৭ দেশের শ্রমবাজারে যাচ্ছে প্রায় ৯৪ শতাংশ বাংলাদেশি কর্মী। গবেষণায় উঠে এসেছে দক্ষতা ও আনুষ্ঠানিক প্রশিক্ষণের বড় ঘাটতি, যা বিদেশি কর্মসংস্থানে চ্যালেঞ্জ বাড়াচ্ছে।
বাংলাদেশ থেকে প্রতিবছর ১৭৫টির বেশি দেশে কর্মী গেলেও মোট বিদেশগামী কর্মীর প্রায় ৯৪ শতাংশই যাচ্ছে মাত্র সাতটি দেশের শ্রমবাজারে। এর মধ্যে পাঁচটি মধ্যপ্রাচ্যের দেশ এবং মালয়েশিয়াসহ কয়েকটি প্রধান শ্রমবাজার রয়েছে। রামরুর প্রতিবেদন ও সিপিডির গবেষণার তথ্য তুলে ধরে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিদেশে কর্মসংস্থানের জন্য দেশের প্রশিক্ষণব্যবস্থাকে শুধু নির্দিষ্ট কয়েকটি দেশের চাহিদার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারের পরিবর্তিত চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্য করা জরুরি।
বৈদেশিক কর্মসংস্থান ও রেমিট্যান্স বাংলাদেশের অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। তবে বিপুলসংখ্যক কর্মী বিদেশে গেলেও তাদের বড় অংশ আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারের উপযোগী আনুষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ ছাড়াই বিদেশে যাচ্ছে। ফলে ৭ দেশের শ্রমবাজারকেন্দ্রিক অভিবাসনের পাশাপাশি কর্মীদের দক্ষতা উন্নয়ন ও আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির বিষয়টি নতুন করে গুরুত্ব পাচ্ছে।
৭ দেশের শ্রমবাজারে কেন এত বেশি নির্ভরতা

বাংলাদেশ থেকে প্রতিবছর ১৭৫টির বেশি দেশে কর্মী যাওয়ার সুযোগ থাকলেও বাস্তবে বিদেশগামী কর্মীদের প্রায় ৯৪ শতাংশ মাত্র সাতটি দেশের শ্রমবাজারে যাচ্ছে। এই দেশগুলোর মধ্যে পাঁচটি মধ্যপ্রাচ্যের দেশ এবং মালয়েশিয়াসহ কয়েকটি বড় শ্রমবাজার রয়েছে।
এর প্রভাব পড়ছে দেশের প্রশিক্ষণব্যবস্থাতেও। বিদেশগামী কর্মীদের প্রশিক্ষণ মূলত এসব দেশের চাহিদাকে কেন্দ্র করেই পরিচালিত হচ্ছে। ফলে আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারের অন্যান্য অংশে প্রয়োজনীয় দক্ষতা, ভাষাজ্ঞান, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা কিংবা আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত যোগ্যতার সঙ্গে প্রশিক্ষণের সংযোগ সীমিত থাকছে।
রামরুর ‘বাংলাদেশ হতে শ্রম অভিবাসনের গতি-প্রকৃতি ২০২৫ : অর্জন ও চ্যালেঞ্জসমূহ’ প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বিদেশে যাওয়া কর্মীদের মাত্র ৩ থেকে ৪ শতাংশ পেশাজীবী ছিলেন। দক্ষ কর্মীর হার ছিল ২০ থেকে ২২ শতাংশ। আর ৭০ থেকে ৭৪ শতাংশ কর্মী ছিলেন আধাদক্ষ বা স্বল্প দক্ষ।
এই পরিসংখ্যান দেখাচ্ছে, ৭ দেশের শ্রমবাজারে বাংলাদেশের কর্মীদের উপস্থিতি বড় হলেও উচ্চ দক্ষতার কর্মী তৈরির ক্ষেত্রে এখনো বড় সুযোগ রয়েছে।
আনুষ্ঠানিক প্রশিক্ষণের বাইরে ৮৭ শতাংশ কর্মী
