এইমাত্র

আরও খবর

News Photocard (16)
যুক্তরাজ্যে পানিতে ডুবে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীর মৃত্যু
News Photocard (33)
হরমুজ প্রণালির নতুন মানচিত্র প্রকাশ করলেন ট্রাম্প
News Photocard (15)
চ্যাটজিপিটি ব্যবহারকারীদের ৫৩ ছবি ফাঁস করল এআই এজেন্টরা
News Photocard (9)
অভিবাসন অভিযানে যুক্তরাষ্ট্রে শ্রমিক সংকট, ব্যাহত গরুর মাংস প্রক্রিয়াজাতকরণ
News Photocard (24)
ভারতজুড়ে নতুন আন্দোলনের হুঁশিয়ারি তেলাপোকাদের

‘অজান্তে সত্য প্রকাশ’, ভারতের উত্থান নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ভয় : রুশ দূত

ভারতের উত্থান নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ভয়—এমন দাবি রুশ রাষ্ট্রদূত ডেনিস আলিপভের। রাইসিনা সংলাপ, রুশ তেল ও ভারত-রাশিয়া সম্পর্ক নিয়ে উঠে এসেছে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা।

ভারতের উত্থান নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ভয় রয়েছে—এমন দাবি করেছেন ভারতে নিযুক্ত রাশিয়ার রাষ্ট্রদূত ডেনিস আলিপভ। রবিবার এনডিটিভির প্রতিরক্ষা সম্মেলনে বক্তব্য দেওয়ার সময় তিনি বলেন, চলতি বছর নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত রাইসিনা সংলাপে যুক্তরাষ্ট্রের এক শীর্ষ কর্মকর্তা প্রকাশ্যে বলেছিলেন, ওয়াশিংটন ভারতকে ‘পরবর্তী চীনে’ পরিণত হতে দেবে না। আলিপভের ব্যাখ্যায়, এ বক্তব্য থেকে যুক্তরাষ্ট্রের ভারতকে ভবিষ্যৎ শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখার বিষয়টি স্পষ্ট হয়।

রাষ্ট্রদূতের বক্তব্যে শুধু ভারত-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক নয়, রাশিয়ার সঙ্গে ভারতের দীর্ঘদিনের সম্পর্ক, রুশ তেল কেনা, নতুন মার্কিন নিষেধাজ্ঞা এবং ব্রিকসের ভবিষ্যৎ ভূমিকার বিষয়ও উঠে আসে।

ভারতের উত্থান নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ভয়—আলিপভের ব্যাখ্যা

ডেনিস আলিপভ ওই মার্কিন বক্তব্যকে ‘অজান্তে সত্য প্রকাশ’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তাঁর দাবি, রাইসিনা সংলাপে যুক্তরাষ্ট্রের একজন শীর্ষ কর্মকর্তা প্রকাশ্যে বলেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্র ভারতকে কখনোই ‘পরবর্তী চীনে’ পরিণত হতে দেবে না।

আলিপভের ব্যাখ্যায়, এখানে ‘পরবর্তী চীন’ বলতে এমন একটি দেশকে বোঝানো হয়েছে, যে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য একটি বড় প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তিতে পরিণত হতে পারে। তাঁর মতে, বক্তব্যটি থেকে বোঝা যায়, ভারত ভবিষ্যতে যত শক্তিশালী হবে, ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে দেশটির ওপর প্রভাব বা চাপ বজায় রাখার চেষ্টা তত বাড়তে পারে।

রুশ রাষ্ট্রদূত আরও বলেন, ভারত একটি পরাশক্তিতে পরিণত হবে—এটি তাঁর মতে অনিবার্য। আর সেই প্রক্রিয়ায় ভারতকে নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য যুক্তরাষ্ট্র সম্ভাব্য বিভিন্ন পদক্ষেপ নিতে পারে বলে তিনি মনে করেন।

এগুলো আলিপভের নিজস্ব রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক বিশ্লেষণ। তাঁর বক্তব্যে যুক্তরাষ্ট্রের নীতির একটি নির্দিষ্ট ব্যাখ্যা তুলে ধরা হয়েছে।

রুশ তেল কেনা নিয়ে ভারতের অবস্থান

আলিপভের বক্তব্যের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল রাশিয়ার কাছ থেকে ভারতের তেল কেনা। এই ইস্যুতে ভারত ইতিমধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের চাপের মুখে রয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

রুশ রাষ্ট্রদূতের দাবি, ভারত রাশিয়ার স্বার্থ রক্ষার জন্য রুশ তেল কিনছে না। বরং ভারতের অর্থনীতি ও জনগণের স্বার্থ বিবেচনা করেই দেশটি রাশিয়া থেকে তেল কিনছে।

