আরও খবর

যে কারণে বাতিল মিশরের গোল (19)
যুক্তরাষ্ট্রে দাবানল নিয়ন্ত্রণে গিয়ে হেলিকপ্টার বিধ্বস্ত, পাইলট-ক্রু নিহত
যে কারণে বাতিল মিশরের গোল (24)
এলএনজি সরবরাহ শুরু, কমতে পারে গ্যাস সংকট
যে কারণে বাতিল মিশরের গোল (21)
আইআরজিসি-সংশ্লিষ্ট ৩ প্রতিষ্ঠানের ওপর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার যুক্তরাষ্ট্রের
যে কারণে বাতিল মিশরের গোল (12)
আকাশে ট্রাম্পের হেলিকপ্টার ও যাত্রীবাহী বিমান মুখোমুখি, তদন্তে মার্কিন সংস্থা
যে কারণে বাতিল মিশরের গোল (32)
যুক্তরাজ্যের চেভেনিং স্কলারশিপের আবেদন শুরু

হরমুজ প্রণালি খুলতে ইরানের কঠোর শর্ত

হরমুজ প্রণালি খুলতে ইরানের কঠোর শর্ত,  যুদ্ধ বন্ধ, নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, ক্ষতিপূরণ ও জব্দ সম্পদ ফেরতের দাবি জানিয়েছে তেহরান।

কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দিতে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে একাধিক কঠোর শর্ত দিয়েছে ইরান। ইরানের সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদ জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র তাদের আচরণ পরিবর্তন না করা পর্যন্ত এই জলপথ খুলে দেওয়া হবে না। শনিবার পরিষদের সচিব ও ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) কমান্ডার মোহাম্মদ বাঘের জোলঘাদর এসব শর্ত তুলে ধরেন।

তবে হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি খুলে দেওয়ার বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে এখনো কোনো চূড়ান্ত সমঝোতা হয়নি। একই সময়ে জলপথটিতে একটি সংযুক্ত আরব আমিরাতের জাহাজে ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র হামলার অভিযোগও উঠেছে।

ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি জানিয়েছেন, নৌ চলাচল নিয়ে একটি সমঝোতায় পৌঁছানোর ক্ষেত্রে দুই পক্ষ কাছাকাছি অবস্থানে রয়েছে। বিশেষ করে জাহাজ চলাচলের জন্য নির্ধারিত ট্রানজিট রুট নিয়ে আলোচনা এগিয়েছে। তবে প্রণালি পুরোপুরি খুলে দেওয়ার বিষয়টি অন্য শর্ত পূরণের ওপর নির্ভর করছে।

ইরানের ৭টি প্রধান শর্ত কী?

ইরান হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়ার আগে যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে বেশ কয়েকটি পদক্ষেপ চেয়েছে। এগুলো মূলত যুদ্ধ, সামরিক উপস্থিতি, নিষেধাজ্ঞা, ক্ষতিপূরণ এবং জব্দ করা সম্পদকে কেন্দ্র করে।

ইরানের দেওয়া দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে—

  1. ভবিষ্যতে ইরানের বিরুদ্ধে কোনো ধরনের হুমকি না দেওয়া।
  2. ইরান ও অঞ্চলটির মিত্র সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে যুদ্ধ স্থায়ীভাবে বন্ধ করা।
  3. ইরানের বন্দরগুলোর ওপর নৌ অবরোধ প্রত্যাহার করা।
  4. অঞ্চলটি থেকে মার্কিন সামরিক বাহিনী সরিয়ে নেওয়া।
  5. যুদ্ধের কারণে ইরানের ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণ ক্ষতিপূরণ দেওয়া।
  6. ইরানের বিরুদ্ধে আরোপিত নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা।
  7. জব্দ করা ইরানি সম্পদ নিঃশর্তভাবে মুক্ত করা।

তেহরানের অবস্থান অনুযায়ী, এসব বিষয়ে অগ্রগতি না হলে হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি খুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে না।

