নতুন পে স্কেলে ১ নভেম্বর চার মাসের বকেয়াসহ বেতন দেওয়ার কথা থাকলেও জটিলতায় আটকে গেছেন অনেক সরকারি চাকরিজীবী। পুরনো স্কেলে বেতন ও বকেয়া পাওয়ার অপেক্ষায় রয়েছেন তাঁরা।
নতুন পে স্কেল অনুযায়ী আগামী ১ নভেম্বর চার মাসের বকেয়াসহ সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন দেওয়ার কথা থাকলেও বেতন নির্ধারণের জটিলতায় অনেকেই এই সুবিধা পাচ্ছেন না। অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নতুন বেতন কাঠামো অনুযায়ী বেতন নির্ধারণ করতে না পারা কর্মীরা আপাতত পুরোনো পে স্কেলেই বেতন পাবেন। তাঁদের বকেয়া অর্থ পরে পরিশোধ করা হবে। নতুন পে স্কেল কার্যকর করার প্রক্রিয়ায় গ্রেডের ক্রম, উচ্চতর গ্রেড, বাড়িভাড়া ভাতা এবং আইবাস++ ব্যবস্থার জটিলতা নিয়ে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
নতুন জাতীয় বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের এই পর্যায়ে বেতন নির্ধারণ সম্পন্ন করতে না পারায় একদিকে যেমন অনেক চাকরিজীবী প্রত্যাশিত আর্থিক সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন, অন্যদিকে পদোন্নতির পরও কারও কারও মোট আয় কমে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। ফলে নতুন বেতন কাঠামো কার্যকরের প্রক্রিয়া এবং সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক জটিলতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
নতুন পে স্কেলে ১ নভেম্বর বেতন, বাদ পড়ছেন অনেক চাকরিজীবী
অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগের সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, আগামী রবিবার, ১ নভেম্বর, সরকারি চাকরিজীবীদের নতুন পে স্কেল অনুযায়ী চার মাসের বকেয়াসহ বেতন দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। তবে সব কর্মচারীর বেতন নির্ধারণের কাজ নির্ধারিত সময়ের মধ্যে শেষ করা সম্ভব হয়নি।
যাঁদের বেতন নতুন কাঠামো অনুযায়ী নির্ধারণ করা যায়নি, তাঁরা আপাতত পুরোনো বেতন স্কেল অনুসারে বেতন পাবেন। নতুন পে স্কেল অনুযায়ী প্রাপ্য বকেয়া অর্থ তাঁদের পরে দেওয়া হবে বলে জানা গেছে।
এতে বেতন প্রদানের নির্ধারিত সময়সূচি থাকলেও সবাই একই সময়ে নতুন কাঠামোর আর্থিক সুবিধা পাচ্ছেন না। যাঁদের বেতন নির্ধারণের কাজ সম্পন্ন হয়েছে, তাঁদের সঙ্গে অন্যদের বেতন পাওয়ার প্রক্রিয়ায় পার্থক্য তৈরি হচ্ছে।
তবে কতজন চাকরিজীবী ১ নভেম্বর নতুন কাঠামো অনুযায়ী বেতন পাবেন না, সে বিষয়ে নির্দিষ্ট সংখ্যা প্রকাশিত হয়নি।
১৪ লাখ সরকারি কর্মচারী, ৮ লাখ পেনশনভোগী ও ৬ লাখ এমপিওভুক্ত শিক্ষক

নতুন পে স্কেল বাস্তবায়নের আওতায় বিপুলসংখ্যক সরকারি কর্মচারী, পেনশনভোগী ও এমপিওভুক্ত শিক্ষক রয়েছেন। প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ১৪ লাখ সরকারি কর্মচারী, ৮ লাখ পেনশনভোগী এবং ৬ লাখ এমপিওভুক্ত শিক্ষকের মধ্যে সবাই নতুন কাঠামো অনুযায়ী বেতন নির্ধারণ করতে পারেননি।
এই বিশালসংখ্যক সুবিধাভোগীর বেতন নির্ধারণের কাজ সম্পন্ন করা বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কিন্তু সংশ্লিষ্টদের সবাই নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বেতন নির্ধারণ করতে না পারায় নতুন কাঠামোর সুবিধা পাওয়ার ক্ষেত্রে জটিলতা দেখা দিয়েছে।
