ভারত থেকে বিদ্যুৎ আনতে গুনতে হবে নতুন চার্জ, আমদানিতে প্রতি ইউনিটে ০.০০৫ রুপি নতুন এসএনএ চার্জ চেয়েছে দেশটি। চুক্তি বিলম্ব হলে ১১৬০ মেগাওয়াট আমদানিতে জটিলতার শঙ্কা।
ভারত থেকে বিদ্যুৎ আমদানির ক্ষেত্রে প্রতি ইউনিটে ০.০০৫ ভারতীয় রুপি হারে নতুন চার্জ দিতে হতে পারে বাংলাদেশকে। ভারতের কেন্দ্রীয় বিদ্যুৎ নিয়ন্ত্রক সংস্থা (সিইআরসি) আন্তঃসীমান্ত বিদ্যুৎ-বাণিজ্যের জন্য এই চার্জের ব্যবস্থা করেছে। বিষয়টি নিয়ে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে নতুন চুক্তি করতে হবে। তবে চুক্তি করতে দেরি হলে এনভিভিএনের মাধ্যমে ১ হাজার ১৬০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আমদানিতে জটিলতা তৈরি হতে পারে বলে জানিয়েছে বিদ্যুৎ বিভাগ।
গত ১৮ আগস্ট অর্থ বিভাগে দেওয়া এক চিঠিতে বিদ্যুৎ বিভাগ নতুন চুক্তির বিষয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ের মতামত চেয়েছে। চিঠিতে ভারতের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান এনটিপিসি বিদ্যুতের ব্যাপারে নিগম লিমিটেড (এনভিভিএন) এবং বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) মধ্যে সেটেলমেন্ট নোডাল এজেন্সি বা এসএনএ চুক্তির প্রয়োজনীয়তার কথা বলা হয়েছে।
কেন ভারত থেকে বিদ্যুৎ আমদানিতে নতুন চার্জ?
বিদ্যুৎ বিভাগ ও পিডিবির সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য অনুযায়ী, এসএনএ চার্জ বিদ্যুতের মূল দাম নয়। এটি আন্তর্দেশীয় বিদ্যুৎ-বাণিজ্যের গ্রিড পরিচালনা এবং বিদ্যুৎ লেনদেন নিষ্পত্তির সঙ্গে যুক্ত খরচ।

পিডিবি সূত্রের বরাতে জানা যায়, আন্তঃসীমান্ত বিদ্যুৎ সরবরাহের সময়সূচি নির্ধারণ, মিটার থেকে বিদ্যুৎ ব্যবহারের তথ্য সংগ্রহ, সরবরাহ ও ব্যবহারের হিসাব সমন্বয় এবং গ্রিড পরিচালনার মতো কাজের ব্যয় মেটাতে এই চার্জ নেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
অর্থাৎ, ভারত থেকে বিদ্যুৎ আমদানির ক্ষেত্রে এটি সরাসরি বিদ্যুতের ইউনিটমূল্যের সঙ্গে যুক্ত কোনো অতিরিক্ত দাম নয়। বরং আন্তঃদেশীয় বিদ্যুৎ লেনদেন পরিচালনা ও হিসাব নিষ্পত্তির জন্য নির্ধারিত একটি চার্জ হিসেবে এটি নেওয়া হবে।
বিদ্যুৎ বিভাগের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করছেন, এই চার্জ যুক্ত হলেও বিদ্যুৎ আমদানির ব্যয় খুব বেশি বাড়বে না। পাশাপাশি এনভিভিএনের সঙ্গে এসএনএ চুক্তি হলে লেনদেনের প্রক্রিয়াও সহজ হবে।
শুরুতে চার্জ চাওয়া হয়েছিল ০.০১ রুপি
ভারতের কেন্দ্রীয় বিদ্যুৎ নিয়ন্ত্রক সংস্থা সিইআরসি আন্তঃসীমান্ত বিদ্যুৎ-বাণিজ্যের জন্য প্রথমে প্রতি ইউনিটে ০.০১ ভারতীয় রুপি চার্জ নেওয়ার প্রস্তাব করেছিল।
তবে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের আবেদনের পর সেই হার কমিয়ে প্রতি ইউনিটে ০.০০৫ ভারতীয় রুপি করা হয়।
বিদ্যুৎ বিভাগের চিঠিতে বলা হয়েছে, প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে বিদ্যুৎ-বাণিজ্যে গ্রিড-সংক্রান্ত চার্জ নিষ্পত্তি সহজ করার উদ্দেশ্যে ভারতের সিইআরসি এসএনএ ব্যবস্থা চালু করেছে।
