নিরাপদ ও টেকসই বিশ্ব গড়ে তোলার আহ্বান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। নিউইয়র্কে ১.৫ ডিগ্রি সীমা, অর্থায়ন ও নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে গুরুত্ব দেন তিনি।
ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য নিরাপদ ও টেকসই বিশ্ব গড়ে তুলতে বিশ্বনেতাদের একসঙ্গে কাজ করার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ২৩ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদরদপ্তরের ট্রাস্টিশিপ কাউন্সিলে ‘ক্লাইমেট অ্যাকশন অ্যান্ড দ্য জাস্ট ট্রানজিশন’ শীর্ষক উচ্চপর্যায়ের সভায় বক্তব্য দেওয়ার সময় তিনি এই আহ্বান জানান। জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের উদ্যোগে আয়োজিত সভায় প্রধানমন্ত্রী বৈশ্বিক উষ্ণায়ন ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে রাখা, জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর জন্য সুলভ অর্থায়ন, জলবায়ু-স্মার্ট প্রযুক্তিতে প্রবেশাধিকার এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি সম্প্রসারণের ওপর গুরুত্ব দেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য আরও নিরাপদ ও টেকসই ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে। তাঁর বক্তব্যে জলবায়ু সংকট মোকাবেলায় বৈশ্বিক সহযোগিতা, অর্থায়ন এবং প্রযুক্তিগত সক্ষমতার বিষয়গুলো বিশেষভাবে উঠে আসে।
জলবায়ু পদক্ষেপে বাংলাদেশের ঝুঁকির চিত্র

প্রধানমন্ত্রী তার বক্তব্যে বাংলাদেশের জলবায়ু বাস্তবতার কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, বিশ্বের মোট গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণে বাংলাদেশের অবদান শূন্য দশমিক ৫ শতাংশেরও কম। অথচ জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ দেশ।
তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, এই শতাব্দীর শেষ নাগাদ সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির কারণে বাংলাদেশের উপকূলীয় এলাকার ১২ থেকে ১৮ শতাংশ পানিতে তলিয়ে যেতে পারে। এর ফলে কোটি কোটি মানুষের জীবিকা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি দেশের খাদ্যনিরাপত্তাও গুরুতর ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সৃষ্ট ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদনের বা জিডিপির প্রায় ১ শতাংশের সমান। এই পরিস্থিতিতে জলবায়ু অভিযোজনের জন্য চলতি বছরের বাজেটে প্রায় ৩ দশমিক ১৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বরাদ্দ করা হয়েছে।
তবে তাঁর বক্তব্যে স্পষ্ট করা হয়, দেশের নিজস্ব উদ্যোগের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সহায়তাও প্রয়োজন। বড় ধরনের জলবায়ুজনিত ক্ষতির ঝুঁকি মোকাবেলায় আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ছাড়া বাংলাদেশের জন্য পরিস্থিতি সামাল দেওয়া কঠিন বলে উল্লেখ করেন তিনি।
জলবায়ু পদক্ষেপে বাংলাদেশের পরিকল্পনা
বাংলাদেশের নেওয়া বিভিন্ন পরিবেশ ও জলবায়ু-সংশ্লিষ্ট উদ্যোগের কথাও তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি জানান, আগামী পাঁচ বছরে বাংলাদেশ ২৫ কোটি গাছ লাগানোর পরিকল্পনা নিয়েছে।
পাশাপাশি পানি সংরক্ষণ, বন্যার ঝুঁকি কমানো, জলাভূমি পুনরুজ্জীবন এবং ভূগর্ভস্থ পানির পুনর্ভরণের লক্ষ্যে প্রায় ২০ হাজার কিলোমিটার নদী ও খাল খননের কাজ চলছে। পদ্মা ব্যারাজ ও তিস্তা ব্যারাজের মাস্টার প্ল্যান বাস্তবায়নের কাজও এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে বলে জানান তিনি।
এ ধরনের উদ্যোগের মাধ্যমে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবেলার পাশাপাশি পানি ব্যবস্থাপনা ও পরিবেশ সুরক্ষার দিকে গুরুত্ব দেওয়ার কথা তুলে ধরা হয়েছে।
নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে লক্ষ্য
বিদ্যুৎ উৎপাদন ও জ্বালানি ব্যবস্থায় পরিবেশবান্ধব পরিবর্তনের কথাও প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে গুরুত্ব পেয়েছে। তিনি জানান, ২০৩০ সালের মধ্যে দেশের বিদ্যুতের চাহিদার ২০ শতাংশ নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে পূরণের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
এর পাশাপাশি পাটজাত পণ্য, পরিবেশবান্ধব পরিবহন, বর্জ্য থেকে জ্বালানি উৎপাদন এবং সার্কুলার অর্থনীতির উদ্যোগসহ সবুজ শিল্পের প্রসারে সরকার কাজ করছে বলে জানান তিনি।
একই সঙ্গে একটি জাতীয় কার্বন বাজার গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলেও উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী।
জলবায়ু সংকটে ৫ জরুরি পদক্ষেপ
