মালয়েশিয়ায় কর্মী নিয়োগে মানতে হবে যেসব নির্দেশনা, কর্মী নিয়োগে ৮ ধাপের নতুন নির্দেশনা দিয়েছে দেশটির মানবসম্পদ মন্ত্রণালয়। কোটা, লেভি, ভিসা ও প্রবেশসহ পুরো প্রক্রিয়া নির্ধারিত নিয়মে চলবে। এখন কী হবে?
মালয়েশিয়ায় কর্মী নিয়োগের প্রক্রিয়া আরও নির্দিষ্ট করতে নতুন নির্দেশনা জারি করেছে দেশটির মানবসম্পদ মন্ত্রণালয়। বিদেশি কর্মী নিয়োগে আগ্রহী প্রতিষ্ঠানগুলোকে নির্ধারিত নিয়ম মেনে আটটি ধাপ সম্পন্ন করতে হবে। এমন সময়ে এই নির্দেশনা এল, যখন বাংলাদেশ থেকে মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠানোর শ্রমবাজার পুনরায় খোলার বিষয়টি নিয়ে দুই দেশের মধ্যে আলোচনা চলছে।
এর আগে মালয়েশিয়ার অনুমোদিত কর্তৃপক্ষ বাংলাদেশ থেকে কর্মী নিয়োগের জন্য ২৫টি রিক্রুটিং এজেন্সি এবং বাংলাদেশে স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য ৪০টির বেশি মেডিক্যাল সেন্টারের তালিকা প্রকাশ করে। তবে তালিকা প্রকাশের পর বাংলাদেশের জনশক্তি রপ্তানিকারকদের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়। কয়েকটি রাজনৈতিক দলও এটিকে ‘সিন্ডিকেট’ হিসেবে উল্লেখ করে প্রতিক্রিয়া জানায়।
এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ সরকারের প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয় মালয়েশিয়া সরকারের কাছে বিষয়টি জানতে চেয়ে চিঠি দিয়েছে। প্রবাসী কল্যাণমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী জানিয়েছেন, শ্রমবাজার নিয়ে দুই দেশের সরকার কাজ করছে এবং পুরো প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা বজায় থাকবে।
মালয়েশিয়ায় কর্মী নিয়োগের আট ধাপ

মালয়েশিয়ার মানবসম্পদ মন্ত্রণালয়ের নতুন নির্দেশনা অনুযায়ী, একজন বিদেশি কর্মী নিয়োগ থেকে শুরু করে তাকে মালয়েশিয়ায় প্রবেশ করানো পর্যন্ত মোট আটটি ধাপ অনুসরণ করতে হবে। এতে নিয়োগকর্তার আবেদন, কোটা অনুমোদন, সরকারি ফি, অনুমোদনপত্র, দূতাবাসের আনুষ্ঠানিকতা, নিয়োগ ও পাঠানো, ভিসা এবং সর্বশেষ মালয়েশিয়ায় প্রবেশের বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
১. কর্মীর চাহিদা জানিয়ে আবেদন
প্রথম ধাপে নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানকে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে বিদেশি কর্মীর চাহিদা জানিয়ে আবেদন করতে হবে অথবা প্রয়োজনীয় অনুমোদন নিতে হবে। একই সঙ্গে নির্ধারিত প্ল্যাটফর্মে সংশ্লিষ্ট শূন্য পদের জন্য নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করতে হবে।
২. বিদেশি কর্মীর কোটা আবেদন
এরপর নিয়োগে আগ্রহী প্রতিষ্ঠানকে মালয়েশিয়ার মানবসম্পদ মন্ত্রণালয়ের ওয়ান-স্টপ সেন্টারে বিদেশি কর্মীর কোটা চেয়ে আবেদন করতে হবে।
অনলাইনে জমা দেওয়া প্রয়োজনীয় কাগজপত্র যাচাইয়ের পর সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ সরাসরি সাক্ষাৎকার নেবে। এরপর কোটা অনুমোদনের বিষয়ে সিদ্ধান্ত জানানো হবে।
৩. লেভি ও সরকারি ফি পরিশোধ
তৃতীয় ধাপে নিয়োগসংক্রান্ত লেভি বা নির্ধারিত সরকারি ফি পরিশোধ করতে হবে। মালয়েশিয়ার অভিবাসন বিভাগ এবং মাইআইএমএমএস ব্যবস্থার মাধ্যমে এই প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার কথা বলা হয়েছে।
৪. শর্তসাপেক্ষ অনুমোদনপত্র সংগ্রহ
ফি পরিশোধের পর নিয়োগদাতাকে শর্তসাপেক্ষ অনুমোদনপত্র সংগ্রহ করতে হবে। মানবসম্পদ মন্ত্রণালয়ের ওয়ান-স্টপ সেন্টার এবং সরকার নির্ধারিত পদ্ধতিতে এই কাজ সম্পন্ন হবে।
৫. দূতাবাসের আনুষ্ঠানিকতা
