রপ্তানির আগে ঋণ পুনরর্থায়ন তহবিল ৫ হাজার কোটি থেকে ৭ হাজার কোটি করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। নতুন ঋণে গ্রাহক পর্যায়ে সর্বোচ্চ সুদ ৬ শতাংশ।
রপ্তানিমুখী শিল্পের রপ্তানির আগে ঋণ পুনরর্থায়ন তহবিল ৫ হাজার কোটি টাকা থেকে বাড়িয়ে ৭ হাজার কোটি টাকা করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। একই সঙ্গে এ স্কিমের আওতায় নতুন ঋণ সুবিধায় গ্রাহক পর্যায়ে সুদের হার সর্বোচ্চ ৬ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে। আগে এই হার ছিল ৫ শতাংশ। বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যাংকিং প্রবিধান ও নীতি বিভাগ-১ থেকে জারি করা সার্কুলারে এসব নির্দেশনা দেওয়া হয়।
বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, রপ্তানিমুখী শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোকে প্রি-শিপমেন্ট ক্রেডিট বা রপ্তানির আগে ঋণ সহায়তা দেওয়ার মাধ্যমে রপ্তানি কার্যক্রম অব্যাহত রাখা এবং বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন বাড়ানোর লক্ষ্যেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
রপ্তানির আগে ঋণ পুনরর্থায়ন তহবিলে আরও ২ হাজার কোটি টাকা
সার্কুলার অনুযায়ী, বাংলাদেশ ব্যাংকের নিজস্ব তহবিল থেকে গঠিত ১০ হাজার কোটি টাকার রপ্তানি সহায়তায় প্রাক-অর্থায়ন তহবিল বা ইএফপিএফ থেকে আরও ২ হাজার কোটি টাকা প্রি-শিপমেন্ট ক্রেডিট পুনরর্থায়ন স্কিমে স্থানান্তর করা হয়েছে।
এর ফলে রপ্তানির আগে ঋণ পুনরর্থায়ন স্কিমের মোট তহবিল বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭ হাজার কোটি টাকা। একই সঙ্গে ইএফপিএফের অবশিষ্ট তহবিলের পরিমাণ নির্ধারণ করা হয়েছে ৩ হাজার কোটি টাকা।
অর্থাৎ, আগে যে ৫ হাজার কোটি টাকা প্রি-শিপমেন্ট ক্রেডিট পুনরর্থায়নের জন্য নির্ধারিত ছিল, তার সঙ্গে আরও ২ হাজার কোটি টাকা যুক্ত হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন নির্দেশনা অনুযায়ী, এই বর্ধিত তহবিলের আওতায় অংশগ্রহণকারী ব্যাংকগুলো রপ্তানিমুখী শিল্পপ্রতিষ্ঠানকে প্রি-শিপমেন্ট ক্রেডিট সুবিধা দিতে পারবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ১ অক্টোবর ২০২৬ তারিখের সার্কুলার তালিকাতেও প্রি-শিপমেন্ট ক্রেডিট পুনরর্থায়ন স্কিমের তহবিল ও সুদের হার পুনর্নির্ধারণের নির্দেশনা প্রকাশিত হয়েছে।
নতুন ঋণে সর্বোচ্চ ৬ শতাংশ সুদ
নতুন ঋণ সুবিধার ক্ষেত্রে গ্রাহক পর্যায়ে সুদের হারেও পরিবর্তন আনা হয়েছে। নতুন নির্দেশনা অনুযায়ী, অংশগ্রহণকারী ব্যাংকগুলো গ্রাহকদের কাছ থেকে সর্বোচ্চ ৬ শতাংশ সুদ নিতে পারবে।
এর আগে গ্রাহক পর্যায়ে এই সুদের হার সর্বোচ্চ ৫ শতাংশ ছিল। ফলে নতুন ঋণ সুবিধার ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ সুদের সীমা ১ শতাংশ পয়েন্ট বাড়ানো হয়েছে।
