চীনের ভূমিধসে নিহত অন্তত ৮, নিখোঁজ ৩৪, ১১০০ জনকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে, ৮০০-এর বেশি উদ্ধারকর্মী তল্লাশি চালাচ্ছেন।
দক্ষিণ-পশ্চিম চীনের চংকিং শহরের পেংশুই কাউন্টিতে ভয়াবহ চীনের ভূমিধসে অন্তত আটজন নিহত এবং ৩৪ জন নিখোঁজ হয়েছেন। শুক্রবার স্থানীয় সময় সকাল ৯টা ৮ মিনিটে ঘটে যাওয়া এই ঘটনায় ১০টিরও বেশি আবাসিক ভবন মাটি ও পাথরের নিচে চাপা পড়ে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় এক হাজার ১০০ জনের বেশি মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং দুর্ঘটনার কারণ তদন্ত এবং নিখোঁজদের উদ্ধারে জোর দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন।
চীনের ভূমিধসে চাপা পড়ে একাধিক আবাসিক ভবন

রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম সিসিটিভির তথ্য অনুযায়ী, চংকিং পৌরসভার পেংশুই কাউন্টিতে পাহাড়ের একটি বড় অংশ ধসে নিচে নেমে আসে। বিপুল পরিমাণ মাটি, পাথর ও ধ্বংসাবশেষের নিচে ১০টিরও বেশি আবাসিক ভবন চাপা পড়ে।
পেংশুই কাউন্টির মেয়র রেন শুজিয়াং জানান, উদ্ধারকারীরা ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে ১০ জনকে জীবিত উদ্ধার করেছেন। তাদের মধ্যে দুজনের অবস্থা গুরুতর বলে জানানো হয়েছে।
তবে উদ্ধার অভিযান এখনও অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে চলছে। পাহাড়ের ঢাল ও চূড়ার বিভিন্ন স্থানে অস্থিতিশীল পাথরের স্তূপ থাকায় যেকোনো সময় নতুন করে ধস নামার আশঙ্কা রয়েছে।
১৮ হাজার ঘনমিটার পাথর ও ধ্বংসাবশেষ নেমে আসে
স্থানীয় পরিকল্পনা ও প্রাকৃতিক সম্পদ বিভাগের প্রধান ওয়াং চুয়ানজুন জানান, ভূমিধসে প্রায় ১৮ হাজার ঘনমিটার পাথর ও ধ্বংসাবশেষ নিচে নেমে এসেছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় পাথরটির আয়তন ছিল প্রায় ৩ হাজার ঘনমিটার।
বিশেষজ্ঞরা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে পাহাড়ের চূড়া ও ঢালের বিভিন্ন স্থানে এখনও অস্থিতিশীল পাথরের স্তূপ দেখতে পেয়েছেন। ফলে উদ্ধারকর্মীদের কাজ করতে হচ্ছে বাড়তি সতর্কতার সঙ্গে।
ওয়াং চুয়ানজুন আরও সতর্ক করে বলেন, ভারি বৃষ্টিপাত অথবা দীর্ঘ সময়ের গরম ও শুষ্ক আবহাওয়ার কারণে এলাকাটিতে নতুন করে ভূমিধসের ঝুঁকি রয়েছে।
শি জিনপিংয়ের তদন্তের নির্দেশ
চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং দুর্ঘটনার কারণ খুঁজে বের করতে তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন। একই সঙ্গে তিনি উদ্ধারকাজ জোরদার করার আহ্বান জানিয়েছেন।
চীনা কর্তৃপক্ষের এই নির্দেশের পর নিখোঁজদের সন্ধানে উদ্ধার তৎপরতা আরও বাড়ানো হয়েছে। তবে অস্থিতিশীল ভূখণ্ড এবং নতুন ধসের আশঙ্কা উদ্ধার অভিযানে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
৮০০-এর বেশি উদ্ধারকর্মী তল্লাশি চালাচ্ছেন
স্থানীয় সরকারের এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, উদ্ধার ও ত্রাণকাজে ৮০০ জনের বেশি কর্মী অংশ নিচ্ছেন। ধ্বংসস্তূপ সরাতে খননযন্ত্র ব্যবহার করা হচ্ছে। পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পর্যবেক্ষণ ও পরিস্থিতি মূল্যায়নে ড্রোন ব্যবহার করছে কর্তৃপক্ষ।
