সাত মাসেও এলপিজি আমদানি করতে পারেনি বিপিসি, পাঁচ দফা দরপত্র ব্যর্থ হওয়ার পর ৫ হাজার টন গ্যাস কিনতে সরাসরি ক্রয়ের উদ্যোগ নিয়েছে বিপিসি।
দেশের এলপিজি বাজারে সরকারি উপস্থিতি বাড়াতে জানুয়ারিতে সরাসরি আমদানির উদ্যোগ নিয়েছিল বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)। কিন্তু সাত মাসে পাঁচবার দরপত্র আহ্বান করেও কোনো গ্রহণযোগ্য সরবরাহকারী পায়নি সংস্থাটি। পরে সরাসরি ক্রয়পদ্ধতিতে ৫ হাজার টন এলপিজি কেনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ প্রক্রিয়ায় প্রায় ৪৫ কোটি টাকার সরবরাহের কাজ পেয়েছে স্পিড মার্কেটিং করপোরেশন। তবে আমদানি করা এলপিজি কবে দেশে পৌঁছাবে, তা এখনো নিশ্চিত নয়।
কেন বিপিসির এলপিজি আমদানির উদ্যোগ

দেশের এলপিজি বাজারের মাত্র ১ দশমিক ৩৩ শতাংশ সরকারের নিয়ন্ত্রণে। বাকি বাজার প্রায় পুরোপুরি বেসরকারি খাতনির্ভর। ফলে বাজারে সংকট দেখা দিলে সরকারি পর্যায়ে সরাসরি সরবরাহ বাড়ানোর সুযোগ সীমিত থাকে।
এই পরিস্থিতিতে বেসরকারি খাতের ওপর নির্ভরতা কমানো এবং সংকটের সময় বাজারে সরবরাহ বাড়াতে গত জানুয়ারিতে সরাসরি এলপিজি আমদানির সিদ্ধান্ত নেয় বিপিসি।
গত ১০ জানুয়ারি এ জন্য নীতিগত অনুমোদন চেয়ে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগে চিঠি দেয় সংস্থাটি। পরে ২০ জানুয়ারি তিনটি শর্তে এলপিজি আমদানির অনুমোদন দেওয়া হয়।
তবে অনুমোদনের পর আমদানি প্রক্রিয়ায় প্রত্যাশিত অগ্রগতি হয়নি। ফেব্রুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত পাঁচ দফায় সরবরাহকারী খুঁজতে দরপত্র আহ্বান করা হলেও কোনো প্রতিষ্ঠান আগ্রহ দেখায়নি।
বিপিসির এলপিজি আমদানি পাঁচ দফা দরপত্রেও ব্যর্থ
বিপিসি সাত মাসে মোট পাঁচবার এলপিজি আমদানির জন্য দরপত্র আহ্বান করে। কিন্তু প্রতিবারই গ্রহণযোগ্য সরবরাহকারী পাওয়া যায়নি।
বিপিসির কর্মকর্তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সরবরাহকারীদের চাওয়া অতিরিক্ত মূল্য বা প্রিমিয়াম ছিল অন্যতম বড় বাধা। একটি প্রতিষ্ঠান সৌদি আরামকোর চুক্তিমূল্যের সঙ্গে প্রতি টন এলপিজিতে ২৭০ মার্কিন ডলার প্রিমিয়াম দাবি করেছিল। বিপিসি সেই প্রস্তাবকে অতিরিক্ত ও অলাভজনক বিবেচনা করে গ্রহণ করেনি।
এর ফলে নিয়মিত দরপত্রের মাধ্যমে এলপিজি আমদানির উদ্যোগ কার্যত আটকে যায়।
সরাসরি ক্রয়ের পথে নতুন উদ্যোগ
দরপত্রে সরবরাহকারী না পাওয়ার পর নতুন পদ্ধতিতে এগোয় বিপিসি। গত ৪ আগস্ট স্পিড মার্কেটিং করপোরেশন নিজ উদ্যোগে এলপিজি সরবরাহের আগ্রহ জানিয়ে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগে প্রস্তাব দেয়।
প্রতিষ্ঠানটি বিপিসির তালিকাভুক্ত সরবরাহকারী নয়। এরপর সরাসরি ক্রয়পদ্ধতিতে তাদের কাছ থেকে ৫ হাজার টন এলপিজি কেনার উদ্যোগ নেওয়া হয়।
স্পিড মার্কেটিং সৌদি আরামকোর আগস্ট মাসের চুক্তিমূল্যের সঙ্গে প্রতি টনে ৯৭ মার্কিন ডলার প্রিমিয়ামে এলপিজি সরবরাহের প্রস্তাব দেয়। বিপিসির মূল্যায়ন কমিটি ওই দরে ৫ হাজার টন এলপিজি কেনার সুপারিশ করে।
