‘এআই ফোর্স’ গঠনের ঘোষণা ট্রাম্পের, এআই খাতে নতুন নেতৃত্বের কথা জানিয়েছেন। চীনকে ছাড়িয়ে যাওয়ার লক্ষ্য, নিরাপত্তা বিতর্ক ও নিয়ন্ত্রণ নিয়ে চলছে নতুন আলোচনা।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই খাতকে এগিয়ে নিতে একটি বিশেষ ‘এআই ফোর্স’ গঠন এবং একজন ‘এআই জার’ নিয়োগের ঘোষণা দিয়েছেন। ১৯ সেপ্টেম্বর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক পোস্টে তিনি জানান, এআই শিল্পের প্রবৃদ্ধিতে তাঁর প্রশাসন বাধা দেবে না। একই সঙ্গে এআই ব্যবহারে অপরাধ হলে বিদ্যমান ফৌজদারি ও দেওয়ানি বিচারব্যবস্থার মাধ্যমেই ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলেন তিনি।
তবে ঘোষণার পরও এআই ফোর্স কীভাবে কাজ করবে, এতে কারা থাকবেন বা এটি বাস্তবায়নের সময়সীমা কী—এসব বিষয়ে ট্রাম্প বিস্তারিত জানাননি। তাঁর এই ঘোষণা এমন এক সময়ে এসেছে, যখন উন্নত এআই ব্যবস্থার সম্ভাব্য ঝুঁকি নিয়ে গবেষক ও প্রযুক্তি খাতের শীর্ষ ব্যক্তিদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে।
ট্রাম্পের এআই ফোর্স পরিকল্পনার মূল বিষয়

ট্রাম্প তাঁর পোস্টে এআইকে ‘পরবর্তী শিল্পবিপ্লব’ কিংবা ইন্টারনেটের মতো একটি বড় প্রযুক্তিগত পরিবর্তন হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, এআইয়ের অর্থনৈতিক প্রভাব ব্যাপক হতে পারে এবং যুক্তরাষ্ট্রের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ২৫ শতাংশ পর্যন্ত এ প্রযুক্তি থেকে আসতে পারে।
এই সম্ভাবনাকে সামনে রেখে যুক্তরাষ্ট্রকে এআই খাতে চীনের চেয়ে এগিয়ে রাখার লক্ষ্যও জানিয়েছেন ট্রাম্প। এ কারণে তাঁর ঘোষিত এআই ফোর্স শুধু প্রযুক্তি ব্যবস্থাপনার উদ্যোগ নয়, যুক্তরাষ্ট্রের বৃহত্তর প্রযুক্তিগত প্রতিযোগিতার অংশ হিসেবেও আলোচনায় এসেছে।
Reuters-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ট্রাম্পের এই ঘোষণায় নতুন এআই উপদেষ্টা বা ‘এআই জার’ নিয়োগের কথাও রয়েছে। তবে পদটির দায়িত্ব, কাঠামো কিংবা সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সঙ্গে এর সম্পর্ক কী হবে, সে বিষয়ে এখনো বিস্তারিত প্রকাশ করা হয়নি।
‘এআই ফোর্স’ নিয়ে এখনো যেসব প্রশ্ন
ঘোষণার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অনির্দিষ্ট বিষয়গুলোর একটি হলো এর সাংগঠনিক কাঠামো। ট্রাম্প এটিকে তাঁর প্রথম মেয়াদে গঠিত স্পেস ফোর্সের সঙ্গে তুলনা করেছেন। তবে নতুন এআই ফোর্স সামরিক নাকি বেসামরিক কাঠামোয় কাজ করবে, তা স্পষ্ট নয়। ওয়াশিংটন পোস্টও জানিয়েছে, এ উদ্যোগের প্রকৃতি সম্পর্কে বিস্তারিত ব্যাখ্যা এখনো পাওয়া যায়নি।
এ ছাড়া এআই জারের ক্ষমতা কতটা হবে এবং তিনি কোন প্রতিষ্ঠান বা সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় করবেন, সেটিও এখনো পরিষ্কার নয়।
নিয়ন্ত্রণ নয়, দ্রুত উন্নয়নের ওপর জোর ট্রাম্পের
এআইয়ের নিরাপত্তাব্যবস্থা আরও শক্তিশালী না হওয়া পর্যন্ত প্রযুক্তিটির উন্নয়ন ধীর করার আহ্বানের সঙ্গে ট্রাম্প একমত নন। তাঁর অবস্থান হলো, যুক্তরাষ্ট্রের এআই শিল্পের প্রবৃদ্ধিকে থামিয়ে দেওয়া বা বাধাগ্রস্ত করা উচিত নয়।
