বিশ্বকাপের নতুন ফরম্যাটে কী বদল আনলো আইসিসি?, ২০২৭ ওয়ানডে বিশ্বকাপের নতুন ফরম্যাটে ১৪ দল, সুপার সিরিজ ও সুপার সেভেন যুক্ত হচ্ছে। আইসিসির বড় পরিবর্তনে কমবে ডেড রাবার ম্যাচ।
আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিল (আইসিসি) ২০২৭ ওয়ানডে বিশ্বকাপের নতুন ফরম্যাট ঘোষণা করেছে। দক্ষিণ আফ্রিকা, জিম্বাবুয়ে ও নামিবিয়ায় অনুষ্ঠেয় এই বিশ্বকাপে ১৪ দলের অংশগ্রহণ বহাল থাকলেও প্রতিযোগিতার কাঠামোয় বড় পরিবর্তন আনা হয়েছে। আইসিসির দাবি, ক্রিকেটের মান বাড়ানো, প্রতিযোগিতার ভারসাম্য তৈরি এবং পুরো আসরজুড়ে দর্শকদের আগ্রহ ধরে রাখতেই ২০২৭ ওয়ানডে বিশ্বকাপের নতুন ফরম্যাট চালু করা হয়েছে।
নতুন কাঠামো নিয়ে অবশ্য সমালোচনাও শুরু হয়েছে। বিশেষ করে বিশ্বকাপের নিচের সারির তিন দলকে নিয়ে ‘সুপার সিরিজ’ আয়োজনের সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। তবে আইসিসির মতে, নতুন এই কাঠামো বিশ্বকাপকে আরও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ও অর্থবহ করে তুলতে পারে।
২০২৭ ওয়ানডে বিশ্বকাপের নতুন ফরম্যাটে কী থাকছে?

২০২৭ সালের ওয়ানডে বিশ্বকাপে আগের মতো ১৪টি দল অংশ নেবে। তবে এবারের আসরে প্রতিযোগিতাটি কয়েকটি ধাপে ভাগ করা হয়েছে। নতুন কাঠামোয় থাকবে—
- সুপার সিরিজ
- গ্রুপ পর্ব
- সুপার সেভেন
- সেমিফাইনাল
- ফাইনাল
পুরো টুর্নামেন্টে মোট ৬০টি ম্যাচ অনুষ্ঠিত হবে।
আইসিসির ওয়ার্কিং গ্রুপে ২০১৯ ও ২০২৩ সালের মতো ১০ দলের বিশ্বকাপ চালু রাখার প্রস্তাবও আলোচনায় ছিল। কয়েকজন সদস্য সেই প্রস্তাবের পক্ষে অবস্থান নিলেও শেষ পর্যন্ত ১৪ দলের বিশ্বকাপই বহাল রাখা হয়েছে।
সুপার সিরিজে তিন দলের লড়াই
নতুন কাঠামোর সবচেয়ে আলোচিত অংশ হলো ‘সুপার সিরিজ’। বিশ্বকাপের প্রাথমিক পর্যায়ে সবচেয়ে নিচে থাকা তিনটি দল এই পর্বে খেলবে।
ছয় ম্যাচের এই পর্ব শেষে মাত্র একটি দল মূল পর্বে জায়গা করে নিতে পারবে। বাকি দুটি দল টুর্নামেন্ট থেকে বিদায় নেবে। অর্থাৎ, নিচের সারির দলগুলোর জন্যও বিশ্বকাপের শুরু থেকেই প্রতিটি ম্যাচ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
এই সিদ্ধান্ত নিয়েই সবচেয়ে বেশি প্রশ্ন উঠেছে। তবে আইসিসি মনে করছে, এই ধাপ প্রতিযোগিতার চাপ বাড়াবে এবং দলগুলোর জন্য প্রতিটি ম্যাচকে গুরুত্বপূর্ণ করে তুলবে।
মূল পর্বে ১২ দলের গ্রুপ লড়াই
সুপার সিরিজ শেষে একটি দল মূল পর্বে উঠবে। এরপর মোট ১২টি দল দুটি গ্রুপে ভাগ হয়ে খেলবে।
