তাহসিফের মৃত্যু ঘিরে নতুন মোড় এনেছে দীপের জিজ্ঞাসাবাদ ও মোটরসাইকেল উদ্ধার। ধাওয়া, নদীতে ঝাঁপ এবং ৮টি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে পিবিআই।
তাহসিফের শেষ কয়েক ঘণ্টা: দীপের নতুন দাবি,—রহস্য কি খুলছে, নাকি আরও ঘনীভূত হচ্ছে? একটি প্রাথমিক অনুসন্ধান প্রচেষ্টা।
রাত ১টা ৩৫ মিনিট।
মায়ের কাছে ভয়েস মেসেজ পাঠিয়েছিলেন বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর সাবেক ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট কে এম তাহসিফ সাউরি।
জানিয়েছিলেন—বাসায় ফিরছেন। কিন্তু তাহসিফ আর ফেরেননি।
পরদিন তুরাগ নদে পাওয়া যায় ২৮ বছর বয়সী এই তরুণের মরদেহ।
প্রথমে সামনে ছিল কয়েকটি প্রশ্ন—তাহসিফের মোটরসাইকেল কোথায়? শেষ রাতে তিনি কার সঙ্গে ছিলেন? কোথা থেকে তাঁর মরদেহ নদীতে এল?
এখন তদন্তে এসেছে নতুন মোড়।

তাহসিফের সঙ্গে সর্বশেষ দেখা যাওয়া তাঁর ‘বন্ধুস্থানীয় ছোট ভাই’ আহমেদ শাহরিয়ার রেজা দীপকে হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন—পিবিআই। পিবিআইয়ের ভাষ্য অনুযায়ী, দীপ দাবি করেছেন—ঘটনাস্থলে তাঁরা কথা বলছিলেন। একপর্যায়ে কিছু লোক তাঁদের ধাওয়া করে। তখন তাহসিফ নদীতে ঝাঁপ দেন এবং দীপ সেখান থেকে পালিয়ে আসেন। আর যে মোটরসাইকেল এত দিন পাওয়া যাচ্ছিল না, মরদেহ উদ্ধারের এলাকার কাছ থেকে পাওয়া গেছে নম্বরপ্লেটবিহীন একটি মোটরসাইকেল। পিবিআই সেটি তাহসিফের কি না যাচাই করছে; প্রাথমিকভাবে তাদের ধারণা, সেটি তাঁরই হতে পারে।
ফলে রহস্যের একটি অংশের সম্ভাব্য উত্তর মিললেও সামনে এসেছে আরও বড় প্রশ্ন—কারা ধাওয়া করেছিল তাহসিফ ও দীপকে? কেন ধাওয়া করেছিল? আর একজন মানুষ নদীতে ঝাঁপ দেওয়ার পর তাঁর সঙ্গে থাকা ব্যক্তি কাউকে না জানিয়ে চলে গেলেন কেন?
দীপের দাবি: ‘তাহসিফ নদীতে ঝাঁপ দেয়, আমি পালিয়ে আসি’ তাহসিফ নিখোঁজ হওয়ার আগে সিসিটিভি ফুটেজে দীপের সঙ্গে তাঁকে দেখা যায়।
উত্তরার বাসার গ্যারেজের সামনে দুজনের দেখা হয়। তাঁরা হাত মেলান। এরপর পৃথক দুটি মোটরসাইকেলে সেখান থেকে বেরিয়ে যান।
তাহসিফের মৃত্যুর পর তাই তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি হয়ে ওঠেন দীপ।
পিবিআই তাঁকে হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করে এবং তাঁকে সঙ্গে নিয়ে রাতভর বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালায়।
জিজ্ঞাসাবাদে দীপের নতুন দাবি—তাঁরা ঘটনাস্থলে কথা বলার সময় কিছু লোক তাঁদের ধাওয়া করে। তাহসিফ তখন নদীতে ঝাঁপ দেন, আর তিনি পালিয়ে যান।
আরও বিস্ময়কর দাবি—দীপ নাকি বলেছেন, ধাওয়াকারীরা পুলিশের লোক ছিলেন।
কিন্তু এই বক্তব্য এখনো প্রমাণিত তথ্য নয়। পিবিআই বলছে, দীপের কাছ থেকে পাওয়া তথ্য যাচাই করা হচ্ছে। আর এখানেই তদন্তের প্রথম বড় প্রশ্ন—যদি সত্যিই তাঁদের ধাওয়া করা হয়ে থাকে, ধাওয়াকারীরা কারা?