ট্রাম্প বলেছেন, তাঁর প্রশাসন এআই শিল্পের প্রবৃদ্ধিতে কোনোভাবেই বাধা দেবে না বা তা থামিয়ে দেবে না। একই সঙ্গে প্রযুক্তির অপব্যবহারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য নতুন কোনো পৃথক বিচারব্যবস্থা তৈরির পরিবর্তে বিদ্যমান ফৌজদারি ও দেওয়ানি আইন প্রয়োগের কথা বলেছেন তিনি।
এ অবস্থানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রে এআই নিরাপত্তা ও নিয়ন্ত্রণ নিয়ে চলমান বিতর্ক আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। একদিকে দ্রুত প্রযুক্তিগত উন্নয়ন এবং আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার বিষয়টি রয়েছে, অন্যদিকে উন্নত এআই ব্যবস্থার সম্ভাব্য ঝুঁকি মোকাবিলার প্রশ্নও সামনে রয়েছে।
এআই নিরাপত্তা নিয়ে বাড়ছে উদ্বেগ
ট্রাম্প এআইয়ের সম্ভাব্য বিপদ নিয়ে ওঠা কিছু উদ্বেগকে ‘হোক্স’ বা ভিত্তিহীন প্রচারণা হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। কিন্তু একই সময়ে বর্তমান ও সাবেক এআই গবেষকদের একাংশ প্রযুক্তিটির দ্রুত অগ্রগতি নিয়ে সতর্ক করেছেন।
Reuters-এর সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সাবেক Anthropic গবেষক Jacob Coxon এআই উন্নয়নের অনিয়ন্ত্রিত গতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। এ ছাড়া অন্য গবেষকরাও উন্নত এআই ব্যবস্থার সম্ভাব্য অস্তিত্বগত ঝুঁকি নিয়ে সতর্ক করেছেন।
এই বিতর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, উদ্বেগ শুধু বাইরের সমালোচকদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। এআই শিল্পের বড় প্রতিষ্ঠানগুলোর শীর্ষ ব্যক্তিদের মধ্যেও উন্নয়ন ও নিরাপত্তার ভারসাম্য নিয়ে আলোচনা চলছে।
ডারিও আমোদেইয়ের ধীরগতির প্রস্তাব
Anthropic-এর প্রধান নির্বাহী দারিও আমোদেই সম্প্রতি এআই উন্নয়নের গতি কমানোর আহ্বান জানিয়েছেন। তাঁর প্রস্তাবের মধ্যে রয়েছে শিল্পজুড়ে উন্নয়ন ধীর করা, নিয়ন্ত্রণমূলক ব্যবস্থা জোরদার করা এবং এআই মডেল তৈরির প্রক্রিয়া স্বাধীনভাবে পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থা করা।
OpenAI-এর প্রধান নির্বাহী স্যাম অল্টম্যান এবং xAI-এর প্রতিষ্ঠাতা ইলন মাস্কও আমোদেইয়ের সুপারিশের সঙ্গে একমত হওয়ার কথা জানিয়েছেন।
Reuters-এর সাম্প্রতিক বিশ্লেষণেও দেখা যায়, বড় এআই প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে প্রযুক্তির নিরাপত্তা, উন্নয়নের গতি এবং সম্ভাব্য ঝুঁকি নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি হয়েছে।
সুপার ইন্টেলিজেন্স তৈরির প্রতিযোগিতা
বর্তমানে Anthropic, OpenAI ও Google-এর মতো বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো আরও উন্নত এআই ব্যবস্থা তৈরির প্রতিযোগিতায় রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের লক্ষ্যগুলোর মধ্যে তথাকথিত ‘সুপার ইন্টেলিজেন্স’ তৈরি অন্যতম—যে ধরনের প্রযুক্তি তাত্ত্বিকভাবে মানুষের বুদ্ধিমত্তাকেও ছাড়িয়ে যেতে পারে।
