আরও খবর

যে কারণে বাতিল মিশরের গোল (4)
দেশের বাজারে আজ যে দামে বিক্রি হচ্ছে সোনার ভরি
যে কারণে বাতিল মিশরের গোল
এসএসসি ও সমমানের ফল প্রকাশ, পাসের হার ৬২.২৫ শতাংশ
যে কারণে বাতিল মিশরের গোল (12)
অস্ট্রেলিয়া গমনেচ্ছুদের জন্য ঢাকাস্থ হাইকমিশনের বিশেষ সতর্কবার্তা
যে কারণে বাতিল মিশরের গোল (9)
নতুন দামে বিক্রি হচ্ছে সোনা, ভরি কত?
যে কারণে বাতিল মিশরের গোল (3)
বিদ্যুৎ-জ্বালানি নিয়ে ষড়যন্ত্র হচ্ছে: প্রধানমন্ত্রী

ভরা মৌসুমেও পাতে উঠছে না ইলিশ

ভরা মৌসুমেও পাতে উঠছে না ইলিশ, ইলিশ সংকট তীব্র হচ্ছে ভরা মৌসুমেও। উৎপাদন কমে ছোট মাছের সরবরাহ, চড়া দাম ও নদী-প্রজনন পরিবেশের সংকট নিয়ে বাড়ছে উদ্বেগ।

বর্ষার ভরা মৌসুমের প্রায় দুই মাস পেরিয়ে গেলেও দেশের বাজারে ইলিশের সরবরাহ স্বাভাবিক হয়নি। মৎস্য বিভাগের তথ্য, গবেষক ও সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য অনুযায়ী, নদীর নাব্যতা সংকট, দূষণ, প্রজনন পরিবেশ নষ্ট হওয়া এবং নির্বিচারে জাটকা ও মা-ইলিশ ধরার কারণে কয়েক বছর ধরে ইলিশের উৎপাদন কমছে। একই সঙ্গে মাছের গড় আকারও ছোট হয়ে যাচ্ছে। ফলে ভরা মৌসুমেও সাধারণ ক্রেতাদের নাগালের বাইরে চলে গেছে বাঙালির প্রিয় এই মাছ।

ইলিশ সংকটের পেছনে উৎপাদন কমার তথ্য

মৎস্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, বর্ষাকাল ইলিশের প্রধান মৌসুম। দেশের মোট আহরিত ইলিশের প্রায় ৭০ শতাংশ আসে দক্ষিণাঞ্চলের নদী ও সাগর থেকে। তবে কয়েক বছর ধরে উৎপাদন বৃদ্ধির হার কমে যাওয়ার পাশাপাশি সাম্প্রতিক সময়ে মোট উৎপাদনেও পতন দেখা দিয়েছে।

তথ্য অনুযায়ী, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে দেশে ইলিশ আহরণ হয়েছিল ৫ দশমিক ৩২ লাখ টন। ২০১৯-২০ অর্থবছরে তা বেড়ে ৫ দশমিক ৫০ লাখ টনে দাঁড়ায়। এরপর ২০২০-২১ অর্থবছরে উৎপাদন হয় ৫ দশমিক ৬৫ লাখ টন এবং ২০২১-২২ অর্থবছরে ৫ দশমিক ৬৬ লাখ টন।

২০২২-২৩ অর্থবছরে ইলিশ উৎপাদন সর্বোচ্চ ৫ দশমিক ৭১ লাখ টনে পৌঁছায়। কিন্তু এরপর থেকেই উৎপাদনে পতন শুরু হয়। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে তা কমে ৫ লাখ ২৯ হাজার ৪৮৭ টনে দাঁড়ায়। সর্বশেষ ২০২৪-২৫ অর্থবছরে উৎপাদন আরও কমে প্রায় পাঁচ লাখ টনে নেমেছে।

এই ধারাবাহিক পতনই বর্তমানে ইলিশের বাজারে সরবরাহ সংকটের অন্যতম বড় কারণ হিসেবে উঠে এসেছে।

ছোট হচ্ছে ইলিশের গড় আকার

শুধু মোট উৎপাদন কমে যাওয়াই নয়, ইলিশের আকার ছোট হয়ে যাওয়াও নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করছে। ইলিশ গবেষক ও বাংলাদেশ মৎস্য বিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের সাবেক পরিচালক আনিসুর রহমান জানান, গত দুই বছরে সামগ্রিক উৎপাদন কমার পাশাপাশি মাছের আকারও ছোট হয়েছে।

তার তথ্য অনুযায়ী, একসময় ইলিশের গড় ওজন ৪০০ থেকে ৪৫০ গ্রাম থাকলেও বর্তমানে তা কমে ৩০০ থেকে ৩৫০ গ্রামে দাঁড়িয়েছে।

