খামেনির জানাজায় যাওয়া বিমানে বাধা, তিনটি ভুল হিসাব, বিমানবন্দরে হামলা, মার্কিন অনীহা ও মিত্রদের সঙ্গে টানাপোড়েনে চাপে রিয়াদ।
সৌদি আরব-হুতি সংঘাত নতুন করে মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলেছে। ইয়েমেনের সশস্ত্র গোষ্ঠী হুতিদের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার মুখে সৌদি আরবের নিরাপত্তা এবং আঞ্চলিক প্রভাব নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। চ্যানেল ২৪-এর প্রকাশিত বিশ্লেষণ অনুযায়ী, সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে অংশীদারত্বে ভাঙন, হুতিদের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপের পরিণতি বিবেচনায় ভুল এবং যুক্তরাষ্ট্রের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা—এই তিনটি বিষয় রিয়াদের বর্তমান সংকটকে আরও গভীর করেছে।
সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান দেশটিকে আধুনিক পর্যটন ও অর্থনৈতিক কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছেন। কিন্তু ইয়েমেনের দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত এবং সাম্প্রতিক হামলা সেই লক্ষ্য বাস্তবায়নের পথে নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। প্রায় ১১ বছর পর ইয়েমেনের যুদ্ধে সৌদি আরব আবারও সরাসরি জড়িয়ে পড়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রশ্ন উঠেছে, আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের পরিকল্পনা থাকা সত্ত্বেও কেন সৌদি আরবকে এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হচ্ছে? বিশ্লেষকদের মতে, সামরিক শক্তির পাশাপাশি কূটনৈতিক সমন্বয়, মিত্রদের নির্ভরযোগ্যতা এবং সংঘাতের দীর্ঘমেয়াদি পরিণতি বিবেচনায় ঘাটতি এই সংকটের গুরুত্বপূর্ণ কারণ।
সৌদি আরব-হুতি সংঘাতের পেছনে তিনটি বড় ভুল হিসাব

সৌদি আরবের বর্তমান সংকটকে শুধু হুতিদের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার মধ্যে সীমাবদ্ধ রেখে ব্যাখ্যা করা কঠিন। এর পেছনে রয়েছে আঞ্চলিক মিত্রদের সঙ্গে সম্পর্কের পরিবর্তন, সামরিক সিদ্ধান্তের প্রতিক্রিয়া এবং যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা নিয়ে প্রত্যাশা ও বাস্তবতার ব্যবধান।
১. সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে অংশীদারত্বে ভাঙন
বিশ্লেষকদের মতে, সৌদি আরবের প্রথম বড় ভুল হিসাব ছিল সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে দীর্ঘদিনের অংশীদারত্বের ভাঙন। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত বছর ইয়েমেনে আমিরাতি বাহিনী হঠাৎ সেনা প্রত্যাহার করে নেয়। এর ফলে দেশটিতে বড় ধরনের ক্ষমতার শূন্যতা তৈরি হয়।
সৌদি আরব সেই শূন্যতা পূরণ করতে পারেনি বলে বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে ইয়েমেনের বিভিন্ন এলাকায় নিজেদের অবস্থান ধরে রাখা এবং হুতিদের অগ্রযাত্রা মোকাবিলায় সৌদি-সমর্থিত পক্ষের জন্য পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে ওঠে।
