এইমাত্র

আরও খবর

News Photocard (13)
মহানগর এক্সপ্রেসের নতুন রুট: এক ট্রেনেই কক্সবাজারে যেতে পারবে ৫ জেলার মানুষ
News Photocard (9)
ফেনীতে মাকে কুপিয়ে হত্যা, মেয়ে আটক
News Photocard (48)
বিদেশের কারাগারে ১৫ হাজারের বেশি বাংলাদেশি, সহায়তা নিয়ে অভিযোগ
News Photocard (27)
মন্ত্রিত্ব ছাড়লেন ইশরাক,মাদক বিরোধী অভিযান নিয়ে অবস্থানে অনড়
News Photocard (15)
বাংলাদেশে ৪৫ মিলিয়ন কানাডিয়ান ডলার বিনিয়োগের ঘোষণা কানাডার

শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ঘোষণা কতটা বাস্তব, কতটা প্রস্তুত নেতা-কর্মীরা

শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ঘোষণা কতটা বাস্তব, কতটা প্রস্তুত নেতা-কর্মীরা, শেখ হাসিনার দেশে ফেরা নিয়ে নতুন আলোচনা শুরু হয়েছে। ডিসেম্বরের ঘোষণার বাস্তবতা, আওয়ামী লীগের প্রস্তুতি ও রাজনৈতিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করেছে এই প্রতিবেদন।

ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ হাসিনা আগামী ডিসেম্বরে বাংলাদেশে ফিরে আদালতে আত্মসমর্পণের ঘোষণা দিয়েছেন। যুক্তরাজ্যভিত্তিক বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে দেওয়া এক টেলিফোন সাক্ষাৎকারে তিনি এই ঘোষণা দেন। একই সঙ্গে বিদেশে অবস্থানরত আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদেরও দেশে ফেরার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। তবে শেখ হাসিনার দেশে ফেরা বাস্তব কোনো রাজনৈতিক পরিকল্পনা, নাকি দলকে সক্রিয় করার কৌশল—এ নিয়ে আওয়ামী লীগের ভেতরেই রয়েছে নানা প্রশ্ন।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মুখে ক্ষমতা ছাড়ার পর শেখ হাসিনা ভারত চলে যান। এর মাধ্যমে তাঁর দীর্ঘ সাড়ে ১৫ বছরের শাসনের অবসান ঘটে। জাতিসংঘের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জুলাই-আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানে প্রায় ১ হাজার ৪০০ মানুষ নিহত হয়েছেন।

ক্ষমতাচ্যুতির পর আওয়ামী লীগের শীর্ষ পর্যায়ের অনেক নেতা, সাবেক মন্ত্রী, সংসদ সদস্য ও তৃণমূলের বহু কর্মী আত্মগোপনে চলে যান। অনেকে ভারত, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশে অবস্থান করছেন। দেশে থাকা অনেক নেতা-কর্মী গ্রেপ্তার হয়েছেন। গত বছরের মে মাসে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা হয়। বর্তমানে দলটির রাজনৈতিক কার্যক্রম মূলত অনলাইনভিত্তিক।

শেখ হাসিনার দেশে ফেরা নিয়ে নতুন রাজনৈতিক আলোচনা

রয়টার্সকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা বলেন, তিনি এবং আওয়ামী লীগের অন্য নেতারা স্বেচ্ছায় দেশে ফিরে আদালতে আত্মসমর্পণ করতে চান। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, তিনি দেশে ফিরতে প্রস্তুত এবং নিজের দেশের মাটিতেই জীবনের শেষ সময় কাটাতে চান।

শেখ হাসিনা বলেন,

তাঁর দলের নেতা-কর্মীদের ওপর দমন-পীড়ন চলছে এবং তিনি দেশে ফিরে বিচারপ্রক্রিয়ার মুখোমুখি হতে চান। তিনি আরও বলেন, বিচার শুরু হলে দেশের মানুষ আদালতের কার্যক্রম সম্পর্কে ধারণা পাবে।

তবে আওয়ামী লীগের দায়িত্বশীল কয়েকজন নেতা মনে করছেন, ডিসেম্বরের সময়সীমা প্রতীকীও হতে পারে। তাঁদের মতে, এই ঘোষণার মাধ্যমে নেতা-কর্মীদের মধ্যে উৎসাহ তৈরি করা, দলীয় নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের দাবি জোরালো করা এবং রাজনৈতিক পরিসর ফিরে পাওয়ার চেষ্টা থাকতে পারে।

এর আগে গত ২৮ জুন ভারতীয় গণমাধ্যম এনডিটিভিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারেও শেখ হাসিনা চলতি বছরের মধ্যে দেশে ফেরার কথা বলেছিলেন। ওই বক্তব্যের পর ভারতীয় ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে বিষয়টি আলোচনায় আসে।

আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা কতটা প্রস্তুত?

