টারিও প্রদেশের দুর্গম উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছে। স্বল্প জনবসতিপূর্ণ এসব এলাকায় যাতায়াতের প্রধান মাধ্যম বিমান।
বর্তমানে প্রায় ৬ লাখ ৫০ হাজার একর বা ২ হাজার ৬৩০ বর্গকিলোমিটার এলাকা দাবানলে পুড়ছে। গত বছরের একই সময়ে পুড়ে যাওয়া ৬ লাখ একর এলাকার তুলনায় এবারের পরিমাণ বেশি।
দাবানলের কারণে হাজার হাজার মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। আগুনের বিস্তার অব্যাহত থাকায় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষদের জন্য আশ্রয়ের ব্যবস্থা করাও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে।
একটি আদিবাসী সম্প্রদায় প্রায় সম্পূর্ণ ধ্বংস
উত্তর-পশ্চিম অন্টারিওর আদিবাসী সম্প্রদায় নামাইগুসিসাগাগুন ফার্স্ট নেশন, যা কলিন্স ফার্স্ট নেশন নামেও পরিচিত, ভয়াবহ দাবানলে প্রায় সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে গেছে।
সম্প্রদায়টির বাসিন্দারা নৌকায় করে এলাকা ছেড়ে থান্ডার বে শহরে আশ্রয় নিতে বাধ্য হন। ইনসিডেন্ট কমান্ডার ম্যাথিউ হোপ জানান, আগুনের পর সেখানে কার্যত কিছুই অবশিষ্ট নেই।
তিনি বলেন, সম্প্রদায়টির সদস্যরা ভেঙে পড়েছেন, শোকাহত এবং হতবিহ্বল হয়ে আছেন।
টরন্টো থেকে প্রায় ১ হাজার ৩০০ কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিমে অবস্থিত থান্ডার বে বর্তমানে দাবানলে ক্ষতিগ্রস্ত হাজারো মানুষের আশ্রয়স্থলে পরিণত হয়েছে। শহরের মেয়র কেন বশকফ জানান, বাস্তুচ্যুত মানুষদের আশ্রয় দিতে গিয়ে শহরটির সক্ষমতা প্রায় পূর্ণ হয়ে গেছে।
দাবানল মোকাবিলায় ১১টি নতুন বিমান কিনবে অন্টারিও
দ্রুত ছড়িয়ে পড়া দাবানল মোকাবিলায় অন্টারিও প্রদেশ ১১টি নতুন বিমান কেনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। শুক্রবার প্রদেশটির প্রিমিয়ার ডাগ ফোর্ড এ ঘোষণা দেন।
দাবানল মোকাবিলার অভিযানকে অপর্যাপ্ত বলে সমালোচনা করা কিছু মার্কিন রাজনীতিকের বক্তব্যও প্রত্যাখ্যান করেন তিনি।
এদিকে, কানাডার দাবানলের ধোঁয়া নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে রাজনৈতিক বিতর্ক চললেও দাবানল পরিস্থিতি শুধু কানাডার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। যুক্তরাষ্ট্রেও এ বছর দাবানলের প্রকোপ বেড়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রেও বেড়েছে দাবানলের প্রকোপ
ন্যাশনাল ইন্টারএজেন্সি ফায়ার সেন্টারের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালে এখন পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রে ৩৭ লাখ একর জমি দাবানলে পুড়ে গেছে।
গত ১০ বছরের একই সময়ের গড় ছিল ২৭ লাখ একর। অর্থাৎ চলতি বছরে যুক্তরাষ্ট্রেও দাবানলে পুড়ে যাওয়া এলাকার পরিমাণ দীর্ঘমেয়াদি গড়ের তুলনায় বেশি।
এই তথ্য জলবায়ু পরিবর্তন ও চরম আবহাওয়ার কারণে উত্তর আমেরিকার বিভিন্ন অঞ্চলে দাবানলের ঝুঁকি বৃদ্ধির বিষয়টি সামনে আনছে।
ভবিষ্যতে আরও বড় চ্যালেঞ্জের আশঙ্কা
কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্র—দুই দেশেই দাবানলের বিস্তার এবং ধোঁয়া নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। কানাডার আগুনের ধোঁয়া সীমান্ত পেরিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে পৌঁছানোয় বিষয়টি পরিবেশগত সংকটের পাশাপাশি দুই দেশের বাণিজ্যিক সম্পর্কের আলোচনাতেও প্রভাব ফেলেছে।
তবে বিশেষজ্ঞদের বক্তব্য অনুযায়ী, তাপমাত্রা বৃদ্ধি, শুষ্কতা এবং চরম আবহাওয়ার প্রবণতা দাবানলের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। ফলে ভবিষ্যতে এই ধরনের ঘটনা আরও বেশি দেখা যেতে পারে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে কানাডায় আগুন নিয়ন্ত্রণ, বাস্তুচ্যুত মানুষদের আশ্রয় এবং সীমান্ত পেরিয়ে ছড়িয়ে পড়া ধোঁয়া মোকাবিলা—সবকিছুই গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
কানাডার শত শত দাবানল থেকে ছড়িয়ে পড়া ধোঁয়া যুক্তরাষ্ট্রের বিস্তীর্ণ এলাকায় পৌঁছানোর পর বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই পরিস্থিতির জন্য কানাডাকে দায়ী করে শুল্ক বাড়ানোর হুমকি দিয়েছেন। বিপরীতে, জলবায়ু বিশেষজ্ঞরা দাবানলের বিস্তারের পেছনে তাপমাত্রা বৃদ্ধি ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবকে গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে দেখছেন।
অন্যদিকে, অন্টারিওতে দাবানলে হাজার হাজার মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন এবং একটি আদিবাসী সম্প্রদায় প্রায় সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়েছে। প্রদেশটি নতুন বিমান কেনার উদ্যোগ নিয়েছে। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রেও দাবানলের প্রকোপ বেড়েছে। ফলে উত্তর আমেরিকায় দাবানল ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব নিয়ে ভবিষ্যতে আরও বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি হতে পারে।