যুদ্ধের মতো জটিল পরিস্থিতিতে কোনো একটি মিত্র দেশের সেনা প্রত্যাহার শুধু সামরিক শক্তির ভারসাম্যই বদলায় না; স্থানীয় বাহিনীগুলোর সমন্বয় ও নিয়ন্ত্রণেও প্রভাব ফেলে। সৌদি আরবের ক্ষেত্রে আমিরাতের সঙ্গে সম্পর্কের টানাপোড়েন ইয়েমেনে তাদের কৌশলগত অবস্থানকে দুর্বল করেছে বলে বিশ্লেষকেরা মনে করছেন।
২. সানা বিমানবন্দরে হামলার পর হুতিদের পাল্টা পদক্ষেপ
দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হলো, হুতিদের বিরুদ্ধে সৌদি আরবের সামরিক পদক্ষেপের পরিণতি যথাযথভাবে অনুমান করতে না পারা।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত জুলাইয়ে ইরানের সর্বোচ্চ নেতার জানাজায় হুতি প্রতিনিধিদলকে নিয়ে যাওয়ার জন্য একটি ইরানি বিমান তেহরানে যাওয়ার পথে সানা বিমানবন্দরে পৌঁছালে সৌদি আরব সেখানে হামলা চালায়। এর প্রতিক্রিয়ায় হুতিরা যুদ্ধবিরতি বাতিল করে এবং লোহিত সাগর ও সৌদি আরবের তেল অবকাঠামো লক্ষ্য করে হামলা শুরু করে।
সৌদি সামরিক বাহিনী ও তাদের স্থানীয় মিত্ররা হুতিদের এই আকস্মিক আক্রমণের জন্য প্রস্তুত ছিল না বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এই ঘটনা দেখিয়েছে, একটি সামরিক পদক্ষেপের তাৎক্ষণিক লক্ষ্য থাকলেও তার পরবর্তী প্রতিক্রিয়া আরও বিস্তৃত হতে পারে। সানা বিমানবন্দরে হামলার পর হুতিদের পাল্টা তৎপরতা সৌদি আরবের নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে নতুন করে চাপের মুখে ফেলে।
এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সামরিক অভিযানের সিদ্ধান্ত নেওয়ার পাশাপাশি প্রতিপক্ষ কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানাতে পারে, তার সম্ভাব্য প্রভাবও বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন। বর্তমান সংঘাতের ক্ষেত্রে সেই হিসাবের ঘাটতি সৌদি আরবের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে বলে বিশ্লেষণে উঠে এসেছে।
৩. যুক্তরাষ্ট্রের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা
সৌদি আরবের তৃতীয় বড় ভুল হিসাব হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা। ওয়াশিংটনের সঙ্গে প্রতিরক্ষা চুক্তি থাকা সত্ত্বেও সংকটের সময় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যুদ্ধে সরাসরি জড়াতে অস্বীকৃতি জানান বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
সৌদি আরবের জন্য এটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক বাস্তবতা। দীর্ঘদিনের প্রতিরক্ষা সহযোগিতা থাকলেই প্রতিটি আঞ্চলিক সংঘাতে মিত্র দেশ সরাসরি সামরিকভাবে অংশ নেবে—এমন নিশ্চয়তা নেই।
পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে যুক্তরাষ্ট্রের ওমানে হুতিদের সঙ্গে আলাদা বৈঠক। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই উদ্যোগের ফলে সৌদি আরব নিজেকে আরও একা ও অরক্ষিত মনে করতে শুরু করে।
এতে রিয়াদের সামনে একটি মৌলিক প্রশ্ন তৈরি হয়েছে: নিরাপত্তার জন্য বহিঃশক্তির সহায়তার ওপর নির্ভর করার পাশাপাশি নিজস্ব প্রতিরক্ষা সক্ষমতা এবং আঞ্চলিক কূটনৈতিক সম্পর্ককে কীভাবে শক্তিশালী করা যায়?
