আরও খবর

যে কারণে বাতিল মিশরের গোল (12)
একাধিক বিদেশি দূতাবাসে হুমকির ইমেইল, তদন্তে সিটিটিসি
যে কারণে বাতিল মিশরের গোল (6)
ব্যবস্থা নেবে ইসি: আয়-ব্যয়ের হিসাব দেয়নি এনসিপিসহ ৭ দল
যে কারণে বাতিল মিশরের গোল (12)
অগ্রিম ৭৬ কোটি টাকা নিয়েও সিরাজগঞ্জ বিসিকে গ্যাসলাইন টানছে না পিজিসিএল
যে কারণে বাতিল মিশরের গোল (9)
সংসদীয় স্থায়ী কমিটি: বিরোধী দলকে সভাপতি পদ দেওয়া নিয়ে অনিশ্চয়তা
যে কারণে বাতিল মিশরের গোল (8)
তিন জেলার নেতাদের সঙ্গে তারেক রহমানের মতবিনিময়

পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী কি ব্রিটিশ নাগরিকত্ব ত্যাগ করেছেন

পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী কি ব্রিটিশ নাগরিকত্ব ত্যাগ করেছেন, সরকারি পাসপোর্ট, সংবিধান ও প্রতিমন্ত্রী পদ নিয়ে তৈরি হয়েছে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।

পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী (টেকনোক্র্যাট) হিসেবে গত শুক্রবার শপথ নিয়েছেন হুমায়ুন কবির। এর আগে তিনি প্রতিমন্ত্রী পদমর্যাদায় প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্র উপদেষ্টার দায়িত্ব পালন করছিলেন। তবে দায়িত্ব নেওয়ার পর তাঁর হুমায়ুন কবিরের ব্রিটিশ নাগরিকত্ব নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। কারণ, যুক্তরাজ্যে বেড়ে ওঠা হুমায়ুন কবির একপর্যায়ে ব্রিটিশ নাগরিকত্ব নিয়েছিলেন বলে যুক্তরাজ্য বিএনপির একাধিক নেতা নিশ্চিত করেছেন। এখন প্রশ্ন হলো—প্রতিমন্ত্রী হওয়ার আগে তিনি সেই নাগরিকত্ব ত্যাগ করেছেন কি না।

বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সূত্রের বরাত দিয়ে জানা গেছে, চলতি বছরের ১৭ ফেব্রুয়ারি প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্র উপদেষ্টার দায়িত্ব নেওয়ার পর ২৩ ফেব্রুয়ারি হুমায়ুন কবির তাঁর সাধারণ পাসপোর্ট বা সবুজ পাসপোর্ট জমা দেন। একই মাসে তিনি সরকারি বা কূটনৈতিক পাসপোর্ট, অর্থাৎ লাল পাসপোর্ট নেন।

এরপর গত ছয় মাসে সরকারি পাসপোর্ট ব্যবহার করে তিনি যুক্তরাষ্ট্র, চীন, রাশিয়া, তুরস্ক, ভারত, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত, মরিশাস ও ফিলিপাইনসহ বিভিন্ন দেশে অন্তত ১১ বার সফর করেছেন।

হুমায়ুন কবিরের ব্রিটিশ নাগরিকত্ব ত্যাগের তথ্য কোথায়?

হুমায়ুন কবিরের ব্রিটিশ নাগরিকত্ব নিয়ে সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি হলো, তিনি প্রতিমন্ত্রী হওয়ার আগে নাগরিকত্ব ত্যাগ বা রিনাউন্স করেছেন কি না।

যুক্তরাজ্য বিএনপির একাধিক নেতা নিশ্চিত করেছেন, হুমায়ুন কবির ব্রিটিশ নাগরিক। তবে তিনি পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার আগে ব্রিটিশ নাগরিকত্ব ত্যাগ করেছেন কি না, সে বিষয়ে তাঁরা নিশ্চিত হতে পারেননি।

অন্যদিকে, বাংলাদেশ সরকারের সূত্রগুলো বলছে, হুমায়ুন কবির বিদেশি নাগরিকত্ব ত্যাগের আবেদন করেছেন—এমন কোনো তথ্য তাদের কাছে নেই।

এ বিষয়ে সরাসরি বক্তব্য জানতে গতকাল শনিবার হুমায়ুন কবিরকে একাধিকবার ফোন করা হলেও তাঁকে পাওয়া যায়নি। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জনসংযোগ দপ্তরের সঙ্গেও যোগাযোগ করা হয়েছিল। তবে সেখান থেকেও কোনো জবাব পাওয়া যায়নি।

ফলে এখন পর্যন্ত প্রকাশ্য তথ্যের ভিত্তিতে হুমায়ুন কবিরের ব্রিটিশ নাগরিকত্ব ত্যাগের বিষয়টি নিশ্চিত করা যাচ্ছে না।

সংবিধানে বিদেশি নাগরিকত্ব নিয়ে কী বলা আছে?