সিপিডি, আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) এবং ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশন অব রিপ্যাট্রিয়েটেড বাংলাদেশি এমপ্লয়িজ (ওয়ারবি) ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশনের সহযোগিতায় পরিচালিত গবেষণায় বিদেশগামী কর্মীদের প্রশিক্ষণ পরিস্থিতির একটি গুরুত্বপূর্ণ চিত্র উঠে এসেছে।
গবেষণা অনুযায়ী, বিদেশে যাওয়া কর্মীদের প্রায় ৮৭ শতাংশ সরকারি কারিগরি প্রশিক্ষণকেন্দ্র (টিটিসি) কিংবা বেসরকারি প্রশিক্ষণকেন্দ্র—কোথাও আনুষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ নেননি।
অঞ্চলভেদেও এই হার উল্লেখযোগ্য। চট্টগ্রামে প্রশিক্ষণ না নেওয়া কর্মীর হার ৯২ শতাংশ। রাজশাহী ও রংপুরে তা ৮৪ শতাংশ এবং ঢাকায় ৮৩ শতাংশ।
অর্থাৎ, ৭ দেশের শ্রমবাজারে নিয়মিত কর্মী পাঠানো হলেও বিদেশ যাওয়ার আগে বিপুলসংখ্যক কর্মী প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণের বাইরে থাকছেন। এতে কর্মীদের দক্ষতা যাচাই, আন্তর্জাতিক মানের সনদ এবং নির্দিষ্ট দেশের কাজের পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর প্রস্তুতি সীমিত হতে পারে।
টিটিসিতে প্রশিক্ষণ নিলেও বিদেশমুখী সংযোগ সীমিত
সিপিডির গবেষণায় টিটিসির প্রশিক্ষণার্থীদের উদ্দেশ্য নিয়েও তথ্য পাওয়া গেছে। টিটিসিতে ভর্তি হওয়া প্রশিক্ষণার্থীদের ৭৮ দশমিক ৭ শতাংশ মূলত দক্ষতা অর্জনের জন্য প্রশিক্ষণ নেন।
অন্যদিকে বিদেশে চাকরির আশায় প্রশিক্ষণ নিয়েছেন মাত্র ৩৭ দশমিক ৯ শতাংশ। এতে বোঝা যায়, দেশের কারিগরি প্রশিক্ষণব্যবস্থা এবং বিদেশমুখী কর্মসংস্থানের মধ্যে সরাসরি যোগসূত্র এখনো সীমিত।
৭ দেশের শ্রমবাজারের চাহিদাকে কেন্দ্র করে প্রশিক্ষণ দেওয়ার পাশাপাশি অন্যান্য আন্তর্জাতিক বাজারের প্রয়োজনও বিবেচনায় নেওয়ার বিষয়টি তাই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, কোন দেশে কোন পেশার কর্মীর চাহিদা রয়েছে, কী ধরনের দক্ষতা প্রয়োজন এবং কোন ধরনের সনদ গ্রহণযোগ্য—এসব তথ্য প্রশিক্ষণব্যবস্থার সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত করা প্রয়োজন।
প্রশিক্ষণকেন্দ্রে জনবল ও সরঞ্জামের ঘাটতি
বিদেশগামী কর্মীদের প্রশিক্ষণের ক্ষেত্রে শুধু প্রশিক্ষণ নেওয়ার আগ্রহ নয়, প্রশিক্ষণকেন্দ্রগুলোর সক্ষমতাও গুরুত্বপূর্ণ। সিপিডির গবেষণায় ৪০টি টিটিসির তথ্য বিশ্লেষণ করে জনবলসংকটের বিষয়টি উঠে এসেছে।
গবেষণায় দেখা যায়, প্রতিটি টিটিসিতে গড়ে ৭৩টি অনুমোদিত পদের বিপরীতে প্রায় ৩৬টি পদ শূন্য রয়েছে। এর মধ্যে প্রশিক্ষকের অনুমোদিত পদের গড়ে ২১টি শূন্য।