‘পুলিশের লোক’—এই দাবি যাচাই করা সম্ভব কি? সম্ভব।
দীপ যে জায়গা ও সময়ের কথা বলছেন, তদন্তকারীদের সামনে এখন কয়েকটি সরাসরি কাজ রয়েছে।
সেই সময় ওই এলাকায় কোনো পুলিশি অভিযান হয়েছিল কি না; কোন ইউনিটের সদস্যরা সেখানে ছিলেন; থানার general diary, patrol log, wireless communication কিংবা duty roster-এ তার রেকর্ড রয়েছে কি না—এসব মিলিয়ে দেখা সম্ভব।
আর ধাওয়াকারীরা পুলিশ না হয়ে অন্য কেউ হলে প্রশ্ন হবে—তাঁরা কারা?
পিবিআই কর্মকর্তাদের একটি ধারণা, রাজাবাড়ী ঘাট এলাকা মাদক কারবারের স্পট হিসেবে পরিচিত হওয়ায় মাদক কারবারিদের ধাওয়ার মুখে তাহসিফ নদীতে পড়ে বা ঝাঁপ দিয়ে থাকতে পারেন।
কিন্তু এটিও এখন পর্যন্ত একটি তদন্তাধীন ধারণা—প্রতিষ্ঠিত ঘটনা নয়।
দীপ পালালেন—তারপর কী করলেন?
এখানেই সম্ভবত দীপের বক্তব্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অমীমাংসিত অংশ।
ধরা যাক, তাঁর বক্তব্য পুরোপুরি সত্য। কিছু লোক তাঁদের ধাওয়া করল।
তাহসিফ নদীতে ঝাঁপ দিলেন। দীপ পালিয়ে গেলেন। তারপর?
তিনি কি ৯৯৯-এ ফোন করেছিলেন?
পুলিশকে জানিয়েছিলেন? তাহসিফের পরিবারকে জানিয়েছিলেন?
কাউকে বলেছিলেন যে একজন মানুষ ধাওয়ার মুখে নদীতে ঝাঁপ দিয়েছেন? যদি না বলে থাকেন—কেন বলেননি? এটা কী গভীর রহস্য নয়। আর তাহসিফ নদীতে ঝাঁপ দেওয়ার পর দীপ কি তাঁকে আবার পানির ওপরে উঠতে দেখেছিলেন? নাকি সেখান থেকে সঙ্গে সঙ্গেই চলে যান?
এই কয়েক মিনিটের বর্ণনাই এখন ঘটনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
আরও বড় প্রশ্ন—দীপের বক্তব্য কি একই ছিল?
প্রকাশিত প্রতিবেদনে পিবিআইয়ের একজন কর্মকর্তা বলেছেন, দীপ জিজ্ঞাসাবাদে একেক সময় একেক রকম কথা বলেছেন।
তাঁর সর্বশেষ বক্তব্যের ভিত্তিতে ঘটনাস্থলে গিয়ে মোটরসাইকেলটি উদ্ধার করা হয়েছে বলেও জানিয়েছে পিবিআই।
এই তথ্য গুরুত্বপূর্ণ। কারণ কোনো সাক্ষীর বক্তব্য পরিবর্তিত হওয়া নিজে অপরাধের প্রমাণ নয়। ভয়, বিভ্রান্তি, স্মৃতির সমস্যা—অনেক কারণেই বক্তব্যে অসঙ্গতি থাকতে পারে।
কিন্তু একজন মানুষের রহস্যজনক মৃত্যুর ঘটনায় শেষ পরিচিত সঙ্গীর বক্তব্য বদলালে তদন্তকারীদের সেই অসঙ্গতিগুলো evidence দিয়ে যাচাই করতেই হবে। কোন বক্তব্যটি CCTV, mobile location এবং অন্য physical evidence-এর সঙ্গে মেলে?