বিদেশি নাগরিকত্বের বিষয়টি বাংলাদেশের সংবিধানের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। সংবিধানের ৫৬ ধারায় মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও উপমন্ত্রী নিয়োগের বিধান রয়েছে। সেখানে সংসদ সদস্য নন—এমন ব্যক্তিদের মধ্য থেকেও নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী বা উপমন্ত্রী নিয়োগের সুযোগ রাখা হয়েছে। তবে তাঁদের সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার যোগ্য হতে হবে।

অন্যদিকে, সংবিধানের ৬৬(২)(গ) ধারায় বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তি বিদেশি রাষ্ট্রের নাগরিকত্ব অর্জন করলে কিংবা বিদেশি রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য ঘোষণা বা স্বীকার করলে তিনি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার ক্ষেত্রে অযোগ্য হতে পারেন। একই ধারার ২(ক)-তে জন্মসূত্রে বাংলাদেশের নাগরিক কোনো ব্যক্তি বিদেশি নাগরিকত্ব নেওয়ার পর তা ত্যাগ করলে নির্দিষ্ট শর্তে তাঁকে বিদেশি নাগরিকত্ব অর্জনকারী হিসেবে গণ্য না করার বিধানও রয়েছে।

বিদেশি নাগরিকত্ব ত্যাগের আগের নজির

বিদেশি নাগরিকত্ব ত্যাগ করে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার নজির বাংলাদেশে রয়েছে। গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে বর্তমান পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনমন্ত্রী আবদুল আউয়াল মিন্টু যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকত্ব ত্যাগ করেন। পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদও যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকত্ব ত্যাগ করেন।

বিভিন্ন গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, ওই নির্বাচনে বিদেশি নাগরিকত্ব ছাড়ার আবেদন করে সংসদ সদস্য প্রার্থী হয়েছিলেন ২৩ জন। তাঁদের মধ্যে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি), জাতীয় পার্টি, খেলাফত মজলিস এবং ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থীরাও ছিলেন।

সে সময় বিদেশি নাগরিকত্ব ছাড়ার আবেদনের প্রমাণ দেখাতে সক্ষম প্রার্থীদের মনোনয়নপত্র বৈধ ঘোষণা করেছিল নির্বাচন কমিশন।

এ কারণে হুমায়ুন কবিরের ব্রিটিশ নাগরিকত্ব ত্যাগের প্রমাণ বা আবেদনসংক্রান্ত তথ্য প্রকাশ্যে আছে কি না, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

আগেও বিদেশি নাগরিকত্ব নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে

বাংলাদেশের জাতীয় নির্বাচনে বিদেশি নাগরিকত্ব নিয়ে বিতর্ক নতুন নয়।

২০২৪ সালের দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অস্ট্রেলিয়ার নাগরিকত্ব থাকার কারণে বরিশাল-৪ (মেহেন্দীগঞ্জ-হিজলা) আসনে আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী ও দলের আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক শাম্মী আহমেদের মনোনয়নপত্র বাতিল করা হয়েছিল।

একই নির্বাচনে ফরিদপুর-৩ আসনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী শামীম হকের নেদারল্যান্ডসের নাগরিকত্ব নিয়েও প্রশ্ন উঠেছিল। তিনি নাগরিকত্ব ত্যাগের পক্ষে নির্বাচন কমিশনে নথি জমা দিয়েছিলেন। তবে ওই নথি নিয়ে জালিয়াতির অভিযোগও উঠেছিল। শেষ পর্যন্ত তিনি নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন।

এসব নজিরের কারণে হুমায়ুন কবিরের ব্রিটিশ নাগরিকত্ব ত্যাগের বিষয়টি নিয়ে তথ্যের স্বচ্ছতার দাবি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

আইনজীবীর বক্তব্যে সাংবিধানিক প্রশ্ন

সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী শরীফ ভূঁইয়া মনে করেন, সাংবিধানিকভাবে বিদেশি নাগরিকত্ব থাকা অবস্থায় বাংলাদেশে কারও প্রতিমন্ত্রী হওয়ার সুযোগ নেই।

তিনি বলেন, হুমায়ুন কবির বিদেশি নাগরিকত্ব ত্যাগ করেছেন কি না, কিংবা ত্যাগের জন্য আবেদন করেছেন কি না—তা এখনো জনগণের কাছে স্পষ্ট নয়। তাঁর মতে, বিদেশি নাগরিকত্ব ত্যাগের বিষয়টি সংশ্লিষ্ট বিদেশি দেশের আইন অনুযায়ী নির্ধারিত হয়। শুধু আবেদন করলেই নাগরিকত্ব ত্যাগ সম্পন্ন হয়ে যায় না; আবেদন যাচাই-বাছাইয়ের পর সংশ্লিষ্ট দেশকে বিষয়টি নিষ্পত্তি করতে হয়।

শরীফ ভূঁইয়ার বক্তব্য অনুযায়ী, এই বিষয়ে স্পষ্ট তথ্য প্রকাশ না করে হুমায়ুন কবিরকে প্রতিমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ দেওয়ায় তাঁর নিয়োগ সাংবিধানিক কি না, সে বিষয়ে প্রশ্ন থেকে যায়।

