মিরাজের সিপিএল অভিষেক হলো দারুণ নেমেই মিরাজের স্পিন–ফাঁস; ইমরান তাহিরও প্রশংসা করেন। সেন্ট লুসিয়াকে হারায় গায়ানা।
ক্যারিবিয়ান প্রিমিয়ার লিগে (সিপিএল) মিরাজের সিপিএল অভিষেক হয়েছে দুর্দান্ত বোলিংয়ে। প্রভিডেন্সে সেন্ট লুসিয়া কিংসের বিপক্ষে ৪ ওভারে মাত্র ১৩ রান দিয়ে ৩ উইকেট নিয়েছেন বাংলাদেশের অলরাউন্ডার মেহেদী হাসান মিরাজ। তাঁর সঙ্গে গায়ানা অ্যামাজন ওয়ারিয়র্সের অধিনায়ক ইমরান তাহিরের ৫ উইকেটের স্পিন-দাপটেই সেন্ট লুসিয়া ১১৯ রানে অলআউট হয়। শেষ পর্যন্ত ১৮.৩ ওভারে ৬ উইকেট হারিয়ে সেই লক্ষ্য পেরিয়ে যায় গায়ানা।
ম্যাচ শেষে ম্যাচসেরার পুরস্কার পাওয়া ইমরান তাহির মিরাজের বোলিংয়ের প্রশংসা করেন। তিনি বলেন, আফগানিস্তানের মোহাম্মদ নবীর জায়গায় দলে আসা মিরাজকে পাওয়া গায়ানার জন্য দারুণ ব্যাপার। তাহিরের ভাষায়, মিরাজ একজন ‘বিশ্বমানের বোলার’, যিনি আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বিশ্বের বিভিন্ন জায়গায় পারফর্ম করে আসছেন।
মিরাজের সিপিএল অভিষেক যেভাবে হলো

সিপিএলের শেষ দিকে গায়ানা অ্যামাজন ওয়ারিয়র্সে যোগ দিয়েছেন মেহেদী হাসান মিরাজ। টুর্নামেন্টে তখন আর বাকি ছিল ৮টি ম্যাচ। আফগানিস্তানের অলরাউন্ডার মোহাম্মদ নবীর বদলি হিসেবে গায়ানার দলে জায়গা পান বাংলাদেশের এই স্পিন অলরাউন্ডার।
নবী ভারতের বিপক্ষে টি-টোয়েন্টি সিরিজ খেলতে সিপিএল ছেড়ে যান। ফলে তাঁর জায়গায় মিরাজকে দলে নেয় গায়ানা। বিষয়টি মিরাজের জন্যও ছিল বড় সুযোগ, কারণ নবী এরই মধ্যে গায়ানার অন্যতম প্রধান পারফর্মার হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন।
সাত ম্যাচে ১৩ উইকেট নিয়ে নবী তখন গায়ানার সর্বোচ্চ উইকেটশিকারি ছিলেন। সেই জায়গায় দায়িত্ব নেওয়া মিরাজের জন্য তাই শুরুতেই প্রত্যাশা ছিল। তবে মিরাজের সিপিএল অভিষেক সেই প্রত্যাশার চাপের মধ্যেই দারুণভাবে শুরু হয়েছে।
প্রথম ওভারেই উইকেটের দেখা
সেন্ট লুসিয়া কিংসের বিপক্ষে নিজের প্রথম ওভারেই উইকেট পান মিরাজ। ইনিংসের সপ্তম ওভারের শেষ বলে জন ক্যাম্পবেলকে আউট করেন তিনি।
মিরাজের হাওয়ায় ভাসানো বলে লং অফে ক্যাচ দেন ক্যাম্পবেল। এর মাধ্যমে মিরাজের সিপিএল অভিষেক শুরু হয় উইকেট দিয়ে।
এরপর নিজের তৃতীয় ওভারে আরও দুটি উইকেট তুলে নেন বাংলাদেশের স্পিনার। সেই ওভারে তিনি আউট করেন কেমল স্যাভরি ও চারিত আসালাঙ্কাকে।
স্যাভরি এলবিডব্লিউ হয়ে ফেরেন। তবে পরে রিপ্লেতে দেখা যায়, বল স্টাম্পে আঘাত করেনি। অর্থাৎ রিভিউ নেওয়া হলে স্যাভরি বেঁচে যেতে পারতেন।