মোটরসাইকেল উদ্ধার—রহস্যের বড় সূত্র। গতকাল পর্যন্ত তাহসিফের মোটরসাইকেলের খোঁজ পাওয়া যাচ্ছিল না।
এখন পিবিআই জানিয়েছে, মরদেহ উদ্ধারের এলাকার কাছাকাছি টঙ্গীর মাজার বস্তি থেকে নম্বরপ্লেটবিহীন একটি মোটরসাইকেল উদ্ধার করা হয়েছে। CCTV ফুটেজেও দেখা যায়, তাহসিফ যে মোটরসাইকেল নিয়ে বেরিয়েছিলেন সেটির পেছনে নম্বরপ্লেট ছিল না। উদ্ধার করা মোটরসাইকেলটিরও নম্বরপ্লেট নেই। পিবিআই প্রাথমিকভাবে মনে করছে এটি তাহসিফের হতে পারে, তবে যাচাই চলছে।
মোটরসাইকেলটি তাঁর বলে নিশ্চিত হলে তদন্তের timeline অনেকটাই বদলে যাবে। কারণ তখন অন্তত একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যাবে—তাহসিফ নিজে বা তাঁর মোটরসাইকেল ঘটনাস্থলের কাছাকাছি পৌঁছেছিল।
কিন্তু এরপর নতুন প্রশ্ন—মোটরসাইকেলটি সেখানে কে রেখেছিল?
তাহসিফ? নাকি অন্য কেউ? চাবি কোথায় পাওয়া গেছে?
বাইক থেকে fingerprint, DNA বা অন্য কোনো forensic evidence পাওয়া গেছে কি?
রাত ১টা ৩৫ মিনিটের ভয়েস মেসেজ এখন আরও গুরুত্বপূর্ণ
পরিবারের তথ্য অনুযায়ী, তাহসিফ রাত ১টা ৩৫ মিনিটে মাকে জানিয়েছিলেন—তিনি বাসায় ফিরছেন।
দীপের নতুন বক্তব্য সামনে আসার পর এই ভয়েস মেসেজের location অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
বার্তাটি পাঠানোর সময় তাহসিফ কোথায় ছিলেন? রাজাবাড়ী ঘাট বা মাজার বস্তির কাছাকাছি? নাকি অন্য কোথাও?
মোবাইলের cell-site information, location data এবং digital forensic examination দিয়ে এই প্রশ্নের উত্তর পাওয়া সম্ভব হতে পারে।

এটি জানা গেলে দীপের timeline-এর সঙ্গে তাহসিফের digital footprint মিলিয়ে দেখা যাবে। মরদেহ যেখানে পাওয়া গেছে, সেখানেই কি তিনি নদীতে ঝাঁপ দিয়েছিলেন? এখানেও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন রয়ে গেছে।
The Daily Star-এর ঘটনাস্থলভিত্তিক প্রতিবেদনে একজন প্রত্যক্ষদর্শী বলেছেন, মরদেহটি নদীর পশ্চিম দিক থেকে ভেসে এসে ঘাটে বাঁধা একটি স্পিডবোটে আটকে যায়। অর্থাৎ recovery point-ই যে পানিতে নামার বা পড়ার জায়গা—এটি ধরে নেওয়া যায় না। এখন দীপ যে স্থানকে ঘটনাস্থল হিসেবে দেখাচ্ছেন, সেই জায়গা এবং মরদেহ উদ্ধারের জায়গার সম্পর্ক নির্ণয় করা জরুরি। নদীর স্রোতের দিক, পানির গতি এবং সম্ভাব্য drift time—এসব ফরেনসিকভাবে মিললে দীপের বক্তব্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ যাচাই করা সম্ভব। তাহসিফ সাঁতার জানতেন—বাবার নতুন প্রশ্ন। দীপের বক্তব্য মানতে নারাজ তাহসিফের বাবা এ কে এম এনায়েতুল করিম। তাঁর বক্তব্য—তাহসিফ শুধু সাঁতার জানতেনই না, বিমানবাহিনীর পাইলট হিসেবে সাঁতারের প্রশিক্ষণও নিয়েছিলেন এবং এ বিষয়ে তাঁর সনদ ছিল। বাবার প্রশ্ন—কেন তাঁকে ধাওয়া করা হবে এবং সাঁতার জানা একজন মানুষ নদীতে ঝাঁপ দিয়ে কীভাবে মারা গেলেন?
