অগ্রিম ৭৬ কোটি টাকা নিয়েও সিরাজগঞ্জ বিসিকে গ্যাসলাইন টানছে না পিজিসিএল, চার বছর ধরে ঝুলে থাকা প্রকল্পে উদ্যোক্তারা বিনিয়োগ নিয়ে শঙ্কায় পড়েছেন।
উত্তরবঙ্গের অন্যতম বৃহৎ অর্থনৈতিক অঞ্চল হিসেবে গড়ে তোলা সিরাজগঞ্জ বিসিক শিল্পপার্কে গ্যাস-সংযোগের অবকাঠামো নির্মাণের কাজ চার বছর ধরে ঝুলে আছে। বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন (বিসিক) ২০২২ সালের ২০ জুন পশ্চিমাঞ্চল গ্যাস কোম্পানি লিমিটেডের (পিজিসিএল) অনুকূলে ৭৫ কোটি ৮৩ লাখ টাকা জমা দিলেও শিল্পপার্কের ভেতরের গ্যাসলাইন এখনো নির্মাণ শুরু হয়নি।
পিজিসিএল শিল্পপার্কের প্রধান ফটক পর্যন্ত গ্যাস সরবরাহের পাইপলাইন স্থাপন করেই কাজ বন্ধ রেখেছে। ফলে গ্যাস-সংযোগের অপেক্ষায় থাকা উদ্যোক্তাদের মধ্যে বিনিয়োগ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। দেশে চলমান গ্যাস-সংকট তাঁদের উদ্বেগ আরও বাড়িয়েছে।
শিল্পপার্ক-সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ না হওয়া এবং সম্পূর্ণ অর্থ পরিশোধের পরও প্রকল্পের কাজ অসম্পূর্ণ থাকার বিষয়ে বাণিজ্যিক নিরীক্ষা অধিদপ্তর ২০২৫ সালের ১১ সেপ্টেম্বর একটি মেমো ইস্যু করে।
৭৫ কোটি ৮৩ লাখ টাকা দেওয়ার পরও থেমে আছে কাজ
সিরাজগঞ্জ বিসিক শিল্পপার্কে গ্যাস-সংযোগ দেওয়ার জন্য বিসিকের দেওয়া ৭৫ কোটি ৮৩ লাখ টাকা পিজিসিএলের অনুকূলে জমা হয় ২০২২ সালের জুনে। এরপর শিল্পপার্কের প্রধান ফটক পর্যন্ত পাইপলাইন নেওয়া হলেও ভেতরের অভ্যন্তরীণ পাইপলাইন স্থাপনের কাজ শুরু হয়নি।
এ অবস্থায় প্রকল্পটি দীর্ঘ সময় ধরে ঝুলে থাকায় উদ্যোক্তাদের মধ্যে হতাশা তৈরি হয়েছে। তাঁদের অভিযোগ, শিল্পকারখানা স্থাপনের জন্য প্লট নেওয়ার পরও প্রয়োজনীয় গ্যাস-সংযোগ না থাকায় বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন কঠিন হয়ে পড়ছে।
শিল্পপার্কের প্রধান কর্মকর্তা হিরণ্ময় বর্দ্ধন বলেন, পিজিসিএল অভ্যন্তরীণ গ্যাসলাইন স্থাপনের কাজ শেষ না করায় উদ্যোক্তারা বিসিককে চাপ দিচ্ছেন। বিষয়টি একাধিকবার পিজিসিএলকে জানানো হয়েছে। পাশাপাশি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষও তাগিদপত্র দিয়েছে। বিসিক আবারও এ বিষয়ে তাগাদা দেবে।
সিরাজগঞ্জ বিসিকে গ্যাসলাইন স্থাপনে দফায় দফায় তাগাদা

শিল্পপার্ক-সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, গ্যাসলাইন স্থাপনের কাজ দ্রুত শেষ করার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ গত ৪ এপ্রিল বাংলাদেশ তেল, গ্যাস ও খনিজ সম্পদ করপোরেশনের (পেট্রোবাংলা) চেয়ারম্যানকে তাগিদপত্র পাঠায়।
এরপর ২০ এপ্রিল শিল্প মন্ত্রণালয়ের বিসিক শাখা থেকেও সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দপ্তরে গ্যাস পাইপলাইন স্থাপনের কাজ দ্রুত শেষ করার জন্য তাগিদপত্র দেওয়া হয়।
অর্থাৎ, গ্যাসলাইন নির্মাণ দ্রুত শেষ করার বিষয়ে একাধিক সরকারি দপ্তর থেকে উদ্যোগ নেওয়া হলেও শিল্পপার্কের অভ্যন্তরীণ পাইপলাইন স্থাপনের কাজ এখনো শুরু হয়নি।
৪০০ একর জমিতে শিল্পপার্ক, প্রকল্প ব্যয় বেড়েছে
সিরাজগঞ্জ সদর উপজেলার ছাতিয়ানতলী, পশ্চিম মোহনপুর, বনবাড়িয়া, বেলটিয়া ও মোরগ্রাম মৌজা নিয়ে প্রায় ৪০০ একর জমিতে সিরাজগঞ্জ বিসিক শিল্পপার্ক গড়ে তোলা হয়েছে।
২০১০ সালের জুলাইয়ে প্রকল্পটির কাজ শুরু হয়। মূল পরিকল্পনা অনুযায়ী ২০১৪ সালের জুনে প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা ছিল। তবে পরে সাত দফা মেয়াদ বাড়ানো হয়।
