বর্তমান সংসদের দিকে তাকিয়ে আছে দেশের ১৮ কোটি মানুষ, জাতীয় সংসদে গণতন্ত্রের নতুন অভিযাত্রা নিয়ে ভারপ্রাপ্ত স্পিকার কায়সার কামালের বক্তব্য। ১৮ কোটি মানুষের প্রত্যাশা, সংসদের ভূমিকা ও ভবিষ্যৎ ভাবনা জানুন।
জাতীয় সংসদের ভারপ্রাপ্ত স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল বলেছেন, বর্তমান সংসদের কার্যক্রমের দিকে দেশের ১৮ কোটি মানুষ তাকিয়ে আছে। সম্প্রতি এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, জনগণের প্রত্যাশা পূরণে সংসদ সদস্যদের জ্ঞানভিত্তিক আলোচনা, গঠনমূলক সমালোচনা এবং যুক্তিনির্ভর সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হবে।
তিনি মনে করেন, জাতীয় সংসদ দেশের রাষ্ট্র পরিচালনার অন্যতম প্রধান কেন্দ্র। তাই সংসদে সরকারি দল ও বিরোধী দলের দায়িত্বশীল ভূমিকার মাধ্যমে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন।
ব্যারিস্টার কায়সার কামালের বক্তব্য অনুযায়ী, জাতীয় সংসদে গণতন্ত্রের নতুন অভিযাত্রা শুরু হয়েছে এবং এই অভিযাত্রাকে সফল করতে সবাইকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।
জাতীয় সংসদে গণতন্ত্রের নতুন অভিযাত্রা নিয়ে ১৮ কোটি মানুষের প্রত্যাশা
ভারপ্রাপ্ত স্পিকার বলেন,

বর্তমান সংসদের প্রতি সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা অনেক বেশি। দেশের ১৮ কোটি মানুষের ৩৬ কোটি চোখ জাতীয় সংসদের কার্যক্রমের ওপর নিবদ্ধ রয়েছে।
তিনি জানান, গ্রামের কৃষক, শ্রমিক ও সাধারণ মানুষ মোবাইল ফোনের মাধ্যমে প্রতিদিন সংসদের কার্যক্রম দেখছেন। তাই সংসদ সদস্যদের বক্তব্য ও সিদ্ধান্তের প্রতি জনগণের আগ্রহ রয়েছে।
কায়সার কামাল বলেন, নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা যদি তথ্যভিত্তিক আলোচনা, যুক্তিতর্ক এবং গঠনমূলক সমালোচনার মাধ্যমে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন, তাহলে জনগণের প্রত্যাশা পূরণ সম্ভব হবে।
তিনি বলেন, সংসদ পরিচালনায় তার দায়িত্ব হচ্ছে ন্যায়বিচার ও নিরপেক্ষতা বজায় রাখা। যতদিন তিনি দায়িত্ব পালন করবেন, ততদিন সর্বোচ্চ নিরপেক্ষতার সঙ্গে কাজ করার চেষ্টা করবেন।
‘মজলুমের সংসদ’ হিসেবে বর্তমান সংসদ
ভারপ্রাপ্ত স্পিকার বর্তমান সংসদকে ‘মজলুমের সংসদ’ হিসেবে উল্লেখ করেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, এই সংসদের অধিকাংশ সদস্য অতীতে বিভিন্ন ধরনের রাজনৈতিক নির্যাতন, কারাবরণ, গুম, নির্বাসনসহ নানা প্রতিকূলতার অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে এসেছেন।
তিনি বলেন, ৩৫০ জন সংসদ সদস্যের প্রায় ৯৯ শতাংশই কোনো না কোনোভাবে এসব অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছেন। এ কারণে বর্তমান সংসদ বাংলাদেশের পাশাপাশি বিশ্বের ইতিহাসেও একটি ব্যতিক্রমধর্মী সংসদ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
সংসদে সরকারি ও বিরোধী দলের দায়িত্বশীল ভূমিকা
ব্যারিস্টার কায়সার কামাল বলেন, গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে সরকার ও বিরোধী দল উভয়কেই দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।
তিনি বলেন, মহান মুক্তিযুদ্ধের মূল চেতনার মধ্যে ছিল গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থা, সাম্য, মানবাধিকার, মানবিক মর্যাদা এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা। সেই লক্ষ্য পূরণে বর্তমান রাজনৈতিক পক্ষগুলোকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।
তার মতে, সংসদে মতের ভিন্নতা থাকবে। তবে সেই ভিন্নতা যেন গঠনমূলক আলোচনার মাধ্যমে রাষ্ট্রের উন্নয়নে ভূমিকা রাখে।
জাতীয় সংসদে গণতন্ত্রের নতুন অভিযাত্রা ও রাষ্ট্র পরিচালনার কেন্দ্র
ভারপ্রাপ্ত স্পিকার বলেন, দেশের সব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের কেন্দ্রবিন্দু হচ্ছে জাতীয় সংসদ। তিনি রাষ্ট্রের তিনটি অঙ্গ—বিচার বিভাগ, আইন বিভাগ ও নির্বাহী বিভাগের ভূমিকার কথা উল্লেখ করেন।
তার বক্তব্য অনুযায়ী, আইন বিভাগ আইন প্রণয়ন করে, নির্বাহী বিভাগ তা বাস্তবায়ন করে এবং বিচার বিভাগ আইনের বিভিন্ন দিক পর্যালোচনা করে। তাই রাষ্ট্র পরিচালনার সামগ্রিক কাঠামোর গুরুত্বপূর্ণ অংশ হচ্ছে সংসদ।
তিনি বলেন, রাজনৈতিক ও গণতান্ত্রিক চর্চার উন্নয়নের জন্য জাতীয় সংসদকে কার্যকর প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তুলতে হবে।
তিনি আরও বলেন, সংসদে সরকারি দল তাদের বক্তব্য রাখার সুযোগ পাচ্ছে এবং বিরোধী দলও গঠনমূলক সমালোচনার সুযোগ পাচ্ছে। গণতন্ত্রের সৌন্দর্য হলো—দুই পক্ষের আলোচনার মাধ্যমে রাষ্ট্রের জন্য কার্যকর সিদ্ধান্ত নেওয়া।
