আইসিইউতে থাকা ৮৯ শতাংশ জীবাণুর বিরুদ্ধে কাজ করছে না ওষুধ, আইসিইউতে অ্যান্টিবায়োটিক-প্রতিরোধী জীবাণু নিয়ে আইইডিসিআরের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে উদ্বেগজনক তথ্য। ৮৯% জীবাণু বহু ওষুধে প্রতিরোধী হওয়ায় বাড়ছে স্বাস্থ্যঝুঁকি।
দেশের হাসপাতালগুলোর আইসিইউতে অ্যান্টিবায়োটিক-প্রতিরোধী জীবাণু এখন বড় ধরনের জনস্বাস্থ্য উদ্বেগ হিসেবে দেখা দিয়েছে। সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান (আইইডিসিআর) পরিচালিত ‘অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স সার্ভেইল্যান্স বাংলাদেশ ২০২৫’ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আইসিইউতে শনাক্ত হওয়া জীবাণুর ৮৯ শতাংশই বহু ওষুধ-প্রতিরোধী (এমডিআর)। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সংকটাপন্ন রোগীদের চিকিৎসায় ব্যবহৃত শক্তিশালী অ্যান্টিবায়োটিক এবং বিভিন্ন চিকিৎসাযন্ত্রের ওপর নির্ভরশীলতার কারণে এ পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে। ফলে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ জোরদার করা এখন অত্যন্ত জরুরি।
প্রতিবেদনটি দেশের বিভিন্ন মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল থেকে সংগৃহীত নমুনা ও তথ্য বিশ্লেষণের ভিত্তিতে অ্যান্টিবায়োটিক-প্রতিরোধের জাতীয় চিত্র তুলে ধরেছে।
আইসিইউতে অ্যান্টিবায়োটিক-প্রতিরোধী জীবাণু কেন উদ্বেগের কারণ

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জাতীয়ভাবে পরীক্ষিত নমুনার ৪৬ শতাংশে বহু ওষুধ-প্রতিরোধী (এমডিআর) জীবাণু পাওয়া গেলেও আইসিইউতে এ হার বেড়ে ৮৯ শতাংশে পৌঁছেছে।
একইভাবে, জাতীয় পর্যায়ে সন্দেহভাজন প্যান-ড্রাগ-প্রতিরোধী (পিডিআর) জীবাণুর হার ৬ শতাংশ হলেও আইসিইউতে তা ৪১ শতাংশ। অর্থাৎ আইসিইউতে এমন জীবাণুর উপস্থিতি অনেক বেশি, যাদের বিরুদ্ধে কার্যকর অ্যান্টিবায়োটিকের বিকল্প অত্যন্ত সীমিত।
বিশেষজ্ঞদের মতে, আইসিইউতে ভর্তি রোগীরা সাধারণত ভেন্টিলেটর, ইউরিনারি ক্যাথেটারসহ বিভিন্ন চিকিৎসাযন্ত্র ব্যবহার করেন। পাশাপাশি চিকিৎসার শুরু থেকেই তাদের বিস্তৃত কার্যকারিতার শক্তিশালী অ্যান্টিবায়োটিক দেওয়া হয়। ফলে সেখানে প্রতিরোধী জীবাণু টিকে থাকা এবং দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার অনুকূল পরিবেশ তৈরি হয়।
কোন জীবাণুগুলো সবচেয়ে বেশি প্রতিরোধী
জাতীয় এএমআর প্রতিবেদনে হাসপাতালজুড়ে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ জীবাণুর মধ্যে উচ্চমাত্রার ওষুধ-প্রতিরোধের তথ্য উঠে এসেছে।
এর মধ্যে—
- এন্টারোকক্কাস ফেসিয়ামের ৭৪ শতাংশ
- অ্যাসিনিটোব্যাক্টারের ৬৫ শতাংশ
- ক্লেবসিয়েলা নিউমোনিয়ার ৫৩ শতাংশ
- ই. কোলাইয়ের ৫২ শতাংশ
নমুনায় বহু ওষুধ-প্রতিরোধী বৈশিষ্ট্য পাওয়া গেছে।
এ ছাড়া সিউডোমোনাস অ্যারুজিনোসা, স্ট্যাফাইলোকক্কাস অরিয়াস এবং এন্টারোকক্কাস ফেকালিসেও উল্লেখযোগ্য হারে অ্যান্টিবায়োটিক-প্রতিরোধ শনাক্ত হয়েছে।
হাসপাতালে সবচেয়ে বেশি অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার হচ্ছে আইসিইউতে
১৫ হাজার ৮৪৪টি চিকিৎসা ব্যবস্থাপত্র বিশ্লেষণ করে প্রতিবেদনে দেখা গেছে, হাসপাতালে ব্যবহৃত মোট অ্যান্টিবায়োটিকের ৪৮ শতাংশই ব্যবহার হয়েছে আইসিইউতে।
অন্যদিকে—
- ওয়ার্ডে ব্যবহার হয়েছে ৪৪ শতাংশ
- বহির্বিভাগে ব্যবহার হয়েছে মাত্র ৮ শতাংশ
অর্থাৎ হাসপাতালে ব্যবহৃত প্রতি দুটি অ্যান্টিবায়োটিকের প্রায় একটি ব্যবহার হচ্ছে আইসিইউতে।
বিভিন্ন মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের চিত্র
হাসপাতালভিত্তিক বিশ্লেষণেও একই ধরনের প্রবণতা দেখা গেছে।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে শনাক্ত হওয়া পজিটিভ নমুনার ৭২ শতাংশ এসেছে আইসিইউ থেকে।
এ ছাড়া—
- ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল
- চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল
- রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল
- রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল
এসব হাসপাতালের আইসিইউতেও বহু ওষুধ-প্রতিরোধী এবং কার্বাপেনেম-প্রতিরোধী জীবাণুর উচ্চ উপস্থিতি পাওয়া গেছে।
