পুঁজিবাজারে স্থিতিশীলতা ও বিনিয়োগকারীদের সুরক্ষায় আইন প্রণয়নের উদ্যোগ, সিএমএসএফ আইন ২০২৬ প্রণয়নের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। নতুন আইনে পুঁজিবাজার স্থিতিশীলতা, বিনিয়োগকারী সুরক্ষা ও সম্পদ ব্যবস্থাপনায় আসবে স্বচ্ছতা।
পুঁজিবাজারে স্থিতিশীলতা বৃদ্ধি এবং বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ সুরক্ষায় সিএমএসএফ আইন ২০২৬ প্রণয়নের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ সূত্র জানিয়েছে, বাংলাদেশ ক্যাপিটাল মার্কেট স্ট্যাবিলাইজেশন ফান্ড (সিএমএসএফ)-কে আরও কার্যকর ও স্বয়ংসম্পূর্ণ প্রতিষ্ঠানে রূপ দিতে এবং অব্যবহৃত নগদ লভ্যাংশ, শেয়ার ও অন্যান্য আর্থিক সম্পদের ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে এই আইনের খসড়া তৈরি করা হয়েছে।
‘বাংলাদেশ ক্যাপিটাল মার্কেট স্ট্যাবিলাইজেশন ফান্ড আইন, ২০২৬’-এর খসড়া বর্তমানে অর্থ মন্ত্রণালয়ে যাচাই ও নীতিগত পর্যালোচনার পর্যায়ে রয়েছে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, আইনটি কার্যকর হলে দেশের পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়াতে এবং সম্পদ ব্যবস্থাপনায় সুশাসন প্রতিষ্ঠায় এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
সিএমএসএফ আইন ২০২৬ কেন প্রস্তাব করা হয়েছে

আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ জানিয়েছে, পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ আরও সুরক্ষিত করা এই আইনের অন্যতম লক্ষ্য। একই সঙ্গে বাংলাদেশ ক্যাপিটাল মার্কেট স্ট্যাবিলাইজেশন ফান্ডকে একটি আধুনিক ও কার্যকর প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরের পরিকল্পনা রয়েছে।
প্রস্তাবিত আইনের মাধ্যমে অব্যবহৃত নগদ লভ্যাংশ, শেয়ার এবং অন্যান্য আর্থিক সম্পদের ব্যবস্থাপনায় জবাবদিহিতা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
বর্তমানে সিএমএসএফের কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে বিদ্যমান বিধিমালার আওতায়। নতুন আইন কার্যকর হলে ফান্ডের কাঠামো, পরিচালনা, সম্পদ ব্যবস্থাপনা এবং তদারকি আরও শক্তিশালী আইনি ভিত্তি পাবে।
ডিজিটাল ও স্বচ্ছ হবে লভ্যাংশ বিতরণ ব্যবস্থা
পুঁজিবাজার সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, সিএমএসএফ আইন ২০২৬ কার্যকর হলে সিএমএসএফ বাংলাদেশের পুঁজিবাজারে একটি আধুনিক নগদ লভ্যাংশ বিতরণ কেন্দ্র হিসেবে কাজ করার সুযোগ পাবে।
এর ফলে তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর নগদ লভ্যাংশ বিতরণ প্রক্রিয়া আরও ডিজিটাল, স্বচ্ছ এবং কেন্দ্রীভূত হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হবে।
সিএমএফ-এর অপারেশন বিভাগের অতিরিক্ত পরিচালক মো. ওয়াসি আজম রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা বাসসকে বলেন, প্রস্তাবিত আইন কার্যকর হলে সিএমএসএফ নগদ লভ্যাংশ বিতরণের ক্ষেত্রে আরও কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারবে।
তিনি জানান, বিনিয়োগকারীরা একটি অর্থবছরে পাওয়া লভ্যাংশের ওপর উৎসে কর্তন করা করের সম্পূর্ণ কর চালান এবং কর কর্তন সনদ একটি একক প্ল্যাটফর্ম থেকে পাওয়ার সুযোগ পাবেন। এতে করসংক্রান্ত আনুষ্ঠানিকতা সহজ হবে এবং স্বচ্ছতা বাড়বে।
অব্যবহৃত আর্থিক সম্পদ ব্যবস্থাপনায় নতুন কাঠামো
প্রস্তাবিত আইনে বলা হয়েছে, দীর্ঘদিন ধরে অব্যবহৃত থাকা বিভিন্ন আর্থিক সম্পদ সিএমএসএফের অধীনে ব্যবস্থাপনা করা হবে।
এর মধ্যে রয়েছে—
- নগদ লভ্যাংশ
- বোনাস শেয়ার
- রাইটস শেয়ার
- রিফান্ড অর্থ
- আইপিও ও কোয়ালিফায়েড ইনভেস্টর অফারের (কিউআইও) অনাদায়ী অর্থ