বিসিক ও উদ্যোক্তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, প্রকল্পটির মূল অনুমোদিত ব্যয় ছিল ৩৭৮ কোটি ৯২ লাখ টাকা। পরে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৭১৯ কোটি ২১ লাখ টাকায়।
২০২৪ সালের জুনে প্রকল্পটি আনুষ্ঠানিকভাবে সমাপ্ত দেখানো হলেও বাস্তবে অনেক কাজ এখনো অসম্পূর্ণ রয়েছে। এর মধ্যে গ্যাস-সংযোগের অবকাঠামো ও অভ্যন্তরীণ গ্যাসলাইন অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
উদ্যোক্তাদের বিনিয়োগে অনাগ্রহ বাড়ছে
গ্যাস-সংযোগের অনিশ্চয়তার কারণে শিল্পপার্কে বিনিয়োগের আগ্রহ কমছে বলে জানিয়েছেন উদ্যোক্তারা।
যমুনা পেপার অ্যান্ড বোর্ড ফ্যাক্টরির স্বত্বাধিকারী আবুল কালাম আজাদ এ শিল্পপার্কে চারটি প্লট পেয়েছেন। তাঁর ভাষ্য, প্লটগুলোর কাজ এখনো সম্পূর্ণ হয়নি। এর পাশাপাশি গ্যাসলাইনও স্থাপন করা হচ্ছে না। ফলে তিনি কীভাবে এগোবেন, তা নিয়ে অনিশ্চয়তায় আছেন।
জিলানি অয়েল মিলের স্বত্বাধিকারী আবদুল কাদের পেয়েছেন ছয়টি প্লট। তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, প্লটগুলোর মাটি ভরাটের কাজ অসম্পূর্ণ থাকায় তাঁকে নিজ খরচে মাটি ভরাট করতে হয়েছে। বর্তমানে তিনি মেশিনপত্র স্থাপনের কাজ করছেন। গ্যাস-সংযোগ পাওয়া গেলে দ্রুত কারখানা চালু করার আশা করছেন তিনি।
অন্যদিকে, যমুনা ফুড অ্যান্ড বেভারেজ ইন্ডাস্ট্রিজের পরিচালক ইকবাল হাসান বলেন, সমবায় সমিতির মাধ্যমে দুটি প্লটের বরাদ্দের টাকা দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এখন গ্যাস না থাকার বিষয়টি জানতে পারছেন। তাঁর মতে, গ্যাসলাইন না থাকলে ব্যাংকও বিনিয়োগ করবে না।
আরেক উদ্যোক্তা আবদুর রাজ্জাক বলেন, গ্যাস-সংযোগের বিষয়টি বিবেচনায় রেখেই তিনি প্লট নিয়েছিলেন। কিন্তু এখনো গ্যাসলাইন স্থাপন না হওয়ায় তিনি বিনিয়োগ করতে ভয় পাচ্ছেন।
৮২৯টি প্লটের শিল্পপার্কে দেশি-বিদেশি উদ্যোক্তা
বিসিক কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, শিল্পপার্ক প্রকল্পে ২৭৫ একর জমিতে এ, বি ও এস—এই তিন ক্যাটাগরিতে মোট ৮২৯টি প্লট তৈরি করা হয়েছে।
এর মধ্যে ৫৫০টি প্লট বিদেশি উদ্যোক্তাদের জন্য এবং ২৭৯টি প্লট দেশীয় উদ্যোক্তাদের জন্য রাখা হয়েছে। এ ক্যাটাগরির প্লটের আয়তন ২০ হাজার বর্গফুট, বি ক্যাটাগরির প্লট ১০ হাজার বর্গফুট এবং এস ক্যাটাগরির প্লটের আয়তন ৬ থেকে ২৬ হাজার বর্গফুট।
দুই ধাপে ২৭২টি প্লট দেশীয় উদ্যোক্তাদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। এসব প্লটে বিনিয়োগ ও শিল্পকারখানা স্থাপনের ক্ষেত্রে গ্যাস-সংযোগকে গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো হিসেবে দেখছেন উদ্যোক্তারা।
কিস্তি না দেওয়ার হুঁশিয়ারি উদ্যোক্তাদের
গ্যাস-সংযোগসহ শিল্পপার্কের প্রয়োজনীয় সেবা দ্রুত নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছে স্থানীয় উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ী সংগঠনগুলো। এ বিষয়ে তারা প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়সহ বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের সরাসরি হস্তক্ষেপ চেয়েছে।
