‘সময় নষ্টের যুগ শেষ’, যুক্তরাষ্ট্র ৭ শর্ত না মানা পর্যন্ত বন্ধ থাকবে হরমুজ—ইরানের স্পিকার গালিবাফের কঠোর বার্তায় বাড়ল যুক্তরাষ্ট্র-ইরান
ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মাদ বাঘের গালিবাফ বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র সাতটি শর্ত পূরণ না করা পর্যন্ত হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকবে। ৫ অক্টোবর পার্লামেন্টে দেওয়া বক্তব্যে তিনি জানান, জুনে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে হওয়া ১৪ দফার সমঝোতা স্মারকের ভিত্তিতেই এসব শর্ত নির্ধারণ করা হয়েছে। পশ্চিম এশিয়ায় চলমান সংঘাতের মধ্যে ওয়াশিংটন ও তেহরানের উত্তেজনা বাড়ার সময় গালিবাফের এই বক্তব্য সামনে এলো।
গালিবাফের ভাষ্য অনুযায়ী, সম্প্রতি একজন মধ্যস্থতাকারীর মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র ইরানকে কিছু প্রস্তাব দিয়েছে। তবে ইরানের অবস্থান এতে পরিবর্তন হয়নি। তাঁর দাবি, ইরানের জনগণের প্রতিরোধের কারণে যুক্তরাষ্ট্র হতাশ হয়ে পড়েছে এবং এখন মধ্যস্থতাকারীর মাধ্যমে প্রস্তাব পাঠাচ্ছে।
হরমুজ প্রণালি বন্ধ রাখার ঘোষণা কেন

গালিবাফ স্পষ্ট করে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের একতরফা কোনো দাবি ইরান মেনে নেবে না। তাঁর বক্তব্যের মূল বার্তা হলো—তেহরানের ওপর একতরফা শর্ত চাপিয়ে দেওয়ার সময় শেষ হয়েছে এবং ইরানের অবস্থান এখন পরিষ্কার ও চূড়ান্ত।
তিনি বলেন, সাতটি শর্ত পূরণ না হওয়া পর্যন্ত হরমুজ প্রণালি খোলা হবে না। এসব শর্ত জুনের সমঝোতা স্মারকের ভিত্তিতে নির্ধারিত হয়েছে।
এই অবস্থানকে শুধু একটি সাময়িক বক্তব্য হিসেবে দেখার সুযোগ কম, কারণ হরমুজ প্রণালি পুনরায় খোলার প্রশ্নটি ইরান-যুক্তরাষ্ট্র আলোচনার বৃহত্তর কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত হয়ে গেছে। জুনের সমঝোতা স্মারকে সংঘাত কমানো, আলোচনার পথ তৈরি এবং ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আলোচনার জন্য একটি কাঠামো তৈরির চেষ্টা করা হয়েছিল।
জুনের ১৪ দফা সমঝোতা কী ছিল
জুনে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র ১৪ দফার একটি সমঝোতা স্মারকে সই করেছিল। এর প্রধান লক্ষ্য ছিল দুই দেশের মধ্যে সংঘাত বন্ধ করা এবং পরবর্তী আলোচনার পথ তৈরি করা। বিশেষ করে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে এই সমঝোতাকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হয়েছিল।
সমঝোতা অনুযায়ী, দুই পক্ষ ৬০ দিনের মধ্যে একটি চূড়ান্ত চুক্তিতে পৌঁছানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করেছিল। সেই লক্ষ্যে একটি রোডম্যাপও ঘোষণা করা হয়।
এ ছাড়া আলোচনার রাজনৈতিক তদারকির জন্য ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠনে সম্মত হয়েছিল। দুই দেশের প্রধান আলোচকেরা নিয়মিত ওই কমিটিকে আলোচনার অগ্রগতি জানাবেন—এমন ব্যবস্থাও রাখা হয়েছিল।
সমঝোতার আওতায় পারমাণবিক কর্মসূচি, নিষেধাজ্ঞা এবং চুক্তি বাস্তবায়নের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে কাজ করার জন্য কয়েকটি কর্মদল গঠনের পরিকল্পনা ছিল। পাশাপাশি সমঝোতা বাস্তবায়নের অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ এবং কোনো বিরোধ দেখা দিলে তা সমাধানের ব্যবস্থাও রাখার কথা ছিল।
হরমুজ প্রণালি বন্ধ ও সমঝোতার যোগসূত্র
জুনের সমঝোতার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল সংঘাতের মাত্রা কমিয়ে আলোচনার পরিবেশ তৈরি করা। কিন্তু পরবর্তী সময়ে সেই সমঝোতা ভেঙে যাওয়ায় পরিস্থিতি আবার উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে দেখা যাচ্ছে, হরমুজ প্রণালি পুনরায় খোলার বিষয়টি ইরান-যুক্তরাষ্ট্র আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে আছে।
গালিবাফের বক্তব্যেও সেই যোগসূত্র স্পষ্ট। তিনি হরমুজ প্রণালি খোলার বিষয়টিকে জুনের সমঝোতা স্মারকের শর্ত বাস্তবায়নের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত করেছেন।
মধ্যস্থতাকারীর মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাব
গালিবাফ জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র সম্প্রতি একজন মধ্যস্থতাকারীর মাধ্যমে ইরানকে কিছু প্রস্তাব দিয়েছে। যদিও গণমাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান নিয়ে ভিন্ন ধরনের বক্তব্য এসেছে, তাঁর দাবি অনুযায়ী তেহরান এসব প্রস্তাব সম্পর্কে নিজের অবস্থান পরিষ্কার করেছে।
তিনি বলেন, ইরান একতরফা কোনো দাবি গ্রহণ করবে না। তাঁর বক্তব্যে আলোচনার দরজা পুরোপুরি বন্ধ করার চেয়ে বরং আলোচনার ক্ষেত্রে পারস্পরিক শর্ত ও প্রতিশ্রুতির ওপর গুরুত্ব দেওয়ার বিষয়টি উঠে এসেছে।
সাম্প্রতিক সময়ে কাতারের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে পরোক্ষ যোগাযোগের খবরও এসেছে। রয়টার্স জানিয়েছে, ইরানের প্রস্তাবের বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিক্রিয়া কাতারি মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে তেহরানে পৌঁছেছে এবং আলোচনায় মূল মতপার্থক্যের একটি বিষয় হয়ে উঠেছে বিভিন্ন পদক্ষেপ বাস্তবায়নের ক্রম।
এতে বোঝা যায়, সংঘাতের পাশাপাশি কূটনৈতিক যোগাযোগের একটি পথও সক্রিয় রয়েছে। তবে গালিবাফের বক্তব্য থেকে স্পষ্ট, ইরান আলোচনার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের একতরফা শর্ত মেনে নেওয়ার অবস্থানে নেই।
‘সময় নষ্টের যুগ শেষ’—গালিবাফের বার্তার অর্থ
গালিবাফ তাঁর বক্তব্যে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের একতরফা দাবি চাপিয়ে দেওয়ার সময় শেষ হয়েছে। তাঁর মতে, ইরানের অবস্থান পরিষ্কার এবং চূড়ান্ত।
এই বক্তব্য মূলত ওয়াশিংটনের সঙ্গে ভবিষ্যৎ আলোচনায় ইরানের অবস্থানকে কঠোরভাবে তুলে ধরে। তেহরান চাইছে, যেকোনো সমঝোতা হলে তা দুই পক্ষের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের ভিত্তিতে হোক।
হরমুজ প্রণালি এই আলোচনায় বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে। কারণ এটি ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতের সামরিক ও কূটনৈতিক দুই ক্ষেত্রের সঙ্গেই সম্পর্কিত হয়ে উঠেছে। ইরান প্রণালিটি খোলার বিষয়টিকে নির্দিষ্ট শর্ত পূরণের সঙ্গে যুক্ত করছে, আর যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনাও সেই বৃহত্তর সংঘাত নিরসনের প্রশ্নের সঙ্গে জড়িয়ে আছে।
জুলাইয়ে সমঝোতা ভেঙে আবার সংঘাত
জুনের সমঝোতা শেষ পর্যন্ত টেকেনি। জুলাইয়ে সেটি ভেঙে যাওয়ার পর পশ্চিম এশিয়ায় আবার সংঘাত শুরু হয়।
সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, এরপর যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সামরিক ও বেসামরিক স্থাপনায় হামলা চালায়। এর জবাবে ইরান উপসাগরীয় অঞ্চলে থাকা যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটিতে হামলা চালায়।
ফলে জুনে তৈরি হওয়া কূটনৈতিক কাঠামো দুর্বল হয়ে পড়ে এবং দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা আবার বাড়তে থাকে। হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহও সেই উত্তেজনার অংশ হয়ে ওঠে।
রয়টার্সের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হরমুজ দিয়ে জ্বালানি পরিবহন নিয়ে নিরাপত্তা ও লজিস্টিক ঝুঁকি এখনও রয়েছে। একই সময়ে প্রণালির মাধ্যমে জ্বালানি পরিবহনের প্রবাহও আন্তর্জাতিক বাজারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে আছে।
গালিবাফের বক্তব্যের পর হরমুজ প্রণালি পুনরায় খোলার বিষয়টি ইরান-যুক্তরাষ্ট্র আলোচনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হিসেবে আরও স্পষ্ট হয়েছে। তবে সাতটি শর্তের সবগুলো কী এবং সেগুলোর বাস্তবায়ন কীভাবে হবে—এ বিষয়ে প্রদত্ত উৎস প্রতিবেদনে বিস্তারিত উল্লেখ নেই। তাই এ পর্যায়ে নির্দিষ্ট শর্তের তালিকা অনুমান করা যাচ্ছে না।
তবে ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকারের বক্তব্য থেকে দুটি বিষয় পরিষ্কার। প্রথমত, তেহরান হরমুজ প্রণালি খোলার বিষয়টিকে জুনের সমঝোতা স্মারকের বাস্তবায়নের সঙ্গে যুক্ত করছে। দ্বিতীয়ত, যুক্তরাষ্ট্রের একতরফা দাবি মেনে নেওয়ার বিষয়ে ইরানের অবস্থান কঠোর।
সাম্প্রতিক কূটনৈতিক যোগাযোগের কারণে আলোচনার সম্ভাবনা পুরোপুরি শেষ হয়ে যায়নি। কিন্তু সমঝোতা বাস্তবায়ন, পারস্পরিক প্রতিশ্রুতি এবং হরমুজ প্রণালি পুনরায় খোলার শর্ত—এই তিনটি বিষয় কীভাবে সমন্বয় করা হবে, সেটিই সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে থাকছে।





