এইমাত্র

আরও খবর

যে কারণে বাতিল মিশরের গোল (15)
ঢাকায় চার কৌশলে ছিনতাই হচ্ছে, হিসাব নেই, বিচারও নেই
যে কারণে বাতিল মিশরের গোল (3)
সাগরে সুস্পষ্ট লঘুচাপ, সমুদ্রবন্দরে সতর্কসংকেত বহাল
যে কারণে বাতিল মিশরের গোল
গঙ্গা চুক্তি: নতুন উদ্যোগ বাংলাদেশের, জেআরসিতে আলোচনা চায় ভারত
যে কারণে বাতিল মিশরের গোল
শাহজালালের থার্ড টার্মিনাল ৯৯.৯১% কাজ শেষ, তবু ব্যয় বাড়ছে ৯০২ কোটি টাকা
যে কারণে বাতিল মিশরের গোল (27)
মালয়েশিয়ায় কর্মী নিয়োগে মানতে হবে যেসব নির্দেশনা

ভুয়া ঠিকানা ব্যবহার করে যন্ত্রাংশের নামে বিএমডব্লিউ, লেক্সাস, রেঞ্জ রোভার আমদানি

ভুয়া ঠিকানা ব্যবহার করে যন্ত্রাংশের নামে বিএমডব্লিউ, লেক্সাস, রেঞ্জ রোভার আমদানি ও Toyota আনার ঘটনায় ৪ গাড়ি জব্দ। ভুয়া ঠিকানা ও ২৭ চালানের তথ্য এখন খতিয়ে দেখছে কাস্টমস গোয়েন্দা দল।

গাড়ির যন্ত্রাংশ আমদানির ঘোষণা দিয়ে BMW, Lexus, Range Rover ও Toyota ব্র্যান্ডের চারটি দামি গাড়ি আনার অভিযোগে তদন্ত শুরু করেছে কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তথ্য অনুযায়ী, এসব বিলাসবহুল গাড়ি আমদানি করেছে ক্রাউন অটোমোবাইল সার্ভিসেস নামের একটি প্রতিষ্ঠান।

অভিযোগের বিষয়টি আরও গুরুত্ব পেয়েছে আমদানিকারকের ঘোষিত ঠিকানা নিয়ে প্রশ্ন ওঠায়। নথিতে ঢাকার গেন্ডারিয়ার ৩/১ দীননাথ সেন রোডের ঠিকানা ব্যবহার করা হলেও সরেজমিনে সেখানে ওই নামে কোনো গাড়ি আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানের অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। বরং সেখানে ২০১৮ সাল থেকে একটি আবাসিক ভবন নির্মাণের কাজ চলছে।

গত বৃহস্পতিবার কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের অভিযানে মোংলা বন্দর দিয়ে যন্ত্রাংশ হিসেবে আনা চারটি গাড়ি জব্দ করা হয়। প্রতিটি গাড়ির মূল্য কোটি টাকার বেশি বলে এনবিআর সূত্র জানিয়েছে।

কীভাবে ধরা পড়ল চার বিলাসবহুল গাড়ি

এনবিআর সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, শতভাগ কায়িক পরীক্ষা, বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) ও কুয়েটের বিশেষজ্ঞদের কারিগরি সহায়তা এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই ব্যবহারের মাধ্যমে চারটি গাড়ির শুল্ক ফাঁকির বিষয়টি শনাক্ত করা হয়।

গাড়িগুলো মোংলা বন্দর দিয়ে আনা হয়েছিল। নথিতে এগুলো গাড়ির যন্ত্রাংশ হিসেবে ঘোষণা করা হয়। তবে তদন্তে সেগুলো BMW, Lexus, Range Rover ও Toyota ব্র্যান্ডের চারটি গাড়ি হিসেবে শনাক্ত হয়।

মোংলা বন্দরে চালানটি খালাসের আগেই আটক করা হয়। পরে কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা চট্টগ্রামে একটি BMW এবং কক্সবাজারে আরও তিনটি গাড়ি জব্দ করেন। কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, এসব গাড়ির বৈধ আমদানিসংক্রান্ত নথিপত্র ব্যবহারকারীরা দেখাতে পারেননি।

বিলাসবহুল গাড়ি আমদানির নথিতে ভুয়া ঠিকানার অভিযোগ

ক্রাউন অটোমোবাইল সার্ভিসেসের আমদানি নথিতে গেন্ডারিয়ার ৩/১ দীননাথ সেন রোডের ঠিকানা ব্যবহার করা হয়েছে। কিন্তু সেখানে গিয়ে প্রতিষ্ঠানটির কোনো কার্যক্রম পাওয়া যায়নি।

সরেজমিনে দেখা যায়, ২৬ কাঠা জমির ওপর একটি ভবন নির্মাণের কাজ চলছে। আল-আকসা বিল্ডার্স নামের একটি প্রতিষ্ঠান ভবনটি নির্মাণ করছে। ভবনের কয়েকটি ফ্ল্যাটে মানুষ বসবাস করেন এবং দ্বিতীয় তলায় রয়েছে নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠানের কার্যালয়।