শেখ হাসিনার দেশে ফেরা নিয়ে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হচ্ছে—আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা এই সিদ্ধান্তের সঙ্গে কতটা প্রস্তুতভাবে যুক্ত হতে পারবেন।

আওয়ামী লীগের একাধিক নেতার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গত ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর শেখ হাসিনা বিদেশে থাকা নেতা-কর্মীদের দেশে ফেরার আহ্বান জানিয়ে আসছিলেন। তবে এখন পর্যন্ত উল্লেখযোগ্য কোনো নেতা তাঁর আহ্বানে সাড়া দেননি।

বরং অনেক নেতা নিরাপত্তা ও গ্রেপ্তারের আশঙ্কায় ভারত ছেড়ে অন্য দেশে চলে গেছেন বলে জানা গেছে।

আওয়ামী লীগের একজন দায়িত্বশীল নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, শেখ হাসিনা প্রায় ৪৫ বছর ধরে দলটির সভাপতি। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তাঁর যোগাযোগ রয়েছে এবং দলের বর্তমান দুর্বল অবস্থাও তিনি জানেন। তবে দেশে ফেরার পর দলের কৌশল কী হবে, প্রকাশ্যে সংগঠন গড়ে তোলার সুযোগ কতটা থাকবে—এসব এখনো পরিষ্কার নয়।

ওই নেতা আরও বলেন, যাঁদের আর্থিক ও ব্যক্তিগত নিরাপত্তা রয়েছে, তাঁদের বড় অংশ সরাসরি দেশে ফিরে কারাবরণ করতে আগ্রহী নাও হতে পারেন। ফলে শেখ হাসিনার আহ্বান আবেগ তৈরি করলেও এটি কতটা সম্মিলিত প্রত্যাবর্তনে পরিণত হবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে।

বিচার, মামলা ও প্রত্যর্পণ নিয়ে জটিলতা

শেখ হাসিনা দেশ ছাড়ার পর অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার প্রায় দেড় বছর দেশ পরিচালনা করে। এই সময়ে শেখ হাসিনা, আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতা এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অনেক সদস্যের বিরুদ্ধে শত শত হত্যা মামলা হয়েছে।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালেও শেখ হাসিনাসহ আওয়ামী লীগের কয়েকজন নেতার বিচার শুরু হয়। গত বছরের ১৭ নভেম্বর মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় শেখ হাসিনা ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। তাঁদের বিরুদ্ধে আরও কয়েকটি মামলার বিচার চলমান রয়েছে।

রায়ের পর অন্তর্বর্তী সরকার ভারতকে শেখ হাসিনাসহ দণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর জন্য চিঠি দেয়। ভারত বিষয়টি পর্যালোচনা করার কথা জানালেও প্রত্যর্পণের বিষয়ে এখনো প্রকাশ্য কোনো অগ্রগতি দেখা যায়নি।

বর্তমান বিএনপি সরকারও শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে এনে রায় কার্যকরের কথা বলেছে। শেখ হাসিনার দিল্লিতে অবস্থান এবং তাঁকে ফেরানোর উদ্যোগ বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের ক্ষেত্রেও আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে।

রাজনৈতিক কৌশল নাকি বাস্তব পরিকল্পনা?

