ইরানের ক্ষতিপূরণ দাবির পাল্টা হিসাব দিলেন ট্রাম্প, ৫০ বছরের বিভিন্ন হামলা, সংঘাত ও নিহতদের পরিবারের জন্য ক্ষতিপূরণ চাইবে যুক্তরাষ্ট্র।
ইরানের সঙ্গে সম্ভাব্য শান্তি আলোচনায় ইরানের ক্ষতিপূরণ দাবির পাল্টা হিসেবে ক্ষতিপূরণের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করতে চান যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। গত মঙ্গলবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প জানান, কয়েক দশকে ইরানের সমর্থনে বা ইরানের মাধ্যমে সংঘটিত বিভিন্ন হামলা ও সহিংসতায় ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য তিনি ইরানের কাছ থেকে ক্ষতিপূরণ দাবি করবেন।
ট্রাম্পের এই অবস্থান এসেছে ইরানের পক্ষ থেকে সাম্প্রতিক যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতির জন্য ক্ষতিপূরণ চাওয়ার পর। তিনি ইরানের দাবিকে একটি ‘আকর্ষণীয় ধারণা’ হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রও ইরানের কাছে ক্ষতিপূরণ চাইবে।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনায় ইরানের ক্ষতিপূরণের দাবি এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে উল্লেখ করা হয়নি। তবে ভবিষ্যতে দুই দেশের মধ্যে যেকোনো আলোচনায় বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করতে তিনি তার প্রতিনিধিদের নির্দেশ দিয়েছেন।
৫০ বছরের ক্ষয়ক্ষতির হিসাব চান ট্রাম্প

ট্রাম্প জানিয়েছেন, শুধু সাম্প্রতিক যুদ্ধ নয়, গত ৫০ বছরের বিভিন্ন ঘটনা ও সংঘাতের জন্যও ইরানের কাছ থেকে ক্ষতিপূরণ দাবি করা হবে। তার বক্তব্যে নিহত ও গুরুতর আহত ব্যক্তিদের পরিবারকে ক্ষতিপূরণের আওতায় আনার কথা উঠে এসেছে।
তিনি বিভিন্ন হামলা ও সংঘাতে নিহতদের পাশাপাশি গুরুতর আহত ব্যক্তিদের জন্যও ক্ষতিপূরণ চাওয়ার কথা বলেছেন। এর মধ্যে রাস্তার পাশে পেতে রাখা বোমার হামলার কথাও উল্লেখ করেছেন তিনি।
ট্রাম্পের বক্তব্য অনুযায়ী, এসব ঘটনার সঙ্গে ইরানের প্রয়াত জেনারেল কাসেম সোলেইমানির নেতৃত্বের বিষয়টিও যুক্ত। একই সঙ্গে বিভিন্ন যুদ্ধে নিহত হাজারো মানুষের পরিবারকেও ক্ষতিপূরণের আওতায় আনার কথা বলেছেন তিনি।
ইউএসএস কোল হামলার প্রসঙ্গ
ট্রাম্প তার বক্তব্যে ২০০০ সালের অক্টোবরে ইয়েমেনের এডেন বন্দরে মার্কিন নৌবাহিনীর যুদ্ধজাহাজ ইউএসএস কোল-এ চালানো বোমা হামলার কথা উল্লেখ করেন।
ওই হামলায় যুক্তরাষ্ট্রের ১৭ জন নাবিক নিহত এবং ৩০ জনের বেশি আহত হন। মার্কিন কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থা এফবিআই হামলাটির জন্য আল-কায়েদাকে দায়ী করেছে।
তবে ট্রাম্প এই ঘটনার জন্যও ইরানের কাছ থেকে ক্ষতিপূরণ দাবি করার কথা বলেছেন। তিনি ইউএসএস কোল হামলায় নিহত মার্কিন নাবিকদের পরিবার এবং বিভিন্ন যুদ্ধে নিহত আরও হাজারো মানুষের পরিবারকে ক্ষতিপূরণের আওতায় আনার কথা উল্লেখ করেন।
ইরানের ক্ষতিপূরণ দাবি নিয়ে পাল্টা অবস্থান জানাতে গিয়ে ট্রাম্প ক্ষতিপূরণের দাবির পরিধি আরও বাড়ানোর ইঙ্গিত দিয়েছেন।
ইরানের বিক্ষোভে নিহতদের পরিবারও দাবির আওতায়
ট্রাম্প জানিয়েছেন, গত ৫০ বছরে ইরানে বিভিন্ন বিক্ষোভে অংশ নিয়ে নিহত ব্যক্তিদের পরিবারকেও ক্ষতিপূরণ দেওয়ার দাবি তুলবেন তিনি।