এই প্রতিযোগিতার সঙ্গে নিরাপত্তা প্রশ্নটিও ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত। Anthropic-এর তৈরি Claude, OpenAI-এর ChatGPT এবং Google-এর Gemini-এর মতো এআই ব্যবস্থাকে ঘিরে নিরাপত্তা ও অপব্যবহারের বিভিন্ন ঘটনা প্রকাশ্যে এসেছে।
সাম্প্রতিক সময়ে এআই মডেলগুলোর ক্ষমতা যত বাড়ছে, ততই এগুলোর ওপর নিরাপত্তা পরীক্ষা, স্বাধীন পর্যবেক্ষণ এবং সম্ভাব্য অপব্যবহার ঠেকানোর পদ্ধতি নিয়ে আলোচনা বাড়ছে।
Anthropic-এর সহপ্রতিষ্ঠাতা জ্যাক ক্লার্ক এআই ব্যবস্থায় একটি ‘কিল সুইচ’ বা জরুরি বন্ধ করার ব্যবস্থা বাধ্যতামূলক করার সম্ভাবনার কথা বলেছেন। তাঁর মতে, এমন ব্যবস্থাকে তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে পরীক্ষা করার সুযোগও থাকা প্রয়োজন।
যুক্তরাষ্ট্র-চীন প্রতিযোগিতায় এআই কেন গুরুত্বপূর্ণ
যুক্তরাষ্ট্র ও চীন বিশ্বের দুই বৃহত্তম অর্থনীতি এবং প্রযুক্তিগত নেতৃত্বের প্রতিযোগিতায় এআই এখন গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে। দুই দেশই এআইকে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সক্ষমতার সঙ্গে যুক্ত করছে।
এই প্রেক্ষাপটে ট্রাম্পের এআই ফোর্স ঘোষণাকে শুধু অভ্যন্তরীণ প্রযুক্তি নীতির উদ্যোগ হিসেবে দেখলে পুরো বিষয়টি ধরা পড়ে না। তাঁর বক্তব্যে যুক্তরাষ্ট্রকে চীনের চেয়ে এগিয়ে রাখার বিষয়টি সরাসরি উঠে এসেছে।
আগামী সপ্তাহে ট্রাম্প ও চীনের প্রেসিডেন্ট শি চিনপিংয়ের বৈঠকের কথা রয়েছে। এর আগে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট এবং চীনের ভাইস প্রিমিয়ার হে লাইফেংয়ের বৈঠকেও এআই নিরাপত্তা, বাণিজ্য ও অন্যান্য অর্থনৈতিক বিষয় আলোচনায় থাকার কথা রয়েছে।
ফলে ট্রাম্পের এআই ফোর্স পরিকল্পনার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র-চীন প্রযুক্তি প্রতিযোগিতার বিষয়টিও সামনে আসছে।
ট্রাম্পের ঘোষণা এখনো মূলত একটি পরিকল্পনার পর্যায়ে রয়েছে। এআই ফোর্স কী ধরনের প্রতিষ্ঠান হবে, এর দায়িত্ব কী হবে, কারা এতে যুক্ত থাকবেন এবং নতুন ‘এআই জার’ কী ক্ষমতা পাবেন—এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো প্রকাশিত হয়নি।
একই সঙ্গে এআই শিল্পের দ্রুত বিকাশ এবং নিরাপত্তা নিয়ন্ত্রণের মধ্যে ভারসাম্য কীভাবে রাখা হবে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ট্রাম্প যেখানে দ্রুত উন্নয়ন এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তিগত নেতৃত্ব ধরে রাখার ওপর জোর দিচ্ছেন, সেখানে এআই গবেষকদের একটি অংশ নিরাপত্তা পরীক্ষা ও নিয়ন্ত্রণ জোরদারের আহ্বান জানাচ্ছেন।
এই দুই অবস্থানের মধ্যকার বিতর্কই আগামী সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের এআই নীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠতে পারে। তবে এআই ফোর্স নিয়ে ট্রাম্পের ঘোষণার বাস্তব কাঠামো ও কার্যক্রম সম্পর্কে আরও তথ্য না আসা পর্যন্ত উদ্যোগটির পূর্ণাঙ্গ প্রভাব নির্ধারণ করা কঠিন।