সৌদি আরবের বর্তমান পরিস্থিতি ইঙ্গিত দিচ্ছে, প্রতিরক্ষা চুক্তি ও সামরিক সহযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ হলেও সংকট মোকাবিলায় রাজনৈতিক সমন্বয় এবং বিকল্প কূটনৈতিক পথও প্রয়োজন।
বাব আল-মানদেব প্রণালি ও লোহিত সাগরে বাড়ছে চাপ
সৌদি আরব-হুতি সংঘাতের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো লোহিত সাগরকেন্দ্রিক কৌশলগত প্রতিদ্বন্দ্বিতা। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত জুলাইয়ে নতুন করে উত্তেজনা শুরু হওয়ার পর হুতিরা লোহিত সাগরে সৌদি আরবকে চাপে ফেলতে বাব আল-মানদেব প্রণালি নিয়ন্ত্রণে নেয়।
বাব আল-মানদেব প্রণালি লোহিত সাগরের দক্ষিণ প্রান্তে অবস্থিত একটি গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পথ। এই পথের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হলে ওই অঞ্চলে জাহাজ চলাচল ও সামুদ্রিক বাণিজ্যের ওপর চাপ তৈরি হতে পারে। সৌদি আরবের মতো আঞ্চলিক শক্তির জন্য এমন পরিস্থিতি নিরাপত্তার পাশাপাশি অর্থনৈতিক স্বার্থের সঙ্গেও সম্পর্কিত।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, হুতিরা সৌদি আরবে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পাশাপাশি ইয়েমেনের নতুন নতুন অঞ্চল দখল করে। পরে সৌদি-সমর্থিত ইয়েমেনি বাহিনী কিছু এলাকা আবার তাদের কাছ থেকে পুনর্দখল করে। তবে এর পরও দুই পক্ষের মধ্যে তীব্র লড়াই অব্যাহত থাকে।
এ থেকে বোঝা যায়, ইয়েমেনের সংঘাত শুধু সীমান্তবর্তী সামরিক লড়াই নয়। দেশটির বিভিন্ন অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ, সামুদ্রিক পথের নিরাপত্তা এবং আঞ্চলিক শক্তিগুলোর প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতা একে আরও জটিল করে তুলেছে।
রিয়াদে বিমানবন্দরে হামলা, নিহত ১৭
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের মধ্যে সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদের কিং খালেদ বিমানবন্দরও হামলার লক্ষ্যবস্তু হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, পাঁচ দিনে বিমানবন্দরটিতে চার দফা হামলা চালানো হয়। এর মধ্যে গত শনিবারের হামলাটি ছিল সবচেয়ে প্রাণঘাতী। ইয়েমেনের সশস্ত্র গোষ্ঠী হুতিদের এই হামলায় বাংলাদেশিসহ ১৩ জন নিহত এবং তিন শতাধিক মানুষ আহত হন।
সব হামলা মিলিয়ে নিহতের সংখ্যা দাঁড়ায় ১৭।
এই হতাহতের ঘটনা সৌদি আরবের নিরাপত্তা পরিস্থিতির গুরুতর দিকটি সামনে এনেছে। বিমানবন্দরের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় বারবার হামলা চালানো হলে শুধু সংশ্লিষ্ট অবকাঠামোর নিরাপত্তাই নয়, সাধারণ মানুষের চলাচল ও জনজীবনও ঝুঁকির মুখে পড়ে।
বাংলাদেশিসহ বিদেশি নাগরিকদের হতাহতের তথ্য ঘটনাটির আন্তর্জাতিক গুরুত্বও তুলে ধরে। তবে প্রতিবেদনে নিহত বাংলাদেশিদের পরিচয় বা তাঁদের সংখ্যা সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য দেওয়া হয়নি।
হুতিদের লক্ষ্য সৌদি আরবের ওপর সর্বোচ্চ চাপ সৃষ্টি
ইয়েমেনভিত্তিক গবেষণাপ্রতিষ্ঠান সানা সেন্টারের গবেষক ইয়াসমিন আল এরিয়ানি মনে করেন, হুতিরা সৌদি আরবের ওপর সর্বোচ্চ চাপ সৃষ্টি করার চেষ্টা করছে।