তবে সেই সিদ্ধান্তের পরও মিরাজের বোলিংয়ের কার্যকারিতা কমেনি। তাঁর তৃতীয় শিকার চারিত আসালাঙ্কা উইকেটের পেছনে শাই হোপের হাতে ক্যাচ দিয়ে ফেরেন।
৪ ওভারে ১৩ রান, ৩ উইকেট
মিরাজের বোলিংয়ের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক ছিল রান নিয়ন্ত্রণ। চার ওভারের স্পেলে তিনি দিয়েছেন মাত্র ১৩ রান এবং পেয়েছেন ৩ উইকেট।
সেন্ট লুসিয়ার ব্যাটিং লাইনআপের বিপক্ষে তাঁর এই বোলিং গায়ানার জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। বিশেষ করে ইমরান তাহিরের সঙ্গে মিরাজের স্পিন আক্রমণ সেন্ট লুসিয়ার ইনিংসকে বড় হতে দেয়নি।
মিরাজের সিপিএল অভিষেক তাই ব্যক্তিগত পরিসংখ্যানের দিক থেকেও বেশ সফল—৪ ওভার, ১৩ রান এবং ৩ উইকেট।
তাহিরের ৫ উইকেটের সঙ্গে মিরাজের স্পিন
মিরাজ ৩ উইকেট নিলেও ম্যাচের মূল নায়ক ছিলেন গায়ানার অধিনায়ক ইমরান তাহির। ৪ ওভারে ১৭ রান দিয়ে ৫ উইকেট নিয়েছেন ৪৭ বছর বয়সী এই লেগ স্পিনার।
তাহির ও মিরাজের স্পিন জুটির সামনে সেন্ট লুসিয়া কিংস ১১৯ রানে গুটিয়ে যায়। দুই স্পিনারের বোলিংয়েই ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ গায়ানার হাতে চলে আসে।
মিরাজের তিনটি এবং তাহিরের পাঁচটি—এই আট উইকেটের সমন্বিত প্রভাবেই সেন্ট লুসিয়ার ইনিংস বড় সংগ্রহে রূপ নিতে পারেনি।
গায়ানার জন্য লক্ষ্য ছিল ১২০ রান। সেই রান তুলতে গিয়ে দলটি ৬ উইকেট হারায় এবং ১৮.৩ ওভারে জয় নিশ্চিত করে। ফলে মিরাজের সিপিএল অভিষেক শেষ হয় গায়ানার জয়ের মধ্য দিয়ে।
ব্যাট হাতে মিরাজের অবদান সীমিত
বোলিংয়ে দুর্দান্ত করলেও ব্যাট হাতে নিজের নামের পাশে বড় কোনো অবদান রাখতে পারেননি মিরাজ। গায়ানার রান তাড়ায় তিনি মাত্র ১ রান করে আউট হন।
তবে তাঁর দলের জয়ে বোলিংয়ের অবদানই বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। সেন্ট লুসিয়াকে ১১৯ রানে আটকে দেওয়ার পথে ৩ উইকেট নেওয়ায় মিরাজ গায়ানার বোলিং আক্রমণে কার্যকর ভূমিকা রাখেন।
এ কারণে মিরাজের সিপিএল অভিষেক ব্যাটিংয়ের চেয়ে বোলিং পারফরম্যান্সের জন্যই আলোচনায় এসেছে।
মিরাজকে ‘বিশ্বমানের বোলার’ বললেন তাহির
ম্যাচ শেষে মেহেদী হাসান মিরাজকে প্রশংসায় ভাসিয়েছেন ইমরান তাহির। ম্যাচসেরার পুরস্কার নেওয়ার সময় গায়ানার অধিনায়ক দলের সাবেক সদস্য মোহাম্মদ নবীর কথাও উল্লেখ করেন।
তাহির বলেন, নবী খুব উঁচুমানের বোলার ছিলেন এবং গায়ানার অন্যতম সেরা বোলার ছিলেন। তাঁর জায়গায় মিরাজ এসে যেভাবে বোলিং করেছেন, সেটি দল প্রত্যাশা করেছিল বলেও জানান তাহির।
