কাদের-নাছিম-আরাফাতসহ ৭ জনের রায় ঘোষণা কাল ১৫ সেপ্টেম্বর। জুলাই-আগস্টের আন্দোলন ঘিরে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় সাত আসামির বিষয়ে ট্রাইব্যুনালের সিদ্ধান্ত জানানো হবে।
আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরসহ সাত আসামির বিরুদ্ধে চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার রায় আগামীকাল মঙ্গলবার (১৫ সেপ্টেম্বর) ঘোষণা করা হবে। সোমবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ রায় ঘোষণার দিন নির্ধারণ করেছে। এ মামলায় প্রসিকিউশন সর্বোচ্চ সাজা মৃত্যুদণ্ড চেয়েছে, অন্যদিকে রাষ্ট্রনিযুক্ত আসামিপক্ষের আইনজীবীরা তাদের মক্কেলদের বেকসুর খালাসের আবেদন জানিয়েছেন।
কাদের-নাছিম-আরাফাতের রায় ঘিরে ট্রাইব্যুনালের সিদ্ধান্ত

গত ১৭ আগস্ট প্রসিকিউশন ও আসামিপক্ষের রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবীদের চূড়ান্ত যুক্তিতর্ক শেষ হওয়ার পর মামলাটি রায়ের জন্য অপেক্ষমাণ রাখা হয়। এর আগে দীর্ঘ কয়েক ধাপে মামলার বিচারিক কার্যক্রম এগিয়েছে।
মামলায় ওবায়দুল কাদের ছাড়া অন্য আসামিরা হলেন আওয়ামী লীগের যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, সাবেক তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী আরাফাত, যুবলীগের সভাপতি শেখ ফজলে শামস পরশ, সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হোসেন খান নিখিল, ছাত্রলীগের সভাপতি সাদ্দাম হোসেন এবং সাধারণ সম্পাদক ওয়ালি আসিফ ইনান।
উৎসের তথ্য অনুযায়ী, সাত আসামিই বর্তমানে পলাতক।
সাত আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ কী
মামলার অভিযোগে বলা হয়েছে, জুলাই-আগস্টের আন্দোলন দমনে আসামিরা সমন্বিতভাবে নির্দেশ, প্ররোচনা ও উসকানিমূলক বক্তব্য দিয়েছেন। একই সঙ্গে নেতাকর্মীদের রাজপথে নামিয়ে প্রতিরোধ গড়ে তোলার আহ্বানসহ একাধিক বৈঠকে সহিংসতার পরিকল্পনার অভিযোগও আনা হয়েছে।
অভিযোগে আরও বলা হয়, কোথাও কোথাও সশস্ত্র হামলা, কঠোর দমন-পীড়ন এবং গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখার মাধ্যমে তাঁদের কর্মকাণ্ডের কারণে দেশজুড়ে হত্যা, হত্যাচেষ্টা ও ব্যাপক সহিংসতা সংঘটিত হয়। প্রসিকিউশনের বক্তব্য অনুযায়ী, এসব কর্মকাণ্ড মানবতাবিরোধী অপরাধের পর্যায়ে পড়ে।
যুক্তিতর্কে দুই পক্ষের অবস্থান
মামলার চূড়ান্ত যুক্তিতর্কে চিফ প্রসিকিউটর কার্যালয়ের পক্ষে শুনানি করেন প্রসিকিউটর মো. মিজানুল ইসলাম ও গাজী মোনাওয়ার হুসাইন তামীম। এর আগে গত ১২ আগস্ট চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করেন।
ওবায়দুল কাদের, বাহাউদ্দিন নাছিম ও মোহাম্মদ আলী আরাফাতের পক্ষে যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করেন রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী এম হাসান ইমাম। অন্যদিকে ছাত্রলীগ ও যুবলীগের চার নেতার পক্ষে যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করেন রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী ইশরাত জাহান।
প্রসিকিউশন চূড়ান্ত যুক্তিতর্কে দাবি করেছে, মামলার অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করা সম্ভব হয়েছে। সেই ভিত্তিতে সাত আসামির সর্বোচ্চ সাজা মৃত্যুদণ্ড চাওয়া হয়েছে।