আল-আকসা বিল্ডার্সের হিসাবরক্ষক আবদুল কাইয়ুম জানান, তাঁরা ২০১৮ সাল থেকে সেখানে ভবন নির্মাণ করছেন। ওই জায়গায় কোনো গাড়ির প্রতিষ্ঠান ছিল বলে তাঁর জানা নেই। তবে আগে সেখানে ‘ক্রাউন’ নামে একটি বাতি তৈরির কারখানা ছিল বলে জানান তিনি।

ভবনের পাশের সেলিম স্টোরের মালিক মো. সেলিম মিয়াও একই ধরনের তথ্য দিয়েছেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, সাতক্ষীরাভিত্তিক ক্রাউন কোম্পানি সেখানে আগে বাল্ব তৈরি করত। প্রায় ১০ বছর আগে তাদের কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। পরে জমিটি আবাসন প্রতিষ্ঠানের কাছে দেওয়া হয়।

তবে প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম না থাকলেও ক্রাউন অটোমোবাইল সার্ভিসেসের নামে চিঠি এখনো ওই ঠিকানায় আসে বলে জানান আবদুল কাইয়ুম।

২০১৫ সাল থেকে ২৭টি চালান

আমদানিকারকের ঘোষিত ঠিকানায় গাড়ির যন্ত্রাংশের ব্যবসার অস্তিত্ব না থাকলেও এনবিআরের তথ্য বলছে, প্রতিষ্ঠানটি ২০১৫ সাল থেকেই গাড়ির যন্ত্রাংশ আমদানি করে আসছে।

এই সময়ে ক্রাউন অটোমোবাইল সার্ভিসেস মোট ২৭টি চালান আমদানি করেছে। এসব চালানের ঘোষিত মোট আমদানিমূল্য ছিল ১ লাখ ২৯ হাজার মার্কিন ডলার।

২০১৫ সালের ২৮ জুলাই চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে প্রতিষ্ঠানটির প্রথম চালান আসে। প্রায় দেড় হাজার ডলার মূল্যের ওই চালানে দুই টন গাড়ির যন্ত্রাংশ আনার ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল।

ওই বছর মোট চারটি চালান আমদানি করা হয়। পরবর্তী বছরগুলোতে এক থেকে ছয়টি করে চালান এসেছে। এর মধ্যে ২০২৪ সালে পাঁচটি এবং ২০২৫ সালে ছয়টি চালান আমদানি করা হয়।

তবে এসব চালানের ক্ষেত্রে একটি বিষয় বিশেষভাবে নজরে এসেছে। কাস্টমস প্রতিটি চালানের ঘোষিত আমদানিমূল্যের তুলনায় বেশি শুল্কায়নমূল্য নির্ধারণ করেছে। কোনো কোনো চালানে ঘোষিত ও শুল্কায়নমূল্যের পার্থক্য প্রায় দেড় থেকে ছয় গুণ পর্যন্ত ছিল।

অর্থাৎ, আমদানিকারকের ঘোষিত মূল্য কম হওয়ায় সেটি গ্রহণ না করে কাস্টমস বাস্তব মূল্যের ভিত্তিতে শুল্কায়ন করেছে।

চট্টগ্রাম বন্দর থেকে মোংলা পর্যন্ত চালানের তথ্য

ক্রাউন অটোমোবাইল সার্ভিসেসের আগের সব চালান চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে খালাস করা হয়েছিল। এর মধ্যে সাতটি চালান চট্টগ্রাম বন্দর থেকে ঢাকার কমলাপুর কনটেইনার ডিপোতে নিয়ে খালাস করা হয়। অন্য চালানগুলো চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসে শুল্কায়নের পর খালাস দেওয়া হয়েছে।

সব চালানের পণ্য ঘোষণায় গাড়ির যন্ত্রাংশের কথা উল্লেখ করা হয়েছিল।

তবে এবার প্রথমবারের মতো মোংলা বন্দর দিয়ে আসা চালানটি খালাসের আগেই আটক করা হয়। এই চালানেই চারটি বিলাসবহুল গাড়ি যন্ত্রাংশ হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছিল।

চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে আসা ক্রাউন অটোমোবাইল সার্ভিসেসের চালান খালাসের কাজে এম জেড ইন্টারন্যাশনাল যুক্ত ছিল। প্রতিষ্ঠানটির কর্ণধার মাসুদুজ্জামানের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁর সাড়া পাওয়া যায়নি।

জাপানের একই রপ্তানিকারকের তথ্য

মোংলা বন্দর দিয়ে যন্ত্রাংশ হিসেবে আনা চারটি গাড়ি জাপানের আশিকাগা–শি শহরের মাহি কার পোর্ট থেকে ক্রাউন অটোমোবাইল সার্ভিসেসের কাছে রপ্তানি করা হয়েছে।