আনিসুর রহমানের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সমুদ্রের তাপমাত্রা বৃদ্ধি, নদীদূষণ, নাব্যতা সংকট এবং ইলিশের প্রজননের স্বাভাবিক পরিবেশ ব্যাহত হওয়ার প্রভাব পড়ছে মাছটির ওপর। সংকট মোকাবিলায় নদীর পরিবেশ রক্ষা এবং কার্যকর গবেষণার ওপর গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলেছেন তিনি।

নদীর পরিবেশ ও জীবনচক্রে বাধা

খুলনা জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. বদরুজ্জামান বলেন, একটি ইলিশের এক থেকে দেড় কেজি ওজন হতে অন্তত দেড় বছর সময় লাগে। নদীতে ডিম ফুটে জন্ম নেওয়া ইলিশের পোনা সাগরে চলে যায়। পরে পরিণত হয়ে আবার মিঠাপানিতে ফিরে এসে ডিম ছাড়ে।

তবে অতিরিক্ত মাছ ধরার কারণে অনেক ক্ষেত্রে ইলিশের এই স্বাভাবিক জীবনচক্র পূর্ণ হচ্ছে না বলে জানান তিনি।

তার ভাষ্য অনুযায়ী, মোহনায় নিষিদ্ধ জালের ব্যবহার, বালু উত্তোলন, শিল্প-কারখানার দূষণ এবং অপরিকল্পিত অবকাঠামো নির্মাণ নদীর স্বাভাবিক পরিবেশ ও প্রবাহকে ব্যাহত করছে। একই সঙ্গে সাগরে ট্রলিং জাহাজের মাধ্যমে মা-ইলিশ ও জাটকা ধরার কারণেও বড় আকারের ইলিশের সংকট তৈরি হচ্ছে।

আইন অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে কারাদণ্ড ও জরিমানার বিধান থাকলেও নিষিদ্ধ জালের ব্যবহার পুরোপুরি বন্ধ করা যাচ্ছে না বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

বাজারে সরবরাহ কম, দাম ক্রেতার নাগালের বাইরে

ইলিশ সংকটের সরাসরি প্রভাব পড়েছে বাজারদরে। বর্তমানে বাজারে ছোট আকারের ইলিশের সরবরাহও কম। এর পাশাপাশি দীর্ঘদিন হিমায়িত করে রাখা মাছ নতুন করে বাজারজাত করার অভিযোগ রয়েছে।

খুলনার ময়লাপোতা সান্ধ্যবাজারে ইলিশ কিনতে যাওয়া ব্যাংক কর্মকর্তা শাহরিয়ার হোসেন বলেন, এক কেজি ইলিশের জন্য ৩ হাজার ৫০০ টাকা খরচ করার সামর্থ্য তার নেই। তার মতে, বাঙালির প্রিয় ইলিশ এখন সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে গেছে।

স্কুলশিক্ষক সৌমেন অধিকারীও ভরা মৌসুমে ইলিশের এত বেশি দাম নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তার বক্তব্য, মৌসুমে দাম এত বেশি হলে সাধারণ মানুষ কীভাবে ইলিশ কিনবে। একই সঙ্গে বাজারে নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর তদারকি আরও দৃশ্যমান হওয়া প্রয়োজন বলেও তিনি মনে করেন।

কেন বাড়ছে ইলিশের দাম

খুচরা ব্যবসায়ীরা অবশ্য ইলিশের বাড়তি দামের জন্য সরবরাহব্যবস্থার একাধিক ধাপ ও অতিরিক্ত হাতবদলকে দায়ী করছেন।

তাদের দাবি, জেলেদের কাছ থেকে মাছ আহরণের পর খুচরা বাজারে পৌঁছানোর আগে ইলিশ কয়েক দফা হাতবদল হয়। প্রতিটি ধাপেই মাছের দাম বাড়ে। এর সঙ্গে দাদন, অতিমুনাফা, বরফ এবং জ্বালানি তেলের বাড়তি খরচ যুক্ত হওয়ায় মাছ আহরণ ও বাজারজাতের ব্যয়ও বেড়েছে।

ব্যবসায়ীদের কেউ কেউ অধিক লাভের আশায় ইলিশ হিমায়িত করে সংরক্ষণ করছেন। সরবরাহ কম থাকায় আগের বছরের মজুদ করা ‘হিম ইলিশ’ও বাজারে ছাড়া হচ্ছে বলে জানিয়েছেন এক বিক্রেতা।

বর্তমানে বাজারে ৩০০ থেকে ৪০০ গ্রাম ওজনের ছোট ইলিশ ১ হাজার ৪০০ থেকে ১ হাজার ৬০০ টাকা, এক কেজি ওজনের ইলিশ প্রায় ৩ হাজার ৫০০ টাকা এবং দেড় কেজি ওজনের ইলিশ সর্বোচ্চ ৪ হাজার ৫০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে।

হিমায়িত ইলিশ নিয়েও উদ্বেগ

দীর্ঘদিন হিমায়িত করে রাখা ইলিশের মান নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ছয় মাসের বেশি সময় ফ্রিজিং করে রাখলে ইলিশের গুণগত ও পুষ্টিমান কমতে শুরু করে।

