নবম পে স্কেলের প্রজ্ঞাপন জারিতে দুই সপ্তাহ পার হলেও খসড়া এখনো আইন মন্ত্রণালয়ে যায়নি। ১৭, ২১ বা ২২ সেপ্টেম্বর গেজেট প্রকাশের সম্ভাবনা রয়েছে।
দীর্ঘ ১০ বছর পর সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য নতুন বেতনকাঠামো অনুমোদনের পরও নবম পে স্কেলের প্রজ্ঞাপন জারি হয়নি। গত ৩১ আগস্ট মন্ত্রিসভায় নতুন বেতনকাঠামো অনুমোদনের প্রায় দুই সপ্তাহ পেরিয়ে গেলেও প্রজ্ঞাপনের বিস্তারিত খসড়া এখনো আইন মন্ত্রণালয়ে ভেটিংয়ের জন্য পাঠানো হয়নি। অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্র বলছে, খসড়াটি বর্তমানে অর্থ মন্ত্রণালয়েই রয়েছে এবং দ্রুত তা আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠানোর প্রস্তুতি চলছে। ভেটিং শেষ হলে ১৭, ২১ অথবা ২২ সেপ্টেম্বরের যেকোনো একদিন গেজেট প্রকাশের সম্ভাবনা রয়েছে।
সরকারি চাকরিজীবীদের মধ্যে এ নিয়ে উদ্বেগ ও হতাশা তৈরি হলেও সাবেক আমলাদের মতে, মন্ত্রিসভার অনুমোদনের পর গেজেট প্রকাশের আগে বেশ কিছু প্রশাসনিক ও আইনগত ধাপ সম্পন্ন করতে হয়। ফলে অনুমোদনের পর কিছুটা সময় লাগা অস্বাভাবিক নয়।
নবম পে স্কেলের প্রজ্ঞাপন জারিতে বর্তমান অবস্থান

গত ৩১ আগস্ট নতুন বেতনকাঠামো অনুমোদন করে বাংলাদেশ সরকার। মন্ত্রিসভার অনুমোদনের পর মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছিল, প্রায় এক সপ্তাহের মধ্যে নতুন বেতনকাঠামোর প্রজ্ঞাপন প্রকাশ করা হতে পারে।
কিন্তু ১৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সেই প্রজ্ঞাপন প্রকাশিত হয়নি। বরং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, প্রজ্ঞাপনের বিস্তারিত খসড়াই এখনো আইন মন্ত্রণালয়ে ভেটিংয়ের জন্য পাঠানো হয়নি।
অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, নতুন বেতন কাঠামোর সারাংশ আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠানোর প্রস্তুতি চলছে। আগামী বুধবারের মধ্যে ভেটিং সম্পন্ন করা সম্ভব হলে চলতি সেপ্টেম্বরেই গেজেট প্রকাশ করা যেতে পারে।
তবে প্রশাসনিক কাঠামোর বিভিন্ন ধাপের কারণে সময়সূচিতে পরিবর্তনও হতে পারে। ফলে এখনো নির্দিষ্ট কোনো দিনকে চূড়ান্ত ঘোষণা করা হয়নি।
১৭, ২১ না ২২ সেপ্টেম্বর—কবে হতে পারে গেজেট
নতুন বেতনকাঠামোর গেজেট প্রকাশের জন্য একাধিক সম্ভাব্য তারিখ বিবেচনায় রাখা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, আইন মন্ত্রণালয়ের ভেটিং শেষ হলে ১৭, ২১ অথবা ২২ সেপ্টেম্বর গেজেট প্রকাশ হতে পারে।
তবে এসব তারিখের কোনটি চূড়ান্ত হবে, তা এখনো নির্ধারিত হয়নি। ভেটিং প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পরই চূড়ান্ত তারিখ ঠিক করা হবে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক অর্থ মন্ত্রণালয়ের এক উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তা জানিয়েছেন, গেজেট প্রকাশের দিনক্ষণ নিয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। একাধিক সম্ভাব্য সময় নিয়ে আলোচনা হয়েছে। আইন মন্ত্রণালয়ের ভেটিং শেষ হওয়ার পর তারিখ নির্ধারণ করা হবে।
কেন এত সময় লাগছে