এখানে উল্লেখিত সংখ্যা সংশ্লিষ্ট সুবিধাভোগী গোষ্ঠীর আকার তুলে ধরে। তবে তাঁদের মধ্যে ঠিক কতজনের বেতন নির্ধারণ অসম্পূর্ণ রয়েছে, তা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়নি।
অর্থসচিবের কাছে আবেদন করেও সমাধান মেলেনি
প্রতিবেদন অনুযায়ী, নতুন পে স্কেল বাস্তবায়নের বিভিন্ন জটিলতা দূর করার জন্য অর্থসচিব মো. খায়েরুজ্জামান মজুমদারের কাছে আবেদন করা হয়েছিল। তবে আবেদন করার পরও সমস্যার সমাধান হয়নি বলে জানা গেছে।
বেতন নির্ধারণের নিয়ম প্রয়োগ করতে গিয়ে যেসব অসংগতি সামনে এসেছে, সেগুলো দূর করা না গেলে সংশ্লিষ্ট কর্মচারীদের বেতন ও আর্থিক সুবিধা নির্ধারণে আরও জটিলতা তৈরি হতে পারে।
তবে অর্থসচিবের কাছে করা আবেদনের বিষয়ে কী সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, কিংবা সমস্যাগুলো সমাধানে পরবর্তী কোনো পদক্ষেপ নির্ধারণ করা হয়েছে কি না, সে সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি।
বেতন নির্ধারণে গ্রেড ও বাড়িভাড়া ভাতা নিয়ে অসংগতি
বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের অনেক কর্মকর্তা-কর্মচারী এখনো নতুন পে স্কেল অনুযায়ী বেতন নির্ধারণের কাজ শেষ করতে পারেননি। তাঁদের অভিযোগ, নতুন নিয়ম কার্যকর করতে গিয়ে বেতন গ্রেডের স্বাভাবিক ক্রম বজায় রাখা, উচ্চতর গ্রেড নির্ধারণ এবং বাড়িভাড়া ভাতা হিসাব করার ক্ষেত্রে অসংগতি দেখা দিয়েছে।
বেতন কাঠামোয় গ্রেডের অবস্থান ও উচ্চতর গ্রেডের হিসাব কর্মচারীদের প্রাপ্য বেতনের সঙ্গে সম্পর্কিত। তাই এসব ক্ষেত্রে নিয়ম প্রয়োগে অসংগতি দেখা দিলে বেতন নির্ধারণের প্রক্রিয়া জটিল হতে পারে।
একইভাবে বাড়িভাড়া ভাতার হিসাবেও সমস্যা দেখা দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। ফলে শুধু মূল বেতন নির্ধারণ নয়, অন্যান্য আর্থিক সুবিধা হিসাব করার ক্ষেত্রেও সংশ্লিষ্টদের সমস্যার মুখোমুখি হতে হচ্ছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে কোন গ্রেডে বা কোন মন্ত্রণালয়ে কী ধরনের অসংগতি বেশি দেখা দিয়েছে, তার বিস্তারিত বিবরণ প্রকাশিত হয়নি। ফলে অভিযোগগুলোর ব্যাপ্তি কিংবা নির্দিষ্ট কোনো নিয়মের কারণে কতজন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন, তা নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না।
আইবাস++ ব্যবস্থার জটিলতাও বাধা
বেতন নির্ধারণের প্রক্রিয়ায় আরেকটি সমস্যা হিসেবে উঠে এসেছে আইবাস++ ব্যবস্থার জটিলতা। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অভিযোগ, নতুন বেতন কাঠামোর নিয়ম প্রয়োগের পাশাপাশি এই ব্যবস্থার জটিলতাও বেতন নির্ধারণের কাজ শেষ করতে বাধা সৃষ্টি করছে।
আইবাস++ ব্যবস্থার মাধ্যমে বেতনসংক্রান্ত হিসাব ও প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনার ক্ষেত্রে সমস্যা দেখা দিলে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সংশ্লিষ্ট কর্মীদের বেতন নির্ধারণ সম্পন্ন করা কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