কোনো কোনো প্রশিক্ষণকেন্দ্রে একজন প্রশিক্ষকের বিপরীতে শিক্ষার্থীর সংখ্যা এক হাজারের বেশি। এ ধরনের পরিস্থিতিতে প্রশিক্ষণের মান বজায় রাখা এবং প্রত্যেক শিক্ষার্থীকে পর্যাপ্ত ব্যবহারিক অনুশীলনের সুযোগ দেওয়া কঠিন হয়ে পড়তে পারে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, ৭ দেশের শ্রমবাজারের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতার জন্য প্রশিক্ষকের সংখ্যা বাড়ানো এবং প্রশিক্ষণ সরঞ্জাম আধুনিক করা প্রয়োজন।
পুরোনো পদ্ধতি ও পরিবর্তিত প্রযুক্তির চ্যালেঞ্জ
সিপিডির রিসার্চ ফেলো আবু সালেহ মো. শামীম আলম শিবলী কালের কণ্ঠকে বলেন, কিছু দেশ কর্মী নেওয়ার আগে ভাষা ও কাজের দক্ষতা যাচাই করে। জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ায় এ ধরনের পরীক্ষা রয়েছে। তাঁর মতে, বাংলাদেশের প্রশিক্ষণ অনেক ক্ষেত্রে এখনো পুরোনো পদ্ধতিতে চলছে।
তিনি উল্লেখ করেন, সৌদি আরব, দুবাই, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ায় প্রযুক্তি দ্রুত পরিবর্তন হচ্ছে। বিদেশি শ্রমবাজারের চাহিদা নিয়মিত বিশ্লেষণ করে সেই অনুযায়ী প্রশিক্ষণের কারিকুলাম, আসনসংখ্যা এবং প্রশিক্ষকের দক্ষতা নির্ধারণের কার্যকর কাঠামো এখনো দুর্বল।
অর্থাৎ ৭ দেশের শ্রমবাজারের বর্তমান চাহিদা পূরণের পাশাপাশি ভবিষ্যৎ প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের সঙ্গে কর্মীদের দক্ষতা কীভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ করা যায়, সেটিও প্রশিক্ষণনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠছে।
প্রশিক্ষণব্যবস্থায় কী ধরনের পরিবর্তনের কথা বলা হচ্ছে
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিদেশগামী কর্মীদের জন্য দেশ ও পেশাভিত্তিক প্রশিক্ষণের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারের চাহিদা অনুযায়ী কারিকুলাম ও প্রশিক্ষণ সরঞ্জাম আধুনিক করা প্রয়োজন।
এর সঙ্গে প্রশিক্ষকদের দক্ষতা বাড়ানো, মানসম্মত সনদ চালু এবং প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কর্মীদের তথ্যভিত্তিক ডেটাবেইস তৈরির ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
সাবেক বিএমইটি পরিচালক ও এসআইসিআইপি প্রকল্পের কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ স্পেশালিস্ট ড. মো. নুরুল ইসলাম বলেন, গত ২০ বছরে দেশের কারিগরি প্রশিক্ষণব্যবস্থায় উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়েছে। তবে আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে যে ধরনের দক্ষ কর্মীর চাহিদা রয়েছে, সেই অনুযায়ী প্রশিক্ষণ এখনো পুরোপুরি সাজানো হয়নি।
তাঁর মতে, এর অন্যতম বড় ঘাটতি প্রশিক্ষকসংকট। পাশাপাশি প্রশিক্ষণযন্ত্র দ্রুত আধুনিকায়ন না করাও একটি সমস্যা।
শুধু কর্মী পাঠানোর সংখ্যা নয়, দক্ষতাও গুরুত্বপূর্ণ