তবে এসব সম্পদের প্রকৃত মালিক বা উত্তরাধিকারীরা নির্ধারিত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে দাবি জানালে যাচাই-বাছাই শেষে তা ফেরত পাওয়ার সুযোগ থাকবে।
এই ব্যবস্থার মাধ্যমে বিনিয়োগকারীদের দীর্ঘদিন ধরে পড়ে থাকা সম্পদের ব্যবস্থাপনায় আরও সুশৃঙ্খল পদ্ধতি তৈরি হবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
পরিচালনা পর্ষদ ও প্রশাসনিক কাঠামোর প্রস্তাব
সিএমএসএফ আইন ২০২৬-এর খসড়ায় সিএমএসএফকে একটি সংবিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠান হিসেবে প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব রাখা হয়েছে।
ফান্ড পরিচালনার জন্য একটি পরিচালনা পর্ষদ গঠনের বিধান রাখা হয়েছে। প্রস্তাবিত কাঠামো অনুযায়ী, পর্ষদে চেয়ারম্যান, কমিশনের প্রতিনিধি, বিভিন্ন আর্থিক ও পুঁজিবাজার সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি এবং স্বতন্ত্র সদস্য থাকার কথা বলা হয়েছে।
এ ছাড়া প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার নেতৃত্বে ফান্ডের দৈনন্দিন কার্যক্রম পরিচালিত হবে।
প্রস্তাবিত আইনে ফান্ড পরিচালনার ক্ষেত্রে প্রশাসনিক কাঠামো, তদারকি, জবাবদিহিতা এবং সম্পদ ব্যবস্থাপনার বিষয়গুলোকে আইনি কাঠামোর আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
ফান্ডের অর্থ ব্যবহারে থাকবে নির্দিষ্ট নীতিমালা
খসড়া আইনে বলা হয়েছে, সিএমএসএফের অর্থ পুঁজিবাজারের স্থিতিশীলতা রক্ষা, বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ সংরক্ষণ এবং কমিশনের অনুমোদনক্রমে নিরাপদ ও অনুমোদিত খাতে বিনিয়োগ করা যাবে।
একই সঙ্গে ফান্ড পরিচালনায় নিরীক্ষা, হিসাব সংরক্ষণ, বার্ষিক প্রতিবেদন প্রকাশ এবং প্রয়োজনীয় তথ্য প্রকাশের বাধ্যবাধকতা রাখা হয়েছে।
এতে ফান্ডের কার্যক্রমে স্বচ্ছতা বাড়বে এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর কাছে জবাবদিহিতা নিশ্চিত হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
আইন লঙ্ঘনে শাস্তিমূলক ব্যবস্থার বিধান
প্রস্তাবিত আইনে নির্ধারিত বিধান লঙ্ঘন, তথ্য গোপন, বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রদান এবং ফান্ড-সংশ্লিষ্ট সম্পদের অপব্যবহারের ক্ষেত্রে শাস্তিমূলক ব্যবস্থার বিধান রাখা হয়েছে।
এ ছাড়া বিদ্যমান বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (ক্যাপিটাল মার্কেট স্ট্যাবিলাইজেশন ফান্ড) বিধিমালা, ২০২১ রহিত করে নতুন আইন কার্যকর করার প্রস্তাব করা হয়েছে।
পুঁজিবাজারে আস্থা বৃদ্ধির সম্ভাবনা
সংশ্লিষ্টদের মতে, সিএমএসএফ আইন ২০২৬ কার্যকর হলে অব্যবহৃত বিনিয়োগকারীর সম্পদের সুশাসন নিশ্চিত করা সহজ হবে।
পাশাপাশি লভ্যাংশ বিতরণ ব্যবস্থায় আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার, সম্পদ ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা এবং বিনিয়োগকারীদের অধিকার সংরক্ষণের মাধ্যমে দেশের পুঁজিবাজারে আস্থা বাড়তে পারে।
তবে আইনটি কার্যকর হওয়ার আগে এটি অর্থ মন্ত্রণালয়ের যাচাই ও নীতিগত পর্যালোচনার ধাপ অতিক্রম করবে।
পুঁজিবাজার সংস্কারে সরকারের উদ্যোগ
পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকারীদের সুরক্ষা এবং আর্থিক সম্পদের ব্যবস্থাপনায় কার্যকর কাঠামো তৈরি করতে সরকারের এই উদ্যোগকে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন খাত সংশ্লিষ্টরা।
পুঁজিবাজারে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে আইনভিত্তিক কাঠামো তৈরি হলে দীর্ঘমেয়াদে বিনিয়োগকারীদের আস্থা বৃদ্ধিতে সহায়ক হতে পারে।