যুক্তরাষ্ট্র চায় গ্রহণযোগ্য চুক্তি

ইরানের শর্তের বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র তাৎক্ষণিক কোনো মন্তব্য করেনি। তবে ওয়াশিংটনের অবস্থান হলো, হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলতে সম্মত হওয়ার আগে একটি গ্রহণযোগ্য চুক্তিতে পৌঁছাতে হবে।

ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি অবশ্য জানিয়েছেন, নৌ চলাচল নিয়ে আলোচনা অগ্রসর হয়েছে। নির্ধারিত ট্রানজিট রুট ব্যবহারের বিষয়ে দুই পক্ষের অবস্থান কাছাকাছি এসেছে বলেও তিনি জানান।

তবে প্রণালি সম্পূর্ণভাবে খুলে দেওয়ার বিষয়টি কেবল জাহাজ চলাচলের রুট নির্ধারণের ওপর নির্ভর করছে না। ইরানের অন্যান্য দাবির বাস্তবায়নের সঙ্গেও বিষয়টি যুক্ত রয়েছে।

আরাগচি এই পরিস্থিতির জন্য যুক্তরাষ্ট্রের অন্তর্বর্তী চুক্তি লঙ্ঘনকে দায়ী করেছেন।

ওমানের মধ্যস্থতায় আলোচনা চলছে

ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার আলোচনায় মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করছে ওমান। দেশটি জানিয়েছে, আলোচনা ‘ইতিবাচক ও গঠনমূলক পরিবেশে’ অব্যাহত রয়েছে।

একই সঙ্গে হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী জাহাজে হামলারও নিন্দা জানিয়েছে ওমান।

ইরানের অভিযোগ ও অবস্থানের পাশাপাশি জলপথটির নিরাপত্তা নিয়েও নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। ইরান বর্তমানে কার্যত প্রণালিতে অবরোধ আরোপ করেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

দেশটি প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী জাহাজের কাছ থেকে অর্থ নেওয়ার দাবি করছে। পাশাপাশি নিজেদের নির্ধারিত রুট এড়িয়ে চলার চেষ্টা করা জাহাজগুলোতে বারবার হামলা চালানোর অভিযোগও রয়েছে।

তবে প্রণালিতে ইরানের কোনো ধরনের টোল আরোপের বিরোধিতা করছে যুক্তরাষ্ট্র।

অন্তর্বর্তী চুক্তির সময়সীমা শেষের পথে

জুনে স্বাক্ষরিত অন্তর্বর্তী চুক্তিতে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের সময়সূচি এবং যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ নিয়ে একটি পরিকল্পনা চূড়ান্ত চুক্তির অংশ হওয়ার কথা রয়েছে।

একই চুক্তির আওতায় ইরানের জব্দ করা সম্পদ নিয়েও আলোচনা হওয়ার কথা। চূড়ান্ত চুক্তিতে পৌঁছাতে নির্ধারিত ৬০ দিনের সময়সীমা শেষ হতে এখন আর এক সপ্তাহের কিছু বেশি সময় বাকি।

তবে প্রয়োজন হলে এই সময়সীমা বাড়ানো হতে পারে।

এর পাশাপাশি হরমুজ প্রণালি পরিচালনা নিয়ে ওমানের সঙ্গে আলাদা একটি চুক্তিতেও পৌঁছানোর কাছাকাছি রয়েছে বলে জানিয়েছে ইরান।

এতে বোঝা যাচ্ছে, নৌ চলাচলের নির্দিষ্ট রুট নিয়ে আলোচনা এগোলেও পুরো প্রক্রিয়াটি এখনো একাধিক রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক শর্তের সঙ্গে যুক্ত রয়েছে।

দ্রুত সমঝোতার পক্ষে ইরানের প্রেসিডেন্ট

ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান দ্রুত একটি সমঝোতায় পৌঁছানোর পক্ষে মত দিয়েছেন।

তিনি বলেছেন, চুক্তিতে পৌঁছানোর জন্য বর্তমান সময়টিই সবচেয়ে ভালো। পেজেশকিয়ানের দাবি, যুদ্ধের মধ্যেও ইরানের জনগণের মধ্যে ঐক্য ও শক্তি বজায় রয়েছে এবং দেশটি যুদ্ধে শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে।