জলবায়ু সংকট মোকাবেলায় প্রধানমন্ত্রী পাঁচটি জরুরি পদক্ষেপের ওপর গুরুত্ব দেন। তাঁর বক্তব্যে এগুলো আন্তর্জাতিক সহযোগিতার প্রয়োজনীয়তার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত ছিল।
প্রথমত, প্যারিস চুক্তিতে নির্ধারিত বৈশ্বিক উষ্ণায়ন ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের সীমার মধ্যে রাখার জন্য বিশ্বব্যাপী গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ কমানোর ওপর জোর দেন তিনি।
দ্বিতীয়ত, জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর জন্য অভিযোজন খাতে পূর্বানুমেয় ও সুলভ অর্থায়ন নিশ্চিত করার আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর জলবায়ু অভিযোজন কার্যক্রম এগিয়ে নিতে অর্থায়নের নিশ্চয়তা গুরুত্বপূর্ণ।
তৃতীয়ত, জলবায়ু-স্মার্ট প্রযুক্তিতে আরও বেশি প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করার কথা বলেন তিনি। এর মাধ্যমে একটি ন্যায্য ও সমতাভিত্তিক জলবায়ু উত্তরণের পথ তৈরি করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন প্রধানমন্ত্রী।
চতুর্থত, সুলভ অর্থায়ন, সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং প্রযুক্তি হস্তান্তরের মাধ্যমে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার সম্প্রসারণের আহ্বান জানান তিনি।
পঞ্চমত, ক্ষয়ক্ষতি ও লোকসান তহবিলের পূর্ণ বাস্তবায়ন নিশ্চিত করার পাশাপাশি নিয়মিতভাবে ওই তহবিলে অর্থ পুনঃপূরণের আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী।
জাতিসংঘের ২০২৬ সালের উচ্চপর্যায়ের সপ্তাহের কর্মসূচিতে ২৩ সেপ্টেম্বর ‘Climate Action and the Just Transition’ বিষয়ক উচ্চপর্যায়ের সভাটি নির্ধারিত ছিল। জাতিসংঘ জানিয়েছে, সভাটির লক্ষ্য ছিল ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের সীমা ধরে রাখতে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা জোরদার, সাশ্রয়ী অর্থায়ন বৃদ্ধি এবং জলবায়ু ন্যায়বিচার ও মানুষের জীবিকা সুরক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপ এগিয়ে নেওয়া।
বাংলাদেশের একার পক্ষে লক্ষ্য অর্জন কঠিন
প্রধানমন্ত্রী তাঁর বক্তব্যে বাংলাদেশের নিজস্ব উদ্যোগের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সহযোগিতার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, এককভাবে বাংলাদেশের পক্ষে জলবায়ু সংক্রান্ত এসব লক্ষ্য অর্জন সম্ভব নয়।
এ ক্ষেত্রে ‘অভিন্ন কিন্তু পৃথক দায়িত্ব ও নিজ নিজ সক্ষমতা’ নীতির ভিত্তিতে সম্মিলিত পদক্ষেপের প্রয়োজন রয়েছে বলে উল্লেখ করেন তিনি।
অর্থাৎ, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবেলায় দেশগুলোর দায়িত্ব ও সক্ষমতার পার্থক্য বিবেচনায় রেখে আন্তর্জাতিক সহযোগিতার কাঠামো আরও কার্যকর করার প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরা হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ তার জলবায়ু পরিকল্পনাগুলো বাস্তবায়নে সহায়তা করবে—এমন অংশীদারি প্রত্যাশা করে। অর্থায়ন, প্রযুক্তি ও সক্ষমতা বৃদ্ধির সহযোগিতাকে তিনি বাংলাদেশের জলবায়ু পরিকল্পনা বাস্তবায়নের সঙ্গে যুক্ত করেছেন।
ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য নিরাপদ বিশ্বের আহ্বান
প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের মূল বার্তায় ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নিরাপত্তা ও টেকসই উন্নয়নের বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। তিনি বিশ্বনেতাদের উদ্দেশে সম্মিলিতভাবে কাজ করার আহ্বান জানিয়ে বলেন, বর্তমান প্রজন্মের দায়িত্ব হলো ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য আরও নিরাপদ ও টেকসই ভবিষ্যৎ তৈরি করা।
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবেলায় বাংলাদেশের অবস্থানও তাঁর বক্তব্যে তুলে ধরা হয়। কম গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ করেও বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনের বড় ঝুঁকিতে রয়েছে—এই বাস্তবতার সঙ্গে অভিযোজন অর্থায়ন, প্রযুক্তি এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার প্রয়োজনীয়তাকে তিনি যুক্ত করেন।
এদিকে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে যোগ দিতে বর্তমানে নিউইয়র্কে অবস্থান করছেন। ২৪ সেপ্টেম্বর সাধারণ বিতর্কে বাংলাদেশের পক্ষে তাঁর বক্তব্য দেওয়ার কথা রয়েছে। জাতিসংঘের সময়সূচি অনুযায়ী, ৮১তম সাধারণ পরিষদের সাধারণ বিতর্ক ২২ থেকে ২৬ সেপ্টেম্বর এবং ২৮ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত হচ্ছে।





