কানাডার গাড়ি ও ইস্পাতে শুল্ক কমাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র, সমঝোতায় দুই দেশ, গাড়ি ও ট্রাকে ২৫% থেকে ১৫% এবং ইস্পাত-অ্যালুমিনিয়ামে ৫০% থেকে ২৫% শুল্ক কমানোর প্রস্তাব।
দীর্ঘদিনের বাণিজ্যিক টানাপোড়েন কমাতে কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্র একটি সমঝোতা চুক্তির চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছে। প্রস্তাবিত চুক্তির আওতায় কানাডায় তৈরি গাড়ি, ট্রাক, ইস্পাত ও অ্যালুমিনিয়ামের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের আরোপিত শুল্ক উল্লেখযোগ্যভাবে কমানোর পরিকল্পনা করা হয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নতুন করে কানাডীয় পণ্যের ওপর শুল্ক আরোপের সময়সীমা পিছিয়ে ২২ আগস্ট শনিবার পর্যন্ত করেছেন। দুই দেশের আলোচকরা প্রায় ২০ বিলিয়ন ডলারের বাণিজ্যিক লেনদেনকে ঘিরে চুক্তির খসড়া চূড়ান্ত করতে কাজ করছেন।
সাম্প্রতিক আলোচনায় গাড়ি ও ট্রাকের শুল্ক ২৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১৫ শতাংশ করার প্রস্তাব এসেছে। একই সঙ্গে ইস্পাত ও অ্যালুমিনিয়ামের শুল্ক ৫০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ২৫ শতাংশ করার পরিকল্পনা রয়েছে। তবে ধাতব পণ্যের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট কোটা ব্যবস্থা কার্যকর থাকবে।
গাড়ি ও ট্রাকে শুল্ক ২৫% থেকে ১৫% করার প্রস্তাব
সমঝোতার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর একটি হলো কানাডায় নির্মিত গাড়ি ও ট্রাকের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক কমানো। বর্তমানে এসব পণ্যের ওপর ২৫ শতাংশ শুল্ক রয়েছে। আলোচনায় এই হার কমিয়ে ১৫ শতাংশ করার প্রস্তাব করা হয়েছে।
কানাডার গাড়ি শিল্পের জন্য বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ যুক্তরাষ্ট্রের বাজারের সঙ্গে দেশটির উৎপাদন ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ। শুল্ক কমলে কানাডায় উৎপাদিত যানবাহনের যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে প্রবেশের ক্ষেত্রে চাপ কমতে পারে।
তবে গাড়ির শুল্ক নিয়ে দুই দেশের মধ্যে আলোচনায় কিছু পার্থক্য এখনও রয়েছে বলে সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। তাই প্রস্তাবিত হার চূড়ান্ত চুক্তিতে একই থাকবে কি না, সেটি নির্ভর করছে চলমান আলোচনার ওপর।
ইস্পাত ও অ্যালুমিনিয়ামে শুল্ক অর্ধেক করার পরিকল্পনা
কানাডা-যুক্তরাষ্ট্র শুল্ক কমানোর আরেকটি বড় ক্ষেত্র হলো ইস্পাত ও অ্যালুমিনিয়াম। প্রস্তাব অনুযায়ী, এসব পণ্যের ওপর বর্তমান ৫০ শতাংশ শুল্ক কমিয়ে ২৫ শতাংশ করার পরিকল্পনা রয়েছে।
তবে এই সুবিধা একটি নির্দিষ্ট কোটা ব্যবস্থার অধীনে দেওয়া হবে। অর্থাৎ নির্ধারিত সীমার মধ্যে আমদানি করা পণ্যের ক্ষেত্রে কম শুল্ক কার্যকর হতে পারে। কোটা ব্যবস্থার বাইরে থাকা পণ্যের জন্য আগের উচ্চ শুল্ক বহাল থাকার বিষয়টি আলোচনায় রয়েছে।
ইস্পাত ও অ্যালুমিনিয়াম দুই দেশের শিল্পখাতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় এই সিদ্ধান্ত বাণিজ্যিক সম্পর্কের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলতে পারে। দীর্ঘদিন ধরে এসব পণ্যের শুল্ক নিয়ে দুই দেশের মধ্যে মতবিরোধ রয়েছে।
২২ আগস্ট পর্যন্ত সময় পেল আলোচনা
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কানাডীয় পণ্যের ওপর নতুন শুল্ক আরোপের সময়সীমা পিছিয়ে ২২ আগস্ট পর্যন্ত করেছেন। এর আগে নতুন শুল্ক কার্যকরের বিষয়ে চাপ তৈরি হয়েছিল।
ট্রাম্প সাংবাদিকদের বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডা একটি ইতিবাচক চুক্তির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। এই সময়ের মধ্যে দুই দেশের আলোচকরা প্রায় ২০ বিলিয়ন ডলারের বাণিজ্যিক লেনদেনকে কেন্দ্র করে চূড়ান্ত খসড়া তৈরির কাজ করছেন।