এই ক্রয়ে মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ৩৬ লাখ ৫০ হাজার মার্কিন ডলার, যা প্রায় ৪৫ কোটি ২৪ লাখ টাকা। বিপিসির নথি অনুযায়ী, স্পিড মার্কেটিং মোট ক্রয়মূল্যের ৫ শতাংশ কার্যসম্পাদন জামানত দিতে সম্মত হয়েছে।
গত বৃহস্পতিবার প্রতিষ্ঠানটি সেই জামানত জমা দিয়েছে। এখন বিপিসির সঙ্গে তাদের চুক্তি হওয়ার কথা। এরপর আমদানির জন্য ঋণপত্র বা এলসি খুলতে হবে। ফলে গ্যাস দেশে পৌঁছানোর নির্দিষ্ট সময় এখনো নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি।
বিপিসির এলপিজি আমদানির শর্ত কী ছিল
জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের দেওয়া অনুমোদনের অন্যতম শর্ত ছিল, বিপিসি আমদানি করা এলপিজি অনুমোদিত বেসরকারি অপারেটরদের কাছে সরবরাহ করবে। পরে এসব অপারেটর নিজেদের ব্যবস্থাপনায় গ্যাস বাজারজাত করবে।
এ বিষয়ে এলপিজি অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (লোয়াব) সভাপতি আমিরুল হক জানিয়েছেন, বেসরকারি অপারেটররা বিপিসিকে সহযোগিতা করতে প্রস্তুত। তবে বাণিজ্যিক শর্তসহ সব নিয়ম উভয় পক্ষের কাছে গ্রহণযোগ্য হওয়া প্রয়োজন।
অর্থাৎ সরকারি আমদানির মাধ্যমে বাজারে সরবরাহ বাড়ানোর পাশাপাশি বেসরকারি অপারেটরদের সঙ্গে সমন্বয়ও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
চট্টগ্রাম ও মোংলায় প্ল্যান্ট স্থাপনের পরিকল্পনা
বিপিসির চেয়ারম্যান মো. মনজুর আলম প্রধান জানিয়েছেন, এলপিজি আমদানির প্রক্রিয়া চলছে এবং দুটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আলোচনা হচ্ছে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, শিগগিরই আমদানি শুরু হতে পারে।
একই সঙ্গে চট্টগ্রাম ও মোংলায় এলপিজি প্ল্যান্ট স্থাপনের চেষ্টাও চালানো হচ্ছে। এসব প্ল্যান্ট তৈরি হলে এলপিজি খাতে সক্ষমতা বাড়বে এবং এতে ভোক্তারা উপকৃত হবেন বলে মনে করেন বিপিসির চেয়ারম্যান।
তবে বর্তমান আমদানি প্রক্রিয়ায় প্রথম চালান ঠিক কবে দেশে আসবে, সে বিষয়ে এখনো নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি।
দেশে এলপিজির ব্যবহার যেভাবে বেড়েছে
২০১৫ সালে আবাসিক খাতে নতুন গ্যাস-সংযোগ বন্ধ করে দেওয়ার পর রান্নার জ্বালানি হিসেবে এলপিজির ব্যবহার দ্রুত বাড়তে থাকে।
লোয়াবের হিসাব অনুযায়ী, ২০১৬ সালে এলপিজি খাতের প্রবৃদ্ধি আগের বছরের তুলনায় ১০০ শতাংশ ছিল। ২০১৭ সালে প্রবৃদ্ধি আরও বেড়ে ১২৩ শতাংশে পৌঁছায়।
২০১৭-১৮ অর্থবছরে দেশে প্রায় সাড়ে পাঁচ লাখ টন এলপিজি সরবরাহ হয়েছিল। বর্তমানে সেই পরিমাণ বছরে প্রায় ১৫ থেকে ১৬ লাখ টনে পৌঁছেছে।
বাজারের এই বড় প্রবৃদ্ধির বিপরীতে সরকারি সরবরাহের অংশ খুবই কম। বিপিসির হিসাবে, সরকার সরাসরি কোনো এলপিজি আমদানি করে না। ইস্টার্ন রিফাইনারিতে তেল পরিশোধনের সময় উপজাত হিসেবে কিছু এলপিজি পাওয়া যায়।
অন্যদিকে বেসরকারি খাতের ১৫ থেকে ২০টি প্রতিষ্ঠান এলপিজির বড় অংশ আমদানি করে থাকে।