অন্যদিকে, বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে রপ্তানির আগে ঋণ পুনরর্থায়ন সুবিধা নেওয়ার বিপরীতে অংশগ্রহণকারী ব্যাংককে ৩ শতাংশ সুদ দিতে হবে। আগে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে পুনরর্থায়ন সুবিধা নেওয়ার ক্ষেত্রে এই হার ছিল ২ শতাংশ।
এভাবে নতুন নির্দেশনায় একদিকে পুনরর্থায়ন তহবিলের আকার বাড়ানো হয়েছে, অন্যদিকে গ্রাহক ও অংশগ্রহণকারী ব্যাংকের জন্য প্রযোজ্য সুদের হারও পুনর্নির্ধারণ করা হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের পুনরর্থায়ন ব্যবস্থায় নতুন কাঠামো
প্রি-শিপমেন্ট ক্রেডিট মূলত রপ্তানির আগে প্রয়োজনীয় অর্থায়ন সুবিধার সঙ্গে সম্পর্কিত। এই স্কিমের মাধ্যমে রপ্তানিমুখী শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোকে ব্যাংকের মাধ্যমে ঋণ সহায়তা দেওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে।
নতুন সার্কুলারের মাধ্যমে রপ্তানির আগে ঋণ পুনরর্থায়ন তহবিলের পরিমাণ ৭ হাজার কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। একই সঙ্গে এ সুবিধার আওতায় নতুন ঋণের সর্বোচ্চ গ্রাহক সুদ ৬ শতাংশ এবং বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে পুনরর্থায়নের ক্ষেত্রে ব্যাংকের জন্য সুদ ৩ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের আগের নির্দেশনাতেও প্রি-শিপমেন্ট ক্রেডিট পুনরর্থায়ন স্কিমের জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিজস্ব তহবিল ব্যবহারের কাঠামো ছিল।
সময়মতো অর্থ পরিশোধ না করলে ব্যাংক রেটে সুদ
সার্কুলারে পুনরর্থায়নের অর্থ পরিশোধের বিষয়েও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী কোনো ব্যাংক পুনরর্থায়নের অর্থ পরিশোধ করতে ব্যর্থ হলে অনাদায়ী সময়ের জন্য ব্যাংক রেটে সুদ দিতে হবে।
অর্থাৎ, বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে নেওয়া পুনরর্থায়নের অর্থ নির্ধারিত সময়ের মধ্যে পরিশোধ না করলে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের ওপর অতিরিক্ত সুদের দায় তৈরি হবে।
এই ব্যবস্থার পাশাপাশি পুনরর্থায়ন সুবিধা নেওয়া ব্যাংককে মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই নেওয়া অর্থের পুরোটা পরিশোধ বা আংশিক সমন্বয়ের সুযোগ দেওয়া হয়েছে। ফলে ব্যাংকগুলো চাইলে নির্ধারিত মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই অর্থ পরিশোধ করতে পারবে অথবা আংশিকভাবে সমন্বয় করতে পারবে।
আগাম পরিশোধ ও আংশিক সমন্বয়ের সুযোগ
বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন নির্দেশনায় পুনরর্থায়ন সুবিধা গ্রহণকারী ব্যাংকের জন্য আগাম পরিশোধের সুযোগ রাখা হয়েছে। ব্যাংক চাইলে মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে নেওয়া অর্থের পুরোটা পরিশোধ করতে পারবে।