তাহিরের বক্তব্যের মূল সুর ছিল, মিরাজকে দলে পাওয়া গায়ানার জন্য বড় সুবিধা। বাংলাদেশের এই স্পিনারকে তিনি সরাসরি ‘বিশ্বমানের বোলার’ হিসেবে উল্লেখ করেন।
আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে মিরাজের পারফরম্যান্সের অভিজ্ঞতার কথাও তুলে ধরেন তাহির। তাঁর মতে, বিশ্বের বিভিন্ন জায়গায় আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পারফর্ম করে আসা মিরাজ গায়ানার দলে এসে নিজের সামর্থ্যের প্রমাণ দিয়েছেন।
নবীর জায়গায় মিরাজের শুরুটা সফল
মোহাম্মদ নবীর অনুপস্থিতিতে গায়ানার দলে যোগ দেওয়া মিরাজের ওপর দায়িত্ব কম ছিল না। কারণ নবী এরই মধ্যে সাত ম্যাচে ১৩ উইকেট নিয়ে দলের সর্বোচ্চ উইকেটশিকারি ছিলেন।
তবে প্রথম ম্যাচেই মিরাজ ৩ উইকেট নেওয়ায় সেই শূন্যতা পূরণের সম্ভাবনার একটি শক্তিশালী বার্তা পাওয়া গেছে। যদিও একটি ম্যাচের পারফরম্যান্স দিয়ে পুরো টুর্নামেন্টের ফলাফল নির্ধারণ করা যায় না, মিরাজের সিপিএল অভিষেক নিঃসন্দেহে ইতিবাচক সূচনা এনে দিয়েছে।
মিরাজের চার ওভারের স্পেল এবং তাহিরের পাঁচ উইকেট মিলে গায়ানার বোলিং আক্রমণ সেন্ট লুসিয়ার ওপর বড় প্রভাব তৈরি করে। শেষ পর্যন্ত সেই বোলিং পারফরম্যান্সই ম্যাচের ফল নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
সিপিএলে মিরাজের সামনে নতুন সুযোগ
টুর্নামেন্টের শেষ দিকে গায়ানার দলে যোগ দিলেও মিরাজ নিজের প্রথম ম্যাচেই কার্যকর পারফরম্যান্স দেখিয়েছেন। মিরাজের সিপিএল অভিষেক শুধু ব্যক্তিগত অর্জন নয়, গায়ানার চলমান অভিযানের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ সূচনা হয়ে উঠেছে।
বিশেষ করে নবীর জায়গায় দলে এসে প্রথম ম্যাচেই তিন উইকেট পাওয়া মিরাজের আত্মবিশ্বাস বাড়ানোর মতো পারফরম্যান্স। অন্যদিকে, তাহিরের মতো অভিজ্ঞ ক্রিকেটারের কাছ থেকে পাওয়া ‘বিশ্বমানের বোলার’ স্বীকৃতিও তাঁর এই অভিষেককে আরও আলোচিত করেছে।
সেন্ট লুসিয়ার বিপক্ষে গায়ানার জয় এবং মিরাজের ৩ উইকেট—দুই দিক থেকেই ম্যাচটি বাংলাদেশের এই অলরাউন্ডারের জন্য স্মরণীয় হয়ে থাকল।
ম্যাচের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য এক নজরে
- প্রতিযোগিতা: ক্যারিবিয়ান প্রিমিয়ার লিগ (সিপিএল)
- দল: গায়ানা অ্যামাজন ওয়ারিয়র্স
- প্রতিপক্ষ: সেন্ট লুসিয়া কিংস
- ফল: গায়ানা ৪ উইকেটে জয়ী
- সেন্ট লুসিয়ার সংগ্রহ: ১১৯ রান
- গায়ানার রান: ১৮.৩ ওভারে ৬ উইকেটে জয়
- মেহেদী হাসান মিরাজ: ৪ ওভারে ১৩ রান, ৩ উইকেট
- ইমরান তাহির: ৪ ওভারে ১৭ রান, ৫ উইকেট
- মিরাজের ব্যাটিং: ১ রান
- ম্যাচসেরা: ইমরান তাহির





