নেতানিয়াহু হাঙ্গেরিতে গেলে গ্রেপ্তারের ইঙ্গিত দিয়ে রাখলেন হাঙ্গেরির হবু প্রধানমন্ত্রী পিটার মাজিয়ারের । গ্রেপ্তার ইস্যুতে নতুন রাজনৈতিক সংকেত।
হাঙ্গেরির রাজধানী বুদাপেস্টে এক সংবাদ ব্রিফিংয়ে দেশটির হবু প্রধানমন্ত্রী পিটার মাজিয়ার জানিয়েছেন, তিনি ক্ষমতায় এলে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিসি) থেকে হাঙ্গেরিকে প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত বাতিল করবেন। এই ঘোষণা সরাসরি ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর জন্য একটি সতর্ক সংকেত হিসেবে দেখা হচ্ছে, কারণ তাঁর বিরুদ্ধে ইতোমধ্যে নেতানিয়াহু আইসিসি গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি রয়েছে।
মাজিয়ার স্পষ্ট করে বলেন, আইসিসির সদস্য দেশ হিসেবে হাঙ্গেরির আইনগত বাধ্যবাধকতা রয়েছে—যদি কোনো পরোয়ানাভুক্ত ব্যক্তি দেশটিতে প্রবেশ করেন, তবে তাঁকে আটক করতে হবে। এই বক্তব্য আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
হাঙ্গেরির অবস্থান পরিবর্তনের ইঙ্গিত

সম্প্রতি অনুষ্ঠিত নির্বাচনে পিটার মাজিয়ারের দল ঐতিহাসিক বিজয় অর্জন করেছে। এর ফলে দীর্ঘ ১৬ বছর ক্ষমতায় থাকা ভিক্টর অরবানের শাসনের অবসান ঘটতে যাচ্ছে।
অরবান পূর্বে ঘোষণা দিয়েছিলেন যে, হাঙ্গেরি আইসিসি থেকে বেরিয়ে যাবে। তাঁর এই সিদ্ধান্তের অন্যতম কারণ ছিল নেতানিয়াহু আইসিসি গ্রেপ্তারি পরোয়ানা মেনে নিতে অনীহা।
তবে মাজিয়ার ভিন্ন অবস্থান নিয়েছেন। তিনি জানান, তাঁর দল বিষয়টি গভীরভাবে পর্যালোচনা করেছে এবং আইসিসি থেকে বেরিয়ে যাওয়ার প্রক্রিয়া বন্ধ করা হবে।
নেতানিয়াহু আইসিসি গ্রেপ্তারি পরোয়ানা: আইনি বাস্তবতা
আইসিসি সদস্যপদের প্রভাব
আইসিসির সদস্য দেশগুলোর জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ আইনি বাধ্যবাধকতা রয়েছে। কোনো ব্যক্তি যদি আদালতের গ্রেপ্তারি পরোয়ানাভুক্ত হন এবং সেই দেশের ভূখণ্ডে প্রবেশ করেন, তাহলে সংশ্লিষ্ট দেশকে তাকে আটক করতে হয়।
এই প্রেক্ষাপটে নেতানিয়াহু আইসিসি গ্রেপ্তারি পরোয়ানা বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কারণ, মাজিয়ারের বক্তব্য অনুযায়ী, হাঙ্গেরি যদি আইসিসির সদস্য থাকে, তাহলে নেতানিয়াহুর জন্য দেশটিতে প্রবেশ করা ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।
মাজিয়ারের স্পষ্ট বার্তা
মাজিয়ার বলেন, তিনি ইতোমধ্যেই নেতানিয়াহুকে বিষয়টি পরিষ্কারভাবে জানিয়েছেন। তাঁর ভাষায়, “যদি কোনো দেশ আইসিসির সদস্য হয় এবং কোনো অভিযুক্ত ব্যক্তি সেখানে প্রবেশ করেন, তাহলে তাকে অবশ্যই আটক করতে হবে।”
গাজা যুদ্ধ ও আইসিসির সিদ্ধান্ত
২০২৪ সালে গাজায় যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে। এই সিদ্ধান্ত আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।
এই নেতানিয়াহু আইসিসি গ্রেপ্তারি পরোয়ানা ইস্যুতে বিভিন্ন দেশের প্রতিক্রিয়া ভিন্ন ছিল। কেউ সমর্থন জানিয়েছে, আবার কেউ তীব্র সমালোচনা করেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিক্রিয়া ও অবস্থান
তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন আইসিসির এই পদক্ষেপের সমালোচনা করেছিলেন। পরে তাঁর উত্তরসূরি ডোনাল্ড ট্রাম্পও নেতানিয়াহুকে দৃঢ়ভাবে সমর্থন জানান।
যুক্তরাষ্ট্র আইসিসির সদস্য নয়। ফলে নেতানিয়াহু আইসিসি গ্রেপ্তারি পরোয়ানা থাকা সত্ত্বেও তিনি একাধিকবার যুক্তরাষ্ট্র সফর করতে সক্ষম হন। তিনি ওয়াশিংটন এবং ফ্লোরিডায় ট্রাম্পের বাসভবনেও গিয়েছেন।
ইরানে হামলার আগেও তাঁর যুক্তরাষ্ট্র সফরের বিষয়টি উল্লেখযোগ্য।
অরবান, ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক সম্পর্ক
ভিক্টর অরবান, ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু—এই তিন নেতার মধ্যে ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক সম্পর্ক ছিল।
তারা সবাই ডানপন্থী রাজনীতির প্রতিনিধিত্ব করেন এবং অরবানের ক্ষমতায় টিকে থাকার পক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন। তবে শেষ পর্যন্ত নির্বাচনে অরবানের বড় ধরনের পরাজয় ঘটে।
এই পরিবর্তনের ফলে হাঙ্গেরির পররাষ্ট্রনীতি ও আন্তর্জাতিক অবস্থানে বড় ধরনের পরিবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও আইসিসি প্রসঙ্গ
হাঙ্গেরি যদি আইসিসি থেকে বেরিয়ে যেত, তাহলে সেটি হতো ইউরোপীয় ইউনিয়নের একমাত্র দেশ, যার আইসিসির সদস্যপদ থাকত না।
আইসিসি থেকে প্রত্যাহারের সিদ্ধান্তটি ২ জুন কার্যকর হওয়ার কথা ছিল। তবে মাজিয়ারের নতুন অবস্থানের কারণে এই সিদ্ধান্ত এখন অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।
আন্তর্জাতিক প্রভাব ও ভবিষ্যৎ বিশ্লেষণ
কূটনৈতিক সম্পর্কের সম্ভাব্য পরিবর্তন
মাজিয়ারের এই অবস্থান ইউরোপীয় ও আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে নতুন বার্তা দিচ্ছে। বিশেষ করে নেতানিয়াহু আইসিসি গ্রেপ্তারি পরোয়ানা বাস্তবায়নের প্রশ্নে এটি গুরুত্বপূর্ণ।
এতে ইসরায়েল-হাঙ্গেরি সম্পর্কেও প্রভাব পড়তে পারে।
আইনের শাসন বনাম রাজনৈতিক অবস্থান
এই ইস্যুতে একটি বড় প্রশ্ন উঠে এসেছে—আন্তর্জাতিক আইন কতটা কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা সম্ভব, যখন তা রাজনৈতিক স্বার্থের সঙ্গে সংঘর্ষে আসে।