সিরাজগঞ্জ বিসিক শিল্পপার্ক শিল্প উদ্যোক্তা মালিক সমিতির সভাপতি আবদুল কাদের বলেন, জ্বালানি ও গ্যাসের ব্যবস্থা না থাকলে উদ্যোক্তারা কেন বিনিয়োগ করবেন—এটাই বড় প্রশ্ন। গ্যাস না থাকলে ব্যাংকও ঋণ দেবে না বলে তিনি উল্লেখ করেন।
তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, দ্রুত গ্যাসলাইন স্থাপনসহ শিল্পপার্কের সব ধরনের সেবা নিশ্চিত করা না হলে আগামী ফেব্রুয়ারি মাসের কিস্তির টাকা কেউ জমা দেবেন না বলে উদ্যোক্তারা সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
এতে গ্যাস-সংযোগের বিষয়টি উদ্যোক্তাদের জন্য শুধু উৎপাদন শুরুর প্রশ্ন নয়, বরং তাঁদের বিনিয়োগ ও আর্থিক দায়বদ্ধতার সঙ্গেও সরাসরি যুক্ত হয়ে উঠেছে।
পিজিসিএলের বক্তব্য কী
সিরাজগঞ্জ বিসিক শিল্পপার্কের প্রধান কর্মকর্তা হিরণ্ময় বর্দ্ধন বলেন, শিল্পপার্কে জ্বালানি ও গ্যাস-সংযোগের বিষয়টি এখন পুরোপুরি পিজিসিএলের ওপর নির্ভরশীল।
অন্যদিকে পশ্চিমাঞ্চল গ্যাস কোম্পানি লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (চলতি দায়িত্ব) এস এম তরিকুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, অতিবৃষ্টির কারণে গ্যাস পাইপলাইন স্থাপনের কাজ এগিয়ে নেওয়া যাচ্ছে না।
তিনি জানান, কাজ শেষ হওয়ার পর সরকারের পর্যাপ্ত গ্যাস সরবরাহ থাকলে সংযোগ দেওয়া হবে।
ফলে একদিকে উদ্যোক্তারা দ্রুত গ্যাসলাইন নির্মাণ ও শিল্পপার্কের সেবা নিশ্চিত করার দাবি জানাচ্ছেন, অন্যদিকে পিজিসিএল কাজ এগিয়ে নিতে অতিবৃষ্টির বাধার কথা জানিয়েছে। একই সঙ্গে গ্যাস সরবরাহের পর্যাপ্ততার বিষয়টিও সংযোগ দেওয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বলে জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।
দীর্ঘসূত্রতায় উদ্যোক্তাদের চাপ বাড়ছে
সিরাজগঞ্জ বিসিক শিল্পপার্কের গ্যাস-সংযোগের বিষয়টি কয়েক বছর ধরে ঝুলে থাকায় উদ্যোক্তাদের বিনিয়োগ পরিকল্পনা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। বিসিকের পক্ষ থেকে একাধিকবার পিজিসিএলকে জানানো হয়েছে এবং বিভিন্ন সরকারি দপ্তর থেকেও দ্রুত কাজ শেষ করার জন্য তাগিদ দেওয়া হয়েছে।
তবে বাস্তবে শিল্পপার্কের ভেতরের গ্যাসলাইন নির্মাণ শুরু না হওয়ায় অনিশ্চয়তা কাটছে না। প্লটের অসম্পূর্ণ কাজ, গ্যাস-সংযোগের অভাব এবং চলমান গ্যাস-সংকট—সব মিলিয়ে উদ্যোক্তাদের উদ্বেগ বাড়ছে।
সিরাজগঞ্জ বিসিক শিল্পপার্কের ভবিষ্যৎ বিনিয়োগ পরিস্থিতি অনেকটাই নির্ভর করছে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ও গ্যাস-সংযোগ নিশ্চিত হওয়ার ওপর। উদ্যোক্তারা দ্রুত কাজ শেষ করার দাবি জানিয়েছেন, আর পিজিসিএলের পক্ষ থেকে কাজ শেষ হওয়ার পর পর্যাপ্ত গ্যাস সরবরাহের শর্তের কথা বলা হয়েছে।
সিরাজগঞ্জ বিসিক শিল্পপার্কে গ্যাস-সংযোগের অবকাঠামো নির্মাণে অর্থ পরিশোধের পরও অভ্যন্তরীণ গ্যাসলাইন স্থাপনের কাজ শুরু না হওয়ায় উদ্যোক্তাদের মধ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। ২০২৪ সালের জুনে প্রকল্প সমাপ্ত দেখানো হলেও বাস্তবে অসম্পূর্ণ কাজ রয়ে গেছে।
সরকারি বিভিন্ন দপ্তর থেকে দ্রুত কাজ শেষ করার তাগিদ দেওয়া হয়েছে। উদ্যোক্তারাও গ্যাসলাইনসহ প্রয়োজনীয় সেবা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন। এখন পিজিসিএলের কাজ এগিয়ে নেওয়া এবং পর্যাপ্ত গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত হওয়ার ওপরই শিল্পপার্কে বিনিয়োগের পরবর্তী অগ্রগতি অনেকাংশে নির্ভর করছে।