এ ছাড়া গত পাঁচ মাসের যুদ্ধে নিহত আরও ৫২ হাজার মানুষের পরিবারের জন্যও ক্ষতিপূরণ দাবি করার কথা বলেছেন ট্রাম্প।
অর্থাৎ, তার ঘোষিত অবস্থানে শুধু যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক বা মার্কিন সেনাদের ক্ষয়ক্ষতি নয়, ইরানের অভ্যন্তরীণ বিক্ষোভ এবং সাম্প্রতিক যুদ্ধের নিহতদের পরিবারও অন্তর্ভুক্ত হচ্ছে।
তবে এসব দাবির বাস্তবায়ন কীভাবে হবে, সে বিষয়ে SOURCE TEXT-এ কোনো বিস্তারিত তথ্য দেওয়া হয়নি।
ভবিষ্যৎ আলোচনায় ক্ষতিপূরণকে গুরুত্ব দেওয়ার নির্দেশ
ট্রাম্প বলেছেন, ভবিষ্যতে ইরানের সঙ্গে যেকোনো আলোচনা হলে ক্ষতিপূরণের বিষয়টি সেখানে ‘দৃঢ়ভাবে’ অন্তর্ভুক্ত করতে তিনি তার প্রতিনিধিদের নির্দেশ দিয়েছেন।
এর এক দিন আগে ট্রাম্প জানিয়েছিলেন, যুদ্ধ নিয়ে তার অবস্থান কিছুটা নিম্নমাত্রায় আনছেন। তার বক্তব্য থেকে ইঙ্গিত পাওয়া যায়, ইরানের ওপর আরও সামরিক হামলা চালানোর পরিবর্তে অর্থনৈতিক চাপ অব্যাহত রাখার বিষয়ে তিনি আগ্রহী।
এই পরিস্থিতিতে ক্ষতিপূরণের দাবি ভবিষ্যৎ শান্তি আলোচনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠতে পারে।
ইরানের শর্তও রয়েছে আলোচনার টেবিলে
অন্যদিকে, ইরানও শান্তি বা ভবিষ্যৎ আলোচনার ক্ষেত্রে কয়েকটি শর্তের কথা জানিয়েছে।
ইরানের দাবি, গত কয়েক মাসের যুদ্ধে দেশটির যে ক্ষতি হয়েছে, তার জন্য ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। পাশাপাশি ইরানের ওপর থাকা অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা তুলে নিতে হবে এবং দেশটির জব্দ করা সম্পদ ছেড়ে দিতে হবে।
ইরান জানিয়েছে, এসব শর্ত পূরণ না হওয়া পর্যন্ত হরমুজ প্রণালি খোলা হবে না।
এ ছাড়া ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর বা আইআরজিসি আলাদাভাবে জানিয়েছে, আঞ্চলিক আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ বন্ধ করতে হবে।
ফলে দুই দেশের মধ্যে ভবিষ্যতে আলোচনা হলে একাধিক বিষয় একই সঙ্গে সামনে আসতে পারে। এর মধ্যে রয়েছে ক্ষতিপূরণ, অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা, জব্দ করা সম্পদ এবং হরমুজ প্রণালি।
হরমুজ প্রণালি নিয়ে ইরানের অবস্থান
ইরানের বক্তব্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র হরমুজ প্রণালির অবরোধ তুলে না নেওয়া পর্যন্ত তারা প্রণালিটি আবার খুলবে না।
অন্যদিকে, ইরান গত কয়েক মাসের যুদ্ধে নিজেদের ক্ষতির জন্য ক্ষতিপূরণ চেয়েছে। এর সঙ্গে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং জব্দ করা সম্পদ ফেরত দেওয়ার দাবিও যুক্ত করেছে দেশটি।
অর্থাৎ, দুই পক্ষের দাবির মধ্যে ক্ষতিপূরণের বিষয়টি এখন একটি পাল্টাপাল্টি অবস্থানের রূপ নিয়েছে। ইরান যেখানে নিজেদের ক্ষয়ক্ষতির জন্য ক্ষতিপূরণ চাইছে, সেখানে ট্রাম্প বিভিন্ন অতীত হামলা, সংঘাত ও প্রাণহানির জন্য ইরানের কাছ থেকে ক্ষতিপূরণ দাবি করার কথা জানিয়েছেন।
ইরানের ক্ষতিপূরণ দাবি কেন আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ
ইরানের ক্ষতিপূরণ দাবি এখন সম্ভাব্য শান্তি আলোচনার একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে সামনে এসেছে। কারণ, দুই পক্ষই নিজেদের ক্ষয়ক্ষতি ও দাবিকে আলোচনার সঙ্গে যুক্ত করছে।