তবে সাঁতার জানা মানেই পানিতে মৃত্যু অসম্ভব—এ সিদ্ধান্তও বৈজ্ঞানিকভাবে দেওয়া যায় না। রাতের পরিবেশ, স্রোত, শারীরিক অবস্থা, আঘাত, মাদক বা বিষাক্ত পদার্থের উপস্থিতি কিংবা অন্য কোনো পরিস্থিতি ছিল কি না—এসব জানতে ফরেনসিক রিপোর্ট প্রয়োজন।
তাই বাবার বক্তব্য একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলছে, কিন্তু মৃত্যুর ধরন নির্ধারণ করছে না। শরীরে বাহ্যিক আঘাত নেই—তবু ফরেনসিক রিপোর্টই মূল
পুলিশের প্রাথমিক সুরতহালে তাহসিফের শরীরে বড় ধরনের দৃশ্যমান বাহ্যিক আঘাতের কথা পাওয়া যায়নি। কিন্তু বাহ্যিক আঘাত না থাকা দিয়ে হত্যা, দুর্ঘটনা কিংবা পানিতে ডুবে মৃত্যু—কোনোটিই এককভাবে প্রমাণ বা বাতিল করা যায় না।
ময়নাতদন্ত ও প্রয়োজনীয় পরীক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ হবে—
মৃত্যুর প্রকৃত কারণ কী? তাহসিফ জীবিত অবস্থায় পানিতে গিয়েছিলেন কি না?
শরীরে এমন কোনো অভ্যন্তরীণ আঘাত ছিল কি না যা বাইরে থেকে দৃশ্যমান নয়? রক্ত বা শরীরে alcohol, sedative, narcotic বা অন্য কোনো toxic substance ছিল কি না? মৃত্যুর সম্ভাব্য সময় কখন?
এই উত্তরগুলো ছাড়া কোনো একটি theory-কে চূড়ান্ত বলা ঝুঁকিপূর্ণ।
তাহলে তদন্ত এখন কোথায় দাঁড়াল? গতকাল পর্যন্ত সবচেয়ে বড় রহস্য ছিল। তাহসিফ কোথায় গিয়েছিলেন এবং তাঁর মোটরসাইকেল কোথায়?
দীপ হেফাজতে। একটি সম্ভাব্য ঘটনাস্থল সামনে এসেছে।
মোটরসাইকেলও পাওয়া গেছে। এবং প্রথমবারের মতো শেষ রাতের একটি সম্ভাব্য narrative পাওয়া গেছে। ধাওয়া → নদীতে ঝাঁপ → দীপের পালিয়ে যাওয়া। কিন্তু narrative আর evidence এক জিনিস নয়।
এখন এই বর্ণনাকে যাচাই করতে হবে CCTV, mobile location, call records, police records, প্রত্যক্ষদর্শী, উদ্ধার মোটরসাইকেলের forensic examination এবং ময়নাতদন্তের ফল দিয়ে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন এখন সম্ভবত আটটি—
এক. তাহসিফ ও দীপ ওই রাতে রাজাবাড়ী ঘাট এলাকায় কেন গিয়েছিলেন?
দুই. তাঁদের সত্যিই কেউ ধাওয়া করেছিল কি?
তিন. করে থাকলে তারা কারা—পুলিশ, মাদক কারবারি, নাকি অন্য কেউ?
চার. দীপ কেন তাহসিফকে নদীতে রেখে চলে গেলেন এবং পরে কাকে ঘটনাটি জানিয়েছিলেন?
পাঁচ. দীপের বক্তব্য কেন বদলেছে বলে পিবিআই বলছে?
ছয়. রাত ১টা ৩৫ মিনিটের voice message পাঠানোর সময় তাহসিফের অবস্থান কোথায় ছিল?
সাত. উদ্ধার মোটরসাইকেলের forensic evidence কী বলছে?
আট. সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—ময়নাতদন্ত ও toxicology কি বলছে তাহসিফ কীভাবে মারা গেছেন?
তাই নতুন তথ্য রহস্যের সমাধান করেছে—এ কথা বলার সময় এখনো আসেনি। বরং তদন্ত এখন এমন একটি পর্যায়ে পৌঁছেছে যেখানে একটি নির্দিষ্ট বর্ণনা সামনে এসেছে।
সেই বর্ণনা সত্য কি না, সেটিই এখন প্রমাণ করার পালা।
কারণ শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি শুধু—
তাহসিফ নদীতে ঝাঁপ দিয়েছিলেন কি না—তা নয়।
প্রশ্ন হলো—কেন তাঁকে নদীতে ঝাঁপ দিতে হলো, কারা তাঁকে ধাওয়া করেছিল, তাঁর পাশে থাকা মানুষটি কেন সাহায্য না ডেকে চলে গেলেন এবং সেই রাতের প্রতিটি মিনিটের সঙ্গে physical ও digital evidence মেলে কি না।
এই উত্তরগুলো পাওয়া গেলেই বোঝা যাবে—
তুরাগে তাহসিফের মৃত্যু একটি মর্মান্তিক দুর্ঘটনা, নাকি এর পেছনে রয়েছে আরও গভীর কোনো ঘটনা।