শর্তসাপেক্ষ অনুমোদন পাওয়ার পর বিদেশি কর্মীর নিজ দেশে থাকা মালয়েশিয়ান দূতাবাস অথবা সংশ্লিষ্ট কূটনৈতিক মিশনের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করতে হবে।
৬. নিয়োগ ও মালয়েশিয়ায় পাঠানোর ব্যবস্থা
এরপর উৎস দেশ থেকে কর্মী নিয়োগ এবং মালয়েশিয়ায় পাঠানোর ব্যবস্থা করতে হবে। এই ধাপ রিক্রুটমেন্ট এজেন্সি বা নিয়োগকারী সংস্থার মাধ্যমে সম্পন্ন করার কথা বলা হয়েছে।
৭. ভিসা উইথ রেফারেন্স সংগ্রহ
সপ্তম ধাপে বিদেশি কর্মীর জন্য ভিসা উইথ রেফারেন্স বা ভিডিয়োর সংগ্রহ করতে হবে। ভিসা প্রক্রিয়ার এই ধাপ সম্পন্ন হওয়ার পর কর্মী মালয়েশিয়ায় যাওয়ার জন্য পরবর্তী পর্যায়ে যেতে পারবেন।
৮. মালয়েশিয়ায় প্রবেশ
সবশেষে বিদেশি কর্মীর মালয়েশিয়ায় প্রবেশ সম্পন্ন হবে। এই ধাপ শেষ হলেই নির্দেশনায় নির্ধারিত বিদেশি কর্মী নিয়োগের পুরো প্রক্রিয়া সম্পন্ন হবে।
FWCMS পোর্টালে তথ্য দেখার পরামর্শ
মালয়েশিয়ার নির্দেশনায় নিয়োগদাতাদের বিদেশি কর্মী নিয়োগসংক্রান্ত বিস্তারিত তথ্য এবং অনুমোদিত রিক্রুটমেন্ট এজেন্সির তালিকা জানতে Foreign Workers Centralized Management System বা FWCMS পোর্টাল ব্যবহারের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
FWCMS নিজেকে বিদেশি কর্মী নিয়োগ, ব্যবস্থাপনা, পর্যবেক্ষণ ও সংশ্লিষ্ট রিপোর্টিংয়ের জন্য একটি সমন্বিত অনলাইন ব্যবস্থা হিসেবে বর্ণনা করে। মালয়েশিয়ার শ্রম বিভাগের বর্তমান তথ্যেও বিদেশি কর্মীর নতুন কোটা আবেদনের ক্ষেত্রে FWeApproval ও FWCMS ব্যবহারের কথা উল্লেখ রয়েছে।
বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য কেন গুরুত্বপূর্ণ
বাংলাদেশের জন্য মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় নতুন এই নির্দেশনা নিয়ে আগ্রহ তৈরি হয়েছে। তবে এখনো ঠিক কবে বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার আনুষ্ঠানিকভাবে খুলবে, সে বিষয়ে বাংলাদেশ সরকারের প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয় বা কুয়ালালামপুরে বাংলাদেশ হাইকমিশন নিশ্চিত কোনো তারিখ জানতে পারেনি।
এর আগে জুলাইয়ের শেষ দিকে মালয়েশিয়া সফর করে বৈঠকের পর প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহদী আমিন জানিয়েছিলেন, আগস্টের শেষ সপ্তাহ থেকেই বাংলাদেশি শ্রমিকদের মালয়েশিয়ায় যাওয়া শুরু হবে। চলতি মাসের শুরুতে প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমানও সচিবালয়ে এক প্রেস ব্রিফিংয়ে একই কথা বলেছিলেন।
তবে সেই সময়সীমা অনুযায়ী এখনো মালয়েশিয়া সরকারের পক্ষ থেকে শ্রমবাজার খোলার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসেনি। নতুন নির্দেশনাকে বাংলাদেশ সরকার দ্রুত শ্রমবাজার খোলার সম্ভাব্য ইঙ্গিত হিসেবে দেখছে।
২০২১ সালের সমঝোতা স্মারকের বিষয়টি
মালয়েশিয়া ও বাংলাদেশের মধ্যে বিদেশি কর্মী নিয়োগ নিয়ে ২০২১ সালে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছিল। এর মেয়াদ আগামী ডিসেম্বর পর্যন্ত রয়েছে।
তবে নানা দুর্নীতি, অনিয়ম ও সিন্ডিকেটের তৎপরতার অভিযোগের পর ২০২৪ সালের জুনে বাংলাদেশ থেকে মালয়েশিয়ায় কর্মী নিয়োগ বন্ধ হয়ে যায়।
ঢাকায় প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, বিদ্যমান সমঝোতা স্মারক কার্যকর থাকায় সেটি অনুসরণ করেই বাংলাদেশকে কর্মী পাঠাতে হবে। তবে ডিসেম্বরের পর নতুন সমঝোতা স্মারক বা চুক্তির বিষয়ে সরকার পদক্ষেপ নেবে।
এজেন্সি তালিকা নিয়ে বিতর্ক
