১৩৩৯ বিলাসবহুল গাড়ির তথ্য নেই আয়কর নথিতে, অনুসন্ধানে এনবিআর, ৫৪৮৯টির মধ্যে ১৩৩৯টির তথ্য কর নথিতে নেই; রিটার্ন, আয় ও সম্পদের অসামঞ্জস্য খুঁজে এখন ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
দেশে থাকা উচ্চমূল্যের বিলাসবহুল গাড়ি মালিকদের আয়কর নথির সঙ্গে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) তথ্য মিলিয়ে দেখার উদ্যোগ নিয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। এনবিআরের সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স সেল (সিআইসি) ও বিআরটিএর তথ্য বিশ্লেষণে প্রায় ৫ হাজার ৪৮৯টি উচ্চমূল্যের বা বিলাসবহুল গাড়ির তথ্য পাওয়া গেছে। এর মধ্যে এক হাজার ৩৩৯টির বেশি গাড়ির তথ্য মালিকদের আয়কর নথিতে অপ্রদর্শিত অবস্থায় রয়েছে।
সম্প্রতি কর কমিশনারদের সঙ্গে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে এনবিআরের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান আহসান হাবিব মাঠপর্যায়ের কর কর্মকর্তাদের এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার নির্দেশ দেন। উদ্দেশ্য হলো—যেসব বিলাসবহুল গাড়ি মালিক নিয়মিত আয়কর রিটার্ন দাখিল করছেন না অথবা রিটার্নে গাড়ির তথ্য দেখাননি, তাঁদের শনাক্ত করা।
এনবিআরের নির্দেশনায় শুধু গাড়ির মালিকানা যাচাই নয়, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির ঘোষিত আয় ও সম্পদের সঙ্গে গাড়ির মূল্যের সামঞ্জস্যও পরীক্ষা করার কথা বলা হয়েছে।
৫৪৮৯ বিলাসবহুল গাড়ির তথ্য বিশ্লেষণ

এনবিআরের তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রায় ৫ হাজার ৪৮৯টি উচ্চমূল্যের বা বিলাসবহুল গাড়ি রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ২ হাজার ৭১৯টি গাড়ি সংশ্লিষ্ট মালিকদের আয়কর নথিতে ঘোষণা করা হয়েছে।
অন্যদিকে, এক হাজার ৩৩৯টির বেশি গাড়ির তথ্য কর নথিতে অপ্রদর্শিত অবস্থায় পাওয়া গেছে। সিআইসি ও বিআরটিএর বিভিন্ন তথ্য বিশ্লেষণ করে এই চিত্র পাওয়া যায়।
এখানে মূল বিষয় হচ্ছে, কোনো ব্যক্তির নামে বিআরটিএতে বিলাসবহুল গাড়ি নিবন্ধিত থাকলেও সেটির তথ্য তাঁর আয়কর নথিতে পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে গাড়ির মালিকানা ও কর নথির মধ্যে যে পার্থক্য তৈরি হয়েছে, সেটিই এখন এনবিআরের যাচাইয়ের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
এনবিআরের কর্মকর্তারা মনে করছেন, বিআরটিএর মালিকানা-সংক্রান্ত তথ্য আয়কর নথির সঙ্গে সমন্বয় করলে করদাতাদের আয়, সম্পদ ও গাড়ির মালিকানার মধ্যে সম্ভাব্য অসামঞ্জস্য শনাক্ত করা সহজ হতে পারে।
বিলাসবহুল গাড়ির তথ্য কেন যাচাই করছে এনবিআর
কোনো ব্যক্তির ঘোষিত আয় ও সম্পদের তুলনায় তাঁর মালিকানাধীন বিলাসবহুল গাড়ি অত্যন্ত উচ্চমূল্যের হলে বিষয়টি কর কর্মকর্তাদের কাছে যাচাইয়ের প্রয়োজন তৈরি করতে পারে। কারণ এসব গাড়ির প্রতিটির দাম এনবিআরের কর্মকর্তাদের প্রাথমিক ধারণা অনুযায়ী এক কোটি থেকে ১০ কোটি টাকা বা তারও বেশি হতে পারে।
