‘ফুটবল বিক্রির কোনো অধিকার নেই ফিফার’, বেসরকারি বিনিয়োগ নিয়ে নতুন বিতর্ক শুরু হয়েছে। উয়েফা এর বিরোধিতা করেছে, আর ইনফান্তিনো জানিয়েছেন উন্নয়নের লক্ষ্যেই পরিকল্পনা।
বিশ্ব ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফার পরিকল্পিত ফিফা বিশ্বকাপ বেসরকারি বিনিয়োগ উদ্যোগ নিয়ে আপত্তি জানিয়েছে ইউরোপীয় ফুটবল নিয়ন্ত্রক সংস্থা উয়েফা। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়, আগামী বিশ্বকাপ আয়োজন ও ফুটবলের উন্নয়নে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে বড় অঙ্কের অর্থ সংগ্রহের পরিকল্পনা করছে ফিফা। এই পরিকল্পনার পর উয়েফা জানায়, বিশ্বকাপ কোনো বিক্রিযোগ্য সম্পদ নয় এবং ফুটবলের পরিচালন ব্যবস্থাকে বাণিজ্যিক পণ্যে পরিণত করা উচিত নয়।
ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর নেতৃত্বে সংস্থাটির সঙ্গে উয়েফার সম্পর্ক দীর্ঘদিন ধরেই টানাপোড়েনের মধ্যে রয়েছে। এবারের বিশ্বকাপ ঘিরেও ফিফার কয়েকটি সিদ্ধান্ত নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছিল ইউরোপের ফুটবল নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি।
নতুন করে বেসরকারি বিনিয়োগের পরিকল্পনা সামনে আসার পর সেই বিরোধ আরও প্রকাশ্যে এসেছে।
ফিফা বিশ্বকাপ বেসরকারি বিনিয়োগ পরিকল্পনা নিয়ে কী বলছে উয়েফা
উয়েফা এক বিবৃতিতে ফিফার পরিকল্পনার সমালোচনা করে বলেছে, এটি এমন একটি সিদ্ধান্ত যা নির্ধারিত সীমা অতিক্রম করতে পারে। সংস্থাটি মনে করে, ফুটবলের নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠানগুলোর দায়িত্বশীলভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত।
উয়েফার বক্তব্য অনুযায়ী, ফুটবলের অস্তিত্ব, পরিচালনা ব্যবস্থা এবং ভবিষ্যৎ কোনো কেনাবেচার পণ্য নয়। বিশেষ করে আর্থিকভাবে কারা লাভবান হবে, সে বিষয়ে যদি পর্যাপ্ত স্বচ্ছতা না থাকে, তাহলে বিষয়টি আরও উদ্বেগ তৈরি করে।
বিবৃতিতে উয়েফা বলেছে, ফুটবলের মালিক কেউ নয় এবং কোনো সংস্থারই ফুটবল বিক্রি করার অধিকার নেই।
উয়েফার এই অবস্থান মূলত ফিফার সম্ভাব্য নতুন অর্থনৈতিক কাঠামো নিয়ে উদ্বেগ থেকে এসেছে।
ফিফার ১০ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ পরিকল্পনা

বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সদস্য দেশগুলোর অনুমোদন নিয়ে ফুটবলের উন্নয়নের জন্য বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে ১০ বিলিয়ন ডলার অর্থ সংগ্রহের পরিকল্পনা করছে ফিফা।
এই পরিকল্পনার আওতায় বেসরকারি সংস্থাগুলোর সঙ্গে যৌথভাবে বিশ্বকাপ পরিচালনার বিষয়টিও বিবেচনায় রয়েছে। তবে ফিফার পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, টুর্নামেন্ট পরিচালনার পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ ফিফার কাছেই থাকবে।
ফিফার ধারণা, বেসরকারি বিনিয়োগ যুক্ত হলে বিশ্বব্যাপী ফুটবলের উন্নয়ন কার্যক্রম আরও বিস্তৃত করা সম্ভব হবে।
এ বিষয়ে ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো জানিয়েছেন, ফুটবলের উন্নয়ন ও বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে টেকসই ব্যবস্থা গড়ে তোলাই এই পরিকল্পনার মূল উদ্দেশ্য।
ইনফান্তিনোর বক্তব্যে উন্নয়নের লক্ষ্য