অভিবাসন ও শরণার্থী বিষয়ক বিশেষজ্ঞ আসিফ মুনীরের মতে, এত দিন বৈদেশিক কর্মসংস্থানের সাফল্য মূলত কত লাখ কর্মী বিদেশে গেলেন—এই সংখ্যা দিয়ে মাপা হয়েছে। তবে পরিবর্তিত শ্রমবাজারে কর্মীর দক্ষতা, আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি, ভাষাজ্ঞান, সংশ্লিষ্ট পেশায় কাজের সক্ষমতা এবং প্রযুক্তির সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর ক্ষমতাও গুরুত্বপূর্ণ।
জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও ইউরোপের শ্রমবাজারে ভাষা, নির্দিষ্ট পেশাগত দক্ষতা, নিরাপত্তা এবং আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত যোগ্যতার ওপর গুরুত্ব বাড়ছে।
এই বাস্তবতায় ৭ দেশের শ্রমবাজারে বাংলাদেশের কর্মীদের দীর্ঘদিনের নির্ভরতার পাশাপাশি নতুন ও বৈচিত্র্যময় শ্রমবাজারের জন্য প্রস্তুতি নেওয়ার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
ইউরোপের শ্রমবাজারের সঙ্গে দক্ষতা মিলানোর উদ্যোগ
উৎসের তথ্য অনুযায়ী, ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে বাংলাদেশের ‘ট্যালেন্ট পার্টনারশিপ’ প্রকল্পেও বাংলাদেশের দক্ষতা প্রশিক্ষণকে ইউরোপের শ্রমবাজারের চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্য করার উদ্যোগ রয়েছে।
এর মাধ্যমে বাংলাদেশের কর্মীদের দক্ষতা উন্নয়ন এবং আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারের প্রয়োজনের সঙ্গে প্রশিক্ষণব্যবস্থার সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করার সুযোগ তৈরি হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার প্রকাশিত তথ্যেও বাংলাদেশে অভিবাসী কর্মীদের দক্ষতা উন্নয়ন, দক্ষতার স্বীকৃতি এবং গন্তব্য দেশের শ্রমবাজারের সঙ্গে প্রশিক্ষণকে সামঞ্জস্য করার প্রয়োজনীয়তার বিষয়টি উঠে এসেছে।
সামনে যে বিষয়গুলো গুরুত্ব পাচ্ছে
বিদেশে কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের জন্য শুধু বেশি সংখ্যক কর্মী পাঠানোই নয়, দক্ষ ও প্রশিক্ষিত কর্মী তৈরির সক্ষমতাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। ৭ দেশের শ্রমবাজারে প্রায় ৯৪ শতাংশ কর্মী যাওয়ার বাস্তবতায় প্রশিক্ষণব্যবস্থাকে কয়েকটি নির্দিষ্ট বাজারের চাহিদার বাইরে নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ের প্রয়োজনের সঙ্গে যুক্ত করার বিষয়টি আলোচনায় এসেছে।
বিশেষ করে ভাষা শিক্ষা, পেশাভিত্তিক দক্ষতা, নিরাপত্তা, প্রযুক্তি ব্যবহারের সক্ষমতা, আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য সনদ এবং আধুনিক প্রশিক্ষণ সরঞ্জাম—এসব ক্ষেত্রে ঘাটতি কমানো প্রয়োজন বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
একই সঙ্গে প্রশিক্ষকদের সংখ্যা ও দক্ষতা বাড়ানো, শ্রমবাজারের তথ্য নিয়মিত বিশ্লেষণ এবং প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কর্মীদের একটি তথ্যভিত্তিক ডেটাবেইস তৈরি করা হলে বিদেশমুখী কর্মসংস্থানের সঙ্গে প্রশিক্ষণব্যবস্থার যোগসূত্র আরও কার্যকর করার সুযোগ তৈরি হতে পারে।