এনডিটিভিকে দেওয়া বক্তব্যে আলিপভ বলেন, রাশিয়ার তেল প্রতিযোগিতামূলক দামে পাওয়া যায়। ফলে ভারত নিজের অর্থনৈতিক স্বার্থ বিবেচনা করেই ওই তেল কিনছে। তাঁর মতে, রাশিয়া থেকে তেল কেনার ক্ষেত্রে ভারতের অবস্থান দেশটির কৌশলগত স্বাধীনতারও একটি প্রকাশ।

নতুন মার্কিন আইনে রাশিয়ার ওপর চাপ

আলিপভ যুক্তরাষ্ট্রের নতুন নিষেধাজ্ঞা উদ্যোগের প্রসঙ্গও তোলেন। তিনি ‘লিন্ডসে ও গ্রাহাম রাশিয়া ও ইরানকে নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার আইন, ২০২৬’-এর কথা উল্লেখ করেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ওই আইনে স্বাক্ষর করেছেন।

আইনটির মাধ্যমে রাশিয়ার ওপর অর্থনৈতিক চাপ বাড়ানোর পাশাপাশি ইরানের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরও কঠোর করার সুযোগ তৈরি হয়েছে। আইনে রাশিয়ার তেল ও গ্যাস কেনা দেশগুলোর পণ্যের ওপর সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপের সুযোগ যুক্তরাষ্ট্রের রয়েছে।

রাশিয়ার জ্বালানি কেনার ক্ষেত্রে ভারত গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় এই বিধানকে ঘিরে দিল্লি ও ওয়াশিংটনের সম্পর্কের ওপর চাপের বিষয়টি আলোচনায় এসেছে। তবে আইনে শুল্ক আরোপের ক্ষমতা থাকলেই তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে কোনো নির্দিষ্ট দেশের ওপর প্রয়োগ হয়েছে—এমনটা বলা যায় না। আইনটির বিধান অনুযায়ী ক্ষমতাটি প্রয়োগের সুযোগ রয়েছে।

আলিপভের বক্তব্য হলো, রাশিয়ার ওপর চাপ সৃষ্টির এই নীতির প্রভাব ভারতের ওপরও পড়তে পারে। তাঁর মতে, ভারত যত এগিয়ে যাবে, দেশটির ওপর এ ধরনের চাপ ও কৌশল অব্যাহত থাকার সম্ভাবনা রয়েছে এবং ভবিষ্যতে তা আরও বাড়তে পারে।

ভারত-রাশিয়া সম্পর্কের দীর্ঘ ইতিহাস

রাশিয়ার সঙ্গে ভারতের সম্পর্ককে আলিপভ তাঁর বক্তব্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে তুলে ধরেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, ভারত ও সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে ১৯৪৭ সালের এপ্রিলে আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত হয়।

১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যাওয়ার পরও রাশিয়া সেই সম্পর্ক ধরে রাখে। আলিপভের মতে, দীর্ঘ সময় ধরে পারস্পরিক আস্থা ও সম্মান ভারত-রাশিয়া সম্পর্কের অন্যতম ভিত্তি হিসেবে কাজ করেছে।

তিনি বলেন, যাদের ওপর আস্থা রাখা যায় না, তাদের সঙ্গে ব্যবসা করা সম্ভব নয়। দুই দেশের সম্পর্কের ধারাবাহিকতার বিষয়টি ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করও একবার উল্লেখ করেছেন বলে জানান রুশ রাষ্ট্রদূত।

আলিপভ আরও বলেন, সোভিয়েত ইউনিয়নের সময় থেকেই ভারত ও রাশিয়ার সম্পর্ক অব্যাহত রয়েছে। আগামী বছর দুই দেশ কূটনৈতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার ৮০ বছর পূর্তি উদ্‌যাপন করবে।

তাঁর মতে, কয়েক দশকে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন এলেও দুই দেশের সম্পর্ক টিকে থাকার অন্যতম কারণ হলো—ভারত ও রাশিয়া তাদের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে তৎকালীন বৈশ্বিক পরিস্থিতির ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল করেনি।

সম্পর্কের ভিত্তি পারস্পরিক আস্থা ও সহযোগিতা

আলিপভের বক্তব্য অনুযায়ী, ভারত-রাশিয়া সম্পর্ককে শুধু রাশিয়ার দিক থেকে ভারতের সঙ্গে অংশীদারত্ব হিসেবে দেখা হয় না। তাঁর মতে, ভারতও রাশিয়াকে গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করে।

