বড় যুদ্ধের অশনি সংকেত, অস্ট্রেলিয়ায় আবারও খুলছে সেই টাংস্টেন খনি, ২০২৬ সালে অস্ট্রেলিয়ার এই খনি কেন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে, জানুন বিস্তারিত।
অস্ট্রেলিয়ার কিং আইল্যান্ডে দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা ডলফিন টাংস্টেন মাইন আবার চালুর উদ্যোগকে সম্ভাব্য বড় সংঘাতের প্রস্তুতির সঙ্গে যুক্ত করে দেখছে নিউইয়র্ক পোস্টের একটি প্রতিবেদন। বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন সংঘাতের মধ্যে যুদ্ধ ও প্রতিরক্ষা শিল্পে গুরুত্বপূর্ণ ধাতু টাংস্টেনের চাহিদা বাড়ার প্রেক্ষাপটে খনিটির কার্যক্রম পুনরায় সক্রিয় করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ২০২৬ সালে এসে খনিটিতে উৎপাদন বাড়ানোর প্রস্তুতি চলছে এবং আগামী সেপ্টেম্বর থেকে ভূগর্ভ থেকে প্রথম আকরিক উত্তোলন ও সরবরাহ শুরুর পরিকল্পনা রয়েছে।
টাংস্টেনের কৌশলগত গুরুত্বের কারণেই অস্ট্রেলিয়ার এই পুরোনো খনি নতুন করে আলোচনায় এসেছে। যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা USGS-এর তথ্যেও টাংস্টেনকে গুরুত্বপূর্ণ খনিজ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। সংস্থাটির মতে, টাংস্টেন বিভিন্ন শিল্পে ব্যবহৃত হয় এবং অস্ত্র ও গোলাবারুদসহ প্রতিরক্ষা খাতেও এর ব্যবহার রয়েছে।
টাংস্টেন কেন এত গুরুত্বপূর্ণ

টাংস্টেন অত্যন্ত শক্ত ও তাপসহনশীল একটি ধাতু। এ কারণে সামরিক সরঞ্জাম, বর্ম-ভেদী গোলাবারুদ এবং সাঁজোয়া যানের বর্ম তৈরিতে এর ব্যবহার গুরুত্বপূর্ণ বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে টাংস্টেনের ব্যবহার শুধু প্রতিরক্ষা শিল্পেই সীমাবদ্ধ নয়। USGS বলছে, টাংস্টেনের বড় একটি ব্যবহার টাংস্টেন কার্বাইড তৈরিতে, যা ধাতু, খনি ও নির্মাণ শিল্পে ক্ষয়-প্রতিরোধী উপকরণ হিসেবে ব্যবহৃত হয়। একই সঙ্গে টাংস্টেন ভারী ধাতব সংকর, বিশেষায়িত ইস্পাত ও বিভিন্ন শিল্পপণ্যে ব্যবহৃত হয়।
সামরিক ক্ষেত্রে এর গুরুত্ব বাড়ার অন্যতম কারণ হলো উচ্চ তাপমাত্রা ও কঠিন পরিবেশে এর কার্যকারিতা। USGS-এর ২০২৫ সালের গুরুত্বপূর্ণ খনিজ তালিকাতেও টাংস্টেনকে জেট ইঞ্জিন, গোলাবারুদ এবং খনি ও কাটিং সরঞ্জামে ব্যবহৃত ধাতু হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
ডলফিন টাংস্টেন মাইনের দীর্ঘ যুদ্ধ-ইতিহাস
কিং আইল্যান্ডের ডলফিন মাইন গত এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে বিভিন্ন পর্যায়ে চালু ও বন্ধ হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুদ্ধের সময় টাংস্টেনের চাহিদা বেড়ে গেলে খনিটির কার্যক্রম সক্রিয় হয়েছে এবং পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে আবার বন্ধ হয়েছে।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় অস্ত্র তৈরির প্রয়োজন মেটাতে ১৯১৭ সালে ডলফিন মাইন প্রথম চালু করা হয়। কিন্তু তিন বছর পর যুদ্ধ শেষ হলে টাংস্টেনের বাজারে বড় পরিবর্তন আসে। এর পরিপ্রেক্ষিতে খনিটি বন্ধ হয়ে যায়।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আশঙ্কায় ১৯৩৮ সালে আবার খনিটি চালু করা হয়। পরবর্তী সময়ে কোরিয়া ও ভিয়েতনাম যুদ্ধ এবং স্নায়ুযুদ্ধের সময়ও বিভিন্ন পর্যায়ে এর কার্যক্রম চলেছে।
১৯৮৯ সালে বার্লিন প্রাচীর পতনের পর ডলফিন মাইন কার্যত দীর্ঘমেয়াদে বন্ধ হয়ে যায়। তখন ধারণা করা হয়েছিল, খনিটির কার্যক্রম হয়তো আর ফিরবে না।
২০২২ সালে পুনরায় চালুর উদ্যোগ
প্রায় তিন দশক বন্ধ থাকার পর ২০২২ সালের জানুয়ারিতে ডলফিন টাংস্টেন মাইন পুনরায় চালুর কাজ শুরু হয়। উল্লেখযোগ্যভাবে, এর কয়েক সপ্তাহ পরই রাশিয়া ইউক্রেনে সামরিক অভিযান শুরু করে।