আল-জাজিরাকে দেওয়া বক্তব্যে তিনি বলেন, সৌদি আরবে হামলার মাত্রা বাড়িয়েছে হুতিরা এবং ভবিষ্যতে তাদের তৎপরতা আরও বাড়তে পারে। তাঁর মূল্যায়ন অনুযায়ী, গোষ্ঠীটি শুধু সৌদি আরবকেই নয়, অন্যান্য আঞ্চলিক দেশকেও উসকানি দিচ্ছে। এতে সংঘাতের পরিধি আরও বিস্তৃত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
এই মূল্যায়ন থেকে বোঝা যায়, বর্তমান পরিস্থিতি শুধু সৌদি আরব ও হুতিদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে কি না, সেটি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। সংঘাতের সঙ্গে আরও আঞ্চলিক পক্ষ জড়িয়ে পড়লে কূটনৈতিক সমাধান খুঁজে পাওয়া কঠিন হতে পারে।
অন্যদিকে, হুতিদের হামলার কড়া জবাব দেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছে সৌদি নেতৃত্বাধীন যৌথ বাহিনী। তবে সামরিক পাল্টা পদক্ষেপ পরিস্থিতিকে কতটা নিয়ন্ত্রণে আনতে পারবে, তা এখনো অনিশ্চিত।
সংকট মোকাবিলায় নতুন প্রতিরক্ষা অংশীদার খুঁজছে সৌদি আরব
যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি সামরিক অংশগ্রহণ না পাওয়ার প্রেক্ষাপটে সৌদি আরব নিজেদের নিরাপত্তা অবস্থান শক্তিশালী করার চেষ্টা করছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মিসর, ফ্রান্স ও যুক্তরাজ্যের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সহযোগিতার পাশাপাশি সম্প্রতি তুরস্ক ও পাকিস্তানের সঙ্গেও নতুন প্রতিরক্ষা চুক্তির মাধ্যমে অবস্থান জোরদার করার উদ্যোগ নিয়েছে রিয়াদ।
এই উদ্যোগের মাধ্যমে সৌদি আরব নিরাপত্তা সহযোগিতার পরিধি বাড়াতে চাইছে বলে প্রতীয়মান হয়। তবে নতুন চুক্তি কতটা কার্যকর হবে, তা নির্ভর করবে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সহযোগিতা, বাস্তবায়ন এবং সংঘাতের পরিস্থিতির ওপর।
প্রতিরক্ষা অংশীদারত্ব বাড়ানো সামরিক সক্ষমতা জোরদারে ভূমিকা রাখতে পারে। কিন্তু ইয়েমেনের সংঘাতের স্থায়ী সমাধানের জন্য কেবল সামরিক সহযোগিতা যথেষ্ট হবে কি না, সেটি আলাদা প্রশ্ন।
বিশ্লেষণে উঠে এসেছে, বিভক্ত মিত্রবাহিনী এবং সুস্পষ্ট রাজনৈতিক সমাধানের অভাব সৌদি আরবের দীর্ঘমেয়াদি স্বস্তির পথে বড় বাধা হতে পারে। ফলে নিরাপত্তা সহযোগিতার পাশাপাশি ইয়েমেনের রাজনৈতিক পরিস্থিতি মোকাবিলায় কার্যকর কৌশলও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
সৌদি আরব-হুতি সংঘাতের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট
সৌদি আরব ও ইরান-সমর্থিত হুতিদের দ্বন্দ্ব দীর্ঘদিনের। ২০১৪ সালে হুতিরা ইয়েমেনের রাজধানী সানা দখল করে নেয়। এর পরের বছর, ২০১৫ সালে, হুতিবিরোধী সামরিক অভিযান শুরু করে সৌদি আরব।
দুই পক্ষের মধ্যে দীর্ঘ লড়াই চললেও এর সবচেয়ে বড় মূল্য দিতে হয়েছে সাধারণ মানুষকে। সংঘাতের কারণে ইয়েমেনে লাখো মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
২০২২ সালে একটি যুদ্ধবিরতি চুক্তির মাধ্যমে সংঘাতের তীব্রতা কমে আসে। তবে সেই যুদ্ধবিরতি ইয়েমেনের রাজনৈতিক ও আঞ্চলিক বিভাজনের স্থায়ী সমাধান নিশ্চিত করতে পারেনি। বর্তমানে হুতি এবং সৌদি-সমর্থিত সরকার—উভয় পক্ষই নিজেদের নিয়ন্ত্রণে থাকা অঞ্চলগুলো পরিচালনা করছে।
এই প্রেক্ষাপট বর্তমান উত্তেজনা বোঝার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘদিনের বিরোধ, ভৌগোলিক নিয়ন্ত্রণ নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং আঞ্চলিক শক্তিগুলোর সম্পৃক্ততা ইয়েমেনের সংকটকে জটিল করে রেখেছে।
সৌদি আরবের সামনে কী চ্যালেঞ্জ?