সাম্প্রতিক সময়ে দুই দেশের মধ্যে উচ্চপর্যায়ের আলোচনা অব্যাহত রয়েছে। এর আগে ১৯ আগস্ট নতুন শুল্ক কার্যকরের সময়সীমা ঘিরে অগ্রগতির কথা জানিয়ে ট্রাম্প তা পিছিয়ে দেন।
কানাডার পাল্টা পদক্ষেপের ইঙ্গিত
সমঝোতার অংশ হিসেবে কানাডাও কিছু পদক্ষেপ নেওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছে। কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি দেশটির বিভিন্ন প্রদেশে মার্কিন মদের ওপর থাকা বিধিনিষেধ তুলে নেওয়ার বিষয়ে ইঙ্গিত দিয়েছেন।
মার্কিন প্রশাসনের কাছে কানাডার বাজারে মার্কিন পণ্যের প্রবেশাধিকার একটি গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য বিষয়। বিশেষ করে অ্যালকোহল ও অন্যান্য বাণিজ্যিক বাধা নিয়ে দুই দেশের মধ্যে আলোচনা হয়েছে।
সাম্প্রতিক আলোচনায় কানাডার পক্ষ থেকে যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক কমানোর পাশাপাশি পাল্টা বাণিজ্যিক পদক্ষেপ শিথিল করার বিষয়ও সামনে এসেছে। ফলে প্রস্তাবিত সমঝোতাটি শুধু শুল্ক কমানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে দুই দেশের বাজারে পণ্য প্রবেশের সুযোগ বাড়ানোর দিকেও যেতে পারে।
দুই দেশের অর্থনীতিতে সম্ভাব্য প্রভাব

মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধি ও প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের মতে, প্রস্তাবিত সমঝোতা কার্যকর হলে যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডা—উভয় দেশের অর্থনীতি শক্তিশালী হতে পারে। একই সঙ্গে দীর্ঘদিনের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যিক টানাপোড়েনও কমে আসবে।
শুল্ক কমানোর ফলে দুই দেশের ব্যবসায়ীদের জন্য বাণিজ্যিক পরিবেশ কিছুটা সহজ হতে পারে। বিশেষ করে গাড়ি, ট্রাক, ইস্পাত ও অ্যালুমিনিয়াম খাত সরাসরি এই পরিবর্তনের আওতায় আসবে।
তবে চুক্তিটি এখনো চূড়ান্ত হয়নি। ফলে প্রস্তাবিত শুল্কহার ও অন্যান্য শর্ত শেষ পর্যন্ত কীভাবে কার্যকর হবে, তা চূড়ান্ত সমঝোতার ওপর নির্ভর করবে।
কানাডা-যুক্তরাষ্ট্র শুল্ক কমানো কেন গুরুত্বপূর্ণ
কানাডা-যুক্তরাষ্ট্র শুল্ক কমানোর প্রস্তাবটি দুই দেশের দীর্ঘদিনের বাণিজ্য বিরোধের প্রেক্ষাপটে গুরুত্বপূর্ণ। গাড়ি ও ধাতব পণ্যের ওপর উচ্চ শুল্ক দুই দেশের শিল্প ও ব্যবসায়িক সম্পর্কের ওপর চাপ তৈরি করেছে।
প্রস্তাবিত সমঝোতায় গাড়ি ও ট্রাকের শুল্ক ২৫ শতাংশ থেকে ১৫ শতাংশ এবং ইস্পাত ও অ্যালুমিনিয়ামের শুল্ক ৫০ শতাংশ থেকে ২৫ শতাংশে নামানোর কথা বলা হয়েছে। পাশাপাশি কানাডার পক্ষ থেকে মার্কিন মদের ওপর থাকা কিছু বিধিনিষেধ শিথিল করার ইঙ্গিত এসেছে।
ফলে চুক্তিটি বাস্তবায়িত হলে দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্যিক উত্তেজনা কমানোর একটি নতুন পথ তৈরি হতে পারে। তবে চূড়ান্ত চুক্তির শর্ত এবং বাস্তবায়ন পদ্ধতি না আসা পর্যন্ত বিষয়টিকে প্রস্তাব হিসেবেই দেখা হচ্ছে।
বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার আলোচকরা চুক্তির শেষ পর্যায়ের খসড়া তৈরিতে ব্যস্ত। ২২ আগস্টের সময়সীমার আগে দুই দেশ সমঝোতায় পৌঁছাতে পারে কি না, সেটিই এখন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
গাড়ি, ট্রাক, ইস্পাত ও অ্যালুমিনিয়ামের শুল্ক কমানোর প্রস্তাবের পাশাপাশি বাজারে প্রবেশাধিকার ও বাণিজ্যিক বিধিনিষেধ নিয়েও আলোচনা চলছে। দুই দেশের কর্মকর্তারা আশা করছেন, একটি সমঝোতা হলে দীর্ঘদিনের বাণিজ্যিক টানাপোড়েন অনেকটাই কমে আসবে।
তবে চূড়ান্ত চুক্তি স্বাক্ষর এবং কার্যকর হওয়ার আগে প্রস্তাবিত হার বা শর্তে পরিবর্তন আসার সুযোগ রয়েছে। তাই আগামী দিনের আলোচনাই নির্ধারণ করবে কানাডা-যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্য সম্পর্কের পরবর্তী কাঠামো।