তবে গাড়ির মূল্য ও মালিকের আয়-সম্পদের মধ্যে অসামঞ্জস্য থাকলেই সেটিকে কর ফাঁকি হিসেবে চূড়ান্তভাবে ধরে নেওয়া হচ্ছে না। বরং এমন পরিস্থিতিকে সম্ভাব্য অসামঞ্জস্যের একটি ইঙ্গিত হিসেবে দেখে প্রয়োজনীয় তথ্য যাচাই করা হবে।
কর কর্মকর্তারা দেখতে চাইবেন, গাড়িটি কেনার অর্থের উৎস কী ছিল এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির আয়কর রিটার্নে গাড়িটির তথ্য যথাযথভাবে উল্লেখ করা হয়েছে কি না।
এভাবে বিলাসবহুল গাড়ি মালিকদের তথ্য যাচাইয়ের মাধ্যমে কর নথিতে অনুপস্থিত সম্পদ বা রিটার্ন দাখিল না করার বিষয়গুলো শনাক্ত করার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
কোন কোন ব্র্যান্ডের গাড়ি রয়েছে তালিকায়
সিআইসির পাওয়া এক হাজার ৩৩৯টি কর নথিতে অপ্রদর্শিত গাড়ির মধ্যে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডের গাড়ি রয়েছে। তালিকায় টয়োটা, বিএমডব্লিউ, মার্সিডিস বেঞ্জ, জিপ, ল্যান্ড রোভার, অডি, রেঞ্জ রোভার, পোর্শে, জাগুয়ার, বেন্টলি, রোলস রয়েস, ক্যাডিলাক, মাসেরাতি, টেসলা, ফেরারি ও ল্যাম্বরগিনির মতো ব্র্যান্ডের গাড়ির তথ্য রয়েছে।
এসব বিলাসবহুল গাড়ি সাধারণত উচ্চমূল্যের হওয়ায় এগুলোর মালিকানা এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির আয়-সম্পদের তথ্য পর্যালোচনাকে গুরুত্ব দিচ্ছে এনবিআর।
গাড়ির ইঞ্জিন ক্ষমতা ও সিসির ওপর নির্ভর করে এসব গাড়ি আমদানিতে শুল্ক-করও তুলনামূলক বেশি হয়। ফলে গাড়ির মালিকানা, ক্রয়মূল্য এবং মালিকের আয়কর নথির তথ্য পরস্পরের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না, তা যাচাই করা কর কর্মকর্তাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
গত বছরও ৪০৯ গাড়ির মালিকের সন্ধান পেয়েছিল সিআইসি
বিলাসবহুল গাড়ির মালিকদের কর নথির আওতায় আনার বিষয়টি নতুন নয়। এর আগে গত বছর সিআইসি ৪০৯ জন গাড়ির মালিকের সন্ধান পেয়েছিল।
তাঁরা বিপুল অর্থ ব্যয়ে বিলাসবহুল গাড়ি কিনে ব্যবহার করছিলেন এবং বিআরটিএ থেকে গাড়ির নিবন্ধনও নিয়েছিলেন। কিন্তু তাঁদের আয়কর রিটার্ন দাখিলের তথ্য পাওয়া যায়নি।
অর্থাৎ, গাড়ির মালিকানা থাকলেও এসব ব্যক্তি আয়কর নথির আওতায় ছিলেন না—এমন তথ্য পেয়েছিল সিআইসি।
এর পাশাপাশি সিআইসি কর নথিতে দেখানো হয়নি—এমন এক হাজার ৩৩৯টি গাড়ির তথ্যও পেয়েছে। এবার এসব তথ্যের ভিত্তিতে মাঠপর্যায়ের কর কর্মকর্তাদের আরও বিস্তৃতভাবে যাচাই করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
কর কর্মকর্তারা কী যাচাই করবেন
এনবিআরের নির্দেশনা অনুযায়ী, প্রতিটি কর অঞ্চলের অনুসন্ধান ও তদন্তদল নিজ নিজ এলাকায় উচ্চমূল্যের গাড়ির মালিকদের তথ্য যাচাই করবে।
প্রথমত, কোনো বিলাসবহুল গাড়ি মালিক নিয়মিত আয়কর রিটার্ন দাখিল করছেন কি না, তা দেখা হবে। এরপর তাঁর রিটার্নে গাড়িটির তথ্য যথাযথভাবে উল্লেখ করা হয়েছে কি না, সেটিও পরীক্ষা করা হবে।
এর সঙ্গে ঘোষিত আয় ও সম্পদের তথ্যের সঙ্গে গাড়ির মূল্য সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না, সেটিও বিবেচনায় নেওয়া হবে।