নতুন করে মালয়েশিয়ায় কর্মী নিয়োগের প্রস্তুতির মধ্যেই বাংলাদেশি রিক্রুটিং এজেন্সির তালিকা প্রকাশ নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। জনশক্তি রপ্তানিকারকদের সংগঠন বায়রার সাবেক যুগ্ম মহাসচিব মোহাম্মদ ফখরুল ইসলাম দাবি করেছেন, তালিকাভুক্ত এজেন্সিগুলোর দুই-তিনটি ছাড়া অধিকাংশই মূলত ‘ডামি এজেন্সি’। তার অভিযোগ, এসব প্রতিষ্ঠানের পেছনে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সক্রিয়তা রয়েছে।
তিনি প্রশ্ন তুলেছেন, তালিকাভুক্ত অনেক এজেন্সিকে বাংলাদেশি জনশক্তি রপ্তানিকারকরাই চেনেন না, তাহলে মালয়েশিয়া সরকার কীভাবে তাদের শনাক্ত করল। তার ভাষ্য অনুযায়ী, আগের সিন্ডিকেটের একটি অংশের সঙ্গে নতুন কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তি যুক্ত হয়ে শ্রমবাজার নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করছে এবং এর সঙ্গে বড় ধরনের দুর্নীতিও জড়িত।
তবে প্রবাসী কল্যাণমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী সিন্ডিকেট বা এ ধরনের কোনো তৎপরতার অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছেন। তিনি বলেছেন, দুই দেশের সরকার শ্রমবাজার নিয়ে কাজ করছে এবং যা হবে তা স্বচ্ছতার সঙ্গে হবে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, কোনো গোপনীয়তা বা সিন্ডিকেট থাকবে না এবং নিয়ম মেনে সবাই কাজের সুযোগ পাবে।
শ্রমবাজার খোলার অপেক্ষায় বাংলাদেশ
এখন মূল প্রশ্ন হলো, নতুন নির্দেশনার পর বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার কবে আনুষ্ঠানিকভাবে খুলবে। মানবসম্পদ মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনায় বিদেশি কর্মী নিয়োগের প্রক্রিয়াকে স্বচ্ছ, সুশৃঙ্খল ও নির্ধারিত নিয়মের মধ্যে রাখার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
এদিকে বাংলাদেশ সরকার আশা করছে, দ্রুতই মালয়েশিয়ার পক্ষ থেকে শ্রমবাজার খোলার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা পাওয়া যাবে। তবে ঘোষণার নির্দিষ্ট তারিখ এখনো নিশ্চিত হয়নি।
বাংলাদেশ থেকে কর্মী পাঠানোর ক্ষেত্রে নতুন নির্দেশনার আটটি ধাপ, অনুমোদিত এজেন্সি, মেডিক্যাল সেন্টার এবং বিদ্যমান সমঝোতা স্মারকের বিষয়গুলো তাই বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে। একই সঙ্গে এ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং আগের অনিয়মের পুনরাবৃত্তি ঠেকানো নিয়েও আলোচনা রয়েছে।
FWCMS ও নির্ধারিত প্রক্রিয়ার গুরুত্ব
নতুন ব্যবস্থায় নিয়োগকর্তার আবেদন থেকে শুরু করে কোটা, সরকারি ফি, অনুমোদন, দূতাবাসের আনুষ্ঠানিকতা এবং ভিসা পর্যন্ত একাধিক ধাপ নির্ধারণ করা হয়েছে। FWCMS প্ল্যাটফর্মে কোটা আবেদন ও বিদেশি কর্মী ব্যবস্থাপনার বিভিন্ন প্রক্রিয়া অনলাইনে পরিচালনার সুবিধা রয়েছে।
ফলে মালয়েশিয়ায় কর্মী নিয়োগের ক্ষেত্রে নিয়োগদাতাদের নির্ধারিত নিয়ম অনুসরণ করা এবং অনুমোদিত চ্যানেল ব্যবহার করাই নতুন ব্যবস্থার মূল বিষয় হিসেবে সামনে এসেছে।
মালয়েশিয়ার মানবসম্পদ মন্ত্রণালয়ের আট ধাপের নির্দেশনা বাংলাদেশি কর্মী পাঠানোর সম্ভাব্য প্রক্রিয়াকে আরও কাঠামোবদ্ধ করার ইঙ্গিত দিচ্ছে। তবে বাংলাদেশ থেকে মালয়েশিয়ায় কর্মী যাওয়া কবে আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হবে, সেটি এখনো মালয়েশিয়া সরকারের ঘোষণার ওপর নির্ভর করছে।
একই সঙ্গে এজেন্সি ও মেডিক্যাল সেন্টারের তালিকা নিয়ে যে প্রশ্ন উঠেছে, সেগুলোর বিষয়ে বাংলাদেশ সরকার মালয়েশিয়ার কাছে ব্যাখ্যা চেয়েছে। তাই শ্রমবাজার খোলার আগে স্বচ্ছতা, নির্ধারিত নিয়ম এবং অনুমোদিত প্রক্রিয়া—এই বিষয়গুলোই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।