ট্রাম্পের বক্তব্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র ভবিষ্যৎ আলোচনায় ক্ষতিপূরণের বিষয়টি শক্তভাবে তুলবে। অন্যদিকে, ইরান তাদের ক্ষয়ক্ষতির জন্য ক্ষতিপূরণ, নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং জব্দ করা সম্পদ ফেরতের দাবি জানিয়েছে।
এ অবস্থায় দুই দেশের আলোচনায় শুধু সাম্প্রতিক যুদ্ধের বিষয় নয়, অতীতের হামলা ও সংঘাতের ঘটনাও আলোচনার অংশ হতে পারে।
শান্তি আলোচনার ক্ষেত্রে ক্ষতিপূরণকে কীভাবে বিবেচনা করা হবে, তা এখন দুই পক্ষের অবস্থানের ওপর নির্ভর করবে। তবে SOURCE TEXT অনুযায়ী, উভয় দেশই আলোচনার আগে নিজেদের শর্ত স্পষ্ট করেছে।
ট্রাম্পের দাবির পরিধি আরও বিস্তৃত
ট্রাম্পের বক্তব্যে দেখা যায়, তার প্রস্তাবিত ক্ষতিপূরণের পরিধি একটি নির্দিষ্ট ঘটনা বা সময়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তিনি গত ৫০ বছরের বিভিন্ন বিক্ষোভ, হামলা ও সংঘাতে নিহত এবং গুরুতর আহত ব্যক্তিদের বিষয়টি সামনে এনেছেন।
এর মধ্যে ইউএসএস কোল হামলায় নিহত মার্কিন নাবিকদের পরিবার, বিভিন্ন সংঘাতে নিহত মানুষের পরিবার এবং ইরানের বিক্ষোভে নিহত ব্যক্তিদের পরিবারও রয়েছে।
এ ছাড়া গত পাঁচ মাসের যুদ্ধে নিহত ৫২ হাজার মানুষের পরিবারের জন্য ক্ষতিপূরণের দাবি তোলার কথা বলেছেন তিনি।
এভাবে ট্রাম্পের পাল্টা অবস্থান ইরানের সঙ্গে ভবিষ্যৎ আলোচনার সম্ভাব্য এজেন্ডাকে আরও বিস্তৃত করতে পারে।
সামনে আলোচনায় কোন বিষয়গুলো গুরুত্ব পেতে পারে
দুই দেশের বর্তমান অবস্থান বিবেচনায় ভবিষ্যৎ আলোচনায় কয়েকটি বিষয় বিশেষ গুরুত্ব পেতে পারে। প্রথমত, ক্ষতিপূরণের দাবি নিয়ে দুই পক্ষের অবস্থান। দ্বিতীয়ত, ইরানের ওপর থাকা অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা। তৃতীয়ত, ইরানের জব্দ করা সম্পদ। চতুর্থত, হরমুজ প্রণালির পরিস্থিতি।
এর পাশাপাশি আঞ্চলিক আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা নিয়েও ইরানের আপত্তি রয়েছে। আইআরজিসির বক্তব্য অনুযায়ী, আঞ্চলিক আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ বন্ধ করতে হবে।
ফলে সম্ভাব্য শান্তি আলোচনা হলে একাধিক জটিল ও পরস্পর সম্পর্কিত বিষয় একসঙ্গে বিবেচনা করতে হতে পারে।
ইরানের ক্ষতিপূরণ দাবি ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের অবস্থান এখন পাল্টাপাল্টি দাবিতে পরিণত হয়েছে। ইরান সাম্প্রতিক যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতির জন্য ক্ষতিপূরণ, নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং জব্দ করা সম্পদ ফেরত চাচ্ছে। এর বিপরীতে ডোনাল্ড ট্রাম্প গত ৫০ বছরের বিভিন্ন হামলা, সংঘাত ও প্রাণহানির জন্য ইরানের কাছ থেকে ক্ষতিপূরণ দাবি করার কথা জানিয়েছেন।
ট্রাম্প তার প্রতিনিধিদের ভবিষ্যৎ আলোচনায় বিষয়টি দৃঢ়ভাবে অন্তর্ভুক্ত করার নির্দেশ দিয়েছেন। ফলে দুই দেশের সম্ভাব্য শান্তি আলোচনায় ক্ষতিপূরণসহ হরমুজ প্রণালি, নিষেধাজ্ঞা ও জব্দ করা সম্পদের বিষয়গুলো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।





