আর্জেন্টিনার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক পদক্ষেপ নেওয়ার পথে ফিফা, বিশ্বকাপ ফাইনালের সংঘর্ষ ও একাধিক শৃঙ্খলাভঙ্গের অভিযোগে, তদন্ত শেষে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেবে।
বিশ্বকাপ ফাইনালে স্পেনের বিপক্ষে পরাজয়ের পর মাঠে ঘটে যাওয়া সংঘর্ষ এবং টুর্নামেন্টজুড়ে ওঠা একাধিক শৃঙ্খলাভঙ্গের অভিযোগের পর আর্জেন্টিনার বিরুদ্ধে ফিফার শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া শুরু করেছে বিশ্ব ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফা। নিউইয়র্কের নিউ জার্সি স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত ফাইনালের পরের ঘটনাগুলো তদন্ত করে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে শৃঙ্খলাবিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
ফিফা জানিয়েছে, অভিযুক্তদের নিজেদের বক্তব্য উপস্থাপনের সুযোগ দেওয়া হয়েছে। সেই প্রক্রিয়া শেষ হলে ফিফার শৃঙ্খলা কমিটি যথাসময়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানাবে।
আর্জেন্টিনার বিরুদ্ধে ফিফার শাস্তিমূলক ব্যবস্থা কেন শুরু হলো
বিশ্বকাপ ফাইনালে স্পেনের কাছে ১–০ গোলে হারের পর ম্যাচ শেষের বাঁশি বাজতেই দুই দলের খেলোয়াড়দের মধ্যে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়।

স্পেনের বদলি খেলোয়াড়েরা উদ্যাপনের জন্য মাঠে প্রবেশ করলে আর্জেন্টিনার কয়েকজন খেলোয়াড় ও কোচিং স্টাফের সদস্যদের সঙ্গে তাদের সংঘর্ষ বাধে।
এই ঘটনার তদন্তে ফিফা শৃঙ্খলা ও নৈতিকতাবিষয়ক একজন প্রসিকিউটর নিয়োগ করে। সপ্তাহব্যাপী তদন্তের পর প্রসিকিউটরের সুপারিশের ভিত্তিতে একাধিক অভিযোগের তদন্ত এগিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়।
ফিফার বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ফিফা শৃঙ্খলাবিধি অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট সবাইকে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দেওয়া হয়েছে। এরপর শৃঙ্খলা কমিটি তাদের সিদ্ধান্ত জানাবে।
ফাইনালের সংঘর্ষে কী ঘটেছিল
ফাইনাল শেষ হওয়ার পর স্পেনের বদলি খেলোয়াড়েরা মাঠে প্রবেশ করে শিরোপা উদ্যাপন শুরু করেন।
এ সময় আর্জেন্টিনার মিডফিল্ডার লিয়ান্দ্রো পারেদেস স্পেনের মিডফিল্ডার গাভিকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেন এবং তাঁর মুখে আঘাত করেন। একই ঘটনায় স্পেনের ডিফেন্ডার এরিক গার্সিয়াও আঘাতপ্রাপ্ত হন।
এই ঘটনাগুলোই তদন্তের অন্যতম প্রধান ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করছে ফিফা।
কার বিরুদ্ধে কী অভিযোগ তদন্ত করছে ফিফা
প্রসিকিউটরের সুপারিশ অনুযায়ী ফিফা এখন নিম্নোক্ত অভিযোগগুলো তদন্ত করবে—
- নাহুয়েল মলিনার বিরুদ্ধে দুটি অভিযোগ।
- লিয়ান্দ্রো পারেদেসের বিরুদ্ধে তিনটি অভিযোগ।
- সহকারী কোচ রবার্তো আয়ালার বিরুদ্ধে একটি অভিযোগ।
তাদের বিরুদ্ধে ফিফার শৃঙ্খলাবিধির ১৪ নম্বর ধারা অনুযায়ী অভিযোগ আনা হয়েছে।
এ ছাড়া খেলোয়াড়সুলভ আচরণবিরোধী অভিযোগে নাহুয়েল মলিনার পাশাপাশি থিয়াগো আলমাদা এবং স্পেনের মিডফিল্ডার গাভির বিরুদ্ধেও তদন্ত চলছে।
শাস্তির বিধানে কী রয়েছে
ফিফার শৃঙ্খলাবিধি অনুযায়ী—
- খেলোয়াড়সুলভ আচরণবিরোধী অপরাধে অন্তত এক ম্যাচের নিষেধাজ্ঞা হতে পারে।