তার বক্তব্য এমন সময়ে এসেছে, যখন হরমুজ প্রণালি নিয়ে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে আলোচনা চলমান এবং একই সঙ্গে জলপথের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন অভিযোগ সামনে এসেছে।

সংযুক্ত আরব আমিরাতের জাহাজে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার অভিযোগ

শনিবার হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলের সময় সংযুক্ত আরব আমিরাতের রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন তেল-গ্যাস কোম্পানি অ্যাডনকের একটি জাহাজে ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র হামলার অভিযোগ উঠেছে।

সংযুক্ত আরব আমিরাতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার অংশ হিসেবে ইরান ওই ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে।

অ্যাডনক জানিয়েছে, এই হামলায় কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি। তবে কোম্পানিটির দাবি, গত ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরুর পর হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলের সময় তাদের এক ডজনের বেশি জাহাজ ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার শিকার হয়েছে।

অ্যাডনকের তথ্য অনুযায়ী, এসব হামলায় একজন ক্রু নিহত এবং আরও ২০ জন আহত হয়েছেন।

আরেকটি জাহাজে প্রজেক্টাইল আঘাত

পরে যুক্তরাজ্যের মেরিটাইম ট্রেড অপারেশনস বা ইউকেএমটিও জানায়, ওমানের খাসাব শহরের পূর্বে একটি জাহাজে প্রজেক্টাইল আঘাত হানে।

ঘটনার পর জাহাজটিতে আগুন ধরে যায়। পরে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনা হয়। ইউকেএমটিও জানিয়েছে, জাহাজ ও এর সব ক্রু নিরাপদ রয়েছে।

তবে এই ঘটনা অ্যাডনকের জাহাজে হামলার একই ঘটনা কি না, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

ফলে একদিকে হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার শর্ত নিয়ে কূটনৈতিক আলোচনা চলছে, অন্যদিকে জলপথে জাহাজ চলাচলের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন অভিযোগ সামনে এসেছে।

বর্তমান পরিস্থিতিতে হরমুজ প্রণালি পুনরায় পুরোপুরি খুলে দেওয়া নির্ভর করছে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের আলোচনার অগ্রগতির ওপর। নৌ চলাচলের নির্ধারিত ট্রানজিট রুট নিয়ে অগ্রগতি হলেও ইরানের অন্যান্য শর্ত এখনো বড় বিষয় হয়ে রয়েছে।

বিশেষ করে যুদ্ধ বন্ধ, নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, ক্ষতিপূরণ এবং জব্দ করা সম্পদ মুক্ত করার দাবিগুলো চূড়ান্ত সমঝোতার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে উঠে এসেছে।

অন্যদিকে, ৬০ দিনের সময়সীমা শেষ হওয়ার পথে থাকায় আলোচনার গতি বাড়ানোর প্রয়োজন তৈরি হয়েছে। প্রয়োজন হলে সময়সীমা বাড়ানোর সুযোগও রয়েছে।

ইরান দ্রুত সমঝোতার পক্ষে অবস্থান নিলেও হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি খুলে দেওয়ার বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।

হরমুজ প্রণালি নিয়ে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে আলোচনা এখন গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে রয়েছে। নৌ চলাচলের ট্রানজিট রুট নিয়ে অগ্রগতি হলেও ইরানের একাধিক কঠোর শর্ত এবং জাহাজে হামলার অভিযোগ পরিস্থিতিকে জটিল করে রেখেছে।

ওমানের মধ্যস্থতায় আলোচনা ‘ইতিবাচক ও গঠনমূলক পরিবেশে’ চললেও পুরোপুরি সমঝোতায় পৌঁছাতে এখনো বেশ কিছু বিষয় নিষ্পত্তি করা প্রয়োজন। সামনে চূড়ান্ত চুক্তি ও হরমুজ প্রণালি পরিচালনা নিয়ে আলোচনার অগ্রগতিই পরিস্থিতির পরবর্তী দিক নির্ধারণ করবে।

সর্বাধিক পঠিত