এ ছাড়া দীর্ঘদিন সংরক্ষণ করা মাছ খেলে খাদ্যে বিষক্রিয়ার ঝুঁকিও থাকতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন। ফলে বাজারে সরবরাহ বাড়ানোর পাশাপাশি মাছের সংরক্ষণ পদ্ধতি ও মান নিয়েও নজরদারির প্রয়োজনীয়তা সামনে এসেছে।

সরকারি অবতরণ কেন্দ্রেও কমেছে সরবরাহ

ইলিশ সংকটের প্রভাব পড়েছে সরকারি মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রগুলোতেও। বাংলাদেশ মৎস্য উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএফডিসি) আওতায় সারা দেশে থাকা ২০টি মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রের মধ্যে পাঁচটি বন্ধ রয়েছে। আরও নয়টি কেন্দ্র সীমিত পরিসরে কার্যক্রম চালাচ্ছে।

খুলনা মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রের তথ্য পরিস্থিতির একটি স্পষ্ট চিত্র তুলে ধরে। গত পাঁচ বছরের মধ্যে এবারই সেখানে ইলিশের সরবরাহ সবচেয়ে কম।

চলতি জুলাই পর্যন্ত ভরা মৌসুমে খুলনা মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রে মাত্র দেড় হাজার কেজি ইলিশ এসেছে। অথচ ২০২২ সালের জুলাইয়ে সেখানে ইলিশ এসেছিল ৩৮ হাজার ৫৪৬ কেজি। ২০২৩ সালে এসেছিল ১৫ হাজার ৯৭৬ কেজি এবং ২০২৪ সালে ৮ হাজার ৩৯১ কেজি।

দেশের অন্যতম বড় ইলিশের মোকাম বরগুনার পাথরঘাটাতেও এবার সরবরাহ কমেছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

অভয়াশ্রম সংরক্ষণে গুরুত্ব

বিশেষজ্ঞদের মতে, ইলিশের প্রজনন ও বিচরণক্ষেত্র রক্ষায় নিঝুম দ্বীপ, নাফ নদীসহ ছয়টি এলাকাকে অভয়াশ্রম ঘোষণা করা হলেও সেগুলো কার্যকরভাবে সংরক্ষণ করা যায়নি। এর ফলে ইলিশের উৎপাদন ও প্রজনন—দুই ক্ষেত্রেই নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।

তাদের মতে, জাটকা ও মা-ইলিশ ধরা পুরোপুরি বন্ধ করা গেলে ইলিশের উৎপাদন উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ানো সম্ভব। এ জন্য মৎস্য সুরক্ষা অধ্যাদেশ, ২০২৫ এবং সংশ্লিষ্ট বিধিমালার কার্যকর প্রয়োগ প্রয়োজন।

একই সঙ্গে নিষিদ্ধ ট্রলিং বন্ধ, নদীর সমন্বিত ব্যবস্থাপনা এবং জেলেদের তালিকা হালনাগাদ করে যথাযথ প্রণোদনা দেওয়ার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

সামনে যে বিষয়গুলো গুরুত্বপূর্ণ

বর্তমান পরিস্থিতিতে ইলিশের সরবরাহ ও উৎপাদন বাড়াতে নদী ও সাগরের পরিবেশ রক্ষা, প্রজননক্ষেত্র সংরক্ষণ এবং অবৈধ মাছ ধরা বন্ধ করা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। একই সঙ্গে বাজারে সরবরাহব্যবস্থার ধাপগুলোতে অতিরিক্ত হাতবদল ও সংরক্ষিত মাছের মান নিয়েও নজরদারি প্রয়োজন বলে সংশ্লিষ্টদের বক্তব্যে উঠে এসেছে।

ভরা মৌসুমেও ইলিশের কম সরবরাহ, ছোট আকার এবং চড়া দাম সাধারণ ক্রেতাদের জন্য পরিস্থিতি কঠিন করে তুলেছে। একই সঙ্গে উৎপাদন কমে যাওয়া, নদীর নাব্যতা ও দূষণ, প্রজনন পরিবেশের পরিবর্তন এবং জাটকা ও মা-ইলিশ ধরার বিষয়গুলো ইলিশের ভবিষ্যৎ উৎপাদন নিয়ে উদ্বেগ বাড়াচ্ছে।

বিশেষজ্ঞদের প্রস্তাব অনুযায়ী, নদী ও প্রজননক্ষেত্র রক্ষা, নিষিদ্ধ মাছ ধরা বন্ধ এবং বিদ্যমান আইন কার্যকরভাবে প্রয়োগ করা গেলে ইলিশের উৎপাদন বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে বর্তমান বাজার পরিস্থিতি দেখাচ্ছে, বাঙালির প্রিয় এই মাছকে সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে রাখতে উৎপাদন ও সংরক্ষণ—দুই দিকেই গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।

সর্বাধিক পঠিত