একইভাবে, প্রয়োজন অনুযায়ী নেওয়া অর্থের একটি অংশও সমন্বয় করা যাবে। ফলে রপ্তানির আগে ঋণ পুনরর্থায়ন সুবিধার অর্থ ব্যবস্থাপনায় অংশগ্রহণকারী ব্যাংকের জন্য এই দুটি বিকল্প থাকছে।
তবে পুনরর্থায়ন সুবিধার অন্যান্য নির্দেশনা আগের মতোই বহাল থাকবে বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। অর্থাৎ নতুন সার্কুলারে যেসব বিষয়ে পরিবর্তন আনা হয়েছে, সেগুলো ছাড়া প্রি-শিপমেন্ট ক্রেডিট পুনরর্থায়ন স্কিমের অন্যান্য নিয়ম অপরিবর্তিত থাকবে।
কেন তহবিল বাড়ানো হলো
বাংলাদেশ ব্যাংকের সার্কুলারে সিদ্ধান্তটির উদ্দেশ্যও স্পষ্ট করা হয়েছে। রপ্তানিমুখী শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোকে প্রি-শিপমেন্ট ক্রেডিটের মাধ্যমে ঋণ সহায়তা দিয়ে রপ্তানি কার্যক্রম অব্যাহত রাখা এবং বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন বাড়ানোর লক্ষ্যে এই পরিবর্তন আনা হয়েছে।
এই দৃষ্টিকোণ থেকে ৫ হাজার কোটি টাকার বিদ্যমান তহবিলের সঙ্গে আরও ২ হাজার কোটি টাকা যুক্ত করায় স্কিমটির মোট আকার দাঁড়িয়েছে ৭ হাজার কোটি টাকা।
এতে রপ্তানির আগে ঋণ পুনরর্থায়ন সুবিধার আওতায় অতিরিক্ত ২ হাজার কোটি টাকার অর্থায়ন কাঠামো যুক্ত হলো। একই সঙ্গে ইএফপিএফে ৩ হাজার কোটি টাকা অবশিষ্ট থাকছে।
নতুন নির্দেশনা অবিলম্বে কার্যকর
বাংলাদেশ ব্যাংকের সার্কুলারে বলা হয়েছে, নতুন নির্দেশনা অবিলম্বে কার্যকর হবে। ফলে তহবিলের পরিমাণ বৃদ্ধি, নতুন ঋণে সর্বোচ্চ ৬ শতাংশ সুদ, বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে পুনরর্থায়নের ক্ষেত্রে ৩ শতাংশ সুদ এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যে অর্থ পরিশোধের নিয়ম—সবই নতুন নির্দেশনা অনুযায়ী প্রযোজ্য হবে।
রপ্তানিমুখী শিল্পের জন্য রপ্তানির আগে ঋণ পুনরর্থায়ন ব্যবস্থার এই পরিবর্তনের মূল বিষয় হলো তহবিলের পরিমাণ বৃদ্ধি এবং সুদের হার পুনর্নির্ধারণ। একই সঙ্গে ব্যাংকগুলোর জন্য আগাম পরিশোধ বা আংশিক সমন্বয়ের সুযোগ রাখা হয়েছে।
সংক্ষেপে পরিবর্তনগুলো
- পুনরর্থায়ন তহবিল: ৫ হাজার কোটি → ৭ হাজার কোটি টাকা
- ইএফপিএফ থেকে স্থানান্তর: আরও ২ হাজার কোটি টাকা
- ইএফপিএফে অবশিষ্ট: ৩ হাজার কোটি টাকা
- গ্রাহক পর্যায়ে নতুন ঋণের সর্বোচ্চ সুদ: ৬ শতাংশ
- আগে গ্রাহক পর্যায়ে সুদ ছিল: ৫ শতাংশ
- বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে পুনরর্থায়নে ব্যাংকের সুদ: ৩ শতাংশ
- আগে ব্যাংকের জন্য এই হার ছিল: ২ শতাংশ
- নির্ধারিত সময়ে অর্থ পরিশোধে ব্যর্থ হলে: অনাদায়ী সময়ের জন্য ব্যাংক রেটে সুদ
- মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে: পুরো অর্থ পরিশোধ বা আংশিক সমন্বয়ের সুযোগ
- নতুন নির্দেশনা: অবিলম্বে কার্যকর