আইইডিসিআরের পর্যবেক্ষণ
অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স সার্ভেইল্যান্স প্রতিবেদনের প্রধান সম্পাদক এবং আইইডিসিআরের মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা (ভাইরোলজি) অধ্যাপক ডা. জাকির হোসেন হাবীব বলেন, নজরদারির তথ্য অনুযায়ী দেশে অ্যান্টিবায়োটিক-প্রতিরোধ ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, বিশেষ করে আইসিইউতে বহু ওষুধ-প্রতিরোধী জীবাণুর হার এবং বহুল ব্যবহৃত অ্যান্টিবায়োটিকের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ উদ্বেগজনক পর্যায়ে রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, অ্যান্টিবায়োগ্রাম বিশ্লেষণে কার্যকর অ্যান্টিবায়োটিকের সংখ্যা কমে আসছে। তাই সংক্রমণ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ (আইপিসি) ব্যবস্থা শক্তিশালী করা এখন সবচেয়ে জরুরি।
সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে কোথায় দুর্বলতা
সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালের কনসালট্যান্ট (মেডিসিন) ডা. আরিফুল বাশার বলেন, দেশে সংক্রমণ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ (আইপিসি) বিষয়ে গাইডলাইন থাকলেও বাস্তবায়নে দুর্বলতা রয়েছে।
তার মতে—
- আইসিইউতে অপ্রয়োজনীয় লোকজনের প্রবেশ
- স্বাস্থ্যবিধি যথাযথভাবে অনুসরণ না করা
- চিকিৎসা যন্ত্রপাতি ও শয্যার পর্যাপ্ত নজরদারির অভাব
এসব কারণে এক রোগী থেকে অন্য রোগীর শরীরে প্রতিরোধী জীবাণু ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি বাড়ছে।
আইইডিসিআরের সুপারিশ
আইইডিসিআর মনে করছে, নতুন অ্যান্টিবায়োটিক উদ্ভাবনের পাশাপাশি বিদ্যমান ওষুধের যৌক্তিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে।
প্রতিষ্ঠানটি হাসপাতালগুলোতে অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল স্টিওয়ার্ডশিপ (এএসপি) কার্যক্রম আরও জোরদারের সুপারিশ করেছে।
এ ছাড়া গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে—
- প্রয়োজন ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার না করা
- পরীক্ষার ফলের ভিত্তিতে ওষুধ নির্বাচন
- নিয়মিত প্রেসক্রিপশন পর্যালোচনা
ব্যবহৃত অ্যান্টিবায়োটিকের ধরন কী বলছে
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ব্যবহৃত অ্যান্টিবায়োটিকের ৯০ দশমিক ৯ শতাংশই বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ‘ওয়াচ’ শ্রেণির।
এই শ্রেণির অ্যান্টিবায়োটিক তুলনামূলক শক্তিশালী হওয়ায় সতর্কতার সঙ্গে ব্যবহার করা প্রয়োজন।
অন্যদিকে—
- ‘অ্যাকসেস’ শ্রেণির ব্যবহার ছিল ৯ দশমিক ৭ শতাংশ
- ‘রিজার্ভ’ শ্রেণির ব্যবহার ছিল ১ শতাংশেরও কম
বিশেষজ্ঞদের মতামত
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাবেক মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. শাহ মনির হোসেন বলেন, অ্যান্টিবায়োটিকের অতিরিক্ত ও অযৌক্তিক ব্যবহার, চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ওষুধ সেবন এবং নির্ধারিত কোর্স সম্পূর্ণ না করার কারণে দেশে অ্যান্টিবায়োটিক-প্রতিরোধ দ্রুত বাড়ছে।
তিনি বলেন, পরিস্থিতি মোকাবিলায় হাসপাতালের সংক্রমণ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা আরও কার্যকর করতে হবে।
তার মতে, বর্তমানে অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স নিয়ে নজরদারির বড় অংশ হাসপাতালভিত্তিক। কমিউনিটি পর্যায়ে আরও বিস্তৃত নজরদারি ও তুলনামূলক গবেষণা বাড়ানো গেলে দেশের প্রকৃত পরিস্থিতি আরও স্পষ্টভাবে জানা সম্ভব হবে।
সাম্প্রতিক জাতীয় প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, আইসিইউতে অ্যান্টিবায়োটিক-প্রতিরোধী জীবাণু দেশের স্বাস্থ্যখাতের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্বেগের বিষয় হয়ে উঠেছে। বিশেষজ্ঞরা সংক্রমণ প্রতিরোধ, অ্যান্টিবায়োটিকের যৌক্তিক ব্যবহার এবং হাসপাতালভিত্তিক নজরদারি জোরদারের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। একই সঙ্গে কমিউনিটি পর্যায়ে গবেষণা ও পর্যবেক্ষণ বাড়ানোর মাধ্যমে অ্যান্টিবায়োটিক-প্রতিরোধের প্রকৃত চিত্র তুলে ধরার প্রয়োজনীয়তার কথাও উল্লেখ করেছেন।