প্রতিবেদনে গ্রেড, উচ্চতর গ্রেড ও বাড়িভাড়া ভাতার অসংগতির পাশাপাশি আইবাস++ ব্যবস্থার জটিলতার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। তবে ব্যবস্থাটির কোন নির্দিষ্ট ধাপে সমস্যা হচ্ছে, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য দেওয়া হয়নি।
পদোন্নতির পরও আয় কমে যাওয়ার আশঙ্কা
নতুন পে স্কেল বাস্তবায়নের জটিলতা শুধু বেতন পেতে বিলম্বের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অভিযোগ অনুযায়ী, বেতন নির্ধারণের নিয়ম প্রয়োগে অসংগতির কারণে কেউ কেউ প্রত্যাশিত আর্থিক সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। আবার কারও ক্ষেত্রে পদোন্নতি পাওয়ার পরও মোট আয় কমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
পদোন্নতির পর সাধারণত সংশ্লিষ্ট কর্মীর বেতন ও আর্থিক সুবিধার হিসাব নতুন অবস্থানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণভাবে নির্ধারণ করা প্রয়োজন। কিন্তু নতুন কাঠামোর নিয়ম প্রয়োগে অসংগতি থাকলে প্রত্যাশিত বেতন নির্ধারণ নিয়ে বিভ্রান্তি তৈরি হতে পারে।
এ কারণে নতুন পে স্কেল বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে শুধু বেতন নির্ধারণ সম্পন্ন করাই নয়, বরং সংশ্লিষ্ট নিয়মগুলোর সঠিক প্রয়োগ নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
তবে পদোন্নতির পর কারও আয় বাস্তবে কমেছে কি না, নাকি এ বিষয়ে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে—প্রতিবেদনে তা আলাদাভাবে নিশ্চিত করা হয়নি। তাই বিষয়টিকে সংশ্লিষ্টদের উত্থাপিত অভিযোগ ও আশঙ্কা হিসেবেই বিবেচনা করতে হবে।
নতুন পে স্কেল অনুমোদন থেকে বেতন নির্ধারণ: ঘটনাপ্রবাহ
নতুন জাতীয় বেতন কাঠামো অনুমোদন ও বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ তারিখ রয়েছে। প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, গত ৩১ আগস্ট মন্ত্রিসভায় নবম জাতীয় পে স্কেল অনুমোদন পায়। এরপর ১৭ সেপ্টেম্বর নতুন জাতীয় বেতন স্কেলের প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়।
পরবর্তী সময়ে ৫ অক্টোবর থেকে বেতন নির্ধারণের কাজ শুরু হয়। কিন্তু প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার পরও বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের অনেক কর্মকর্তা-কর্মচারী তাঁদের বেতন নির্ধারণের কাজ শেষ করতে পারেননি।
ঘটনাগুলোর ধারাবাহিকতা নিচে তুলে ধরা হলো।
৩১ আগস্ট, ২০২৬: মন্ত্রিসভায় নবম জাতীয় পে স্কেল অনুমোদন পায়।
১৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬: নতুন জাতীয় বেতন স্কেলের প্রজ্ঞাপন জারি হয়।
৫ অক্টোবর, ২০২৬: নতুন কাঠামো অনুযায়ী বেতন নির্ধারণের কাজ শুরু হয়।
১ নভেম্বর, ২০২৬: চার মাসের বকেয়াসহ বেতন দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। তবে যাঁদের নতুন কাঠামো অনুযায়ী বেতন নির্ধারণ সম্পন্ন হয়নি, তাঁরা আপাতত পুরোনো স্কেলে বেতন পাবেন।
এই সময়সূচি অনুযায়ী, অনুমোদন ও প্রজ্ঞাপন জারির পর বেতন নির্ধারণের কাজ শুরু হলেও বাস্তবায়নের সব জটিলতা এখনো দূর হয়নি।
বকেয়া বেতন কবে পাবেন কর্মীরা?