ভারত থেকে নেপাল ও ভুটানে বিদ্যুৎ বাণিজ্যের ক্ষেত্রেও একই হারে এসএনএ চার্জ নেওয়া হচ্ছে বলে চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
১ হাজার ১৬০ মেগাওয়াট বিদ্যুতের জন্য চুক্তির উদ্যোগ
বর্তমানে বিভিন্ন চুক্তির আওতায় ভারত থেকে বাংলাদেশের মোট ২ হাজার ৬৫৬ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আমদানির সুযোগ রয়েছে। এর মধ্যে এনভিভিএনের মাধ্যমে সরকারি পর্যায়ে একাধিক উৎস থেকে বিদ্যুৎ আমদানির ব্যবস্থা রয়েছে।
এনটিপিসির কেন্দ্র থেকে ২৫০ মেগাওয়াট, দামোদর ভ্যালি করপোরেশন বা ডিভিসি থেকে ৩০০ মেগাওয়াট এবং ত্রিপুরা স্টেট ইলেকট্রিসিটি করপোরেশন থেকে ১৬০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আমদানির ব্যবস্থা রয়েছে।
এ ছাড়া বেসরকারি খাত থেকেও ভারতের বিদ্যুৎ আমদানির চুক্তি রয়েছে। পিটিসি ইন্ডিয়ার মাধ্যমে সেম্বকর্প এনার্জি ইন্ডিয়ার একটি কেন্দ্র থেকে ২০০ মেগাওয়াট এবং সেম্বকর্প থেকে সরাসরি আরও ২৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আমদানির চুক্তি রয়েছে।
এই বিভিন্ন উৎস মিলিয়ে মোট ১ হাজার ১৬০ মেগাওয়াট বিদ্যুতের জন্য এনভিভিএন ও পিডিবির মধ্যে এসএনএ চুক্তি করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
চুক্তি বিলম্ব হলে কী হতে পারে
বিদ্যুৎ বিভাগের চিঠিতে সতর্ক করা হয়েছে, এনভিভিএন ও পিডিবির মধ্যে এসএনএ চুক্তি করতে দেরি হলে এনভিভিএনের মাধ্যমে ১ হাজার ১৬০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আমদানিতে জটিলতা তৈরি হতে পারে।
এ কারণে নতুন চুক্তির বিষয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ের মতামত চাওয়া হয়েছে। গত ১৮ আগস্ট বিদ্যুৎ বিভাগ অর্থ বিভাগে এ বিষয়ে চিঠি পাঠায়।
চুক্তিটি কার্যকর হলে এনভিভিএনের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট বিদ্যুৎ লেনদেন নিষ্পত্তির সুযোগ তৈরি হবে। বিদ্যুৎ বিভাগের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, এর ফলে পরবর্তী সময়ে প্রতিটি বিদ্যুৎকেন্দ্রের সঙ্গে আলাদাভাবে বিল পরিশোধের প্রয়োজন হবে না।
আদানির বিদ্যুতে আলাদা এসএনএ চুক্তি লাগবে না
ভারত থেকে বাংলাদেশের বিদ্যুৎ আমদানির মোট সক্ষমতার একটি বড় অংশ আসে ভারতের ঝাড়খন্ডের গোড্ডায় নির্মিত আদানির বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে।
এই কেন্দ্র থেকে বাংলাদেশে ১ হাজার ৪৯৬ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আমদানির চুক্তি রয়েছে। তবে এই বিদ্যুতের ক্ষেত্রে নতুন করে এসএনএ চুক্তির প্রয়োজন হবে না বলে জানিয়েছেন পিডিবির কর্মকর্তারা।
তাঁদের বক্তব্য অনুযায়ী, আদানির সঙ্গে বাংলাদেশের বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তির মধ্যেই এ ধরনের চার্জের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। ফলে আদানির বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে আমদানি করা ১ হাজার ৪৯৬ মেগাওয়াট বিদ্যুতের জন্য আলাদা করে এসএনএ চুক্তি করার প্রয়োজন নেই।
এদিকে এনভিভিএনের মাধ্যমে আমদানির আওতায় থাকা ১ হাজার ১৬০ মেগাওয়াট বিদ্যুতের জন্যই নতুন এসএনএ চুক্তির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