যদি বড় ধরনের অসামঞ্জস্য পাওয়া যায়, তাহলে গাড়ি কেনার অর্থের উৎসসহ সংশ্লিষ্ট আর্থিক তথ্য যাচাইয়ের সুযোগ থাকবে। তবে যাচাইয়ের ফলের ভিত্তিতেই পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এনবিআরের লক্ষ্য হচ্ছে তথ্যের বিভিন্ন উৎসের মধ্যে সমন্বয় করে করদাতার প্রকৃত আর্থিক অবস্থার সঙ্গে আয়কর নথির সামঞ্জস্য যাচাই করা।
শুধু বিলাসবহুল গাড়ি নয়, নজরদারি বাড়ছে অন্য ক্ষেত্রেও
আয়কর রিটার্নের আওতা বাড়ানোর অংশ হিসেবে শুধু বিলাসবহুল গাড়ি মালিকদের তথ্য যাচাইয়ের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি। এনবিআর আরও কয়েকটি ক্ষেত্রেও নজরদারি বাড়ানোর নির্দেশ দিয়েছে।
এর মধ্যে উৎসে কর কর্তনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রম তদারকি এবং সঞ্চয়পত্রধারীদের আয়কর রিটার্ন দাখিল নিশ্চিত করার বিষয় রয়েছে।
কর কমিশনারদের সঙ্গে বৈঠকে কর ফাঁকি শনাক্তে কর অঞ্চলের অনুসন্ধান ও তদন্তদলকে আরও সক্রিয় করার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
অর্থাৎ, আয়কর রিটার্নের আওতা বাড়াতে এনবিআর বিভিন্ন সরকারি ও প্রাতিষ্ঠানিক তথ্যকে কাজে লাগানোর দিকে গুরুত্ব দিচ্ছে।
তথ্য সমন্বয়ের মাধ্যমে কর ফাঁকি শনাক্তের চেষ্টা
এনবিআরের কর্মকর্তাদের মতে, বিভিন্ন সরকারি সংস্থার তথ্যের সঙ্গে আয়কর নথির তথ্য সমন্বয় করা হলে সম্ভাব্য কর ফাঁকির ঘটনা শনাক্ত করা সহজ হতে পারে।
বিশেষ করে বিআরটিএতে থাকা গাড়ির মালিকানা-সংক্রান্ত তথ্য কর কর্মকর্তাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি তথ্যসূত্র হতে পারে। কোনো ব্যক্তির নামে উচ্চমূল্যের বিলাসবহুল গাড়ি নিবন্ধিত থাকার তথ্য পাওয়া গেলে সেটি তাঁর আয়কর নথির সঙ্গে মিলিয়ে দেখা সম্ভব।
এই প্রক্রিয়ায় রিটার্ন দাখিল না করা ব্যক্তি কিংবা রিটার্নে গাড়ির তথ্য অপ্রদর্শিত রাখা হয়েছে কি না, তা শনাক্ত করার সুযোগ তৈরি হবে।
এনবিআরের এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য তাই শুধু গাড়ির মালিকদের খুঁজে বের করা নয়; বরং আয়, সম্পদ ও মালিকানার তথ্যের মধ্যে সামঞ্জস্য যাচাই করে আয়কর রিটার্নের আওতা বাড়ানো।
কর ব্যবস্থাপনায় সম্ভাব্য প্রভাব
উচ্চমূল্যের সম্পদ ও আয়কর নথির তথ্যের মধ্যে সমন্বয় বাড়াতে পারলে কর প্রশাসনের তথ্যভিত্তিক অনুসন্ধান আরও কার্যকর হতে পারে। বিলাসবহুল গাড়ি মালিকদের তথ্য যাচাই সেই বৃহত্তর প্রক্রিয়ার একটি অংশ।
তবে কোনো ব্যক্তির গাড়ির মালিকানা বা উচ্চমূল্যের সম্পদ থাকাই কর ফাঁকির প্রমাণ নয়। এনবিআরের নির্দেশনার মূল বিষয় হলো এসব তথ্যের সঙ্গে আয়কর রিটার্নের তথ্য মিলিয়ে সম্ভাব্য অসামঞ্জস্য চিহ্নিত করা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী তা যাচাই করা।
সব মিলিয়ে, বিআরটিএর গাড়ির মালিকানা তথ্যের সঙ্গে আয়কর নথি মিলিয়ে বিলাসবহুল গাড়ি মালিকদের তথ্য যাচাই এখন এনবিআরের কর নজরদারির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে। এক হাজার ৩৩৯টির বেশি গাড়ির তথ্য কর নথিতে অপ্রদর্শিত পাওয়ার পর মাঠপর্যায়ে যাচাইয়ের এই উদ্যোগ কতটা কার্যকর হয়, সেটিই এখন দেখার বিষয়।