নতুন কাঠামো অনুযায়ী বেতন নির্ধারণ সম্পন্ন না হওয়া কর্মচারীদের জন্য আপাতত পুরোনো পে স্কেলে বেতন দেওয়ার কথা জানানো হয়েছে। তাঁদের নতুন পে স্কেল অনুযায়ী প্রাপ্য বকেয়া অর্থ পরে পরিশোধ করা হবে।
তবে বকেয়া অর্থ ঠিক কবে দেওয়া হবে, সে বিষয়ে নির্দিষ্ট কোনো তারিখ প্রকাশিত হয়নি। ফলে যাঁরা নির্ধারিত সময়ে নতুন কাঠামোর সুবিধা পাচ্ছেন না, তাঁদের বকেয়া অর্থ পাওয়ার জন্য অপেক্ষা করতে হতে পারে।
এ ক্ষেত্রে বেতন নির্ধারণের অসম্পূর্ণ কাজ দ্রুত শেষ করা এবং নিয়ম প্রয়োগের অসংগতিগুলো দূর করা গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে গ্রেড, উচ্চতর গ্রেড, বাড়িভাড়া ভাতা ও আইবাস++ ব্যবস্থাসংক্রান্ত সমস্যাগুলোর সমাধান হলে বেতন নির্ধারণের প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া সহজ হতে পারে।
তবে এসব সমস্যা সমাধানে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কী সময়সীমা নির্ধারণ করেছে, তা প্রকাশিত প্রতিবেদনে উল্লেখ নেই।
নতুন পে স্কেল বাস্তবায়নে এখন যেসব বিষয় গুরুত্বপূর্ণ
নতুন জাতীয় বেতন কাঠামো কার্যকরের ক্ষেত্রে বর্তমানে কয়েকটি বিষয় বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে। প্রথমত, যেসব কর্মকর্তা-কর্মচারীর বেতন নির্ধারণ এখনো শেষ হয়নি, তাঁদের কাজ সম্পন্ন করা প্রয়োজন। দ্বিতীয়ত, গ্রেডের স্বাভাবিক ক্রম, উচ্চতর গ্রেড ও বাড়িভাড়া ভাতা নির্ধারণের ক্ষেত্রে যে অসংগতির অভিযোগ উঠেছে, সেগুলো যাচাই করা জরুরি।
তৃতীয়ত, আইবাস++ ব্যবস্থার জটিলতা বেতন নির্ধারণে কীভাবে প্রভাব ফেলছে, তা চিহ্নিত করা প্রয়োজন। এসব বিষয় সমাধান না হলে নতুন কাঠামো অনুযায়ী বেতন প্রদান এবং বকেয়া অর্থ পরিশোধের প্রক্রিয়া আরও সময়সাপেক্ষ হতে পারে।
অন্যদিকে, সংশ্লিষ্ট কর্মচারীদের অভিযোগের প্রকৃত কারণ ও ব্যাপ্তি নির্ধারণের জন্য বিস্তারিত প্রশাসনিক তথ্য প্রয়োজন। বর্তমানে প্রকাশিত তথ্য থেকে সমস্যাগুলোর নির্দিষ্ট সংখ্যা, বিভাগভিত্তিক চিত্র কিংবা সমাধানের সময়সীমা নিশ্চিত করা যাচ্ছে না।
সব মিলিয়ে, ১ নভেম্বর চার মাসের বকেয়াসহ বেতন দেওয়ার পরিকল্পনা থাকলেও নতুন পে স্কেল অনুযায়ী বেতন নির্ধারণের অসম্পূর্ণ কাজ অনেক কর্মচারীর জন্য বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। আপাতত তাঁদের পুরোনো স্কেলে বেতন দেওয়ার কথা জানানো হয়েছে এবং নতুন কাঠামো অনুযায়ী বকেয়া অর্থ পরে পরিশোধের কথা বলা হয়েছে। তবে বকেয়া পাওয়ার নির্দিষ্ট তারিখ এবং বেতন নির্ধারণের জটিলতা সমাধানের সময়সীমা এখনো স্পষ্ট নয়।