ভারত থেকে বিদ্যুৎ আমদানির লেনদেন সহজ করার লক্ষ্য
এসএনএ ব্যবস্থার মূল উদ্দেশ্য আন্তঃসীমান্ত বিদ্যুৎ-বাণিজ্যের লেনদেন ও গ্রিড-সংক্রান্ত হিসাব নিষ্পত্তি সহজ করা। বিদ্যুৎ সরবরাহের সময়সূচি, মিটারভিত্তিক ব্যবহারের তথ্য, সরবরাহ ও ব্যবহারের হিসাব এবং গ্রিড পরিচালনার মতো বিষয়গুলো এই প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত।
বিদ্যুৎ বিভাগের বক্তব্য অনুযায়ী, এনভিভিএনের সঙ্গে চুক্তির ফলে বিদ্যুৎ আমদানির লেনদেন আরও সহজ হবে। বিশেষ করে একাধিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের সঙ্গে আলাদা আলাদা বিল নিষ্পত্তির পরিবর্তে একটি নোডাল প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সেটেলমেন্ট করার সুযোগ তৈরি হবে।
তবে নতুন চার্জের কারণে ভারত থেকে বিদ্যুৎ আমদানির ব্যয় কিছুটা বাড়বে। যদিও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, চার্জটি বিদ্যুতের মূল দাম নয় এবং এতে সামগ্রিক ব্যয় খুব বেশি বাড়ার কথা নয়।
বিদ্যুৎ আমদানির চুক্তিতে এখন গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত
ভারত থেকে বিদ্যুৎ আমদানির ক্ষেত্রে নতুন এসএনএ চার্জ এবং চুক্তি সম্পাদনের বিষয়টি এখন বাংলাদেশের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও সংস্থাগুলোর বিবেচনায় রয়েছে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের মতামত পাওয়ার পর চুক্তি করার প্রক্রিয়া এগোবে।
বিশেষ করে এনভিভিএনের মাধ্যমে ১ হাজার ১৬০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আমদানির ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে চুক্তির বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ বিদ্যুৎ বিভাগের চিঠিতে চুক্তিতে বিলম্ব হলে আমদানিতে জটিলতার আশঙ্কার কথা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে।
অন্যদিকে, আদানির বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে ১ হাজার ৪৯৬ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আমদানির ক্ষেত্রে বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তির মধ্যেই সংশ্লিষ্ট চার্জের বিষয়টি থাকায় আলাদা এসএনএ চুক্তির প্রয়োজন নেই।
ভারত থেকে বিদ্যুৎ আমদানিতে প্রতি ইউনিটে ০.০০৫ ভারতীয় রুপি হারে এসএনএ চার্জ যুক্ত হওয়ার প্রক্রিয়া বাংলাদেশের বিদ্যুৎ আমদানি ব্যবস্থায় নতুন একটি বিষয়। ভারতের সিইআরসি প্রথমে ০.০১ রুপি চার্জের প্রস্তাব করলেও পিডিবির আবেদনের পর তা অর্ধেকে নামিয়ে ০.০০৫ রুপি করা হয়েছে।
এই চার্জ মূলত আন্তঃসীমান্ত গ্রিড পরিচালনা ও বিদ্যুৎ লেনদেন নিষ্পত্তির ব্যয় হিসেবে নেওয়া হবে। তবে এনভিভিএনের মাধ্যমে ১ হাজার ১৬০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আমদানির জন্য প্রয়োজনীয় এসএনএ চুক্তি সময়মতো না হলে জটিলতা তৈরির আশঙ্কা রয়েছে। তাই চুক্তি সম্পাদনের বিষয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ের মতামত এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।