এর আগে চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে খালাস করা গাড়ির যন্ত্রাংশের বেশির ভাগ চালানও একই প্রতিষ্ঠান থেকে পাঠানো হয়েছিল।

এনবিআরের ডেটাবেজে ২০১৮ সাল থেকে রপ্তানিকারকের তথ্য পাওয়া যায়। সেই তথ্য অনুযায়ী, ২০১৮ সালের পর ক্রাউন অটোমোবাইল সার্ভিসেসের একটি চালান ছাড়া বাকি সব চালানের রপ্তানিকারক ছিল মাহি কার পোর্ট। ব্যতিক্রম একটি চালান পাঠিয়েছিল দুবাইয়ের মেগাসিটি জেনারেল ট্রেডিং।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে দেশের একজন গাড়ি ব্যবসায়ী জানিয়েছেন, জাপানে পুরোনো গাড়ি ও গাড়ির যন্ত্রাংশ রপ্তানির ব্যবসার সঙ্গে অনেক বাংলাদেশি যুক্ত রয়েছেন।

আগের ২৭ চালানও এখন তদন্তের আওতায়

চারটি গাড়ি আটকের পর একই আমদানিকারকের আগের চালানগুলোর বিষয়টিও সামনে এসেছে। বিশেষ করে গত ১২ বছরে খালাস নেওয়া ২৭টি চালানে প্রকৃতপক্ষে কী ধরনের পণ্য এসেছিল, তা খতিয়ে দেখার প্রশ্ন উঠেছে।

কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক রেজভী আহম্মেদ জানিয়েছেন, বিষয়গুলো নিয়ে তদন্ত কার্যক্রম শুরুর প্রক্রিয়া চলছে।

অর্থাৎ, বর্তমান তদন্ত শুধু মোংলা বন্দরে আটক চারটি গাড়ির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকছে না। একই আমদানিকারকের আগের চালানগুলোর ঘোষিত পণ্য ও প্রকৃত পণ্যের মধ্যে কোনো অসঙ্গতি ছিল কি না, সেটিও তদন্তের আওতায় আসতে পারে।

বিলাসবহুল গাড়ি আমদানির ঘটনায় সামনে যেসব প্রশ্ন

এই ঘটনায় কয়েকটি বিষয় বিশেষভাবে সামনে এসেছে। প্রথমত, আমদানিকারকের নথিতে ব্যবহৃত ঠিকানায় প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রমের অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। দ্বিতীয়ত, দীর্ঘ সময় ধরে গাড়ির যন্ত্রাংশ আমদানির নামে ২৭টি চালান খালাস করা হয়েছে। তৃতীয়ত, সর্বশেষ চালানে যন্ত্রাংশের পরিবর্তে চারটি দামি গাড়ি পাওয়া গেছে।

এ ছাড়া আগের চালানগুলোর ঘোষিত মূল্য ও কাস্টমসের নির্ধারিত শুল্কায়নমূল্যের মধ্যে বড় ব্যবধানও তদন্তের গুরুত্ব বাড়িয়েছে।

তবে এসব আগের চালানে কী পণ্য ছিল বা সেখানে কোনো অনিয়ম হয়েছিল কি না, সে বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত তদন্ত শেষ হওয়ার আগে দেওয়া হয়নি।

কাস্টমসের তদন্তে এখন নজর আগের চালানে

বর্তমান ঘটনায় কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা চারটি গাড়ি জব্দ করেছেন এবং আগের আমদানি কার্যক্রম নিয়েও তদন্তের প্রক্রিয়া শুরু করছেন।

এনবিআরের তথ্য অনুযায়ী, শুল্ক ফাঁকির বিষয়টি শনাক্ত করতে কায়িক পরীক্ষা, বিশেষজ্ঞদের কারিগরি সহায়তা ও এআই ব্যবহার করা হয়েছে। ফলে বিলাসবহুল গাড়ি আমদানি সংক্রান্ত এই ঘটনায় শুধু জব্দ হওয়া গাড়ি নয়, আমদানির পুরো প্রক্রিয়া ও আগের চালানগুলোর তথ্যও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

গাড়ির যন্ত্রাংশ আমদানির ঘোষণা দিয়ে চারটি বিলাসবহুল গাড়ি আনার ঘটনায় কাস্টমসের অভিযানের পর আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানের ঠিকানা, আগের ২৭টি চালান এবং ঘোষিত পণ্যের প্রকৃততা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

চারটি গাড়ি জব্দের পাশাপাশি আগের চালানগুলোতেও কী পণ্য এসেছিল, তা খতিয়ে দেখার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের তদন্ত এগিয়ে গেলে এ ঘটনায় আরও তথ্য সামনে আসতে পারে।

সর্বাধিক পঠিত