তবে খনি পুনরায় চালুর উদ্যোগকে শুধু একটি নির্দিষ্ট যুদ্ধের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত করার পরিবর্তে প্রতিবেদনে বৈশ্বিক প্রতিরক্ষা ও গুরুত্বপূর্ণ খনিজের সরবরাহ পরিস্থিতির বৃহত্তর প্রেক্ষাপট তুলে ধরা হয়েছে।
২০২৬ সালে এসে খনিটিতে টাংস্টেন উৎপাদন বাড়ানোর প্রস্তুতি চলছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, আগামী সেপ্টেম্বর থেকে ভূগর্ভ থেকে প্রথম আকরিক উত্তোলন ও সরবরাহ শুরু হতে পারে।
ডলফিন টাংস্টেন মাইন ও চীনের সরবরাহ-নির্ভরতা
অস্ট্রেলিয়ার এই খনি পুনরায় চালুর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে প্রতিবেদনে টাংস্টেনের বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থায় চীনের আধিপত্যের কথা বলা হয়েছে।
বর্তমান তথ্যও দেখায়, টাংস্টেন উৎপাদনে চীনের অবস্থান অত্যন্ত শক্তিশালী। USGS-এর ২০২৬ সালের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে বিশ্বের মোট খনি-উৎপাদিত টাংস্টেনের আনুমানিক ৮২ শতাংশই চীনে উৎপাদিত হয়েছে।
ফলে চীনের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমিয়ে বিকল্প উৎস গড়ে তোলার বিষয়টি বিভিন্ন দেশের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। গুরুত্বপূর্ণ খনিজের সরবরাহ ব্যবস্থা নিরাপদ রাখতে নতুন খনি উন্নয়ন এবং পুরোনো খনি পুনরায় চালুর উদ্যোগও সেই বৃহত্তর কৌশলের অংশ।
এই প্রেক্ষাপটে ডলফিন টাংস্টেন মাইন অস্ট্রেলিয়ার জন্য একটি সম্ভাব্য বিকল্প সরবরাহ উৎস হিসেবে গুরুত্ব পাচ্ছে।
তাইওয়ান ঘিরে উত্তেজনাও বাড়াচ্ছে টাংস্টেনের গুরুত্ব
প্রতিবেদনটিতে চীন ও পশ্চিমা দেশগুলোর মধ্যে তাইওয়ানকে ঘিরে উত্তেজনার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। সম্ভাব্য সামরিক সংঘাতের আশঙ্কায় যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশ প্রতিরক্ষা শিল্পে প্রয়োজনীয় গুরুত্বপূর্ণ খনিজের মজুত ও সরবরাহ নিশ্চিত করার উদ্যোগ নিয়েছে।
টাংস্টেনের ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ, কারণ সামরিক সরঞ্জাম ও ক্ষেপণাস্ত্র তৈরিতে এই ধাতুর ব্যবহার রয়েছে। সাম্প্রতিক বিভিন্ন সংঘাতে ক্ষেপণাস্ত্রের ব্যবহার ও উৎপাদন বাড়ার ফলে টাংস্টেনের মতো গুরুত্বপূর্ণ ধাতুর নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করার প্রতিযোগিতাও বাড়ছে বলে প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়েছে।
USGS-ও টাংস্টেনকে জাতীয় নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা শিল্পের সঙ্গে সম্পর্কিত গুরুত্বপূর্ণ খনিজ হিসেবে বিবেচনা করে। সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, চীনের খনিজ উৎপাদন বিশ্ব সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ভূমিকা রাখে এবং ২০২৪ সালে চীন টাংস্টেন উৎপাদনে বিশ্বে শীর্ষে ছিল।
যুক্তরাষ্ট্রের ১৬০ কোটি ডলারের চুক্তি
টাংস্টেনের বিকল্প উৎস নিশ্চিত করার প্রতিযোগিতার আরেকটি উদাহরণ হিসেবে প্রতিবেদনে যুক্তরাষ্ট্রের একটি উদ্যোগের কথা বলা হয়েছে।
নিউইয়র্ক পোস্টের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র সম্প্রতি কাজাখস্তানের একটি বড় অব্যবহৃত টাংস্টেনের ভাণ্ডার থেকে খনিজ উত্তোলনের জন্য ১৬০ কোটি ডলারের একটি চুক্তি করেছে।
অর্থাৎ, অস্ট্রেলিয়ার ডলফিন টাংস্টেন মাইন পুনরায় চালুর উদ্যোগকে বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা হিসেবে না দেখে বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ খনিজ সরবরাহ ব্যবস্থায় বিকল্প উৎস তৈরির বৃহত্তর প্রবণতার অংশ হিসেবেও দেখা হচ্ছে।
যুদ্ধের আশঙ্কা কি সত্যিই বাড়ছে?