- সংঘর্ষের অভিযোগ প্রমাণিত হলে ন্যূনতম তিন ম্যাচের নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার বিধান রয়েছে।
চূড়ান্ত তদন্ত শেষে ফিফার শৃঙ্খলা কমিটি সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে, তা ঘোষণা করবে।
আর্জেন্টিনা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের বিরুদ্ধেও তদন্ত
শুধু ব্যক্তিগত অভিযোগ নয়, আর্জেন্টিনা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের বিরুদ্ধেও শৃঙ্খলাবিষয়ক কার্যক্রম শুরু করেছে ফিফা।
অভিযোগগুলোর মধ্যে রয়েছে—
- খেলাধুলার চেতনাবিরোধী কার্যক্রম (১৩ নম্বর ধারা)
- দলের অসদাচরণ (১৪ নম্বর ধারা)
- বৈষম্য ও বর্ণবাদী আচরণ (১৫ নম্বর ধারা)
- ম্যাচে শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা রক্ষার নিয়ম ভঙ্গ (১৭ নম্বর ধারা)
এগুলো টুর্নামেন্টের বিভিন্ন ম্যাচে সংঘটিত ঘটনাকে কেন্দ্র করে তদন্তাধীন রয়েছে।
আরও যেসব অভিযোগ উঠেছে
ফিফার তদন্তে আরও কয়েকটি অভিযোগ অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে—
- বৈষম্যমূলক স্লোগান ও অঙ্গভঙ্গি
- নির্ধারিত সময়ের পরে ম্যাচ শুরু করা
- দল ও দর্শকদের অনুপযুক্ত বার্তা প্রদর্শন
- দর্শকদের মাঠে বিভিন্ন বস্তু নিক্ষেপের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা
এসব অভিযোগও শৃঙ্খলাবিধির আওতায় মূল্যায়ন করা হবে।
ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জের ব্যানার নিয়েও প্রশ্ন
বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে ইংল্যান্ডকে হারানোর পর আর্জেন্টিনার খেলোয়াড়েরা ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জের ওপর আর্জেন্টিনার সার্বভৌমত্ব দাবি করে একটি ব্যানার প্রদর্শন করেন।
স্প্যানিশ ভাষায় লেখা সেই ব্যানারে উল্লেখ ছিল, “ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জ আর্জেন্টিনার।”
ফিফা জানিয়েছে, খেলাধুলার কোনো প্রতিযোগিতাকে খেলাধুলাবহির্ভূত প্রদর্শনী বা প্রচারের জন্য ব্যবহার করা হলে তা শৃঙ্খলাবিধির লঙ্ঘন হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
এ প্রসঙ্গে ফিফা স্মরণ করিয়ে দেয়, ২০১৪ সালে স্লোভেনিয়ার বিপক্ষে একটি প্রীতি ম্যাচের আগে একই ধরনের ব্যানার প্রদর্শনের ঘটনায় আর্জেন্টিনাকে ২০ হাজার পাউন্ড জরিমানা করা হয়েছিল।
ফিফার পরবর্তী পদক্ষেপ
ফিফার ভাষ্য অনুযায়ী, তদন্তের আওতায় থাকা প্রত্যেককে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দেওয়া হয়েছে। সেই প্রক্রিয়া শেষ হলে শৃঙ্খলা কমিটি সংশ্লিষ্ট অভিযোগগুলোর বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানাবে।
ফলে বিশ্বকাপ ফাইনালের সংঘর্ষ এবং টুর্নামেন্টজুড়ে ওঠা বিভিন্ন অভিযোগে আর্জেন্টিনার বিরুদ্ধে ফিফার শাস্তিমূলক ব্যবস্থা কী হবে, তা এখন ফিফার আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় রয়েছে।
বিশ্বকাপ ফাইনালের পর মাঠের উত্তেজনা, একাধিক খেলোয়াড় ও কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ এবং আর্জেন্টিনা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের বিরুদ্ধে পৃথক শৃঙ্খলাবিষয়ক কার্যক্রম—সব মিলিয়ে বিষয়টি এখন ফিফার শৃঙ্খলা কমিটির বিবেচনায়। তদন্ত শেষ হওয়ার পরই জানা যাবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও সংস্থার বিরুদ্ধে কী ধরনের শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়।