মন্ত্রিসভায় বেতনকাঠামো অনুমোদনের পর সরাসরি গেজেট প্রকাশ করা হয় না। এর আগে অনুমোদিত কাঠামোর বিস্তারিত প্রজ্ঞাপন তৈরি, আইনগত যাচাই এবং প্রশাসনিক বিভিন্ন প্রস্তুতি সম্পন্ন করতে হয়।
কর্মকর্তাদের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, প্রথম ধাপ হলো প্রজ্ঞাপনের বিস্তারিত খসড়া প্রস্তুত করা। এই কাজটি করে অর্থ মন্ত্রণালয়। মন্ত্রিসভায় অনুমোদনের জন্য পাঠানো খসড়ায় সাধারণত কোন গ্রেডে কী পরিমাণ বেতন-ভাতা বাড়বে, তার সামগ্রিক প্রস্তাব থাকে। কিন্তু অনুমোদনের পর প্রজ্ঞাপনে বাস্তবায়নের বিস্তারিত নির্দেশনা যুক্ত করতে হয়।
সাবেক সচিব ড. মো. আনোয়ার উল্ল্যাহ বলেন, বিভিন্ন শ্রেণির কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ক্ষেত্রে নতুন বেতনকাঠামো কীভাবে কার্যকর হবে, তা প্রজ্ঞাপনে স্পষ্ট করতে হয়।
তার ব্যাখ্যা অনুযায়ী, জনপ্রশাসনের পাশাপাশি সেনা, নৌ ও বিমান বাহিনী, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি), পুলিশ, সরকারি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা কীভাবে কার্যকর হবে, সে বিষয়েও বিস্তারিত নির্দেশনা থাকতে হবে।
ফলে আগে থেকে সব প্রস্তুতি না থাকলে প্রজ্ঞাপনের খসড়া তৈরি করতেই কিছুটা সময় লাগতে পারে।
আইন মন্ত্রণালয়ের ভেটিং কেন গুরুত্বপূর্ণ
প্রজ্ঞাপনের খসড়া প্রস্তুত হওয়ার পর তা আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়। সেখানে প্রস্তাবিত বেতনকাঠামোর সঙ্গে সংবিধান, চাকরি-সংক্রান্ত আইন বা বিধির কোনো অসঙ্গতি রয়েছে কি না, তা যাচাই করা হয়।
এ ছাড়া প্রজ্ঞাপনে ব্যবহৃত শব্দ, বাক্য ও আইনি পরিভাষার কোনো অস্পষ্টতা বা দ্ব্যর্থবোধকতা আছে কি না, সেটিও পরীক্ষা করা হয়। এর মূল উদ্দেশ্য হলো ভবিষ্যতে আইনি জটিলতা বা ভুল ব্যাখ্যার সুযোগ কমানো।
নতুন বেতনকাঠামো কার্যকর করতে প্রয়োজনীয় বিধিমালা বা সংবিধিবদ্ধ আদেশের খসড়াও এ পর্যায়ে চূড়ান্ত করার প্রক্রিয়া থাকে।
সাবেক সচিব ড. মো. আনোয়ার উল্ল্যাহ জানান, এসব কাজ শেষ হওয়ার পর প্রজ্ঞাপনের চূড়ান্ত খসড়া আইন মন্ত্রণালয় থেকে আবার অর্থ মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়।
এরপর অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা চূড়ান্ত খসড়াটি সরকারি মুদ্রণালয় বা বিজি প্রেসে মুদ্রণের জন্য পাঠান। মুদ্রণ শেষে সেটি সংগ্রহ করে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রজ্ঞাপন জারি করে অর্থ মন্ত্রণালয়।
অর্থ মন্ত্রণালয় ও আইন মন্ত্রণালয়ের বক্তব্যে কী জানা গেল
গত রবিবার বিকেলে আইন মন্ত্রণালয়ের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তা জানান, গত সপ্তাহে তারা শুনেছিলেন যে অনুমোদিত পে-স্কেলের খসড়া এক-দুই দিনের মধ্যেই ভেটিংয়ের জন্য পাঠানো হবে। কিন্তু তখন পর্যন্ত সেটি আইন মন্ত্রণালয়ে পৌঁছায়নি।
তিনি জানান, খসড়াটি অর্থ মন্ত্রণালয়েই রয়েছে।
অন্যদিকে, অর্থ মন্ত্রণালয়ের এক উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তা বলেন, বিষয়টি খসড়া আটকে রাখার মতো কিছু নয়। গেজেট আকারে প্রকাশের জন্য যে প্রস্তুতি ও প্রক্রিয়া অনুসরণ করা প্রয়োজন, সেগুলো মেনেই কাজ চলছে।