ডলফিন মাইনের ইতিহাসে যুদ্ধ ও খনি চালুর মধ্যে একটি সম্পর্ক দেখা গেলেও শুধু খনি পুনরায় চালু হওয়ার ঘটনাকে বিশ্বযুদ্ধ শুরু হওয়ার নিশ্চিত সংকেত হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। প্রতিবেদনে বরং এটিকে সম্ভাব্য দীর্ঘমেয়াদি সংঘাতের প্রস্তুতি এবং প্রতিরক্ষা শিল্পের জন্য কৌশলগত খনিজ নিশ্চিত করার প্রবণতার সঙ্গে সম্পর্কিত করে দেখা হয়েছে।
বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে সংঘাত চলতে থাকায় সামরিক সরঞ্জাম ও ক্ষেপণাস্ত্রের চাহিদা বাড়তে পারে। একই সঙ্গে প্রতিরক্ষা শিল্পে ব্যবহৃত কাঁচামালের সরবরাহ নিরাপদ রাখাও দেশগুলোর জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
এই পরিস্থিতিতে টাংস্টেনের মতো কৌশলগত খনিজের উৎস নিয়ে প্রতিযোগিতা বাড়া স্বাভাবিক। অস্ট্রেলিয়ার ডলফিন মাইন পুনরায় সক্রিয় করার উদ্যোগ সেই বাস্তবতারই একটি দৃষ্টান্ত হিসেবে সামনে এসেছে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ডলফিন মাইন থেকে ভূগর্ভস্থ আকরিক উত্তোলন ও সরবরাহ শুরু হওয়ার কথা। এর মাধ্যমে অস্ট্রেলিয়া বৈশ্বিক টাংস্টেন সরবরাহ ব্যবস্থায় নতুন করে ভূমিকা রাখার সুযোগ পেতে পারে।
তবে এর প্রভাব কতটা হবে, তা নির্ভর করবে উৎপাদনের পরিমাণ, সরবরাহ এবং বৈশ্বিক বাজারের চাহিদার ওপর। বর্তমান পর্যায়ে নিশ্চিতভাবে বলা যায়, গুরুত্বপূর্ণ খনিজের সরবরাহ নিয়ে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা বাড়ার সময়েই অস্ট্রেলিয়ার পুরোনো এই খনি আবার আলোচনায় এসেছে।
অস্ট্রেলিয়ার কিং আইল্যান্ডে দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা ডলফিন মাইন পুনরায় চালুর উদ্যোগ টাংস্টেনের কৌশলগত গুরুত্বকে নতুন করে সামনে এনেছে। প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ থেকে শুরু করে কোরিয়া ও ভিয়েতনাম যুদ্ধ এবং স্নায়ুযুদ্ধ—বিভিন্ন সময়ে খনিটির কার্যক্রমের সঙ্গে যুদ্ধকালীন চাহিদার সম্পর্ক ছিল।
২০২২ সালে পুনরায় চালুর কাজ শুরু হওয়ার পর ২০২৬ সালে এসে উৎপাদন বাড়ানোর প্রস্তুতি এবং সেপ্টেম্বর থেকে আকরিক সরবরাহ শুরুর পরিকল্পনা নতুন করে আন্তর্জাতিক মনোযোগ তৈরি করেছে।
তবে এই উদ্যোগকে সরাসরি বিশ্বযুদ্ধের পূর্বাভাস হিসেবে না দেখে গুরুত্বপূর্ণ খনিজের সরবরাহ নিশ্চিত করা, চীনের ওপর নির্ভরতা কমানো এবং প্রতিরক্ষা শিল্পের কাঁচামাল নিরাপদ রাখার বৈশ্বিক প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে দেখা বেশি যুক্তিসংগত। অস্ট্রেলিয়ার ডলফিন টাংস্টেন মাইন সেই পরিবর্তিত ভূরাজনৈতিক ও সরবরাহ-বাস্তবতার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হয়ে উঠেছে।