হুমায়ুন কবিরের শিক্ষা ও রাজনৈতিক জীবন

সিলেটের ওসমানীনগর উপজেলার হবসপুর গ্রামে জন্ম হুমায়ুন কবিরের। মাত্র আড়াই বছর বয়সে পরিবারের সঙ্গে তিনি যুক্তরাজ্যে চলে যান। সেখানেই তাঁর বেড়ে ওঠা ও উচ্চশিক্ষা।

সংশ্লিষ্ট একটি সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, তিনি যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অব সাসেক্স থেকে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ে স্নাতক (সম্মান) ডিগ্রি অর্জন করেন। পরে লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিকস অ্যান্ড পলিটিক্যাল সায়েন্স, ইউনিভার্সিটি অব কেমব্রিজ এবং লিডস ল স্কুল থেকে তিনটি পৃথক বিষয়ে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নেন।

পেশাগত জীবনে তিনি লন্ডনে মেয়রের দপ্তরসহ ব্রিটিশ সরকারের উচ্চপর্যায়ে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন।

রাজনীতিতে তাঁর হাতেখড়ি হয় যুক্তরাজ্যের লেবার পার্টির মাধ্যমে। টাওয়ার হ্যামলেটস কাউন্সিলের সাবেক ডেপুটি মেয়র অহিদ আহমদ চৌধুরীর তথ্য অনুযায়ী, ২০০৬ থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত হুমায়ুন কবির লেবার পার্টির বেথনাল গ্রিন অ্যান্ড বো শাখার সেক্রেটারি ছিলেন।

পরবর্তীতে ২০২৫ সালের ২২ অক্টোবর তিনি বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব (আন্তর্জাতিক বিষয়ক) হন।

সরকারি পাসপোর্ট ব্যবহারের তথ্য কী বলছে?

হুমায়ুন কবিরের সরকারি পাসপোর্ট ব্যবহারের তথ্যও আলোচনায় এসেছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সূত্র অনুযায়ী, ২৩ ফেব্রুয়ারি তিনি সাধারণ পাসপোর্ট জমা দিয়ে ওই মাসেই সরকারি বা কূটনৈতিক পাসপোর্ট নেন।

এরপর সৌদি আরব সফরের সময় তিনি প্রথমবার লাল পাসপোর্ট ব্যবহার করেন। গত ছয় মাসে অন্তত ১১ বার বিদেশ সফরে তিনি সরকারি পাসপোর্ট ব্যবহার করেছেন।

তবে সরকারি পাসপোর্ট নেওয়া বা ব্যবহারের তথ্য থেকেই তাঁর ব্রিটিশ নাগরিকত্ব ত্যাগের বিষয়টি নিশ্চিত করা যায় না। এ কারণে নাগরিকত্ব ত্যাগের আবেদন, তা নিষ্পত্তির প্রমাণ বা সংশ্লিষ্ট সরকারি নথি প্রকাশ্যে এসেছে কি না—সেটিই এখন মূল প্রশ্ন।

এখনো নিশ্চিত নয় নাগরিকত্ব ত্যাগের বিষয়টি

সব মিলিয়ে, হুমায়ুন কবির একসময় ব্রিটিশ নাগরিক ছিলেন—এমন তথ্য যুক্তরাজ্য বিএনপির একাধিক নেতা নিশ্চিত করেছেন। কিন্তু তিনি পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার আগে সেই নাগরিকত্ব ত্যাগ করেছেন কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়।

বাংলাদেশ সরকারের সূত্রগুলোর কাছেও নাগরিকত্ব ত্যাগের আবেদনসংক্রান্ত তথ্য নেই বলে জানা গেছে। একই বিষয়ে হুমায়ুন কবিরের বক্তব্য জানতে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও কোনো উত্তর পাওয়া যায়নি।

তাই বর্তমানে হুমায়ুন কবিরের ব্রিটিশ নাগরিকত্ব নিয়ে মূল প্রশ্নের উত্তর প্রকাশ্যে অনির্ধারিত রয়েছে। নাগরিকত্ব ত্যাগের প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছিল কি না, তা সংশ্লিষ্ট নথি বা দায়িত্বশীল পক্ষের স্পষ্ট বক্তব্যের মাধ্যমে পরিষ্কার হতে পারে।

বে হুমায়ুন কবিরের দায়িত্ব গ্রহণের পর তাঁর ব্রিটিশ নাগরিকত্বের বিষয়টি নতুন করে সামনে এসেছে। তাঁর যুক্তরাজ্যে বেড়ে ওঠা, লেবার পার্টির রাজনীতিতে সম্পৃক্ততা এবং একসময় ব্রিটিশ নাগরিকত্ব নেওয়ার তথ্য নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

তবে এখন পর্যন্ত পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, তিনি প্রতিমন্ত্রী হওয়ার আগে ব্রিটিশ নাগরিকত্ব ত্যাগ করেছেন কি না, সেটি নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না। ফলে বিষয়টি নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে যাওয়ার আগে সরকারি নথি ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের স্পষ্ট বক্তব্যের প্রয়োজন রয়েছে।

সর্বাধিক পঠিত