এলপিজির দাম ও সাম্প্রতিক সংকট
দেশে ব্যবহৃত এলপিজির প্রায় ৮০ শতাংশ গৃহস্থালির রান্নার কাজে ব্যবহৃত হয়। ২০২০ সালে ১২ কেজির একটি এলপিজি সিলিন্ডারের দাম ছিল প্রায় ৯০০ টাকা।
২০২১ সালের মে থেকে এলপিজির দাম নির্ধারণ করে আসছে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)। ওই বছরের মে মাসে ১২ কেজির সিলিন্ডারের দাম নির্ধারিত ছিল ৮৪২ টাকা।
তবে ২০২২ সালে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর আন্তর্জাতিক বাজারের প্রভাবে এলপিজির দাম বাড়তে থাকে। গত ডিসেম্বরের তীব্র সংকটের সময় দেশের কোনো কোনো এলাকায় ১২ কেজির একটি সিলিন্ডার ৩ হাজার টাকা পর্যন্ত বিক্রি হওয়ার তথ্যও পাওয়া যায়।
এই সংকটের অভিজ্ঞতার পরই বাজারে সরকারি সরবরাহের বিকল্প উৎস তৈরি করার প্রয়োজনীয়তা আরও সামনে আসে। এর ধারাবাহিকতায় বিপিসি সরাসরি এলপিজি আমদানির উদ্যোগ নেয়।
আরেক প্রতিষ্ঠানও এলপিজি সরবরাহে আগ্রহী
স্পিড মার্কেটিংয়ের পাশাপাশি ব্রাদার্স এলপিজি নামের আরেক প্রতিষ্ঠানও বিপিসিকে এলপিজি সরবরাহ করতে রাজি হয়েছে।
বিপিসির বোর্ডে ওই সরবরাহের অনুমোদন হয়েছে। তবে এ ক্ষেত্রে সরকারের অনুমোদন এখনো পাওয়া যায়নি।
ফলে বর্তমানে বিপিসির এলপিজি আমদানির প্রক্রিয়ায় একাধিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আলোচনার বিষয়টি সামনে এসেছে। একই সঙ্গে স্পিড মার্কেটিংয়ের সঙ্গে চুক্তি ও এলসি খোলার পর সরবরাহের পরবর্তী ধাপ সম্পন্ন হবে।
বিশেষজ্ঞের পরামর্শ: শুধু একবার আমদানি যথেষ্ট নয়
কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক এম শামসুল আলম মনে করেন, বিপিসির উদ্যোগ দ্রুত শেষ করা প্রয়োজন। তবে তাঁর মতে, একবার এলপিজি আমদানি করলেই বাজারে সরকারের কার্যকর উপস্থিতি নিশ্চিত হবে না।
তিনি বলেন, বিপিসির অঙ্গপ্রতিষ্ঠান এলপি গ্যাস লিমিটেডের সক্ষমতা বাড়ানো দরকার। এর মাধ্যমে নিয়মিত এলপিজি আমদানির ব্যবস্থা করার পাশাপাশি নিজস্ব আমদানি, সংরক্ষণ ও বোতলজাত করার অবকাঠামো গড়ে তোলার প্রয়োজন রয়েছে।
শামসুল আলমের মতে, এলপিজির বাজার প্রায় পুরোপুরি বেসরকারি খাতনির্ভর হওয়ায় সরকারি উপস্থিতি বাড়ানো জরুরি। বিপিসি নিয়মিত আমদানি করতে পারলে বাজারে সরবরাহের একটি বিকল্প উৎস তৈরি হবে এবং প্রতিযোগিতাও বাড়তে পারে।
বিপিসির সামনে এখন মূল কাজ হলো স্পিড মার্কেটিংয়ের সঙ্গে চুক্তি সম্পন্ন করা, আমদানির জন্য এলসি খোলা এবং সরবরাহ নিশ্চিত করা। তবে এসব ধাপ শেষ হওয়ার পরই আমদানি করা এলপিজি দেশে পৌঁছানোর বিষয়টি স্পষ্ট হবে।
একই সঙ্গে ব্রাদার্স এলপিজির প্রস্তাবে সরকারি অনুমোদন এবং চট্টগ্রাম ও মোংলায় প্রস্তাবিত প্ল্যান্ট স্থাপনের উদ্যোগও নজরে রয়েছে।
দীর্ঘমেয়াদে সরকারি সক্ষমতা বাড়িয়ে নিয়মিত এলপিজি আমদানির ব্যবস্থা করা গেলে বাজারে সরকারি সরবরাহের বিকল্প তৈরি হতে পারে। তবে বর্তমান পর্যায়ে বিপিসির প্রথম সরাসরি আমদানির প্রক্রিয়াই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।