তিনি বলেন, দুই দেশ কখনোই তাদের সম্পর্ককে এমনভাবে দেখেনি যে একজনের লাভ মানেই অন্য পক্ষের ক্ষতি। বরং বছরের পর বছর পারস্পরিক সহযোগিতা ও সমর্থন সম্পর্কটিকে শক্ত ভিত্তি দিয়েছে।

এই অবস্থানের ওপর ভিত্তি করে ভবিষ্যতে দুই দেশের সম্পর্ক আরও বিস্তৃত করার সুযোগ রয়েছে বলেও মন্তব্য করেন রুশ রাষ্ট্রদূত।

এখানে ভারতের কৌশলগত স্বাধীনতার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। রাশিয়ার তেল কেনার বিষয়ে ভারতের অবস্থানকে আলিপভ যেমন অর্থনৈতিক স্বার্থের সঙ্গে যুক্ত করেছেন, তেমনি এটিকে কৌশলগত সিদ্ধান্ত হিসেবেও ব্যাখ্যা করেছেন।

পুতিন-মোদি বৈঠক ও ব্রিকসের প্রসঙ্গ

সম্প্রতি রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বৈঠকের কথাও তুলে ধরেন ডেনিস আলিপভ।

১১ সেপ্টেম্বর নয়াদিল্লিতে ব্রিকস নেতাদের সম্মেলনের ফাঁকে পুতিন ও মোদি বৈঠক করেন। আলিপভের মতে, ওই বৈঠক এবং ব্রিকস সম্মেলনের বিভিন্ন আলোচনা বিশ্বরাজনীতিতে সংগঠনটির সদস্য দেশগুলোর আরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার আগ্রহকে তুলে ধরেছে।

রুশ রাষ্ট্রদূতের ভাষ্য অনুযায়ী, ব্রিকসের দেশগুলো আন্তর্জাতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে আরও শক্তিশালী ভূমিকা চায়। একই সঙ্গে তারা এমন একটি বিকল্প আলোচনার প্ল্যাটফর্মের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে, যেখানে বিভিন্ন দেশের অংশগ্রহণের সুযোগ থাকবে।

আলিপভ বলেন, ভারত ও অন্যান্য অংশীদার দেশের সঙ্গে রাশিয়াও এমন একটি ব্যবস্থা গড়ে তোলার পক্ষে, যেখানে আন্তর্জাতিক বিষয়ে বিভিন্ন দেশের মতামত গুরুত্ব পাবে।

ভারত-রাশিয়া সম্পর্কের সামনে নতুন বাস্তবতা

ডেনিস আলিপভের বক্তব্যে একই সঙ্গে তিনটি বিষয় স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে—ভারতের ক্রমবর্ধমান বৈশ্বিক গুরুত্ব, রাশিয়ার সঙ্গে ভারতের অর্থনৈতিক সম্পর্ক এবং আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় ব্রিকসের ভূমিকা।

একদিকে ভারতের শক্তিশালী হয়ে ওঠাকে তিনি দীর্ঘমেয়াদি বাস্তবতা হিসেবে দেখছেন। অন্যদিকে রাশিয়ার সঙ্গে ভারতের জ্বালানি ও কূটনৈতিক সম্পর্ককে দুই দেশের পারস্পরিক স্বার্থের অংশ হিসেবে তুলে ধরেছেন।

অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন নিষেধাজ্ঞা কাঠামো এবং রাশিয়ার জ্বালানি কেনা নিয়ে চাপের বিষয়টি ভারত-রাশিয়া সম্পর্কের সামনে নতুন কূটনৈতিক বাস্তবতা তৈরি করছে বলে তাঁর বক্তব্যে ইঙ্গিত পাওয়া যায়।

তবে এসব বিষয়ে আলিপভের বক্তব্য রাশিয়ার রাষ্ট্রদূত হিসেবে তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি। যুক্তরাষ্ট্রের ভারতনীতি সম্পর্কে তাঁর ব্যাখ্যাকে ওয়াশিংটনের আনুষ্ঠানিক অবস্থান হিসেবে বিবেচনা করা যায় না, যদি না সংশ্লিষ্ট মার্কিন কর্তৃপক্ষ তা পৃথকভাবে নিশ্চিত করে।

সব মিলিয়ে, ভারতের উত্থান, রুশ তেল এবং বৈশ্বিক শক্তির ভারসাম্য—এই তিনটি বিষয়কে কেন্দ্র করেই আলিপভের সাম্প্রতিক বক্তব্যে ভারত-রাশিয়া-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের একটি বৃহত্তর চিত্র উঠে এসেছে।

সর্বাধিক পঠিত