মেটার নতুন এআই প্রযুক্তি ‘মিউজ’ ই-মেইল, ভ্রমণ ও কেনাকাটার কাজ করতে পারে। তবে ব্যক্তিগত তথ্যের নিরাপত্তা নিয়ে বড় উদ্বেগ তৈরি হয়েছে ব্যবহারকারীদের মধ্যে।
মেটা নতুন এআই অ্যাসিস্ট্যান্ট ‘মিউজ’ চালু করেছে, যা ব্যবহারকারীর হয়ে ই-মেইল পাঠানো, গাড়ি বিক্রির মতো কাজ করা এবং ভ্রমণের পরিকল্পনা করার সক্ষমতা রাখে। ৮ সেপ্টেম্বরের ঘোষণায় মেটা জানিয়েছে, মেটার নতুন এআই প্রযুক্তি মিউজ আপাতত যুক্তরাষ্ট্রে আলাদা অ্যাপ ও হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে ব্যবহার করা যাবে। ভবিষ্যতে স্মার্ট গ্লাসেও এটি যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
মেটার লক্ষ্য, প্রতিদিনের কোটি কোটি ব্যবহারকারীর জন্য একটি শক্তিশালী ‘পার্সোনাল সুপার-ইন্টেলিজেন্স’ সেবা তৈরি করা। তবে ব্যক্তিগত অ্যাপ ও তথ্য ব্যবহারের এই সক্ষমতার পাশাপাশি মিউজকে ঘিরে নিরাপত্তা ও গোপনীয়তা নিয়ে উদ্বেগও তৈরি হয়েছে। রয়টার্সের প্রতিবেদনে মেটার কর্মীদের পরীক্ষার সময় পাওয়া বিভিন্ন অভিজ্ঞতার কথা উঠে এসেছে।
মেটার নতুন এআই প্রযুক্তি মিউজ কী করতে পারে

মিউজকে সাধারণ প্রশ্নের উত্তর দেওয়া এআইয়ের চেয়ে বেশি স্বয়ংক্রিয়ভাবে কাজ করার জন্য তৈরি করা হয়েছে। এটি ব্যবহারকারীর বিভিন্ন অ্যাপের সঙ্গে সংযুক্ত হয়ে নির্দিষ্ট কাজ নিজে সম্পন্ন করতে পারে।
মেটার তথ্য অনুযায়ী, মিউজ ই-মেইল, ক্যালেন্ডার, পেমেন্ট, স্বাস্থ্য তথ্য ও কেনাকাটার মতো বিভিন্ন অ্যাপের সঙ্গে যুক্ত হতে পারে। ফলে ব্যবহারকারী কোনো কাজের নির্দেশ দিলে সেটি সংশ্লিষ্ট অ্যাপ ব্যবহার করে কাজটি সম্পন্ন করার চেষ্টা করতে পারে।
এই সংযোগের ক্ষেত্রে ব্যবহারকারীর নিয়ন্ত্রণও রাখা হয়েছে। অর্থাৎ, কোন কোন অ্যাপের সঙ্গে মিউজ যুক্ত হবে, তা ব্যবহারকারী নির্ধারণ করতে পারবেন। প্রয়োজন হলে পরবর্তী সময়ে এসব অ্যাপের সঙ্গে মিউজের সংযোগ বিচ্ছিন্নও করা যাবে।
দৈনন্দিন কাজে বাড়তে পারে সুবিধা
মিউজের অন্যতম বড় বৈশিষ্ট্য হলো, এটি শুধু তথ্য সরবরাহ না করে ব্যবহারকারীর হয়ে বাস্তব কাজ সম্পন্ন করার দিকে এগোচ্ছে।
যেমন, ভ্রমণের পরিকল্পনা করতে গেলে বিভিন্ন তথ্য খুঁজে সাজানোর কাজ এটি করতে পারে। একইভাবে ই-মেইল ব্যবস্থাপনা বা অন্যান্য সংযুক্ত অ্যাপের কাজেও সহায়তা করতে পারে।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে মেটার একজন কর্মীর অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। ওই কর্মী ইন্দোনেশিয়ায় তার মধুচন্দ্রিমার ভ্রমণসূচি তৈরিতে মিউজের সহায়তা নিয়েছিলেন। তার অভিজ্ঞতায় প্রযুক্তিটি এতটাই কার্যকর ছিল যে তিনি মিউজকে সফরের ‘তৃতীয় সঙ্গী’ হিসেবে মনে করেছিলেন।
এ ধরনের অভিজ্ঞতা দেখায়, সঠিকভাবে কাজ করতে পারলে মিউজ ব্যবহারকারীর সময় ও পরিশ্রম কমাতে পারে।
ব্যাকগ্রাউন্ডেও কাজ করতে পারে মিউজ
মিউজের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো এর ক্লাউডভিত্তিক ভার্চুয়াল সিস্টেম।
মেটার তৈরি এই এআই এজেন্ট নিজস্ব ভার্চুয়াল সিস্টেমে কাজ করে। ফলে ব্যবহারকারী সরাসরি অ্যাপে সক্রিয় না থাকলেও মিউজ ব্যাকগ্রাউন্ডে নির্দিষ্ট কাজ চালিয়ে যেতে পারে।
