ব্যাংকের এমডি-সিইওদের কর্মক্ষমতা ৬ মাস পর পর মূল্যায়ন, ১০০ নম্বরের স্কোরকার্ডে খেলাপি ঋণ, সুশাসন, তারল্য ও মুনাফাসহ গুরুত্বপূর্ণ সূচক বিবেচনা করবে বাংলাদেশ ব্যাংক।
দেশের সরকারি ও বেসরকারি সব ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তাদের (সিইও) দায়িত্ব ও কর্মক্ষমতা মূল্যায়নের জন্য নতুন নীতিমালা জারি করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। নতুন কাঠামোর আওতায় ব্যাংকের এমডি-সিইও কর্মমূল্যায়ন হবে ১০০ নম্বরের একটি স্কোরকার্ডের ভিত্তিতে। এতে খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণ, মূলধনভিত্তিক সক্ষমতা, সুশাসন, আর্থিক স্থায়িত্বসহ ব্যাংকের গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রমকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
নীতিমালা অনুযায়ী, ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদকে আগামী এক মাসের মধ্যে এমডি ও সিইওদের জন্য নির্ধারিত কেপিআই বা মূল কর্মসম্পাদন সূচকের লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করতে হবে। এসব লক্ষ্য তিন বছর অথবা সংশ্লিষ্ট এমডির অবশিষ্ট মেয়াদের জন্য নির্ধারণ করা হবে।
এরপর নির্ধারিত লক্ষ্য অর্জনের অগ্রগতি প্রতি ছয় মাস পরপর পর্যালোচনা করতে হবে। পর্যালোচনার ফলাফল বাংলাদেশ ব্যাংকে জমা দেওয়ার নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে।
১০০ নম্বরের স্কোরকার্ডে যেভাবে হবে মূল্যায়ন
বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন কাঠামোতে ব্যাংকের এমডি-সিইও কর্মমূল্যায়ন পাঁচটি প্রধান সূচকের ওপর নির্ভর করবে। প্রতিটি সূচকের জন্য আলাদা নম্বর নির্ধারণ করা হয়েছে। সব মিলিয়ে মূল্যায়ন হবে ১০০ নম্বরে।
সূচকগুলো হলো—

- তহবিল সুরক্ষা ও তারল্য পরিস্থিতি—২৫ নম্বর
- সম্পদের গুণগত মান—২৫ নম্বর
- সুশাসন ও অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ—২৫ নম্বর
- আর্থিক অন্তর্ভুক্তকরণ, গ্রাহকসেবা ও বাজার আচরণ—১৫ নম্বর
- মুনাফা অর্জন—১০ নম্বর
এই পাঁচটি ক্ষেত্রের সম্মিলিত ফলাফলের ভিত্তিতে একজন এমডি বা সিইওর কেপিআই মূল্যায়ন করা হবে।
এ কাঠামোর ফলে একজন শীর্ষ নির্বাহীর কার্যক্রম শুধু ব্যাংকের মুনাফার ওপর নির্ভর করে মূল্যায়িত হবে না। বরং ব্যাংকের তারল্য, সম্পদের মান, অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ, গ্রাহকসেবা এবং আর্থিক অন্তর্ভুক্তির মতো বিষয়ও সমানভাবে বিবেচনায় আসবে।
ব্যাংকের এমডি-সিইও কর্মমূল্যায়নে ৭৫ নম্বর গুরুত্বপূর্ণ সীমা
নতুন নীতিমালায় প্রাপ্ত নম্বরের ভিত্তিতে এমডি ও সিইওদের পারফরম্যান্সের বিভিন্ন স্তর নির্ধারণ করা হয়েছে।
১০০ নম্বরের মধ্যে ৭৫ বা তার বেশি নম্বর পেলে সংশ্লিষ্ট এমডির পারফরম্যান্সকে মানসম্মত রেটিং হিসেবে বিবেচনা করা হবে।