শেখ হাসিনার দেশে ফেরা নিয়ে আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরে মতভেদ রয়েছে। আত্মগোপনে থাকা কয়েকজন নেতা জানিয়েছেন, এই ঘোষণার পেছনে নির্দিষ্ট কোনো সাংগঠনিক প্রস্তুতির তথ্য তাঁদের জানা নেই।

তাঁদের মতে, ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি, ক্ষমতাসীন বিএনপির অবস্থান, জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) ভূমিকা এবং আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির ওপর অনেক কিছু নির্ভর করবে।

শেখ হাসিনার বক্তব্যের পর রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন বলেছেন, শেখ হাসিনার বিষয়টি সরকার আইনের দৃষ্টিতেই দেখছে। তাঁর মতে, শেখ হাসিনার বক্তব্য নৈরাজ্য সৃষ্টি করতে পারে এবং পুরো বিষয়টি আইন অনুযায়ী পরিচালিত হবে।

এদিকে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বলেছেন, দেশে ফেরার পরিকল্পনার কথা বলা হলেও তিনি মনে করেন, শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে দেওয়া রায়ের বিষয়টিও সামনে রয়েছে।

জনগণের আস্থা ও আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ

রয়টার্সকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা বলেন, দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকলে কোনো সরকারের ভুল হতে পারে এবং জনগণের সেই সরকারের ভালো-মন্দ বিচার করার অধিকার রয়েছে।

তিনি দাবি করেন, আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ না করে জনগণের ওপর সিদ্ধান্ত ছেড়ে দেওয়া উচিত। দল পুনর্গঠনের অংশ হিসেবে অনলাইনে দেশের ৩০০ সংসদীয় আসনের মধ্যে ১২৫টি আসনের নেতা-কর্মীদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন বলেও জানান তিনি।

তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দেশে ফেরার ঘোষণা দিলেই দলীয় পুনর্গঠন সহজ হবে না। কারণ আওয়ামী লীগের কার্যক্রম বর্তমানে নিষিদ্ধ এবং মাঠ পর্যায়ে দলীয় কাঠামো দুর্বল অবস্থায় রয়েছে।

এ ছাড়া জুলাই-আগস্টের আন্দোলনে সংঘটিত হত্যাকাণ্ড নিয়ে শেখ হাসিনা প্রকাশ্যে দুঃখ প্রকাশ করেননি—এ বিষয়টিও রাজনৈতিক আলোচনায় রয়েছে। তাঁর ও আওয়ামী লীগের নেতাদের বক্তব্যে আন্দোলনকে ষড়যন্ত্র হিসেবে উল্লেখ করার বিষয়টি নিয়েও সমালোচনা রয়েছে।

আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে শেখ হাসিনার অবস্থান

শেখ হাসিনার দেশে ফেরা নিয়ে ভারতীয় গণমাধ্যমে কয়েক মাস ধরেই প্রতিবেদন প্রকাশিত হচ্ছে। কিছু রাজনৈতিক বিশ্লেষক মনে করছেন, তাঁর অবস্থান এবং দেশে ফেরার বক্তব্যের সঙ্গে আঞ্চলিক কূটনৈতিক বিষয়ও জড়িত থাকতে পারে।

বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের ক্ষেত্রে শেখ হাসিনার দিল্লিতে অবস্থান একটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হয়ে রয়েছে। একই সঙ্গে বাংলাদেশে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার বিষয়টিও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আলোচিত হচ্ছে।

রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, শেখ হাসিনা দেশে ফিরে আদালতের মুখোমুখি হওয়ার কথা বলেছেন। তবে বাস্তবে সেই সিদ্ধান্ত কীভাবে কার্যকর হবে, তা নির্ভর করবে দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি, আইনি প্রক্রিয়া এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর অবস্থানের ওপর।

শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ঘোষণা বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন আলোচনা তৈরি করেছে। তবে এখন পর্যন্ত দৃশ্যমান কোনো বড় সাংগঠনিক প্রস্তুতি, নেতা-কর্মীদের সম্মিলিত প্রত্যাবর্তনের উদ্যোগ বা রাজনৈতিক সমঝোতার চিত্র দেখা যাচ্ছে না।

ফলে শেখ হাসিনার এই ঘোষণা আপাতত একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক বার্তা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এটি ভবিষ্যতে বাস্তব রাজনৈতিক পদক্ষেপে রূপ নেবে কি না, তা নির্ভর করবে আগামী মাসগুলোর রাজনৈতিক পরিস্থিতির ওপর।

সর্বাধিক পঠিত