প্রতিটি গ্রুপে থাকবে ছয়টি করে দল। এই পর্বে দলগুলো নিজেদের গ্রুপে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবে এবং পরবর্তী ধাপে যাওয়ার জন্য গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান তৈরি করবে।
এরপর চালু হবে নতুন ‘সুপার সেভেন’ পর্ব। আগের ‘সুপার সিক্স’ কাঠামোর পরিবর্তে এই ধাপটি যুক্ত করা হচ্ছে।
সুপার সেভেনে সেমিফাইনালের লড়াই
সুপার সেভেন পর্ব শেষে সেরা চারটি দল সেমিফাইনালে জায়গা পাবে। এরপর নিয়ম অনুযায়ী সেমিফাইনাল ও ফাইনালের মাধ্যমে বিশ্বকাপের চ্যাম্পিয়ন নির্ধারিত হবে।
আইসিসির নতুন পরিকল্পনার অন্যতম লক্ষ্য হলো প্রতিযোগিতার শেষ পর্যন্ত দলগুলোর মধ্যে চাপ ও লড়াই বজায় রাখা। সংস্থাটির মতে, এই কাঠামোতে গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচের সংখ্যা বাড়বে এবং এমন ম্যাচ কমে আসবে যেগুলোর ফলাফল টুর্নামেন্টের পরবর্তী ধাপে কোনো প্রভাব ফেলবে না।
‘ডেড রাবার’ ম্যাচ কমানোর লক্ষ্য আইসিসির
ক্রিকেটে ‘ডেড রাবার’ বলতে সাধারণত এমন ম্যাচকে বোঝানো হয়, যার ফলাফল টুর্নামেন্টের পরবর্তী অবস্থান বা যোগ্যতা অর্জনে বড় কোনো প্রভাব ফেলে না।
আইসিসির দাবি, ২০২৭ ওয়ানডে বিশ্বকাপের নতুন ফরম্যাট এমনভাবে সাজানো হয়েছে যাতে প্রতিটি ম্যাচের গুরুত্ব বাড়ে। শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত দলগুলোকে প্রতিযোগিতার মধ্যে রাখতে এই কাঠামো তৈরি করা হয়েছে।
বিশেষ করে শীর্ষ দলগুলোর মধ্যে বেশি ম্যাচ আয়োজনের ফলে দর্শকদের আগ্রহ বাড়বে বলে মনে করছে ক্রিকেটের নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি। একই সঙ্গে দলগুলোর জন্যও গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচের সংখ্যা বাড়বে।
১৪ দলের বিশ্বকাপ কেন বহাল রাখল আইসিসি?
২০১৯ ও ২০২৩ সালের মতো ১০ দলের বিশ্বকাপ আয়োজনের প্রস্তাব আলোচনায় থাকলেও আইসিসি শেষ পর্যন্ত ১৪ দলের ফরম্যাট বহাল রেখেছে।
এর ফলে সহযোগী বা অ্যাসোসিয়েট দেশগুলোর জন্য বিশ্বকাপে জায়গা পাওয়ার সুযোগও বজায় থাকছে। এটি নতুন কাঠামোর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
অর্থাৎ, একদিকে বিশ্বকাপের প্রতিযোগিতামূলক মান ধরে রাখার চেষ্টা করা হয়েছে, অন্যদিকে সহযোগী দেশগুলোর জন্য বিশ্ব ক্রিকেটের সবচেয়ে বড় মঞ্চে ওঠার সুযোগও রাখা হয়েছে।
আইসিসির নতুন পরিকল্পনায় ইতিবাচক দিক
নতুন ফরম্যাট নিয়ে সমালোচনা থাকলেও এর কিছু ইতিবাচক দিকও রয়েছে। প্রথমত, ১৪ দলের অংশগ্রহণ বহাল থাকায় বিশ্বকাপে বিভিন্ন অঞ্চলের দলগুলোর অংশগ্রহণের সুযোগ থাকছে।