৬৫ থেকে ৭৫ নম্বরের ক্ষেত্রে রেটিং হবে ‘এভারেজ’ বা উন্নতি প্রয়োজন। অর্থাৎ নির্ধারিত লক্ষ্য পূরণ হলেও পারফরম্যান্সের আরও উন্নতির প্রয়োজন রয়েছে বলে ধরা হবে।
অন্যদিকে, ৬৫-এর নিচে নম্বর পেলে সংশ্লিষ্ট এমডিকে ‘বিলো এভারেজ’ বা অবিলম্বে উন্নতি প্রয়োজন হিসেবে বিবেচনা করা হবে। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংক সংশ্লিষ্ট এমডিকে নোটিশ দিতে পারবে।
এই স্কোরকার্ড শুধু মূল্যায়নের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী, এমডি ও সিইওদের বেতন-ভাতা, প্রণোদনা এবং অন্যান্য সুবিধা নির্ধারণেও স্কোরকার্ড ব্যবহার করতে হবে।
ন্যূনতম ৩০টি কেপিআই নির্ধারণ
বাংলাদেশ ব্যাংক এমডিদের কর্মক্ষমতা যাচাইয়ের জন্য ন্যূনতম ৩০টি কেপিআই নির্ধারণ করেছে। এর মধ্যে ছয়টি গুরুত্বপূর্ণ কেপিআইয়ে নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে ব্যর্থ হলে নম্বর কেটে নেওয়ার বিধান রাখা হয়েছে।
নীতিমালায় কেপিআই অর্জনের ক্ষেত্রেও একটি নির্দিষ্ট সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে। কোনো কেপিআইয়ের নির্ধারিত লক্ষ্যের অন্তত ৫০ শতাংশ অর্জন করতে পারলেই ওই সূচকে নম্বর পাওয়া যাবে।
অর্জনের হার ৫০ শতাংশের নিচে হলে সংশ্লিষ্ট কেপিআইয়ে কোনো নম্বর পাওয়া যাবে না। অর্থাৎ ওই ক্ষেত্রে স্কোর হবে শূন্য।
তবে ৫০ শতাংশ বা তার বেশি অর্জন হলে অর্জনের মাত্রা অনুযায়ী আনুপাতিক হারে নম্বর যোগ হবে। আর নির্ধারিত লক্ষ্য শতভাগ অর্জন করতে পারলে সংশ্লিষ্ট কেপিআইয়ের পূর্ণ নম্বর পাওয়া যাবে।
খেলাপি ঋণ ব্যবস্থাপনায় বিশেষ গুরুত্ব
নতুন ব্যাংকের এমডি-সিইও কর্মমূল্যায়ন কাঠামোর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলোর একটি হলো খেলাপি ঋণ ব্যবস্থাপনা। নীতিমালায় খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণকে শীর্ষ নির্বাহীদের কর্মক্ষমতা যাচাইয়ের গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে।
যে ছয়টি ক্ষেত্রে পারফরম্যান্স ৫০ শতাংশের কম হলে বা শূন্য অর্জন হলে নম্বর কর্তনের বিধান রয়েছে, সেগুলো হলো—
১. আমানত-ঋণ অনুপাত
২. মোট খেলাপি ঋণের অনুপাত
৩. প্রকৃত খেলাপি ঋণের অনুপাত
৪. বড় ঋণ ও শীর্ষ ঋণগ্রহীতার কেন্দ্রীভূত ঝুঁকি
৫. খেলাপি ও অবলোপনকৃত ঋণ আদায়
৬. সিএমএসএমই, কৃষি, গ্রিন ফাইন্যান্স ও আর্থিক অন্তর্ভুক্তির প্রসার
এই ছয়টি ক্ষেত্রে নির্ধারিত লক্ষ্য অর্জন না হলে সংশ্লিষ্ট এমডির স্কোরে তার প্রভাব পড়বে। ফলে ব্যাংকের ঋণ ব্যবস্থাপনা ও ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণ এখন শীর্ষ নির্বাহীদের পারফরম্যান্সের সঙ্গে আরও সরাসরি যুক্ত হচ্ছে।
ধারাবাহিক খারাপ পারফরম্যান্সে মেয়াদ বাড়বে না
বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন নীতিমালায় শুধু নির্দিষ্ট সময়ের স্কোর নয়, ধারাবাহিক কর্মক্ষমতার বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে।