জিয়ান্নি ইনফান্তিনো বলেন, ফিফার দায়িত্ব হলো বিশ্বকাপের মাধ্যমে ফুটবলের অন্য অংশগুলোও যেন উপকৃত হয় তা নিশ্চিত করা।
তার মতে, বিশ্বের প্রতিটি প্রান্তে টেকসই ও অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন নিশ্চিত করার মধ্যেই ফিফার ভূমিকা রয়েছে।
ফিফা মনে করছে, তৃতীয় পক্ষ বা বেসরকারি অংশীদার যুক্ত হলে সদস্য দেশগুলো এককালীন মূলধন হিসেবে সর্বোচ্চ ২ কোটি ডলার পর্যন্ত আর্থিক সুবিধা পেতে পারে।
তবে সমালোচকদের একটি অংশের আশঙ্কা, এই ধরনের উদ্যোগ ভবিষ্যতে বিশ্বকাপের ওপর বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রভাব বাড়াতে পারে।
বেসরকারি বিনিয়োগ নিয়ে ফুটবল বিশ্বে বিতর্ক
ফিফা বিশ্বকাপ বেসরকারি বিনিয়োগ নিয়ে বিতর্কের মূল বিষয় হচ্ছে ফুটবলের আর্থিক উন্নয়ন এবং ঐতিহ্যগত নিয়ন্ত্রণের মধ্যে ভারসাম্য।
একদিকে ফিফা বলছে, নতুন বিনিয়োগের মাধ্যমে ফুটবলের উন্নয়ন, অবকাঠামো এবং সদস্য দেশগুলোর আর্থিক সক্ষমতা বাড়ানো সম্ভব হবে।
অন্যদিকে উয়েফা মনে করছে, ফুটবলের মূল কাঠামো ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় বাণিজ্যিক প্রভাব বাড়ার ঝুঁকি রয়েছে।
বিশ্ব ফুটবলে ফিফা ও উয়েফার মধ্যে ক্ষমতা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ নিয়ে মতপার্থক্য নতুন নয়। তবে বিশ্বকাপের মতো বড় একটি আন্তর্জাতিক আয়োজনের অর্থায়ন পদ্ধতি পরিবর্তনের সম্ভাবনা এই বিতর্ককে আরও সামনে নিয়ে এসেছে।
ফিফার পরিকল্পনায় নিয়ন্ত্রণ থাকবে কার হাতে
ফিফার পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, বেসরকারি অংশীদার যুক্ত হলেও বিশ্বকাপ পরিচালনার নিয়ন্ত্রণ ফিফার কাছেই থাকবে।
সংস্থাটি মনে করছে, নতুন অর্থায়ন কাঠামো বিশ্বব্যাপী ফুটবলের উন্নয়নকে আরও গতিশীল করতে পারে।
তবে উয়েফা এবং সমালোচকদের মূল প্রশ্ন হলো, এই ধরনের বিনিয়োগের ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত গ্রহণ, লাভের অংশীদারিত্ব এবং স্বচ্ছতা কীভাবে নিশ্চিত করা হবে।
এই বিষয়গুলো পরিষ্কার না হওয়া পর্যন্ত বিতর্ক চলবে বলেই ধারণা করা হচ্ছে।
ফুটবলের ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন আলোচনা
বিশ্ব ফুটবল এখন শুধু মাঠের প্রতিযোগিতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বড় অর্থনৈতিক কাঠামো, সম্প্রচার স্বত্ব, বাণিজ্যিক অংশীদারিত্ব এবং বৈশ্বিক উন্নয়ন পরিকল্পনা।
ফিফার নতুন উদ্যোগ সেই অর্থনৈতিক বাস্তবতারই অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে একই সঙ্গে ফুটবলের ঐতিহ্য, স্বচ্ছতা এবং নিয়ন্ত্রণ কাঠামো নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।
ফিফা ও উয়েফার অবস্থানের পার্থক্য আগামী দিনে বিশ্ব ফুটবলের পরিচালনা ব্যবস্থায় নতুন আলোচনার জন্ম দিতে পারে।
ফিফা বিশ্বকাপ বেসরকারি বিনিয়োগ পরিকল্পনা বিশ্ব ফুটবলে বড় একটি বিতর্ক তৈরি করেছে। ফিফা যেখানে এটিকে উন্নয়ন ও আর্থিক সক্ষমতা বৃদ্ধির উদ্যোগ হিসেবে দেখছে, সেখানে উয়েফা ফুটবলের নিয়ন্ত্রণ ও স্বচ্ছতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।
আগামী দিনে এই পরিকল্পনা কীভাবে বাস্তবায়িত হয় এবং সদস্য দেশগুলো কী সিদ্ধান্ত নেয়, তার ওপরই নির্ভর করবে বিশ্বকাপের অর্থনৈতিক কাঠামোর ভবিষ্যৎ।