নতুন দুর্ঘটনা এড়াতে ধসের স্থানকে ঘিরে এক কিলোমিটার ব্যাসার্ধের মধ্যে পানি, বিদ্যুৎ ও গ্যাস সরবরাহ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।
সামাজিক মাধ্যমে প্রকাশিত ছবিতে দেখা গেছে, কমলা রঙের পোশাক পরা উদ্ধারকর্মীরা ধ্বংসস্তূপের মধ্যে তল্লাশি চালাচ্ছেন। এক পর্যায়ে উদ্ধারকারীরা ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে একজনকে জীবিত উদ্ধার করতে সক্ষম হন।
স্থানীয়দের সতর্কতায় শুরু হয় সরিয়ে নেওয়ার কাজ
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, বড় ধসের আগে পাহাড় থেকে ছোট ছোট পাথর গড়িয়ে পড়ছিল। একই সঙ্গে অস্বাভাবিক শব্দও শোনা যাচ্ছিল।
এরপর স্থানীয় প্রশাসন ও সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিরা দ্রুত মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ নেন। স্থানীয় সংবাদপত্র চংকিং ডেইলি জানিয়েছে, মানুষকে সরিয়ে নেওয়ার কাজ চলার সময়ই বড় ধরনের ভূমিধসের ঘটনা ঘটে।
সিসিটিভির সম্প্রচারিত ভিডিওতে পাহাড়ের একটি বড় অংশ ধসে পাশের আবাসিক এলাকার ওপর পড়ে যেতে দেখা গেছে।
নতুন ধসের আশঙ্কায় উদ্ধার অভিযান বাধাগ্রস্ত
ধসের স্থানটির আশপাশে বেশ কয়েকটি ভবন ছিল। উদ্ধারকারীরা ধ্বংসস্তূপের মধ্যে নিখোঁজদের সন্ধান চালিয়ে যাচ্ছেন। তবে ভূমি এখনও অস্থিতিশীল থাকায় অভিযান বারবার বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
ভূমিধসের ফলে পাহাড় থেকে নেমে আসা বিশাল পাথরের খণ্ড নিচের একটি জলপথে গিয়ে পড়ে। ঘটনাস্থলের পাশে থাকা প্রায় পাঁচ ও পনেরো তলা উচ্চতার দুটি ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হলেও ধসে পড়েনি।
প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, টানা বৃষ্টিপাতের কারণে এই চীনের ভূমিধসের ঘটনা ঘটেছে। দুর্ঘটনাস্থলটি উজিয়াং নদীর একটি অংশের কাছে অবস্থিত। নদীটি ছোট ছোট শহর ও ধাপযুক্ত কৃষিজমির মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে।
ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় পাঠানো হয়েছে ত্রাণসামগ্রী
দুর্যোগ মোকাবিলায় চীনা কর্তৃপক্ষ ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় ১৩ হাজারের বেশি ত্রাণসামগ্রী পাঠিয়েছে। এসব সামগ্রীর মধ্যে রয়েছে তাঁবু, ভাঁজ করা বিছানা এবং জরুরি পারিবারিক সহায়তা কিট।
এদিকে, পেংশুই কাউন্টি চংকিংয়ের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে অবস্থিত। এলাকাটি হুবেই ও গুইঝৌ প্রদেশের সীমান্তঘেঁষা।
চীনের ভূমিধসের পর এখন উদ্ধার অভিযান, নিখোঁজদের সন্ধান এবং নতুন করে ধসের ঝুঁকি মোকাবিলায় কর্তৃপক্ষের তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে।
চংকিংয়ের পেংশুই কাউন্টিতে ভয়াবহ চীনের ভূমিধসে এখন পর্যন্ত আটজনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে এবং ৩৪ জন নিখোঁজ রয়েছেন। ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে ১০ জনকে জীবিত উদ্ধার করা হলেও অস্থিতিশীল পাহাড়ি ভূখণ্ডের কারণে উদ্ধার অভিযান কঠিন হয়ে উঠেছে। কর্তৃপক্ষ একদিকে নিখোঁজদের সন্ধান চালাচ্ছে, অন্যদিকে নতুন করে ভূমিধসের ঝুঁকি মোকাবিলায় নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করেছে।