বর্তমান পরিস্থিতিতে সৌদি আরবের সামনে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ রয়েছে।
প্রথমত, বিমানবন্দর ও তেল অবকাঠামোর মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। দ্বিতীয়ত, হুতিদের হামলা মোকাবিলায় সামরিক প্রস্তুতি ও স্থানীয় মিত্রদের সমন্বয় জোরদার করা। তৃতীয়ত, যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরতার পাশাপাশি অন্যান্য দেশের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা কার্যকর করা।
এর পাশাপাশি ইয়েমেনের রাজনৈতিক সংকটের সমাধান খোঁজাও জরুরি। সামরিক সাফল্যের মাধ্যমে কিছু এলাকা পুনর্দখল করা সম্ভব হলেও তা দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতার নিশ্চয়তা দেয় না। বিশেষ করে স্থানীয় পক্ষগুলোর মধ্যে বিভক্তি অব্যাহত থাকলে নতুন করে সংঘাত ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা থেকেই যায়।
সৌদি আরবের অর্থনৈতিক ও পর্যটনকেন্দ্রিক উন্নয়ন পরিকল্পনার জন্যও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা গুরুত্বপূর্ণ। নিরাপত্তা পরিস্থিতি দীর্ঘ সময় অস্থির থাকলে দেশটির আধুনিকায়ন ও আন্তর্জাতিক যোগাযোগের পরিকল্পনা বাড়তি চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে। তবে বর্তমান সংঘাতের কারণে এসব পরিকল্পনায় ঠিক কী ধরনের অর্থনৈতিক প্রভাব পড়েছে, সে বিষয়ে প্রতিবেদনে নির্দিষ্ট পরিসংখ্যান দেওয়া হয়নি।
সৌদি আরব-হুতি সংঘাতের সাম্প্রতিক পরিস্থিতি দেখাচ্ছে, আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সামরিক শক্তির পাশাপাশি কূটনৈতিক সমন্বয় ও দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক পরিকল্পনাও প্রয়োজন। সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে অংশীদারত্বে ভাঙন, সানা বিমানবন্দরে হামলার পর হুতিদের প্রতিক্রিয়া এবং যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি অংশগ্রহণে অনীহা—এই তিনটি বিষয় সৌদি আরবের কৌশলগত অবস্থানকে কঠিন করে তুলেছে বলে বিশ্লেষণে উঠে এসেছে।
রিয়াদ এখন নতুন প্রতিরক্ষা অংশীদারত্বের মাধ্যমে নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করার চেষ্টা করছে। তবে এই উদ্যোগ কতটা সফল হবে, তা নির্ভর করবে সামরিক প্রস্তুতি, মিত্রদের সমন্বয় এবং রাজনৈতিক সমাধানের অগ্রগতির ওপর।
ইয়েমেনের দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের অভিজ্ঞতা বলছে, কেবল সামরিক অভিযান দিয়ে স্থায়ী শান্তি নিশ্চিত করা কঠিন। তাই সৌদি আরবের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো নিরাপত্তা রক্ষা এবং সংঘাতের বিস্তার ঠেকানোর পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক সমাধানের পথ খুঁজে বের করা।