এই সক্ষমতা মিউজকে প্রচলিত এআই চ্যাটবট থেকে আলাদা করার অন্যতম দিক। কারণ ব্যবহারকারীকে প্রতিটি ধাপে সক্রিয়ভাবে নির্দেশ দিতে না হলেও এআই এজেন্ট নির্দিষ্ট কাজ চালিয়ে যাওয়ার জন্য তৈরি করা হয়েছে।
তবে একই সুবিধা আবার নিরাপত্তার প্রশ্নও তৈরি করছে। কারণ কোনো এআই যখন ব্যক্তিগত অ্যাপ ও বাস্তব তথ্যের সঙ্গে সরাসরি কাজ করে, তখন ভুল সিদ্ধান্ত বা অনাকাঙ্ক্ষিত আচরণের প্রভাবও বেশি হতে পারে।
মেটার নতুন এআই প্রযুক্তি মিউজ নিয়ে বড় নিরাপত্তা উদ্বেগ
ব্যক্তিগত অ্যাপ ব্যবহারের ক্ষমতা মিউজের কার্যকারিতা বাড়ালেও এটি নিরাপত্তা ঝুঁকিও বাড়িয়েছে। মেটার কর্মীদের অভ্যন্তরীণ পরীক্ষার বিভিন্ন অভিজ্ঞতা সেই উদ্বেগকে সামনে এনেছে।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কিছু কর্মী মিউজের সংযোগ বারবার বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার অভিযোগ করেছেন। কেউ কেউ জানিয়েছেন, এটি টিকিট বুকিংয়ের তথ্য ঠিকভাবে পর্যবেক্ষণ করতে পারেনি। আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে মিউজ নীরবে কাজ বন্ধ করে দিয়েছে।
মেটার চিফ টেকনোলজি অফিসার অ্যান্ড্রু বোসওয়ার্থও বারবার লগ আউট হয়ে যাওয়ার সমস্যার কথা জানিয়েছেন। অর্থাৎ প্রযুক্তিটির সক্ষমতার পাশাপাশি নির্ভরযোগ্যতা নিয়েও পরীক্ষার পর্যায়ে প্রশ্ন উঠেছে।
ব্যক্তিগত ছবির ঘটনায় গোপনীয়তার প্রশ্ন
সবচেয়ে উদ্বেগজনক ঘটনাগুলোর একটি ছিল ব্যক্তিগত গোপনীয়তার সঙ্গে সম্পর্কিত।
একটি শিশুর জন্মদিনের ছবিতে থাকা খেলনা শনাক্ত করার চেষ্টা করার সময় মিউজ নিরাপত্তা ব্যবস্থার সীমা অতিক্রম করে আইক্লাউডে থাকা ব্যক্তিগত ছবি প্রকাশ করে ফেলে বলে রয়টার্সের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এ ধরনের ঘটনা দেখায়, ব্যক্তিগত অ্যাপের সঙ্গে এআই এজেন্টকে যুক্ত করার ক্ষেত্রে শুধু কাজের দক্ষতা নয়, তথ্যের সীমা ও অনুমতির বিষয়টিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
কারণ মিউজ যদি একাধিক ব্যক্তিগত সেবায় প্রবেশাধিকার পায়, তাহলে ভুলভাবে কোনো তথ্য ব্যবহারের ঝুঁকিও তৈরি হতে পারে।
মেটার ব্যাখ্যা কী
নিরাপত্তা নিয়ে ওঠা অভিযোগগুলোর বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে মেটা নির্দিষ্ট ঘটনাগুলোর ব্যাখ্যা দেয়নি। তবে মেটার এআই প্রোডাক্টস বিভাগের ভাইস প্রেসিডেন্ট বিশাল শাহ নিরাপত্তাকে গুরুত্ব দেওয়ার কথা জানিয়েছেন।
তিনি বলেন, কোনো ভুল কখনোই হবে না—এমন নিশ্চয়তা দেওয়া সম্ভব নয়। তবে মিউজের স্থাপত্যের প্রতিটি অংশ যতটা সম্ভব নিরাপদ, সুরক্ষিত ও গোপনীয় রাখার লক্ষ্যেই তৈরি করা হয়েছে।
বিশাল শাহের বক্তব্য অনুযায়ী, নিরাপত্তা আরও শক্তিশালী করার জন্য মিউজের প্রকাশনা বিলম্বিত করা হয়েছিল। অর্থাৎ মেটা বাজারে আনার আগে প্রযুক্তিটির নিরাপত্তা নিয়ে অতিরিক্ত কাজ করেছে।
ব্যবহারকারীর নিয়ন্ত্রণ কতটা গুরুত্বপূর্ণ
মিউজের ক্ষেত্রে ব্যবহারকারীর অনুমতি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। মেটার তথ্য অনুযায়ী, ব্যবহারকারী কোন কোন অ্যাপের সঙ্গে মিউজকে যুক্ত করবেন, তা নিজেরাই বেছে নিতে পারবেন।
প্রয়োজনে সেই অ্যাক্সেস প্রত্যাহার করার সুযোগও থাকবে।
এটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ মিউজ ই-মেইল, ক্যালেন্ডার, পেমেন্ট, স্বাস্থ্য তথ্য এবং কেনাকাটার মতো সংবেদনশীল ক্ষেত্রের সঙ্গে কাজ করতে পারে। তাই ব্যবহারকারীকে অ্যাক্সেস দেওয়ার আগে কোন ধরনের তথ্য এআই দেখতে বা ব্যবহার করতে পারবে, সেটি বোঝা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
মেটার নতুন এআই প্রযুক্তি মিউজের কার্যকারিতা যত বাড়বে, তথ্য ব্যবহারের সীমা ও নিরাপত্তা নিয়ন্ত্রণের গুরুত্বও তত বাড়বে।
আপাতত শুধু যুক্তরাষ্ট্রে
মেটার ঘোষণা অনুযায়ী, মিউজের প্রাথমিক ব্যবহার যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যেই সীমিত থাকবে। সেখানে এটি আলাদা মিউজ অ্যাপ এবং হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে ব্যবহার করা যাবে।
ভবিষ্যতে মেটার স্মার্ট গ্লাসেও প্রযুক্তিটি যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। তবে স্মার্ট গ্লাসে ঠিক কীভাবে মিউজ ব্যবহার করা হবে, সে বিষয়ে দেওয়া তথ্যের বাইরে এই প্রতিবেদনে অতিরিক্ত কোনো তথ্য যুক্ত করা হচ্ছে না।
মিউজের সামনে মূল চ্যালেঞ্জ
মিউজের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হলো সুবিধা ও নিরাপত্তার মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করা।
একদিকে, একজন ব্যবহারকারীর হয়ে ভ্রমণ পরিকল্পনা, ই-মেইল বা অন্যান্য কাজ করার সক্ষমতা সময় বাঁচাতে পারে। অন্যদিকে, এসব কাজের জন্য এআইকে ব্যক্তিগত অ্যাপের সঙ্গে যুক্ত হতে হয়।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে মেটা কর্মীদের পরীক্ষায় যেমন ইতিবাচক অভিজ্ঞতা পাওয়া গেছে, তেমনি সংযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়া, পর্যবেক্ষণে ব্যর্থতা এবং ব্যক্তিগত তথ্যের অনাকাঙ্ক্ষিত ব্যবহারের মতো সমস্যার কথাও এসেছে।
তাই মিউজের সাফল্য শুধু এটি কত দ্রুত বা কত বেশি কাজ করতে পারে, তার ওপর নির্ভর করবে না। বরং ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষা, নির্ভরযোগ্যতা এবং ব্যবহারকারীর নিয়ন্ত্রণ কতটা কার্যকর থাকে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ হবে।
মেটার নতুন এআই প্রযুক্তি মিউজ নিয়ে শেষ কথা
মেটার নতুন এআই প্রযুক্তি মিউজ এআই অ্যাসিস্ট্যান্টের ব্যবহারকে আরও স্বয়ংক্রিয় পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার একটি উদ্যোগ। এটি ব্যবহারকারীর হয়ে বিভিন্ন অ্যাপ ব্যবহার করে কাজ করার লক্ষ্য নিয়ে তৈরি হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে প্রাথমিকভাবে অ্যাপ ও হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে সেবাটি চালু করা হয়েছে।
তবে প্রযুক্তিটির সম্ভাবনার পাশাপাশি পরীক্ষায় পাওয়া বিভিন্ন সমস্যা গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তাও দিচ্ছে। বিশেষ করে ব্যক্তিগত তথ্য, অ্যাপ অ্যাক্সেস এবং নির্ভরযোগ্যতার বিষয়গুলো এআই এজেন্ট ব্যবহারের ক্ষেত্রে বড় বিবেচ্য হয়ে উঠছে।
মেটার দাবি, নিরাপত্তা ও গোপনীয়তাকে গুরুত্ব দিয়েই মিউজ তৈরি করা হয়েছে। এখন ব্যবহারকারীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হবে, বাস্তব ব্যবহারে এই নিরাপত্তা ব্যবস্থা কতটা কার্যকরভাবে কাজ করে।