দ্বিতীয়ত, সুপার সিরিজের মাধ্যমে নিচের সারির দলগুলোর ম্যাচেও বাড়তি গুরুত্ব তৈরি হতে পারে। ছয় ম্যাচের পর্বে মাত্র একটি দল মূল পর্বে উঠবে বলে প্রতিটি ম্যাচে চাপ থাকবে।
তৃতীয়ত, গ্রুপ পর্ব ও সুপার সেভেনের কাঠামো দলগুলোর জন্য দীর্ঘমেয়াদি প্রতিযোগিতার সুযোগ তৈরি করবে। একই সঙ্গে শীর্ষ দলগুলোর মধ্যে বেশি ম্যাচ হওয়ায় দর্শকদের আগ্রহও বাড়তে পারে।
এ ছাড়া, ‘ডেড রাবার’ ম্যাচ কমানোর লক্ষ্য বাস্তবায়িত হলে বিশ্বকাপের পুরো আসরজুড়েই প্রতিদ্বন্দ্বিতা ধরে রাখা সম্ভব হতে পারে।
ফরম্যাট নিয়ে বিতর্ক থাকলেও লক্ষ্য প্রতিযোগিতা বাড়ানো
নতুন কাঠামোর সবচেয়ে বেশি সমালোচনা হচ্ছে নিচের সারির তিন দলকে নিয়ে সুপার সিরিজ আয়োজনের সিদ্ধান্তকে ঘিরে। কারণ, এই পর্বে তিন দলের মধ্যে মাত্র একটি দল মূল বিশ্বকাপে টিকে থাকবে।
তবে আইসিসির দৃষ্টিতে, এই কাঠামো প্রতিটি ম্যাচের গুরুত্ব বাড়ানোর একটি উপায়। সংস্থাটি মনে করছে, বিশ্বকাপের শুরু থেকেই দলগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতার চাপ থাকলে দর্শকদের আগ্রহও ধরে রাখা সহজ হবে।
২০২৭ ওয়ানডে বিশ্বকাপ কোথায় হবে?
২০২৭ ওয়ানডে বিশ্বকাপ যৌথভাবে আয়োজন করবে দক্ষিণ আফ্রিকা, জিম্বাবুয়ে ও নামিবিয়া।
এই তিন দেশকে ঘিরেই অনুষ্ঠিত হবে বিশ্বকাপের পুরো আয়োজন। ১৪ দলের অংশগ্রহণ, নতুন তিন ধাপের কাঠামো এবং মোট ৬০ ম্যাচের পরিকল্পনা এবারের আসরকে আগের ফরম্যাটগুলোর তুলনায় আলাদা করে তুলবে।
বিশ্ব ক্রিকেটের নিয়ন্ত্রক সংস্থা ২০২৭ ওয়ানডে বিশ্বকাপের নতুন ফরম্যাট সম্পর্কে যে লক্ষ্য জানিয়েছে, তার মূল বিষয় হলো প্রতিযোগিতার ভারসাম্য বাড়ানো এবং পুরো টুর্নামেন্টে ম্যাচগুলোর গুরুত্ব ধরে রাখা। আইসিসির পরিকল্পনা বাস্তবায়নের পরই বোঝা যাবে, নতুন কাঠামো বাস্তবে কতটা কার্যকর হয়।
২০২৭ সালের ওয়ানডে বিশ্বকাপে ১৪ দলের অংশগ্রহণ বহাল রেখে আইসিসি প্রতিযোগিতার কাঠামোয় বেশ কিছু পরিবর্তন এনেছে। সুপার সিরিজ, দুই গ্রুপের মূল পর্ব এবং সুপার সেভেন—এই নতুন ধাপগুলো বিশ্বকাপের লড়াইকে নতুন মাত্রা দিতে পারে।
যদিও নিচের সারির তিন দলকে নিয়ে সুপার সিরিজ আয়োজনের সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে, তবুও আইসিসির দাবি অনুযায়ী নতুন ফরম্যাটের লক্ষ্য হলো প্রতিটি ম্যাচকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তোলা এবং ডেড রাবার ম্যাচ কমানো।