আন্তর্জাতিক সংসদীয় ব্যবস্থার উদাহরণ
ব্যারিস্টার কায়সার কামাল ব্রিটিশ হাউস অব কমন্স, অস্ট্রেলিয়ান পার্লামেন্ট, কানাডিয়ান পার্লামেন্ট, পাকিস্তান ও ভারতের সংসদীয় ব্যবস্থার উদাহরণ তুলে ধরেন।
তিনি বলেন, এসব দেশে সংসদীয় আলোচনার মাধ্যমে রাষ্ট্র পরিচালনার নীতি নির্ধারণ করা হয়। বিভিন্ন মতের আলোচনা ও সমালোচনা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করে।
গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে আরও তথ্য জানতে পাঠকরা আন্তর্জাতিক সংসদীয় ব্যবস্থা সম্পর্কিত নির্ভরযোগ্য তথ্য দেখতে পারেন।
অতীতের রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহ তুলে ধরলেন স্পিকার
সাক্ষাৎকারে ব্যারিস্টার কায়সার কামাল বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের বিভিন্ন অধ্যায়ের কথা তুলে ধরেন।
তিনি বলেন, গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যেই দেশের মানুষ মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছিল। তার দাবি, স্বাধীনতার পর দেশে গণতান্ত্রিক ধারার ব্যত্যয় ঘটে এবং ১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারি একদলীয় বাকশাল ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়।
তিনি পরবর্তী সময়ে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে গণতন্ত্র পুনঃপ্রবর্তনের কথা উল্লেখ করেন। তার বক্তব্য অনুযায়ী, ১৯৭৯ সালের সংসদ বাংলাদেশের ইতিহাসে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সংসদ ছিল।
এরপর তিনি বলেন, জিয়াউর রহমানের হত্যার পর দেশে আবার রাজনৈতিক অস্থিরতা তৈরি হয় এবং হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের নেতৃত্বে স্বৈরাচারী শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়।
তিনি জানান, ১৯৯০ সালের গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে এরশাদ সরকারের পতন ঘটে এবং বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে দেশে সংসদীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়।
নির্বাচন ও গণতান্ত্রিক ধারার পরিবর্তন
ভারপ্রাপ্ত স্পিকার বলেন, ওয়ান ইলেভেনের পর বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ধারায় আবার সংকট তৈরি হয়। তিনি ২০০৮ সালের নির্বাচন, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বিলোপ এবং পরবর্তী নির্বাচনগুলোর প্রসঙ্গ তুলে ধরেন।
তার বক্তব্য অনুযায়ী, ২০১৪ সালের নির্বাচন, ২০১৮ সালের নির্বাচন এবং ২০২৪ সালের নির্বাচন নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি হয়েছিল।
তিনি বলেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে বড় পরিবর্তন আসে। এরপর গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে অন্তর্বর্তী সরকার ও নির্বাচন কমিশনসহ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো কাজ করে।
তিনি দাবি করেন, ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত সংসদ নির্বাচন বাংলাদেশের ইতিহাসে অন্যতম শান্তিপূর্ণ ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন ছিল।
ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের জন্য সংসদের ভূমিকা
ব্যারিস্টার কায়সার কামাল আশা প্রকাশ করেন, জাতীয় সংসদ দেশের বর্তমান ও ভবিষ্যতের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণের কেন্দ্র হয়ে উঠবে।
তিনি বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহীদ ও আহতদের প্রত্যাশা এবং দেশের সাধারণ মানুষের উন্নত ভবিষ্যতের আশা পূরণে সংসদ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।
তার মতে, জাতীয় সংসদে গণতন্ত্রের নতুন অভিযাত্রা সফল করতে হলে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ, মানবাধিকার, সাম্য এবং আইনের শাসনের প্রতি গুরুত্ব দিতে হবে।
জাতীয় সংসদের কার্যক্রম নিয়ে দেশের মানুষের আগ্রহ ও প্রত্যাশার কথা তুলে ধরেছেন ভারপ্রাপ্ত স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল। তার বক্তব্যে সংসদকে কার্যকর, দায়িত্বশীল ও গণতান্ত্রিক আলোচনার কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার গুরুত্ব উঠে এসেছে।
সরকার ও বিরোধী দলের পারস্পরিক দায়িত্বশীল ভূমিকার মাধ্যমে জাতীয় সংসদ দেশের গণতান্ত্রিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে—এমন প্রত্যাশাই প্রকাশ করেছেন তিনি।