অন্যদিকে আসামিপক্ষের রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবীরা প্রসিকিউশনের অভিযোগ প্রমাণের সক্ষমতা নিয়ে আপত্তি জানিয়েছেন। তাঁদের বক্তব্য, প্রসিকিউশন অভিযোগ প্রমাণে ব্যর্থ হয়েছে। তাই তাঁরা সাত আসামির বেকসুর খালাস চেয়েছেন।
কাদের-নাছিম-আরাফাতের রায়: বিচারকাজ যেভাবে এগিয়েছে
গত বছর ১৮ ডিসেম্বর ট্রাইব্যুনাল এ মামলার আনুষ্ঠানিক অভিযোগ আমলে নেন এবং সাত আসামির বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তাঁদের গ্রেপ্তার করতে না পারায় আসামিদের পলাতক দেখিয়ে চলতি বছর ২২ জানুয়ারি অভিযোগ গঠন করা হয়। একই সঙ্গে বিচার শুরুর আদেশ দেন ট্রাইব্যুনাল।
এরপর ১৭ ফেব্রুয়ারি সূচনা বক্তব্যের মাধ্যমে মামলার বিচারকাজ শুরু হয়। পরবর্তী সময়ে সাক্ষ্য গ্রহণের কাজ শেষ হলে গত ৪ আগস্ট থেকে যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শুরু হয়।
প্রসিকিউশন টানা ছয় কার্যদিবস যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করে। এরপর ১২ আগস্ট থেকে আসামিপক্ষের আইনজীবীরা তাঁদের যুক্তি তুলে ধরেন। ১৭ আগস্ট উভয়পক্ষের যুক্তিতর্ক শেষ হলে মামলাটি রায়ের জন্য অপেক্ষমাণ রাখে ট্রাইব্যুনাল।
এখন আগামীকাল মঙ্গলবার ১৫ সেপ্টেম্বর সাত আসামির বিরুদ্ধে এই মামলার রায় ঘোষণা হওয়ার কথা রয়েছে।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের আগের ছয় মামলার রায়
উৎসের তথ্য অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল থেকে জুলাই অভ্যুত্থানে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের ছয়টি মামলার রায় ইতোমধ্যে হয়েছে। এসব মামলায় মোট আসামি ছিলেন ১০৬ জন।
এর মধ্যে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ১৬ আসামিকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। ১১ আসামিকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং ৩৫ আসামিকে বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দেওয়া হয়েছে।
সব মিলিয়ে ছয় মামলায় ৬২ আসামিকে সাজা দেওয়া হয়েছে এবং দুজন খালাস পেয়েছেন। অর্থাৎ ১০৬ আসামির মধ্যে সাজাপ্রাপ্ত আসামির সংখ্যা ১০৪। তাঁদের মধ্যে ৪২ জন পলাতক বলে উৎসে উল্লেখ করা হয়েছে।
এই প্রেক্ষাপটে ওবায়দুল কাদের, বাহাউদ্দিন নাছিম, মোহাম্মদ আলী আরাফাতসহ সাত আসামির মামলার রায়ও জুলাই অভ্যুত্থান-সংক্রান্ত বিচারপ্রক্রিয়ার ধারাবাহিকতায় একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত হিসেবে সামনে এসেছে।
আগামীকাল রায়, নজর ট্রাইব্যুনালের সিদ্ধান্তে
মামলার দুই পক্ষই চূড়ান্ত পর্যায়ে নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করেছে। প্রসিকিউশন অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার দাবি করে সর্বোচ্চ শাস্তি চেয়েছে। আসামিপক্ষের রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবীরা সেই অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে খালাসের আবেদন করেছেন।
ফলে আগামীকাল আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ কী সিদ্ধান্ত দেয়, সেটিই এখন মামলার পরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। রায়ের মধ্য দিয়ে সাত আসামির বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের বিষয়ে ট্রাইব্যুনালের অবস্থান স্পষ্ট হবে।





