বন্যায় বিপর্যস্ত আট জেলা, বাংলাদেশের বন্যা পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে। চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, সিলেটসহ ৮ জেলায় লাখো মানুষ পানিবন্দি, প্রাণহানি বেড়েছে এবং উদ্ধার কার্যক্রমে সেনাবাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে।
টানা বর্ষণ ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে বাংলাদেশের বন্যা পরিস্থিতি আরও অবনতি হয়েছে। বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র জানিয়েছে, দেশের পূর্ব, দক্ষিণ-পূর্ব, উত্তর-পূর্ব ও উত্তরাঞ্চলের কয়েকটি এলাকায় বন্যা পরিস্থিতি উদ্বেগজনক অবস্থায় রয়েছে। চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, বান্দরবান, রাঙামাটি, সিলেট, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ এবং উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন জেলায় নদীর পানি বৃদ্ধি, পাহাড়ধস, সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়া এবং প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। পরিস্থিতি মোকাবেলায় চট্টগ্রামের সাত উপজেলায় সেনাবাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে।
বাংলাদেশের বন্যা পরিস্থিতি: কোন কোন জেলা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত
বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রাম অঞ্চলের প্রায় সব নদীর পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। গত পাঁচ দিন ধরে অন্তত পাঁচ লাখ মানুষ পানিবন্দি রয়েছেন।
সংস্থাটি জানিয়েছে, বান্দরবান, চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারের নদীসংলগ্ন নিম্নাঞ্চলে ধীরে ধীরে কিছুটা উন্নতির সম্ভাবনা থাকলেও ফেনী ও খাগড়াছড়ির কিছু এলাকায় স্বল্পমেয়াদি বন্যা দেখা দিতে পারে। একই সঙ্গে লক্ষ্মীপুর ও নোয়াখালীর নিম্নাঞ্চলেও প্লাবনের আশঙ্কা রয়েছে।
বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের নির্বাহী প্রকৌশলী সরদার উদয় রায়হান বলেন, দেশের অভ্যন্তরে টানা বৃষ্টি এবং উজানে ভারি থেকে অতি ভারি বর্ষণের কারণে নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়েছে। তাঁর মতে, চট্টগ্রামে কিছুটা উন্নতির সম্ভাবনা থাকলেও সিলেট অঞ্চলের পরিস্থিতির আরও অবনতি হতে পারে।
চট্টগ্রামে পাঁচ লাখ মানুষ পানিবন্দি, সাত উপজেলায় সেনা মোতায়েন

চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, বান্দরবান ও রাঙামাটিতে কমপক্ষে পাঁচ লাখ মানুষ পানিবন্দি রয়েছেন।
চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের অনুরোধে ‘ইন এইড টু সিভিল পাওয়ার’-এর আওতায় বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ১০ ও ২৪ পদাতিক ডিভিশনের সদস্যরা লোহাগাড়া, সাতকানিয়া, চন্দনাইশ, বাঁশখালী, বোয়ালখালী, হাটহাজারী ও ফটিকছড়িতে অনুসন্ধান, উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম পরিচালনা করছেন।
আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর) জানিয়েছে, উদ্ধার কার্যক্রম জোরদার করতে তিনটি ক্যাম্প স্থাপন করা হয়েছে। পাশাপাশি পার্বত্য অঞ্চলে পাহাড়ধসের ঝুঁকিতে থাকা ২২১টি পরিবারকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।
বন্যা পরিস্থিতির কারণে চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের অধীন শনিবারের এইচএসসি পরীক্ষাও স্থগিত করা হয়েছে।
প্রাণহানি বেড়েছে, কক্সবাজারে সাত দিনে ২৫ জনের মৃত্যু
বন্যা ও পাহাড়ধসে বিভিন্ন জেলায় প্রাণহানির ঘটনা অব্যাহত রয়েছে।
মৌলভীবাজারে পাহাড়ি ঢলে আশরাফ আলী ওরফে আশই মিয়া (৭০) মারা যান। চট্টগ্রামের বাঁশখালীতে পাহাড়ি ঢলে ভেসে গিয়ে তিন শিশু—মোহাম্মদ আশিক (৭), মোহাম্মদ মিরাজ (৩) এবং তাহিন নুর (১২)—প্রাণ হারায়।
কক্সবাজারের চকরিয়ায় নৌকাডুবিতে নিখোঁজ হওয়ার পর হাসনাতুল জান্নাত ঝর্ণা (১২)-এর মরদেহ উদ্ধার করা হয়। একই ঘটনায় দুই বোন জেরিন মনি (৮) ও শাওরিন মনি (৬) জীবিত উদ্ধার হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছে।
জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, কক্সবাজারে গত সাত দিনে পাহাড়ধসে ১৯ জন এবং পানিতে ডুবে ছয় শিশুসহ মোট ২৫ জনের মৃত্যু হয়েছে।
কক্সবাজারে রেল যোগাযোগ বন্ধ, জনজীবনে দুর্ভোগ
ভারি বর্ষণে চট্টগ্রাম–কক্সবাজার রেললাইনের কালুরঘাট সেতু সংলগ্ন এলাকা তলিয়ে যাওয়ায় তিন দিন ধরে রেল যোগাযোগ বন্ধ রয়েছে।
এ ছাড়া কক্সবাজার–টেকনাফ মহাসড়কের রামু উপজেলার বিভিন্ন অংশ প্লাবিত হওয়ায় যান চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। যদিও পাঁচ দিন পর টেকনাফ–সেন্ট মার্টিন নৌপথে চলাচল আবার শুরু হয়েছে।
জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা (ইউএনএইচসিআর) জানিয়েছে, ৪ জুলাই রাত থেকে ৯ জুলাই দুপুর পর্যন্ত ভারি বর্ষণ ও দুর্যোগে ১৫ জন রোহিঙ্গা নিহত, ১৮ জন আহত এবং ২৬ হাজার ১১৯ জন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। এ সময় চার হাজার ৩০৭ জন সাময়িকভাবে বাস্তুচ্যুত হন।
সিলেট অঞ্চলে পানি বাড়ছে, নতুন বন্যার আশঙ্কা
সিলেট বিভাগের হবিগঞ্জ ও মৌলভীবাজারে নদ-নদীর পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করেছে। অন্তত ৬০টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে।
মৌলভীবাজারের রাজনগরে মনু নদীর প্রতিরক্ষা বাঁধ ভেঙে প্রায় ৩৫টি গ্রামের কয়েক হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়েছেন। অন্যদিকে হবিগঞ্জ সদর উপজেলার কালীগঞ্জ এলাকায় খোয়াই নদীর প্রতিরক্ষা বাঁধ ভেঙে অন্তত ২৫টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের সিলেট অঞ্চলের নির্বাহী প্রকৌশলী দীপক রঞ্জন দাশ বলেন, মেঘালয়ে ভারি বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকায় আগামী কয়েক দিন সিলেটে বন্যার শঙ্কা রয়েছে এবং প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।
উত্তরাঞ্চলেও নদীর পানি বাড়ছে
বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র জানিয়েছে, তিস্তা, ধরলা ও দুধকুমার নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়েছে। নীলফামারী, লালমনিরহাট ও রংপুর জেলার কিছু এলাকায় নদীর পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এসব জেলার নিম্নাঞ্চলে স্বল্পমেয়াদি বন্যা দেখা দিতে পারে।
বান্দরবান, রাঙামাটি ও খাগড়াছড়িতে দুর্ভোগ
বান্দরবানের সাত উপজেলার নিম্নাঞ্চলে অন্তত ১৫ হাজার মানুষ পানিবন্দি রয়েছেন। পাহাড়ধস ও সড়ক প্লাবিত হওয়ায় বান্দরবানের সঙ্গে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার ও রাঙামাটির সড়ক যোগাযোগ ব্যাহত হয়েছে।
রাঙামাটির বাঘাইছড়িতে দেড় হাজারের বেশি পরিবার এখনও পানিবন্দি। জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, ৪০টি আশ্রয়কেন্দ্রে তিন হাজার ৫২৪ জন আশ্রয় নিয়েছেন এবং জেলায় ১২৫টি স্থানে পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটেছে।
সেনাবাহিনীর সহায়তায় সাজেকে আটকে থাকা বাকি প্রায় ৪০০ পর্যটক নিরাপদে খাগড়াছড়িতে ফিরে গেছেন।
খাগড়াছড়ির দীঘিনালায় কয়েক হাজার পরিবার পানিবন্দি রয়েছে এবং পাঁচ শতাধিক পরিবার আশ্রয়কেন্দ্রে অবস্থান করছে।
আবহাওয়ার পূর্বাভাস কী বলছে
আবহাওয়াবিদ তরিফুল নেওয়াজ কবির জানিয়েছেন, মৌসুমি বায়ু সক্রিয় থাকায় এবং লঘুচাপের প্রভাবে আরও কয়েক দিন দেশের বিভিন্ন স্থানে মাঝারি বৃষ্টিপাত হতে পারে। কোথাও কোথাও ভারি থেকে অতি ভারি বর্ষণের সম্ভাবনাও রয়েছে, যা বন্যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করতে পারে।
বাংলাদেশের বন্যা পরিস্থিতি এখনও পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসেনি। চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, বান্দরবান, রাঙামাটি, সিলেট ও উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকায় উদ্ধার, ত্রাণ এবং নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নেওয়ার কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ পরিস্থিতির ওপর নিবিড় নজর রাখছে এবং নদীসংলগ্ন ও ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার বাসিন্দাদের সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছে।