তার বক্তব্য অনুযায়ী, সামরিক ও বেসামরিক বিভিন্ন শ্রেণির কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা এবং অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা কীভাবে কার্যকর হবে, সেসব বিষয় চূড়ান্ত করা হচ্ছে। একই সঙ্গে প্রয়োজনীয় নির্দেশনাসহ প্রজ্ঞাপনের খসড়াও প্রস্তুত করা হচ্ছে।
ওই কর্মকর্তা জানান, দ্রুত খসড়াটি আইন মন্ত্রণালয়ে ভেটিংয়ের জন্য পাঠানো হবে। এরপর প্রজ্ঞাপন জারি করা হবে।
২০১৫ সালের পে স্কেলেও সময় লেগেছিল
সরকারি চাকরিজীবীদের সর্বশেষ জাতীয় বেতন কাঠামো এর আগে ঘোষণা করা হয়েছিল ২০১৫ সালে। ওই বছরের ৭ সেপ্টেম্বর অষ্টম জাতীয় পে স্কেল মন্ত্রিসভায় চূড়ান্ত অনুমোদন পায়।
এরপর প্রায় সাড়ে তিন মাস পর, ১৫ ডিসেম্বর অর্থ মন্ত্রণালয় চূড়ান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করে।
এই আগের উদাহরণ তুলে ধরে সাবেক মন্ত্রিপরিষদসচিব আলী ইমাম মজুমদার বলেন, মন্ত্রিসভার অনুমোদনের পর গেজেট প্রকাশের আগে বেশ কিছু প্রশাসনিক ও আইনগত প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয়। এসব প্রক্রিয়া শেষ করতে কয়েক সপ্তাহ, এমনকি কোনো কোনো ক্ষেত্রে মাসও লেগে যেতে পারে।
তবে দীর্ঘদিন পর নতুন পে স্কেল ঘোষিত হওয়ায় এবার সরকারি চাকরিজীবীদের প্রত্যাশা বেশি। সে কারণে প্রজ্ঞাপন জারিতে বিলম্ব হলে হতাশা তৈরি হওয়াটাও স্বাভাবিক বলে মনে করেন তিনি।
সরকারি চাকরিজীবীদের উদ্বেগের কারণ
নতুন বেতনকাঠামোর জন্য সরকারি চাকরিজীবীদের অপেক্ষা দীর্ঘ হয়েছে। সাধারণভাবে প্রতি পাঁচ বছর পরপর নতুন বেতনকাঠামো ঘোষণার কথা থাকলেও গত ১০ বছরে তা হয়নি।
এ অবস্থায় ৩১ আগস্ট মন্ত্রিসভায় নতুন বেতনকাঠামো অনুমোদনের পর দ্রুত গেজেট প্রকাশের প্রত্যাশা তৈরি হয়। কিন্তু প্রায় দুই সপ্তাহ পরও প্রজ্ঞাপনের খসড়া আইন মন্ত্রণালয়ে ভেটিংয়ের জন্য না যাওয়ায় অনেকের মধ্যে উদ্বেগ ও হতাশা দেখা দিয়েছে।
তবে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, প্রক্রিয়াটি বন্ধ নেই। বরং নতুন বেতনকাঠামোর বিভিন্ন শ্রেণির কর্মকর্তা-কর্মচারীর জন্য বাস্তবায়ন কাঠামো ও প্রয়োজনীয় নির্দেশনা চূড়ান্ত করার কাজ চলছে।
বর্তমান তথ্য অনুযায়ী, নবম পে স্কেলের প্রজ্ঞাপন জারির আগে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হলো বিস্তারিত খসড়া প্রস্তুত করে আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো এবং সেখানে ভেটিং সম্পন্ন করা।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে দ্রুত ভেটিংয়ের জন্য খসড়া পাঠানোর কথা জানানো হয়েছে। ভেটিং শেষ হলে ১৭, ২১ অথবা ২২ সেপ্টেম্বরের মধ্যে কোনো একটি সম্ভাব্য দিনে গেজেট প্রকাশ হতে পারে। তবে ভেটিংয়ের অগ্রগতি ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়া অনুযায়ী সময়সূচিতে পরিবর্তন হতে পারে।
দীর্ঘ ১০ বছর পর অনুমোদিত নতুন বেতনকাঠামো বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে তাই এখন নজর থাকবে খসড়া আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো, ভেটিং শেষ হওয়া এবং চূড়ান্ত গেজেট প্রকাশের ওপর।