মূল্যায়নে কোনো এমডি বা সিইওর ধারাবাহিকভাবে খারাপ পারফরম্যান্স দেখা গেলে তার মেয়াদ বাড়ানো নাও হতে পারে। একই সঙ্গে খারাপ পারফরম্যান্সের কারণে কোনো এমডিকে অপসারণের জন্য পরিচালনা পর্ষদকে নির্দেশ দেওয়ার সুযোগও রাখা হয়েছে।
অর্থাৎ ব্যাংকের এমডি-সিইও কর্মমূল্যায়ন এখন শুধু অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনা মূল্যায়নের একটি প্রক্রিয়া নয়; এর ফলাফল একজন শীর্ষ নির্বাহীর ভবিষ্যৎ দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রেও প্রভাব ফেলতে পারে।
প্রতি ছয় মাসে অগ্রগতি পর্যালোচনা
নতুন ব্যবস্থায় ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের দায়িত্বও নির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়েছে। কেপিআই লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণের পাশাপাশি সেগুলোর অগ্রগতি নিয়মিত পর্যালোচনা করতে হবে।
প্রতি ছয় মাসে লক্ষ্যমাত্রা পূরণের অগ্রগতি যাচাই করার পর সেই ফলাফল বাংলাদেশ ব্যাংকে জমা দিতে হবে। ফলে এমডি ও সিইওদের কর্মক্ষমতা মূল্যায়ন নির্দিষ্ট সময়ের একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়ায় পরিণত হবে।
এ ধরনের মূল্যায়নে ব্যাংকের আর্থিক সক্ষমতা, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা, সুশাসন ও গ্রাহকসেবার পাশাপাশি খেলাপি ঋণ কমানো এবং আদায়ের অগ্রগতিও নজরে থাকবে।
ব্যাংক পরিচালনায় জবাবদিহির নতুন কাঠামো
নীতিমালার বিভিন্ন দিক বিবেচনায় দেখা যায়, বাংলাদেশ ব্যাংক এমডি ও সিইওদের দায়িত্বকে নির্দিষ্ট পরিমাপযোগ্য সূচকের সঙ্গে যুক্ত করতে চায়। ১০০ নম্বরের কাঠামো এবং অন্তত ৩০টি কেপিআইয়ের মাধ্যমে কর্মক্ষমতার তুলনামূলক মূল্যায়নের সুযোগ তৈরি হবে।
একই সঙ্গে বেতন-ভাতা, প্রণোদনা ও অন্যান্য সুবিধার সঙ্গে স্কোরকার্ড যুক্ত করার ফলে কর্মক্ষমতার সঙ্গে ব্যবস্থাপনা সুবিধার সম্পর্কও তৈরি হবে।
বিশেষ করে খেলাপি ঋণ, সম্পদের মান, তারল্য, সুশাসন ও অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণের মতো সূচকগুলোতে গুরুত্ব দেওয়ার ফলে ব্যাংকের শীর্ষ ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব আরও স্পষ্টভাবে পরিমাপযোগ্য হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন নীতিমালায় সরকারি-বেসরকারি সব ব্যাংকের এমডি ও সিইওদের জন্য ১০০ নম্বরের কর্মমূল্যায়ন কাঠামো নির্ধারণ করা হয়েছে। পরিচালনা পর্ষদকে এক মাসের মধ্যে কেপিআই লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করতে হবে এবং প্রতি ছয় মাসে অগ্রগতি পর্যালোচনা করে তা বাংলাদেশ ব্যাংকে জানাতে হবে।
মূল্যায়নে ৭৫ বা তার বেশি নম্বরকে মানসম্মত, ৬৫ থেকে ৭৫ নম্বরকে গড় বা উন্নতি প্রয়োজন এবং ৬৫-এর নিচে নম্বরকে অবিলম্বে উন্নতি প্রয়োজন হিসেবে বিবেচনা করা হবে। ধারাবাহিক খারাপ পারফরম্যান্স হলে মেয়াদ না বাড়ানো বা অপসারণের নির্দেশ দেওয়ার সুযোগও রাখা হয়েছে।





